Beta
বুধবার, ২২ মে, ২০২৪
Beta
বুধবার, ২২ মে, ২০২৪

ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়েছে ইংল্যান্ডেও

যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলে তাঁবু খাটিয়ে বিক্ষোভ করছেন ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীরা।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলে তাঁবু খাটিয়ে বিক্ষোভ করছেন ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীরা।
Picture of সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

বিশ্বসেরা ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় এক যুগের বেশি সময় ধরে বহাল তবিয়তে আছে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টল। থাকবে নাই বা কেন; যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল শহরে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা এবং গবেষণার মান যে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত।

ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের পদার্থ, রসায়ন, প্রকৌশল, গাণিতিক বিজ্ঞান, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও তথ্যবিদ্যা, জীববিজ্ঞান, আইন, আধুনিক ভাষা ও ভাষাতত্ত্ব বিভাগের বেশ সুনাম রয়েছে।

যুক্তরাজ্য তো বটেই, বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মেধাবী শিক্ষার্থীরা এসব বিভাগে পড়তে আসেন।

স্বনামধন্য এই বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রতি খবরের শিরোনাম হয়েছে, তবে এবার পড়ালেখা আর গবেষণা সংক্রান্ত কোনও কারণে নয়।

ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের সাত মাস ধরে চলা নৃশংসতা, সেখানকার সব বিশ্ববিদ্যালয় বোমা মেরে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনার পর আর চুপ থাকতে পারছে না ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের শিক্ষার্থীরা। তারাও নেমেছেন পথে, ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে নিজেদের মতো করে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেছেন।

গত বছরের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকা থেকে ইসরায়েলের দক্ষিণাঞ্চলে অতর্কিত হামলা চালায় ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস। তাদের হামলায় সেদিন ১ হাজার ১৩৯ জন নিহত হয়, জিম্মি করা হয় ২৫২ জনকে।

হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ায় সেদিনই গাজায় হামলা করে ইসরায়েল, যা এখনও চলছে। সাত মাসে ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৩৫ হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছে। আর বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১৯ লাখ মানুষ।

গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে নিজের গায়ে আগুন ধরিয়ে আত্মাহুতি দেন যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর কর্মী ২৫ বছর বয়সী অ্যারন বুশনেল।

এর মাসখানেক পর এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ শুরু করে।

অল্পদিনের মধ্যে সেই বিক্ষোভ বড় আকারে দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি, ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এমআইটি), জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস (ইউসিএলএ) থেকে শুরু করে দেড়শর বেশি কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বিক্ষোভ দমনের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে আড়াই হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে আটক করা হয়েছে।    

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে বিক্ষোভকারীদের আটক করছে পুলিশ।

যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষার্থীদের ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ ইউরোপের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছড়িয়ে পড়তে বেশি সময় নেয়নি। এ মাসের শুরু থেকে যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের মতো এলিট বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে।  

এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মনে করছেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এখন নয় তো কখনোই নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের মতো যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও ক্যাম্পাসে তাঁবু গেড়েছেন স্পষ্ট কিছু দাবি-দাওয়া নিয়ে।

ইসরায়েলকে সমর্থন জুগিয়ে যাওয়া বিভিন্ন কোম্পানিকে যুক্তরাজ্যের যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে, বিনিয়োগ করে যাচ্ছে, তার অবসান চেয়েছেন শিক্ষার্থীরা। 

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের চলমান বিক্ষোভে চাপে আছেন খোদ যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে এরই মধ্যে বৈঠক করেছেন তিনি।    

ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের পরিস্থিতি

১ মে ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত তিনটা। অঝোরে পড়ছে বৃষ্টি। এমন সময় ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের পাঁচ শিক্ষার্থী তাদের একটি গবেষণা কেন্দ্রের উল্টোদিকে পাঁচটি তাঁবু খাটান।  

শুরুতে ফিলিস্তিনের পক্ষে মাত্র পাঁচ জন পথে নামলেও কয়েক রাত পেরোতেই ঠান্ডা আবহাওয়া উপেক্ষা করে আরও কয়েকজন তাদের সঙ্গে যোগ দেন। এখন সেখানে কমপক্ষে ২০টি তাঁবু আছে।   

ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলে তাঁবু খাটিয়ে গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ বন্ধের দাবি জানানো বিক্ষোভকারীদের একজন ইউজেনিয়া।

বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক সংগঠন ব্রিস্টল ফর প্যালেস্টাইন গ্রুপের এই আয়োজক আল জাজিরাকে বলেন, “দিনের বেলায় অনেকে এখানে আসেন। আমাদের সুনির্দিষ্ট কর্মসূচি থাকলে সংহতি জানানো মানুষের সংখ্যা আরও বাড়ে।

“বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-কর্মচারীরা তাঁবুর সামনে থেমে আমাদের সমর্থন জানান। তারা আমাদের কাছে জানতে চান, কীভাবে তারাও এই বিক্ষোভে শামিল হতে পারবেন। এসব আমাদের অনেক অনুপ্রাণিত করে।”

ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে কমিউনিটি কিচেনের ব্যবস্থা করেছেন। এছাড়া আছে কোভিড টেস্টের ব্যবস্থা। ফিলিস্তিনের ইতিহাস নিয়ে বইও বিক্ষোভস্থলে রেখেছেন তারা।

নিউ ইয়র্কের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে তাঁবু গেড়ে শিক্ষার্থীদের অবস্থান।

‘ইসরায়েলপন্থী কোম্পানিতে বিনিয়োগ বন্ধ করতে হবে’  

ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের শিক্ষার্থীদের অন্যতম দাবি, গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞে অবদান রাখা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সম্পর্ক ছিন্ন করতে হবে। এসব কোম্পানিতে আর বিনিয়োগ করা যাবে না।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএই সিস্টেমস নামে ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা কোম্পানির তৈরি এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান গাজা ধ্বংসে ব্যবহার করছে ইসরায়েলের সেনাবাহিনী।     

এ বিষয়ে ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলের শিক্ষার্থী ইউজেনিয়া বলেন, “ইসরায়েলকে অস্ত্র দেয় এমন কোম্পানির সঙ্গে আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলিয়ন পাউন্ডের অংশীদারত্ব আছে।

“ভয়াবহ জাতিগত নিধন, গণহত্যা, জাতিবিদ্বেষ, বসতি স্থাপনকারী-উপনিবেশবাদের সঙ্গে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অংশীদারত্ব যে অন্যায়, তা উপলব্ধি করা কঠিন-এমনটা আমি মনে করি না।” 

ইউজেনিয়া ও তার সঙ্গীদের এরই মধ্যে তাঁবু গুটিয়ে চলে যেতে বলেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তাকর্মীরা। ইউজেনিয়াদের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শাস্তিমূলক কোনও ব্যবস্থা নেয়নি।

তবে যুক্তরাজ্যের যেসব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ চলছে, সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের বৈঠকের পর পরিস্থিতি কী দাঁড়াবে, এ নিয়ে চিন্তিত ইউজেনিয়া ও তার সহপাঠীরা। শিক্ষার্থীদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দমনমূলক আচরণ তো তাদের অজানা নয়।      

গেল মঙ্গলবার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সুনাক তার মন্ত্রিসভাকে বলেন, যুক্তরাজ্যজুড়ে বিভিন্ন ক্যাম্পাসে সম্প্রতি ইহুদিবিদ্বেষ মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।   

এর দুদিন পর ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ, ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড, ইউনিভার্সিটি অব ব্রিস্টলসহ যুক্তরাজ্যের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তাব্যক্তিদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী সুনাক। 

যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডভিত্তিক ইহুদি ছাত্র সংগঠন ইউনিয়ন অব জুয়িশ স্টুডেন্টস এ মাসের শুরুতে অভিযোগ করে জানায়, ফিলিস্তিনপন্থী শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের জেরে ক্যাম্পাসে ইহুদি শিক্ষার্থীদের জন্য এক ধরনের প্রতিকূল ও বিষাক্ত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।

তবে ভিন্ন চিত্রও আছে। যুক্তরাজ্যের সব ইহুদি শিক্ষার্থী এমনটা মনে করছেন না। যেমন লন্ডনের পাবলিক গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে সক্রিয় এক ইহুদি সংগঠন জানিয়েছে, গাজার জন্য লড়াইরত শিক্ষার্থীদের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে থাকতে চান তারা।            

যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডভিত্তিক সংগঠন ইউনিয়ন অব জুয়িশ স্টুডেন্টসের ওই অভিযোগের পর সম্প্রতি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী সুনাক বলেন, “ভিন্ন মতামত প্রকাশের উপযুক্ত স্থান বিশ্ববিদ্যালয়। তবে একই সঙ্গে এটি সহনশীলতা এবং সম্প্রদায়ের প্রতিটি সদস্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনেরও জায়গা।”          

যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটিতে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভকারীরা।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী সুনাক একসময় ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ডের ছাত্র ছিলেন। শুধু তিনি নন, তার পূর্বসূরিদের অধিকাংশই হয় ইউনিভার্সিটি অব অক্সফোর্ড নয়তো ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করেছেন।

নিজের ক্যাম্পাসেই চলমান ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ খুব একটা স্বস্তি দিচ্ছে না সুনাককে।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যামব্রিজের ছাত্র সংগঠন ক্যামব্রিজ ফর প্যালেস্টাইন গ্রুপ সম্প্রতি জানিয়েছে, গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যায় সরাসরি সমর্থন জুগিয়ে যাওয়া বিভিন্ন কোম্পানিতে কোটি কোটি পাউন্ড বিনিয়োগ করেছে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বৃহৎ কলেজ ট্রিনিটি।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, ইসরায়েলভিত্তিক আন্তর্জাতিক সামরিক প্রযুক্তি কোম্পানি ও প্রতিরক্ষা ঠিকাদার এলবিট সিস্টেমসে ৭৫ হাজার ডলার বিনিয়োগ করে ট্রিনিটি কলেজ।

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বের বৃহত্তম নির্মাণ সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী কোম্পানি ক্যাটারপিলারেও মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ আছে ট্রিনিটি কলেজের।

“ইসরায়েল দশকের পর দশক ধরে ফিলিস্তিনে জাতিগত নিধন চালিয়ে আসছে, যা এই সাত মাসে গাজায় বেসামরিক নাগরিকদের হত্যার মাধ্যমে চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে।

“এই কয়েক মাসে গাজার সব বিশ্ববিদ্যালয় বোমা মেরে ধ্বংস করে দিয়েছে ইসরায়েল। এমন পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিদের প্রতি আমাদের সংহতি জানানো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ,” বলেন ইউজেনিয়া।  

ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ চলছে লন্ডনের গোল্ডস্মিথস, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনেও। সেখানকার শিক্ষার্থী ডানা বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য দেশে ইসরায়েলের বিরোধিতা করে শিক্ষার্থীদের লাগাতার বিক্ষোভের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন আছে।

“এবং আমি মনে করি, ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার দাবিকে আলোচনার কেন্দ্রে রাখা এ মুহূর্তে সবচেয়ে দরকার।”     

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত