Beta
মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০২৪
Beta
মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০২৪

কলাম

মনে মনে ওকে ডাকি— দুর্গা, ধাত্রী দুর্গা

আফসান চৌধুরী। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার

‘সকাল সন্ধ্যা’ সংবাদমাধ্যম থেকে যখন লিখতে বলল, বললাম মানুষ নিয়ে লিখব। আমার এই ৭২ বছরের জীবনে যত মানুষের সাথে দেখা হয়েছে বা এখনো দেখা হয় তাদের কয়েকজনকে নিয়ে লিখব। যাদের কথা এখনও মনে পড়ে তাদের কথা। বড় বড় মানুষ বা স্থান কোনওটাই বেশি ভালো লাগে না। পৃথিবীর এত স্থানে গেছি, কত কিছু দেখেছি, দাগ কাটেনি। তাই যারা মনের ঘরে বাস করে তাদের নিয়ে একটা নিয়মিত কলাম লিখব। কর্তৃপক্ষও রাজি হলো। তাই স্মৃতির ভাঙা ঠেলাগাড়ি টানা শুরু করলাম। দেখা যাক এই ঠেলাগাড়ি কতদূর যায়।

২.

আমার কর্মজীবনের বেশির ভাগ সময় কেটেছে ১৯৭১-এর যুদ্ধের ঘটনা নিয়ে কাজ করে। হয় গবেষণা, না হয় পাঠ, না হয় লিখে। আর  ১৯৭১-এর ইতিহাস মানে সবই মানুষের গল্প। সশস্ত্র যুদ্ধ, জাতিসংঘ, রাজনীতি ইত্যাদি। তাতেও মানুষই আসে মূল ভূমিকায়। মানুষের ছায়াচিত্র ভরা সময়। চরম সময় আর চরম মূহুর্তে মানুষ সব পারে, সব করে, সব ধরনের অভিজ্ঞতাও হয়। তাই ১৯৭১ আমার কাছে স্বাধীনতার যুদ্ধ, মানুষের বাঁচা-মরার কাল। বিশ্ব মানব ইতিহাসের একটি ক্ষুদ্র সংস্করণ।

 ৩.

অদ্ভুত বিষয় হলো, যাকে নিয়ে আজ লিখতে বসেছি তাকে কোনওদিন দেখিনি, দেখা হয়নি। অথচ ঘটনাটা শোনার-জানার ৩৫ বছর পর তার কথা বলতে গেলে আজও আমার গলা ধরে আসে। তের-চৌদ্দ বছরের এক মেয়ে, যার নামও জানিনা। যে আমাকে মেয়েটার কথা বলেছিল সেও নাম জানেনা। অচেনা, পথে দেখা হওয়া মানুষ। তাও মাঝে মাঝে, মনে মনে বা আলাপে ওকে একটা নামে ডাকি— দুর্গা, ধাত্রী দুর্গা। এমন সব মানুষ মিলেই আমাদের ইতিহাসের ধাত্রী।

৪.

মেয়েটি আত্মীয়দের সঙ্গে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছিল। একাত্তরের জুলাই-আগস্ট মাস বোধহয়। দেশের নানা জায়গা থেকে ২০-২৫ জন মানুষ জড়ো হয়েছিল কুমিল্লার কসবার কাছে। যে লোক এই ঘটনা আমাকে বলেছিল সে ফরিদপুরের বাসিন্দা।

জানের ভয়ে কুঁকড়ে থাকা মানুষগুলো কোনওভাবে রাত কাটালেও সকালবেলা একটা দুঃসংবাদ পায়। ওই এলাকায় দিন দুয়েক আগে পাকিস্তানি আর্মি আক্রমণ চালায় গানবোট নিয়ে। কয়েকটা নৌকা ধ্বংস হয়, মাঝিদের অনেকেই নৌকা ফেলে পালিয়ে যায়। নৌকা পাওয়া যাচ্ছেনা কয়দিন ধরে। আর তাদের পার করার জন্য ঠিক করা দালালকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছেনা।

সন্ত্রস্ত মানুষগুলো তবুও ঠিক করে, যে করেই হোক সেদিনই তারা ইন্ডিয়ায় চলে যাবে। আবার যদি আক্রমণ হয়! কারণ ওদের ভয় ছিল আর্মিরা হয়ত খবর পেয়ে যাবে এতগুলো নতুন মানুষের গ্রামে আসার।

৫.

গ্রামের এক মানুষ তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়। ফেনী নদীর একটি তুলনামূলক শীর্ণ স্থানে তারা দাঁড়িয়ে থাকে নৌকার আশায়। কোনো নৌকার চেহারা চোখে পড়েনি। তারপরও নিরুপায় হয়ে তারা ঠিক করে যে, ভেসে বেড়ানো কচুরিপানা দিয়ে ভেলার মতো কিছু একটা বানিয়ে হলেও তারা নদী পার হবে। খানিকটা এগিয়ে গেলে নদীর স্রোতের টানে ওপাড়ে চলে যেতে পারবে। “এছাড়া আমাদের কোনো উপায় ছিল না। আমাদের মাথা ঠিক ছিল না, আমরা জানতাম না কী করছি, আমরা কেবল জানে বাঁচতে চাইছিলাম।’’

৬.

বয়স্ক, নারী আর বাচ্চাদের বসানো হয় ভেলায়, বাকিরা কচুরিপানার লতা-পাতার ভেলা হাতে ধরে পা ছুঁড়তে থাকে, ওটা ঠেলে নদী পার হওয়ার চেষ্টায়। কাজটা সহজ ছিল না, কিন্তু তবুও তারা হাত-পা ছুঁড়ে নদীর পানিতে সাঁতরাচ্ছিল। এই ভেলা ধরে শরীরটা নদীর পানিতে রেখে তারা পার হচ্ছিল। কিন্তু ওতে বসা কয়েকজন মানুষের ভারেই ভেলাটা পানিতে ডুবতে শুরু করে।

৭.

এর মধ্যে এক মা, যিনি নিজের শিশুটিকে এক হাতে ধরে রেখেছিলেন তিনি ভয়ে চিৎকার শুরু করে দেন। সেই মা’কে সবাই চুপ করতে বলছিল। কারণ তার আওয়াজ শুনে পাকিস্তানি আর্মি এত মানুষের অস্তিত্ব টের পেয়ে যেতে পারে। যদি আর্মি আসে? কিন্তু মহিলাটি চুপ করছিল না। এমন পরিস্থিতিতে আগে কখনও পড়েনি কেউ।

৮.

সেই কিশোরী মেয়েটি ভেলার একটি কোণা ধরে ভেসে ভেসে যাচ্ছিল। মেয়েটি খুব উদ্বিগ্ন হয়ে ওই মা’কে চুপ করতে বলছিল। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছিল না। ‘‘মাসি, আমরা সবাই আছি, আপনার কিচ্ছু হবে না।’’ কিন্তু মহিলাটি কারও কথা শুনছিল না। সবাই তটস্থ, ভীত। কিন্তু ভগবান জানে ওই কিশোরী মেয়েটির কী মাথায় এল! মেয়েটি ভেলাটা ছেড়ে দিয়ে পানির অতলে মিলিয়ে গেল। যাতে করে অন্তত একটা বাড়তি মানুষের বোঝা কমে। ‘‘আমাদের চোখের সামনে মেয়েটি ডুবে গেল। সবাইকে বাঁচাতে গিয়ে মেয়েটা প্রাণ দিল।’’

৮.

একটা মানুষকে ওইভাবে স্বেচ্ছায় তলিয়ে যেতে দেখে সবাই স্তম্ভিত ও নির্বাক হয়ে যায়। কারও কিছুই করার ছিল না, কারণ মেয়েটি তো আর নেই। তাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। হতবুদ্ধি, হতবাক ওই শিশুকন্যার মা’ও নীরব হয়ে যায়। আর এক সময় তারা নদী পেরিয়ে ওপাড়ে পৌঁছেও যায়।

যে মানুষ পানিতে তলিয়ে যায় অন্যের প্রাণ বাঁচাবার জন্য সেই মানুষের চেয়ে বড় ত্যাগ করা কি সম্ভব? কিশোরী মেয়েটি নিজের প্রাণ দিয়েছিল অন্যদের প্রাণ বাঁচাতে।

১৯৭১ সালের এমন অগুনতি ঘটনা আমাদের মধ্যকার শ্রেষ্ঠতম মানুষদের সঙ্গে আমাদেরকে পরিচিত করে দিয়েছে। অথচ সাধারণ মানুষের এমন অসাধারণ সব অচেনা ইতিহাস জানার বিষয়ে কারও আগ্রহ নেই।

লেখক: মুক্তিযুদ্ধ গবেষক, লেখক ও শিক্ষক

ইমেইল: afsan.c@gmail.com

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত