Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪

প্রাচীন বাংলার ইতিহাসের বাতিঘর মমিন চৌধুরী আর নেই 

ABDUL MOMIN CHOWDHURY
Picture of প্রতিবেদক, সকাল সন্ধ্যা

প্রতিবেদক, সকাল সন্ধ্যা

বাংলার প্রাচীন ইতিহাস পুনর্গঠনের বাতিঘর বরেণ্য ইতিহাসবিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের প্রখ্যাত অধ্যাপক ড. আবদুল মমিন চৌধুরী মারা গেছেন। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন তিনি। শুক্রবার ভোরে ঢাকার লালমাটিয়ায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই ইতিহাসবিদ। তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

ড. আবদুল মমিন চৌধুরীর মৃত্যু সংবাদ সকাল সন্ধ্যাকে নিশ্চিত করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম খাদেমুল হক। তিনি বলেন, ‘‘অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চার জীবন্ত কিংবদন্তী ছিলেন। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চার ক্ষেত্রে অপূরণীয় শূন্যতা সৃষ্টি হলো।’’

বাংলার প্রাচীন ইতিহাস বিশেষত, পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের ইতিহাস পুনর্গঠনে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের বরেণ্য অধ্যাপক ড. আবদুল মমিন চৌধুরী।

গত শতকের মধ্যভাগ পেরিয়েও বঙ্গের প্রাচীন ইতিহাস চর্চায় পশ্চিম ও উত্তর বঙ্গের রাজবংশগুলোর ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়েই ইতিহাসবিদদের মনোযোগ নিবিষ্ট ছিল। ড. আবদুল মমিন চৌধুরী সেসময় দৃষ্টি ফিরিয়েছিলেন পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের প্রাচীন ইতিহাসের দিকে। তিনি প্রাচীন আমলের পূর্ব ও দক্ষিণ বঙ্গের স্বাধীন রাজবংশগুলো নিয়ে বিশদ গবেষণা করেন এবং এ বিষয়ে গ্রন্থ প্রকাশ করেন।  

ড. আবদুল মমিন চৌধুরীর মৃত্যুতে শোক জানিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে তার সরাসরি ছাত্র মুক্তিযুদ্ধ গবেষক ও ইতিহাসবিদ আফসান চৌধুরী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, ‘‘অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরী—‘মমিন স্যার’ আমাদের জন্য ছিলেন ইতিহাস বিভাগের প্রধান বা প্রতীকী চেহারা। তিনি আমাদের প্রথম ক্লাস নেন এবং ইউনিভার্সিটির টিচার বলতে কী বোঝায় সেটা বুঝিয়ে দেন। খুবই কড়া ও রাশভারী মানুষ ছিলেন। সবাই তাকে সমীহ করে চলত। ততদিনে— ১৯৭২ সালে তার ‘ডাইনাস্টিক হিস্টরি অব বেঙ্গল’ বইটি প্রকাশিত হয়েছে, পাল বংশের ইতিহাসের উপর। অতএব আমরা প্রাচীন বঙ্গীয় রাজাদের ইতিহাস শিখেছি এমন এক শিক্ষকের কাছে যিনি নিজেই সেই বিষয়ের অন্যতম প্রধান পণ্ডিত। স্যার ছিলেন বিভাগের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষক এবং তাদের মতো কয়েকজন মিলেই ইতিহাস বিভাগের ভাবমূর্তি গড়ে তোলেন। অন্য যে কারণে অনেকেই স্যারকে মনে রাখবেন সেটা হলো, তার ক্রিকেট প্রীতি। তিনি বিভাগের প্রধান আগ্রহী ছিলেন সেটা শুধু নয়, খেলতেনও বটে। স্পিন বল করতেন, যেটা বিরোধী পক্ষ খুব আরামের সাথে পেটাতো। তার বেলায় শিক্ষক-ছাত্র সম্পর্ক ছিল খুব ঘনিষ্ঠ— যে কথা বার বার মনে হচ্ছে আজ।’’

ড. আবদুল মমিন চৌধুরী ১৯৪০ সালের ২২ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৫৪ সালে ঢাকার আরমানিটোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৫৬ সালে ঢাকা কলেজ থেকে আইএ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে ১৯৫৯ সালে বিএ অনার্স এবং ১৯৬০ সালে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬৫ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (সোয়াস) থেকে পিএইচডি করেন তিনি।

প্রাচীন বাংলার ইতিহাস বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ড. মমিন ১৯৬০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে টিচিং ফেলো হিসেবে যোগদান করেন এবং ১৯৭৮ সালে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৮৫ সালে তিনি সিনিয়র ভিজিটিং কমনওয়েলথ স্কলার হিসেবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের বেশ কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন।

ড. আবদুল মমিন ১৯৯০ সাল থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির সভাপতি এবং ২০০১ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে ২০১৩ সালে তিনি অবসরে যান। এর আগে ২০০১ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের এবং ২০০৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ছিলেন। ২০১৩ থেকে ১৪ সাল পর্যন্ত তিনি সিনিয়র ফুলব্রাইট ফেলো হিসেবে আমেরিকার ভেন্ডারবিল্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে ভিজিটিং স্কলার ছিলেন। অধ্যাপনার পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক, কলা অনুষদের ডিন, সিন্ডিকেট ও সিনেট সদস্য-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্বনামধন্য বিভিন্ন পেশাজীবী সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত ছিলেন।

জাতীয় ও আন্তর্জাতিক জার্নালে আবদুল মমিন চৌধুরীর ৪০টিরও বেশি গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তার রচিত গ্রন্থগুলোর মধ্যে ‘ডাইনাস্টিক হিস্টরি অব বেঙ্গল (৭৫০-১২০০ খ্রিষ্টাব্দ)’ ও ‘প্রাচীন বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতি’ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত