Beta
শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৪

ফিফা নিষিদ্ধ সোহাগ কালি মাখাচ্ছেন চারদিকে

জালিয়াতি ও তহবিল অপব্যবহারের দায়ে ফিফা নিষিদ্ধ করেছে বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগকে। ছবি: সংগৃহীত
জালিয়াতি ও তহবিল অপব্যবহারের দায়ে ফিফা নিষিদ্ধ করেছে বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু নাইম সোহাগকে। ছবি: সংগৃহীত

ফিফার দুই বছরের নিষেধাজ্ঞা মাথায় নিয়ে আবু নাইম সোহাগ বাফুফের চাকরি হারিয়ে এখন নানাদিকে ঢুঁ মারছেন। ফিফার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েও চুপ মেরে গেছেন। প্রায় এক বছর হতে চললেও সোহাগের আপিলের কোনও শুনানিই হয়নি। 

কথায় আছে “বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।” কিন্তু ফিফা ছুঁলে অর্থাৎ ফিফা নিষিদ্ধ করলে কী পরিণতি? অনেকে বলেন, একদম অস্পৃশ্যদের কাতারে ঠেলে দেয়! বিশ্ব ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিভিন্ন মেয়াদ উল্লেখ করে ফুটবলের হেভিওয়েট কর্মকর্তাদের নিষিদ্ধ করলেও তাদের ফেরার সুযোগ থাকে না বললেই চলে। তারা দীর্ঘদিন তদন্ত করে দুর্নীতি-জালিয়াতির অকাট্য তথ্য-প্রমাণ দিয়ে ব্যক্তিকে এমনভাবে চিত্রিত করে, তার সামাজিক অবস্থানও নড়ে যায়। এই কলঙ্ক লুকানোর সাধ্য থাকে না।

ব্যতিক্রম দেখি সোহাগের বেলায়। তাকে দেখলে মনে হবে, ওটা কোনো কলঙ্ক নয়। মাথা উচুঁ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন চারদিকে। ফুটবল ও সরকারের লোকজনের সঙ্গে ছবি দিয়ে নতুন পরিচয়ে নতুনভাবে নিজেকে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন সাবেক বাফুফে সাধারণ সম্পাদক।      

জালিয়াতির কারণে নিষিদ্ধ সোহাগ

ফিফা ৫১ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে আবু নাইম সোহাগের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলো বিস্তারিত তুলে ধরে। ফিফা এথিকস কোডের চারটি ধারায় দোষী সাব্যস্ত করা হয় বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদককে। ধারা অনুযায়ী ‘আনুগত্যের কর্তব্য অবহেলা, সাধারণ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, তহবিল অপব্যবহারের’ তথ্য-প্রমাণ পেয়েই ফিফা দুই বছরের জন্য নিষিদ্ধ করে সোহাগকে। মূলত ২০১৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাফুফের বিভিন্ন লেনদেন ও কেনাকাটা নিয়েই তদন্ত করেছিল ফিফা।

তদন্তে উঠে আসে ২০১৯ সালে জাতীয় দলের ওমান সফরে টিকিট ক্রয়ের জালিয়াতি। পুরবী ইন্টারন্যাশনাল নামের একটি এজেন্সিকে বাফুফে টিকিট ক্রয়ের সরবরাহ আদেশ দিয়েছিল বলে ফিফার কাছে কাগজপত্র পাঠিয়েছিল বাফুফে। তবে ফিফার তদন্তে ওঠে আসে, সেটি একটি জনশক্তি সরবরাহকারী সংস্থা। তারা বিমান টিকিট বিক্রির কাজই করে না। এছাড়া মাল্টিপ্লেক্স টুরস ও ট্রাভেলস নামের আরেক কোম্পানি থেকেও টিকিট ক্রয়ের রশিদ পাঠানো হয়েছিল ফিফার কাছে। অথচ ফিফার কাছে সেই কোম্পানিই জানিয়েছে, বাফুফের কাছ থেকে টিকিট সরবরাহের কোনও দায়িত্ব তারা পায়নি।

২০২০ সালে বাফুফের ফুটবল ক্রয়েও জালিয়াতি ও মিথ্যাচার খুঁজে পায় ফিফা। ফুটবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ওফেলিয়া ইন্টারন্যাশনালের বিল-ভাউচার দিয়েছিল বাফুফে। ফিফার তদন্তে দেখা গেছে, এটি আসলে একটি মেয়েদের পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। বাফুফের নানা কেনাকাটায় এমন জালিয়াতি, মিথ্যাচার ও অর্থ লোপাটের কথা বলেছে ফিফা।

ফিফার বিরুদ্ধে সোহাগের আপিল

কোর্ট অব আরবিট্রেশন ফর স্পোর্ট-এ আপিল করেছিলেন আবু নাইম সোহাগ। ২০২৩ সালের ১০ মে সংবাদ সম্মেলন ডেকে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে যাওয়ার দাবি করে নিষিদ্ধ সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন, “সময় সবকিছুর উত্তর দেবে। আমি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালতে আপিল করেছি। আশা করি নিজের সম্মান ও বাংলাদেশের সম্মান ফিরিয়ে আনতে পারব।” সংবাদ সম্মেলনে তার আইনজীবীও উপস্থিত ছিলেন।

বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের একসময়কার আস্থাভাজন সোহাগ। ছবি: সংগৃহীত

সেই ২০২৩ সালের ১৪ এপ্রিল দুই বছরের নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি সোহাগকে ১২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা জরিমানা করেছিল ফিফা। আরেকটা এপ্রিল কড়া নাড়ছে। প্রায় এক বছর পার হতে চললেও আন্তর্জাতিক আদালতে সোহাগের আপিলের এখনও শুনানিই হয়নি। তাহলে কি সোহাগ রণে ভঙ্গ দিয়েছেন? বাফুফের নিষিদ্ধ সাধারণ সম্পাদকের দাবি, “একটু সময় লাগছে, সবকিছু তো আমাদের হাতে নেই। আমার আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলেছিলাম, আগামী জুনে শুনানির তারিখ পড়তে পারে।” এক ই-মেলের জবাবে আন্তর্জাতিক ক্রীড়া আদালত জানিয়েছে, “শুনানির তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি।”

নিষিদ্ধ সম্পাদকের সঙ্গে কর্তাদের মাখামাখি

সোহাগের ওপর ফিফার নিষেধাজ্ঞার পর গত বছর ১৭ এপ্রিল বাফুফেও তাকে আজীবন নিষিদ্ধ করেছিল। জালিয়াতি, মিথ্যাচার ও দুর্নীতির দায়ে ফিফা তাকে নিষিদ্ধ করার পর বাফুফে এমন সমালোচনার মুখে পড়েছিল যে, সেখান থেকে তারা আপাত মুক্তির উপায় হিসেবে সোহাগকে আজীবন নিষিদ্ধ করে। গঠন করে বাফুফে সহ-সভাপতি কাজী নাবিল আহমেদকে প্রধান করে এক তদন্ত কমিটি, যার তদন্ত কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল বিস্তর। সময়ের ভারে সেই তদন্তের কতটা কী হয়েছিল, সেটা বাফুফে কর্তারাই জানেন। ওই রিপোর্ট তারা প্রকাশ করেননি।

নিষিদ্ধ হওয়ার পর সোহাগ (সবার ডানে) জাতীয় নির্বাচনী প্রচারণায়। পাশে বাফুফে সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন মহি (ডান থেকে দ্বিতীয়)। ছবি: সংগৃহীত

সময়ের চাপে যে বাফুফে ওই নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিল সেটা স্পষ্ট হয় আড়ালে তার সঙ্গে কর্মকর্তাদের মাখামাখি দেখে। তিনি ফুটবলে নিষিদ্ধ অথচ গত জুনে সাফ ফুটবলের টিভিস্বত্ব বিক্রির জন্য যোগাযোগ করেছিলেন একটি টিভি চ্যানেলের সঙ্গে। বিস্মিত হয়েছিলেন চ্যানেল কর্তারাও। এক বাফুফে কর্তাই এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন তাকে। এ ঘটনায় বোঝা যায়, তার সঙ্গে বিদায়ী সম্পাদকের সম্পর্ক কোন পর্যায়ে।

সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনের প্রচারেও দেখা গেছে তার অংশগ্রহণ। আওয়ামী লীগের প্রার্থী বাহাউদ্দিন নাছিমের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে বাফুফে সহ-সভাপতি মহিউদ্দিন মহির পাশে বসে আছেন সোহাগ। একসঙ্গে ছবিও তুলছেন।

সোহাগ ও তাকসিম আহমেদ- দুই বিতর্কিত ব্যক্তি একফ্রেমে। ছবি: সংগৃহীত

তার ছবি দেখা গেছে গাজীপুর মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আজমত উল্লাহ খানের সঙ্গে। এছাড়া ওয়াসার এমডি তাকসিম আহমেদ খানের সঙ্গেও দেখা গেছে সোহাগকে। সর্বশেষ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে ফ্রেমবন্দী হয়েছেন তিনি। 

ফিফা নিষিদ্ধ ব্যক্তিরা দৃশ্যত অচ্ছুৎ

আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, মহাক্ষমতাধর এএফসি প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন হাম্মামের কথা। এশিয়ান ফুটবলে তার অবদান অনেক। কিন্তু বিশ্ব ফুটবল এই কাতারিকে মনে রাখবে ঘুষ দিয়ে বিশ্বকাপ ভেন্যু নেওয়ার জন্য। ২০১১ সালে ফিফা থেকে নিষিদ্ধ হওয়ার পর এই সাবেক এএফসি প্রেসিডেন্টকে আর দেখাই যায়নি কাতারের কোনও ফুটবল আয়োজনে। ফুটবল বিশ্বকাপ কাতারে নেওয়ার পেছনে মূল কুশীলবের ভূমিকায় থাকা এই ব্যক্তির সঙ্গে আয়োজকদের কোনও ছবিই খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাতার ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা তাদের সরকারি কর্মকর্তার কাছে হাম্মামের খোঁজ নিতে গিয়ে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। হাম্মামের নাম উচ্চারণ করলেই যেন পাপ!

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ইয়াফেস ওসমানের সঙ্গে ফ্রেমবন্দী হয়েছেন নিষিদ্ধ সোহাগ। ছবি: সংগৃহীত

ঠিক তেমনি ফিফা নিষিদ্ধ নেপালের সাবেক ফুটবল সভাপতি গণেশ থাপা কিংবা ভারতীয় ফুটবলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলবার্তো কোলাসোকেও দেখা যায় না সরকারি কোনও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হতে। তাদের এড়িয়ে চলেন ফুটবলের লোকজন এবং সরকারি কর্মকর্তারাও।

কেবল এই দেশেই হয় নিষিদ্ধ ব্যক্তিদের নিয়ে মাতামাতি আর মাখামাখি। এ-এক অদ্ভুত দেশ, এখানে বিতর্কিত লোককেই আলাদা খাতিরদারি করা হয়।

সোহাগের নতুন প্ল্যাটফর্ম বিআইপি

বাফুফে থেকে বিতারিত ও ফিফা নিষিদ্ধ আবু নাইম সোহাগ খুঁজছিলেন নতুন প্ল্যাটফর্ম। ইতিমধ্যে তিনি পেয়েও গেছেন বিআইপি (বাংলাদেশ ইনিস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স) নামের একটি সংগঠনের নির্বাহী কমিটি। নগরবিদদের এই সংগঠন পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ে সরকারকে বিভিন্ন পরামর্শ দেয়, অথচ তারাই কিনা ফিফা নিষিদ্ধ এই ব্যক্তিকে জায়গা দিয়েছে সংগঠনের নতুন নির্বাহী কমিটিতে। বিআইপি’র সভাপতি আদিল মোহাম্মদ খান এ ব্যাপারে বলেছেন, “এটা একটা আলোচনার বিষয় ছিল। তবে আমাদের সংগঠনে আড়াই হাজার সদস্য, তাদের ভোটেই তিনি নির্বাচিত হয়েছেন। এখানে তো কিছু করার নেই।”

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রী সাবের হোসেন চৌধুরীকে ফুল দিয়ে অভিনন্দন জানাচ্ছেন নিষিদ্ধ সোহাগসহ বিআইপি’র কর্মকর্তারা। ছবি: সংগৃহীত

নির্বাচিত আবু নাইম সোহাগ বিআইপি’র জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লিয়াজোঁ দেখেন। এই সংগঠন বিভিন্ন এনজিও’র সঙ্গে কাজ করে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকেও তহবিল নিয়ে আসে। কিন্তু ফিফা নিষিদ্ধ এই ব্যাক্তিকে দিয়েই আন্তর্জাতিক যোগাযোগ রক্ষা করবে বিআইপি!

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist