Beta
শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪

‘ভেবেছিলাম, মরেই যাচ্ছি’

baily-road-fire-kachhi-bhai-010324-06

আবরার ফারদিন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। থাকেন দেশের বাইরে। চীনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে সেখানেই কাজ করছেন। অসুস্থ দাদাকে দেখতে ১২ দিন আগে দেশে আসেন। আর এখন নিজেই দগ্ধ। যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে।

সেখানে পোস্ট অপারেটিভ কক্ষের একেবারে শেষ দিকের বিছানাতে শুয়ে আছেন তিনি। হাতের আঙুলে লাগানো পালস অক্সিমিটার, পাশের বড় মনিটরে দেখা গেল অক্সিজেন স্যাচুরেশন ৯৭।

অনুমতি নিয়ে কথা হয় তার সঙ্গে। ২৮ ফেব্রুয়ারির বেইলি রোডের আগুনে অনেকের সঙ্গে আটকা পড়েন তিনি। এদিক সেদিক ছোটাছুটির সময়ে অন্যদের সঙ্গে আশা হারিয়ে ফেলছিলেন তিনিও। আবরার বলেন, “সেখানে সবাই কনফার্ম ছিলাম, উই আর গোয়িং টু ডাই।”

তবে সেই দুঃস্বপ্নের রাত পার করে এখনও শ্বাস নিচ্ছেন তিনি। হাসপাতাল থেকে কবে ছাড়া হতে পারে- প্রশ্নে আবরার বলেন, “কিছু বলেনি এখনও। অবস্থা কখনও ভালো হচ্ছে, কখনও খারাপ। গতকাল (শুক্রবার) রাতে ভালো ছিলাম, সকাল থেকে ফের কিছু জটিলতা দেখা যাচ্ছে। তাই চিকিৎসকরা পর্যবেক্ষণে রাখতে চাচ্ছেন।”

আবরারের দাদা অসুস্থ, বাবা-মাও অসুস্থ। তাদের দেখতেই ছুটি নিয়ে দেশে এসেছেন। সেদিন সন্ধ্যায় বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দাদাকে রক্ত দেন আবরার। এরপর শান্তিনগরে বাসায় ঢোকার আগে বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যান তিনি।

আবরারের বিপরীতেই দুই বেডে রয়েছেন একজন নারী ও একজন পুরুষ। তারা স্বামী-স্ত্রী। ঠিক হয় গ্রিন কোজি কটেজের খানা’জে আড্ডা দেবেন।

ঘটনার দিনের কথা বলা শুরু করেন আবরার। বলেন, “তখন সাড়ে ৯টার মতো হবে। আমরা জাস্ট গেলাম, বসলাম এবং ইনসিডেন্ট শুরু হলো।

“আমরা খানাজে এন্ট্রি করলাম, চেয়ার নিয়ে বসবো। তখনই দেখি সবাই দৌড়াদৌড়ি শুরু করেছে। চারদিকে আতঙ্ক। আমরা উঠে লিফটের সামনে চলে এলাম। অনেক ধোঁয়া দেখতে পেলাম, আর বুঝে ফেললাম ভয়ংকর কিছু ঘটতে যাচ্ছে।”

উপরের দিকে যাবেন না কি নিচের দিকে- তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না আবরার। বলেন, “তবুও উপরের দিকে যেতে শুরু করলাম। তৃতীয় তলা থেকে পঞ্চম বা ষষ্ঠ তলায় যাওয়ার পর শুনতে পেলাম, আগুন উপরে লেগেছে। উপর থেকে সবাই বলছে, আপনারা নিচে যান।”

বারবার বিভ্রান্ত হতে থাকেন আবরাররা। কয়েকবার উঠানামা করেন। বলেন, “সেখানে এত ধোঁয়া যে নিজেদের হাতও দেখা যায় না। এক সময় দুই বন্ধুকে হারিয়ে ফেলি।

আবরার ফারদিন

“কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ওরা কোথায় গেল? আমার এখন কী করা উচিৎ? কয়েকজনকে দেখলাম উপরের দিকে যাচ্ছে, তাদের পিছু নিলাম। কিন্তু সিঁড়িতে যেহেতু কিছু দেখা যাচ্ছিল না, কারও ধাক্কায় আমি পড়ে যাই। সেখানেই কিছুক্ষণ অজ্ঞান হয়ে ছিলাম। অনেক চিৎকার-চ্যাঁচামেচির কারণে আর্লি সেন্স চলে আসে। সে অবস্থাতেই খুব কষ্ট করে উঠতে শুরু করলাম।”

“তখন বুঝতে পারছিলাম, হয়তো আর বেশিক্ষণ বাঁচব না। কারণ, বিষাক্ত ধোঁয়ার মধ্যে চোখ খুলতে পারছিলাম না, নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না।”

“ইচ্ছে করে দম বন্ধ করে রাখছিলাম। কারণ যত দম নিচ্ছি, ততই মৃত্যুর কাছাকাছি যাচ্ছি মনে হচ্ছিল। কোনওরকমে ছাদে পৌঁছাতে পারি। সেখানে কেউ একজন মাথায় পানি দেয়। তখন একটু শ্বাস নিতে পারলাম। সেখানে সবাই কনফার্ম ছিলাম, উই আর গোয়িং টু ডাই।”

এরপর মা-বাবাকে ফোন করেন আবরার। বিদায় চান তাদের কাছে, আল্লাহর কাছে দোয়া চান। কিন্তু কীভাবে নামবেন সেটা কিছুতেই কারও মাথায় আসছিল না। এরইমধ্যে একজন তাদের সামনেই ছাদ থেকে লাফ দেয়।

আবরার বলেন, “এত কাছ থেকে মৃত্যু আমি দেখিনি, কিন্তু সেদিন যখন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, তখন সামনেই মৃত্যু দেখেছি, একটা বাচ্চা ছিল তার মধ্যে…”

ছাদেও আগুন ছিল আববারদের ১০ হাত দূরেই। সেই আগুন নিয়ন্ত্রণে এনে দরজা কেটে তাদের উদ্ধার করেন উদ্ধারকর্মীরা।

পোস্ট অপারেটিভের দরজা খুলতেই ডান পাশে বসে আছেন একজন। কথা বলে জানা গেল তার নাম জহিরুল। মাত্র ছয়মাস আগে কাজ নিয়েছিলেন গ্রিন কোজি কটেজের পাঁচতলায় কেএসটি রেস্টুরেন্টে। গত ১২ বছর ধরে ঢাকায় থাকা জহিরুলের বাড়ি পটুয়াখালীর বাউফলে।

জহিরুল বলেন, “সেদিন অনেক ভিড় ছিল, কেউ কাউকে দেখার মতো পরিস্থিতি ছিল না।

“সম্ভবত সাড়ে ৯টার দিকে ‘আগুন আগুন’ শুনতে পেলাম। এখন ঠিক মনে নেই, অনেক কিছু ভুলে যাচ্ছি। আগুনের কথা শুনে সিঁড়িতে আসলাম। কিন্তু ধুমার জন্য কিচ্ছু দেখা যায় না।”

তার মধ্যেও নিচে নামতে থাকেন জহিরুল। বলতে থাকেন, “যতই নিচে নামি, ততই আগুন আর ধোঁয়া বাড়ে। পরে আবার সিঁড়ি বাইয়া ছাদে যাই। সেখানে অনেক মানুষ। অনেককে ক্রেন দিয়ে নামানো হলেও অনেকেই ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা যায় বলে শুনছি।”

শেষের দিকে ক্রেন দিয়ে নামানো হয় জহিরুলদের। জহিরুলকে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র দিয়েছেন চিকিৎসকরা। তারপরই ভাইকে নিতে এসেছেন বোন কাকলী। তিন ভাইবোনের মধ্যে বড় কাকলী থাকেন নারায়ণগঞ্জে। সেদিন রাত সাড়ে ১০টার দিকে তাকে জহিরুলের ঘটনার কথা জানানো হয়। খবর পেয়ে তিনি ঢাকায় আসেন, গ্রামের বাড়িতে বাবা মা দুজনই অস্থির হয়ে আছেন।

সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া জানিয়ে কাকলী বলেন, “তিনি আমার ভাইরে ফিরায়ে দিছে, আর কিছু চাই না।”

জহিরুল যেখানে বসে ছিলেন তার উল্টোদিকের বেডে বসে ছিলেন রাকিবুল ইসলাম। গত দেড় বছর ধরে ভবনটির তিনতলায় ইলিয়নের আউটলেটে কাজ করেন তিনি। ঘটনার সময়ে তিনি ছিলেন ওয়াশরুমে।

বলেন, “ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে দেখি, আমাদের কেউ নাই। তখন আগুনের কথা শুনলাম, সঙ্গে চিৎকার আর কান্না। তখন সিঁড়ির দিকে দৌঁড় দেই। কিন্তু ধোঁয়ার জন্য পারিনি।”

ফরিদুল ইসলাম

এই আগুনেই প্রাণ হারিয়েছেন রাকিবুলের দুইজন সহকর্মী। তবে তার সঙ্গে আরও তিনজন ছিলেন জানিয়ে রাকিবুল পাশের দুই বেডে চিকিৎসাধীন এক দম্পতি এবং আরেকজনকে দেখান। বলেন, “সব সিঁড়ির মধ্যে গ্যাস সিলিন্ডার ছিল। নামতে ভয় পাইতেছিলাম। তারা (পাশের বেডের দম্পতি) তিনতলায় ইলিয়ন পর্যন্ত আসার পর তাদের টান দিয়ে ভেতরে নিয়া গেছি ওয়াশরুমে। সেখানে চারজন গায়ে পানি ঢাললাম, যেন আগুন না লাগে। এরপর বালতির মধ্যে পানি ভরে গায়ের পোশাক ভিজিয়ে সেগুলো বান্ধি শরীরে।

“এরপর আমরা দুইজন কাচ ভাইঙ্গা বাইর হই, কিন্তু ওই দম্পতি অজ্ঞান হয়ে গেছিল ভেতরই ধোঁয়ার জন্য। আমি বের হবার পর ফায়ার সার্ভিস, পুলিশকে জানাই। তারা ওই দুজনকেও উদ্ধার করে।”

এরপর প্রাণে বেঁচে আছেন এটাই পাওয়া বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “এত মানুষ মারা গেছে। আমরা তো তবুও বাঁইচা আছি। এটাই শুকরিয়া “

ভেতরে কী অবস্থা ছিল সেসময় জানতে চাইলে তিনি বলেন, “ভেতরে আসলে ভালো অবস্থা ছিল।২৯ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে সব দোকানে ডিসকাউন্ট চলতেছিল। একে তো ডিসকাউন্ট, তার উপর ২৯ ফেব্রুয়ারি, তার উপর বৃহস্পতিবার। সব মিলায়ে অনেক অনেক মানুষ ছিল।”

তবে গ্যাস সিলিন্ডারগুলো যদি সিঁড়িতে না রেখে একটা নির্দিষ্ট জায়গায় রাখা থাকত, তাহলে এত মানুষ মারা যেত না বলে মন্তব্য করেন তিনি।

হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন একটি কোম্পানির ডেলিভারিম্যানের কাজ করা ফরিদুল ইসলাম। সেদিন ডেলিভারি কাজে গিয়েই গ্রিন কোজি কটেজের আগুনে পোড়েন তিনি।

আগামীকাল তার পরীক্ষা রয়েছে এবং এটাই শেষ জানিয়ে ফরিদুল বলেন, “আমার অবস্থা অন্যদের তুলনায় ভালো ছিল। এজন্য সেন (সামন্ত লাল সেন) স্যারকে বলেছি, আমার পরীক্ষা আছে, ছেড়ে দিতে। সব পরীক্ষা করে তারা কোনও সমস্যা পায়নি, এজন্য ছেড়ে দিয়েছে।”

পরীক্ষা যেন ভালো হয় সেজন্য সবার দোয়াও চান ফরিদুল।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist