Beta
বুধবার, ২২ মে, ২০২৪
Beta
বুধবার, ২২ মে, ২০২৪
সিপিডির গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা

বিদেশি ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ঢাকার গুলশানে লেকশোর হোটেলে বৃহষ্পতিবার গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে সিপিডি।
ঢাকার গুলশানে লেকশোর হোটেলে বৃহষ্পতিবার গোলটেবিল বৈঠক আয়োজন করে সিপিডি।
Picture of প্রতিবেদক, সকাল সন্ধ্যা

প্রতিবেদক, সকাল সন্ধ্যা

বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ক্রমাগতভাবে বাড়ছে, যা পরিশোধে সরকারকে আবারও ঋণ করতে হচ্ছে। এর কারণ, যে পরিমাণ রাজস্ব আদায়ের আশা করা হয়েছিল, তা হচ্ছে না।

এ পরিস্থিতিতে ঋণ বহন ও পরিশোধের সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকের বক্তারা।

ঢাকার গুলশানে লেকশোর হোটেলে বৃহষ্পতিবার এই বৈঠক আয়োজনে সহায়তা করে এশিয়া ফাউন্ডেশন।

‘বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ ও সুদ পরিশোধের চিত্রে উদ্বেগের কি কোনও কারণ আছে?’ শীর্ষক ওই গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার ফলে সৃষ্ট উদ্বেগগুলো তুলে ধরে বক্তব্য দেন। এসময় তারা সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নে উচ্চ সুদে ঋণ নেওয়ায় দেশে বিদেশি মুদ্রার সংকট ও এর প্রভাবে আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় ভোক্তাদের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়ছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করেন।

বৈঠকে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, “প্রকৃতপক্ষে আমরা সরকার ও সরকারের গ্যারান্টিযুক্ত ঋণের দায়বদ্ধতার একটি বড় অংশ পরিশোধের জন্য ঋণ নিচ্ছি। তাই দ্রুত অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ বাড়ানো ছাড়া কোনও বিকল্প নেই।”

২০২৩ সালের জুনে বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি বিদেশি ঋণ ছিল ৯৮ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা একই বছরের সেপ্টেম্বরে ১০০ বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করেছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বিদেশি ঋণ-জিডিপি অনুপাত ২১ দশমিক ৬ শতাংশ, তুলনামূলকভাবে তা বেশি নয়।

তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, “ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

অনুষ্ঠানে সিপিডি জানিয়েছে, ঋণ পোর্টফোলিওর গঠন দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। রেয়াতি ঋণের অনুপাত কমছে, অন্যদিকে রেয়াতি ও বাজারভিত্তিক ঋণের অংশ বাড়ছে। ঋণের শর্তাবলীও আরও কঠোর হচ্ছে।

বিশেষ করে জিডিপি, রাজস্ব আয়, রপ্তানি, রেমিটেন্স ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের সঙ্গে তুলনা করলে বৈদেশিক ঋণ ও ঋণ পরিশোধের দায়বদ্ধতার দ্রুত বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।

বাংলাদেশের রাজস্ব-জিডিপি অনুপাত বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন—এ তথ্য জানিয়ে মোস্তাফিজুর বলেন, “এর সঙ্গে ঋণ বহনের সক্ষমতা ও ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা উদ্বেগ তৈরি করেছে। দিন শেষে অভ্যন্তরীণ সম্পদ সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ, যা অভ্যন্তরীণ ও বিদেশি উভয় ঋণ পরিশোধের জন্য বিবেচনা করতে হবে।”

অভ্যন্তরীণ সম্পদের একটি ক্রমবর্ধমান অংশ দেশি ও বিদেশি ঋণের মূল ও সুদ পরিশোধে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

সিপিডির বিশেষ ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, “তিন বছর আগে মানুষের মাথাপিছু ঋণের পরিমাণ ছিল এক লাখ টাকা। এখন তা দেড় লাখ টাকায় দাঁড়িয়েছে।  

“বিগত বছরগুলোতে সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পের ৭০ শতাংশ ঋণ নেওয়া হয়েছে বিভিন্ন অবকাঠামো তৈরিতে। ফলে খাতভিত্তিক উন্নয়ন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।”

এসব প্রকল্প থেকে ‘একটি গোষ্ঠী লাভবান হয়েছে’ মন্তব্য করে দেবপ্রিয় বলেন, “গত দেড় দশকে ঋণ করে অনেক মেগা প্রকল্প করেছে সরকার। তা সবার উন্নতিতে কাজে আসেনি। ঋণ বাড়লেও বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নতি হয়নি।”

উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে সিপিডির প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান রেহমান বলেন, “আমরা আশির দশকে যেসব বিদেশি ঋণ নিয়েছিলাম সেগুলির দুটি দিক ছিল। এক, আমরা অনেক বেশি ঋণ করেছিলাম। দ্বিতীয় বিষয়টি ছিল, ঋণগুলো ছিল স্বল্প মেয়াদি।”  

স্বল্প মেয়াদি ঋণের কারণে শ্রীলংকাকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে গিয়েছিল উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, “আমাদের দেশের বিদেশি ঋণের মধ্যে স্বল্প মেয়াদি ঋণ বেশি নয়। ফলে এটা একটি ভালো দিক।” তবে সেই ঋণের সঠিক ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেন তিনি। 

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, “আমাদের এখানে বিপুল আকৃতিতে দুর্নীতি হচ্ছে বড় বড় প্রকল্পগুলোতে। এই যে বেশি বেশি ঋণ নিয়ে বেশি বেশি প্রকল্প করা, তার মধ্যে দিয়ে দুর্নীতির জাল অনেক বড় হচ্ছে। কারণ, এখানে কোন জবাবদীহিতা নেই। এই প্রকল্পগুলো পরিবেশ-প্রতিবেশের জন্য কতটা ক্ষতিকর তার সঠিক মূল্যায়ন হচ্ছে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন আছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমান আলোচকদের বক্তব্য খণ্ডাতে চেষ্টা করেন। এসময় তিনি বিদেশি ঋণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, “যতদিন পর্যন্ত অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় ও অভ্যন্তরীণ অর্থয়ানপুষ্ট বিনিয়োগ না বাড়বে, ততদিন পর্যন্ত বিদেশি সহায়তা, বিদেশি ঋণ ও বিদেশি বিনিয়োগ দরকার হবে। এগুলোর কোনোটি ঋণ খারাপ নয়।”

তিনি বলেন, বিনিময় হার বিশ্বব্যাপি একটি অভিঘাতের মধ্যে পড়ে করোনা মহামারী, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ, হামাস-ইসরায়েল ইস্যুতে। এর মধ্যে দিয়ে সরবরাহ ব্যবস্থা ও উৎপাদনে কিছুটা বিশৃংখলা দেখা দিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, “আমরা অনেকদিন ধরে টাকাকে অতিমূল্যায়িত করে রেখেছিলাম। যখন এই আঘাতগুলো বিশ্বব্যাপী প্রভাব ফেলে তখন আর টাকার এই অবস্থান ধরে রাখা যায়নি। টাকাকে অবমূল্যায়িত করতে হয়েছে।”

তবে সামগ্রিকভাবে টাকার অতিমূল্যায়নের ওপর নির্ভর না করে উৎপাদন বৃদ্ধির ওপরে জোর দেন অর্থ উপদেষ্টা।

তিনি বলেন, বিদেশি মুদ্রার সরবরাহ বাড়াতে হলে বিনিময় হারের থেকে বেশি কাজে আসবে রপ্তানি খাতের উৎপাদন বাড়ানো। এজন্য বিনিয়োগও বাড়াতে হবে, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে হবে। টাকার অবমূল্যায়ন করে রপ্তানি বাড়ানো যাবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর সালেহউদ্দিন আহমেদ বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দেন।

তিনি বলেন, “বিদেশিরা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে চায় না, কারণ এখানে প্রতিটি টেবিলে ঘুষ দিয়ে কাজ করাতে হয়। এ কারণে অনেকে বিদেশি বিনিয়োগ করতে আসে না।”

বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন এশিয়া ফাউন্ডেশনের কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টেটিভ কাজী ফয়সাল বিন সেরাজ, এমসিসিআইর সভাপতি কামরান টি রহমান, এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ নূরুল আমিন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত