Beta
সোমবার, ৪ মার্চ, ২০২৪

পাল্টা আঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের দেরি হলো, না দেরি করল

জর্ডানে ইরাকের সশস্ত্র ইসলামি প্রতিরোধ গোষ্ঠীর হামলায় নিহত মার্কিন সেনাদের শেষকৃত্যানুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ছবি: এপি।

জর্ডানে ড্রোন হামলায় তিন আমেরিকান সেনা নিহত ও ৪১ জন আহত হওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পর ইরাক ও সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধমূলক হামলা শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

গত রবিবার জর্ডানের সিরিয়া সীমান্তের কাছে একটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ওই হামলা চালায় ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠী ইসলামি প্রতিরোধ। এরপর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী দল রিপাবলিকান পার্টির নেতারা ক্ষমতাসীন ডেমোক্রেট সরকারকে ইরানের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য চাপ দিতে শুরু করে।

কিন্তু ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাদের কথায় কান না দিয়ে ধীরে-সুস্থে এগোন। এতে তাকে অনেক প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়।

তবে, পররাষ্ট্র নীতি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাইডেনের ধীরে চলো নীতির ফলে ইরাক ও সিরিয়ার স্থাপনাগুলো থেকে ইরান তার সেনাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি এবং বড় কোনও সংঘর্ষের ঝুঁকিও এড়ানো গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক সাবেক উপ-সহকারী প্রতিরক্ষা সচিব মিক মুলরয় বিবিসিকে বলেছেন, “নিজের সেনাদের সরিয়ে নিয়ে ইরাক-সিরিয়ার মিলিশিয়াদের যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার সক্ষমতা কমানোর সুযোগও পেয়েছে ইরান, যাতে উত্তেজনা আর না বাড়ে।

“যদিও এতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাদের ওপর মিলিশিয়াদের আক্রমণ পুরোপুরি বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তবে, এর সবচেয়ে বড় লাভ হলো এতে আপাতত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হবে।”

শুক্রবার রাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) আল কুদস ফোর্স এবং ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের মোট ৭টি স্থানে হামলা চালিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের হিসাব মতে, মার্কিন বোমারু বিমানগুলো সিরিয়ায় ৪টি ও ইরাকে ৩টি স্থানে ৮৫টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে।

আল জাজিরা জানায়, ইরাক ও সিরিয়ার সরকার এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তবে ইরান এখনও কিছু বলেনি।

হামলাগুলো প্রধানত ইরানের আইআরজিসির আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ও সশস্ত্র বাহিনী শাখা কুদস ফোর্সকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বলেছেন, আবহাওয়া খারাপ থাকায় এই হামলা চালাতে দেরি হয়েছে। তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ এবং বড় কোনও যুদ্ধ এড়াতেই যুক্তরাষ্ট্র প্রতিশোধ নিতে দেরি করেছে।

অ্যারাবিয়ান গাল্ফ স্টেটস ইনস্টিটিউট অব ওয়াশিংটনের গবেষক হুসেইন ইবিশ বিবিসিকে বলেন, “হামলা চালাতে দেরি করে যুক্তরাষ্ট্র মূলত ইঙ্গিত দিতে চাইছে যে, তারা ইরানের ভেতরে হামলা চালাবে না।”

মিক মুলরয় বিবিসিকে বলেন, “দেরি করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত যেসব স্থাপনায় হামলা হবে সেসব থেকে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী বাহিনীর সদস্যদের সরে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে।”

শুক্রবার রাতের এই হামলাও খুব বড় কিছু ছিল না। মাত্র ৩০ মিনিট সময় ধরে হামলা চালানো হয়েছে। মার্কিন সেনাবাহিনীর সক্ষমতার তুলনায় এই হামলার তীব্রতা অনেক কম ছিল। মার্কিন প্রতিরক্ষা সচিব লয়েড অস্টিন যদিও বলছেন, এটা সবে মাত্র শুরু, তবে সামরিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র এর চেয়ে বড় পরিসরে হামলা আর নাও চালাতে পারে।

এতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন বিরোধীদের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছেন। রিপাবলিকানরা তার বিরুদ্ধে ইরানের প্রতি যথেষ্ঠ কঠোর না হওয়ার অভিযোগ এনে আক্রমণ শানাচ্ছেন।

রিপাবলিকানরা বলছেন, এতে ইরানের আয়াতুল্লাহরা আরও আশকারা পেয়ে যাবে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ইরান-সমর্থিত মিলিশিয়াদের হামলাও বন্ধ হবে না।

তবে গবেষক হুসেইন ইবিশ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রকে এখন বড় কোনও সংঘাতে জড়ালে যে, পরিণতি ভালো হবে না এবং ডেমোক্রেটরা মার্কিন জনগণের জনসমর্থন হারাতে পারে তা বাইডেন খুব ভালো করেই জানেন।

হুসেইন ইবিশ বলেন, “রিপাবলিকানরা ইরানে হামলা চালানোর উস্কানি দিচ্ছে মূলত আসন্ন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে সামনে রেখে বাইডেনকে ফাঁদে ফেলার জন্য। ডেমোক্রেটরা ইরানে হামলা চালানোর অনুমোদন দিলে ডোনাল্ড ট্রাম্পরাই তখন আবার বাইডেনকে যুদ্ধবাজ আখ্যা দিয়ে নিন্দা করবেন। এটি একটি রাজনৈতিক ফাঁদ। তবে ডেমোক্রেটরা সেই ফাঁদে পা দেবে না বলেই মনে হচ্ছে।”

সিএনএন এর বিশ্লেষণে বলা হয়, ইরান বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই যুদ্ধ চায় না। আর কয়েকমাস পরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। ফলে বাইডেন প্রশাসন এখন ব্যয়বহুল কোনও যুদ্ধে জড়িয়ে জনসমর্থন হারানোর ঝুঁকি নেবে না। বাইডেন এমনিতেই ইসরালের প্রতি তার অকুণ্ঠ সমর্থনের নীতি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন। তেলের দামও বাড়ছে।

অন্যদিকে, ইরানের অর্থনীতি এখনও নড়বড়ে। অভ্যন্তরীণ অস্থিরতাও পুরোপুরি থামেনি। আর ইরানের প্রধান লক্ষ্য এখন রাশিয়ার সঙ্গে তার কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করে আঞ্চলিক প্রভাব বাড়ানো এবং পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের অবিরাম চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ব্যয়বহুল যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে ইরানের পারমাণবিক শক্তি অর্জন প্রচেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হবে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist