Beta
সোমবার, ২০ মে, ২০২৪
Beta
সোমবার, ২০ মে, ২০২৪

মোড়ক উন্মোচনেই এত আলোচনা যে বই নিয়ে

‘ফিফটি ইয়ার্স অব বাংলাদেশ : ইকোনোমি, পলিটিক্স, সোসাইটি অ্যান্ড কালচার’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান।
‘ফিফটি ইয়ার্স অব বাংলাদেশ : ইকোনোমি, পলিটিক্স, সোসাইটি অ্যান্ড কালচার’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান।
Picture of প্রতিবেদক, সকাল সন্ধ্যা

প্রতিবেদক, সকাল সন্ধ্যা

অর্ধ শতক কাল কীভাবে পেরিয়ে এল বাংলাদেশ, তা নিয়ে ১৭ জনের লেখনী এক মোড়কে এল যে বইয়ে, তার আনুষ্ঠানিক উন্মোচন হলো।

‘ফিফটি ইয়ার্স অব বাংলাদেশ : ইকোনোমি, পলিটিক্স, সোসাইটি অ্যান্ড কালচার’ শিরোনামের বইটি প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রকাশনা সংস্থা রুটলেজ।

বইটিতে বলা হয়েছে, গত ৫০ বছরের মধ্যে ২৪ বছরই বাংলাদেশ কর্তৃত্ববাদী শাসনে ছিল। এর বাইরে নয় বছর ছিল সরাসরি সামরিক শাসনে। ১৭ বছর ছিল প্রতিযোগিতামূলক দল ব্যবস্থায়। তবে এই সবগুলো পর্বই ছিল মূলত অনুদার এবং সংকীর্ণ শাসন পর্ব।

দেশে-বিদেশে অবস্থানরত ১৭ জন ব্যক্তির লেখা রয়েছে এই বইয়ে। তাদের মধ্যে যারা বাংলাদেশে অবস্থান করছেন, তাদের অনেকেই এখনও বইটি হাতে পাননি। তবে দেশের বাইরে যারা, তারা বইটি সংগ্রহ করতে পেরেছেন।

বৃহস্পতিবার ঢাকার ধানমণ্ডিতে সিপিডির কার্যালয়ে বইটির মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠান হয়। যেখানে এর সম্পাদক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান এবং সিপিডির সম্মানীয় ফেলো রওনক জাহান ছিলেন।

রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান বলেন, “বইটির ১০টি কপি আমরা আনার জন্য চেষ্টা করেছি। এর মধ্যে ৫টি কপি পেয়েছি। আর ৫টি কপি অনেক বার যোগাযোগ করেও আনতে পারা যায়নি। বইগুলো ঠিক কী কারণে বাংলাদেশের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ ছাড় করছে না তা বুঝতে পারছি না।”

এরপর অনুষ্ঠানে বইয়ের লেখকরা তাদের নিজ নিজ নিবন্ধর সারাংশ তুলে ধরেন। লেখকদের একটি অংশ স্বশরীরে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। কয়েকজন ভার্চুয়ালি যোগ দেন। দুজন লেখক ছিলেন অনুপস্থিত।

বক্তারা জানান, বইটিতে বাংলাদেশের ৫০ বছরে উন্নয়ন যাত্রা, এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তর এবং রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার বহুমুখী মাত্রা চিত্রিত করা হয়েছে। ছয়টি বিভাগে ১৬টি নিবন্ধর মাধ্যমে দেশটির পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল সংক্রান্ত বহু-বিষয়ক, সামগ্রিক এবং আন্তঃসম্পর্কিত বর্ণনা রয়েছে।

বইটির প্রধান চারটি বিভাগের নিবন্ধগুলো পড়ে তার ওপর পর্যালোচনামূলক বক্তব্য তুলে ধরেন তিনজন বক্তা। তারা হলেন- প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, বিশ্ব ব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফেরদৌস আজিম।

এছাড়া ইংরেজি দৈনিক ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারও অনুষ্ঠানে ছিলেন। তবে তারা কিছু বলেননি।

বইটিতে ‘ভূমিকা : বাংলাদেশের রূপান্তর, প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও প্রতিবন্ধকতা’ শিরোনামের নিবন্ধটি যৌথভাবে লিখেছেন রেহমান সোবহান ও রওনক জাহান।

এছাড়া ‘অর্থনৈতিক রূপান্তর’ বিভাগে ‘পলিসি অ্যাকশন্স, মার্কেট রেসপন্স অ্যান্ড ইকোনোমিক গ্রোথ অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক নিবন্ধটি লিখেছেন বিশ্ব ব্যাংক গ্রুপের সাবেক বেসরকারি খাত বিষয়ক প্রধান বিশেষজ্ঞ সৈয়দ আখতার মাহমুদ।

‘বাংলাদেশ ইন ডুয়াল ট্রানজেশন : অ্যাটেন্ড্যান্ট চ্যালেঞ্জেস অ্যন্ড দ্য নেক্সট স্টেপ’ শীর্ষক নিবন্ধ লিখেছেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান লিখেছেন ‘ইনস্টিটিউশনাল চ্যালেঞ্জেস ইন বাংলাদেশ’স ইকোনোমিক ট্র্যান্সফরমেশন’ শীর্ষক নিবন্ধ।

রাজনীতি সংক্রান্ত বিভাগে ‘ইভোলুশন অফ স্টেট-সোসাইটি রিলেশন্স ইন বাংলাদেশ ওভার দ্য লাস্ট ফাইভ ডিকেডস : অ্যান অ্যানালিটিক্যাল ন্যারেটিভ’ শীর্ষক নিবন্ধ লিখেছেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেেভলপমেন্টের (বিআইজিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মির্জা এম হাসান। যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলী রীয়াজ লিখেছেন ‘ইসলামিস্ট পলিটিক্স ইন বাংলাদেশ : দ্য নেচার, স্কোপ, অ্যান্ড দ্যা পাথওয়ে’ শীর্ষক নিবন্ধ। নরওয়ের লেখক ইউনিভার্সিটি অব অসলোর সাউথ এশিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক আরিলড এঙ্গলসেন রাড লিখেছেন ‘স্টেট-মেকিং, ভায়োলেন্স, অ্যান্ড পলিটিকাল মাসল : বাংলাদেশ অ্যাজ অ্যা পলিক্রেটিক স্টেট’ শীর্ষক নিবন্ধ।

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান রাজনীতি বিষয়ক তিনটি নিবন্ধ পর্যালোচনা করে বলেন, “এই তিনটি লেখা বাংলাদেশের রাজনীতির গতিধারা জানতে, বুঝতে আমাদের সাহায্য করবে। এই লেখাগুলো পড়লে আমরা যারা পত্রিকায় প্রতিদিন অনেক ঘটনা ছাপি, সেগুলির সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে আমরা বুঝতে পারি, আমরা কোন জায়গায় এসে পৌঁছেছি ৫০ বছর পর।

“মির্জা হাসান তার নিবন্ধে বলেছেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থা মূলত তিনটি রূপ গ্রহণ করেছে। কর্তৃত্ববাদী দলের রাষ্ট্র, যেটা এখন চলছে। সামরিক শাসন, প্রতিযোগিতামূলক দল ব্যবস্থা। যেটা শেষ পর্যন্ত সেই কর্তৃত্ববাদী দলের শাসন ব্যবস্থার মধ্যেই পৌঁছে যায়।”

মতিউর রহমান বলেন, “এই নিয়ে তর্ক-বিতর্ক কিছু হতে পারে। তবে লেখক তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আমার কাছে সেই ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে।”

“কর্তৃত্ববাদী দলের শাসনে রাজনৈতিক অভিজাতরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। কয়েক দশকে ব্যক্তি খাতে ব্যবসা-বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ব্যবসায় খাত এখন আগ্রহী রাজনৈতিক অভিজাত শ্রেণীর সঙ্গে চক্র গড়ে তুলে সুবিধা পেতে। আমরা যদি বেসরকারি ব্যাংকের ক্ষেত্রে দেখি, গার্মেন্ট সেক্টরের দিকে দেখি, তাহলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে আমাদের সামনে,” বলেন তিনি।

মতিউর রহমান বলেন, “আলী রীয়াজ বলেছেন, ১৯৭৫ সালের পরে ইসলামিক রাজনীতিকে রাষ্ট্র পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। ২০১৩ সালের পর পৃষ্ঠপোশকতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বিশেষ করে শাসক দলের হেফাজতে ইসলামীর সঙ্গে শোক, ইসলামি দলের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাসহ সামাজিক এজেন্ডা গ্রহণের মাধ্যমে।

“সাধারণভাবে সেকুলার দলগুলো ইসলামীকরণে ভূমিকা রাখছে। ২০০০ সালে জামায়াত ইসলামী ও ইসলামী ঐক্য জোটের সঙ্গে বিএনপি ঐক্য করে। আওয়ামী লীগ ঐক্য করে খেলাফতে মজলিশের সঙ্গে, যদিও পরে তারা সেটা বাতিল করে। আমরা এখন দেখি সরকারি দল ও প্রধান বিরোধী দল তাদের জোটে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বেশি বেশি ইসলামী দল যুক্ত করতে চেষ্টা করে।”

অসলোর গবেষক রাডের লেখা ধরে মতিউর রহমান বলেন, তিনি এক হিসাব দিয়েছেন, ২০০২ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১৪ হাজার ১২৭টি ঘটনায় ২ হাজার ৪১৮ জন নিহত হন সংঘর্ষে। ২০০৬ সাল থেকে ২০১২ সালে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলো বিএনপি সঙ্গে প্রায় ২ হাজার সংঘর্ষে জড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ হয় প্রায় দেড় হাজারটি। বিএনপির নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ হয় এর প্রায় অর্ধেক সংখ্যক।

বইয়ে লেখকদের মধ্যে রয়েছেন রিজওয়ানুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক এম এম আকাশ, ইউনিভার্সিটি ব্রুনাই দারুসসালামের অধ্যাপক ড. ইফতেখার ইকবাল, ইউএনডিপির এইচডিআরও প্রকল্পের সাবেক পরিচালক সেলিম জাহান, ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (সিনিয়র ফেলো) ড. সোহেলা নাজনীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ড. ফখরুল আলম, স্থপতি কাজী খালেদ আশরাফ, অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান।

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এর আগে রওনক জাহানের বাংলাদেশের ২৫ বছর নিয়েও একটি বই প্রকাশ হয়েছিল। এটা তাদের ধারাবাহিক প্রকাশনা।

অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান বলেন, এই বইয়ের সবগুলো লেখাই একটি আরেকটির সঙ্গে সম্পর্কিত।

তিনি এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত