অর্থনীতিতে স্বস্তি আনতে আমীর খসরুকে বেছে নিলেন তারেক রহমান
বুধবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ০২:০৬:০০
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার সরকার সাজিয়েছেন একঝাঁক নতুন মুখ নিয়ে। প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এ সরকারের আকার দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। এর মধ্যে ২৫ জন মন্ত্রী, আর ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক যাত্রায় দেশের একাদশ প্রধানমন্ত্রী হলেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে দুই দশক পর আবার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিল বিএনপি। আর তিন দশক পর নতুন একজন রাজনীতিবিদকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেল বাংলাদেশ।
দীর্ঘ সতের বছর লন্ডনে রাজনৈতিক আশ্রয়ে থাকার পর তিনি গত ২৫ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরেছিলেন এবং ৩০ ডিসেম্বর তার মা বাংলাদেশের তিন বারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর কয়েকদিন পর তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেন।
প্রথমবার সরকার পরিচালনার দায়িত্বে এসে বেশির ভাগ নতুনদের নিয়ে পথ চলার পরিকল্পনা করেছেন তারেক রহমান, যা দৃশ্যমান তার মন্ত্রিসভার তালিকাতে। তবে অভিজ্ঞদেরও সঙ্গী হিসেবে রেখেছেন তিনি।
বদলে যাওয়া বাংলাদেশে বিপুল প্রত্যাশার চাপ মাথায় নিয়ে তরী বাইতে গিয়ে সামাজিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ক্ষেত্রে নানা ঝড়-ঝঞ্ঝার মোকাবেলা করতে হবে তারেক রহমান সরকারকে, তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে ভঙ্গুর অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করা।
ছাত্র আন্দোলনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শাসনামল শেষে দেশ যখন গণতান্ত্রিক উত্তরণের চূড়ান্ত সোপানে, তখন পরবর্তী সরকার অর্থনীতির বন্ধুর পথ কেমন করে পাড়ি দেবে, সেই আলোচনা ঘুরেফিরে আসছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সংস্কারের প্রলেপ দেওয়ার আওয়াজ তুললেও সেখানে সফলতার পাল্লা ভারি হওয়ার বদলে ব্যর্থতাই উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে সকল খাতে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ দেড় দশকের ‘দুঃশাসনের’ পাতা উল্টে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর তাগিদ যেমন নতুন সরকারের ওপর থাকবে, তেমনি দুর্নীতি আর ভুল নীতির নির্মম শিকার অর্থনীতিকে সুস্থ করে তুলতে যথাযথ দাওয়াই ও শুশ্রূষার দরকার হবে।
দীর্ঘদিন ধরে চড়ে থাকা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, ব্যাংক খাতের ক্ষত নিরাময় এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার বহুমুখী চাপ মিলিয়ে কঠিন এক পথ পাড়ি দিতে হবে এই সরকারকে।
করোনা মহামারীর অভিঘাত আর চব্বিশের অভ্যুত্থান দেশের অর্থনীতিকে যে খাদের কিনারে পৌঁছে দিয়েছিল, সেখান থেকে উদ্ধারের বদলে নতুন করে পতন ঠেকানোতেই বেশি মনোযোগী ছিল অন্তর্বর্তী সরকার। রাষ্ট্র সংস্কারের বিরাট ডামাডোলে অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন বলতে তেমন কিছু হয়নি। বরং বর্তমান সরকার উত্তরসূরিদের জন্য যে অর্থনীতি রেখে যাচ্ছে, সেখানে যোগ হয়েছে বিনিয়োগের আস্থাহীনতা ও আইনশৃঙ্খলার অবনতি।
এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, সফল ব্যবসায়ী এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর হাতে। তিনি ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-১১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
স্বচ্ছ ভাবমূর্তি ও কূটনৈতিক শিষ্টাচারের জন্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী রাজনীতিতে বিশেষভাবে সমাদৃত। তিনি ২০০১ সালে খালেদা জিয়ার মন্ত্রসভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আমীর খসরু ১৯৪৯ সালে চট্টগ্রাম জেলার পাহাড়তলী থানার উত্তর কাট্টলীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আলহাজ্ব মাহমুদুন্নবী চৌধুরী ও মাতার নাম মেহেরুন্নেসা বেগম চৌধুরী।
আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী শিক্ষাজীবন শেষ করে তার পিতার ব্যবসায় যুক্ত হন। তিনি চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠা (সিএসই) করেন এবং চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি চট্টগ্রাম চেম্বার অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক সভাপতি ও দক্ষিণ এশিয়া এক্সচেঞ্জ ফেডারেশনের প্রথম সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে বিজয়ী হয়ে আসনটি ছেড়ে দেওয়ার পর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে উপনির্বাচনে বিজয়ী হন। একই আসন থেকে ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে সংসদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হন।
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি চট্টগ্রাম-১০ থেকে নির্বাচন করেন এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী এম আবদুল লতিফের কাছে পরাজিত হন।
২০০১ সালের নির্বাচনে তার নিজ দল বিএনপি সরকার গঠন করলে একই বছরের ১০ অক্টোবর তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হন এবং ২০০৪ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
‘বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার’
তারেক রহমানের মন্ত্রিসভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পাওয়ার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অর্থনীতিতে নানা চ্যালেঞ্জ আছে। সেই চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া হবে। বলে জানিয়েছেন। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে গতিশীল করতে ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সহজ করা এবং ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির (জিডিপি প্রবৃদ্ধি) পথে বাধা হিসেবে চিহ্নিত দুর্নীতি ও চাঁদাবাজি দমনে কার্যকর পদক্ষেপ এই সরকার। এটা আমাদের অঙ্গীকার।”
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানো এবং ব্যবসার খরচ কমাতে নিয়ন্ত্রণ শিথিল (ডিরেগুলেশন) করা হবে বলে জানান তিনি।
আমির খসরু বলন, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের হার এবং গ্যাস ও বিদ্যুতের বাড়তি মূল্য বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে সীমিত করছে।
“এমন বাস্তবতায় ঋণের সুদের হার সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনা, আমলাতান্ত্রিক বাধা দূর করা এবং ব্যবসা সহজীকরণ নীতিই হবে আমাদের সরকারের অগ্রাধিকার।”
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে অনেক চ্যালেঞ্জ’ রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত হ্রাস পাচ্ছে, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে দুর্বলতা রয়েছে এবং পুঁজিবাজারও সংকটে রয়েছে।
“যদিও মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, তবুও তা এখনো উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি তীব্রভাবে কমেছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি দুর্বল অবস্থায় আছে, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমে গেছে এবং দারিদ্র্য বাড়ছে।”
“এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ আমাদের বড় ও কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং অতীতের সরকারগুলোর তুলনায় আরও কঠোর সংস্কার প্রয়োজন হবে।”
“অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা নির্ধারণ করতে একটি সমন্বিত পর্যালোচনা করা হবে। এরপর দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে একটি রোডম্যাপ প্রণয়ন করা হবে,” বলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।