Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

বেইলি রোডে এক আগুনে কেন এত মৃত্যু

ঢাকার বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের একজন।
ঢাকার বেইলি রোডে গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের একজন।

পাঁচ বছর আগে ঢাকার বনানীর ২২ তলা এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছিলেন ২৬ জন, সেখানে বেইলি রোডে সাত তলা গ্রিন কোজি কটেজ শপিং মলে আগুনে মারা গেলেন তার প্রায় দ্বিগুণ।

বেইলি রোডের ভবনটির খাবারের দোকানগুলোতে সপ্তাহান্তের দিনটিতে ছিল বেশ ভিড়, সেই সঙ্গে অগ্নি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঘাটতির বিষয়টিও প্রকাশ পাচ্ছে আগুন লাগার পর।

বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টার সময় গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নেভায়। এই অগ্নিকাণ্ডে মারা গেছেন ৪৬ জন।

আগুনে পুড়েছে ‘গ্রিন কোজি কটেজে’ থাকা খাবারের দোকান ‘কাচ্চি ভাই’ও। ছবি : সকাল সন্ধ্যা

দোকানে জমজমাট সময়ে আগুন

ঢাকার এক সময়ের নাটক পাড়া বেইলি রোড এখন মুখরোচক নানা খাবারের দোকানে ভরা। যে ভবনে আগুন লেগেছিল, সেই গ্রিন কোজি কটেজের সাতটি তলাজুড়ে ছিল কাচ্চি ভাই, পিজ্জা ইন, জেস্টি, স্ট্রিট ওভেন ও অ্যামব্রোসিয়ার মতো খাবারের দোকান।

সাধারণত প্রতি রাতেই খাবারের দোকানে ভিড় জমে। এর মধ্যে বিরিয়ানীর দোকান কাচ্চি ভাইতে ২০ শতাংশ মূল্য ছাড়ের ঘোষণা ভিড় বাড়িয়েছিল।

সিদ্ধেশ্বরীর বাসিন্দা বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা শাহাদাত সজীব বৃহস্পতিবার রাতে আড্ডা দিতে বেইলি রোডে গিয়ে কাচ্চি ভাইয়ে বিশেষ অফার দেখে সেখানে ঢু মেরেছিলেন।

সজীব সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “একে তো বৃহস্পতিবার, আবার ২০ পার্সেন্ট ছাড়ের কারণে অনেক মানুষ ছিল। আমরা ৯টার দিকে কাচ্চি ভাইয়ে যাই। তবে এত মানুষ ছিল যে আমরা ২০-২৫ মিনিট অপেক্ষা করে জায়গা না পেয়ে নিচে নেমে আসি।”

কাচ্চি ভাই দোকানের কর্মচারী সিয়াম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “প্রায় বৃহস্পতিবারই আমাদের কিছু না কিছু অফার থাকত। কাল ২৯ ফেব্রুয়ারি, চার বছর একদিন আসে, তার উপর বৃহস্পতিবার। এজন্য আমাদের অফার ছিল।”

বিশেষ অফারের জন্য কাচ্চি ভাইয়ে রাতে ব্যাপক ভিড়ের কথা আরও অনেকে জানিয়েছেন। এছাড়া ভবনের অন্য খাবারের দোকানগুলোতেও মানুষের কমতি ছিল না।

সজীব ও তার বন্ধু কাচ্চি ভাই থেকে বেরিয়ে আসার আধা ঘণ্টা পরই আগুন লাগে ওই ভবনে। ভবনটির নিচতলার একটি দোকান থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে মনে করছে ফায়ার সার্ভিসসহ অন্য সংস্থাগুলো।

সজীব বলেন, “(নিচতলার) চুমুক চায়ের দোকানে আমরা যাই, তাদের কাছ থেকে চা নিই। চা নিয়ে আমরা বের হয়ে আসি। সিরাজ সেন্টারের (পাশের ভবন) নিচে আসতে আসতেই দেখি আগুন।

“আমরা যেই দোকান থেকে চা নিয়েছি, সেই দোকান থেকেই। আর কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক হলে আমি হয়ত থাকতাম না এখানে আর।”

ছিল না জরুরি নির্গমন পথ

সাত তলা গ্রিন কোজি কটেজ শপিং মলে অনেক দোকান থাকলেও জরুরি নির্গমন পথ ছিল না বলেই ফায়ার সার্ভিস জানাচ্ছে।

বাহিনীর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, ভবনটিতে লিফট ছিল উঠা-নামার একমাত্র মাধ্যম। সিঁড়ি না থাকায় অনেকেই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন।

ভবনে থাকা পিজ্জা ইন দোকানের কর্মকর্তা সালমান আলিম একটি সিঁড়ি পথ থাকার কথা জানালেন। তবে জরুরি নির্গমন পথ যে ছিল না, তা তার কথায় স্পষ্ট।

“ভবনে একটি লিফট আর একটি সিঁড়ি বাদে আর কিছুই ছিল না। ফায়ার এক্সিট বলে কোনও কিছু এ ভবনে ছিল না,” তিনি বলেন সকাল সন্ধ্যাকে।

ভবনের একটি মোবাইল ফোনের দোকানের মালিক রাহাত মিয়া শুভও সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আগুন লাগলে বের হওয়ার কোনও বিকল্প ব্যবস্থাও ছিল না।”

ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাইন উদ্দিন সাংবাদিকদের বলেন, ভবনটিতে নিরাপত্তার যথেষ্ট ব্যবস্থা ছিল না। সিঁড়ি ছিল মাত্র একটি।

ফলে প্রায় পুরোটা কাচ ঘেরা ওই ভবনে আগুন লাগার পর আতঙ্কিত মানুষরা বের হওয়ার পথ পাননি। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ বন্ধ হয়ে গেলে আতঙ্ক আরও বাড়ে।

কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁর কর্মচারী সিয়াম বলেন, “বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সবাই চিৎকার করা শুরু করেছিল। ভয়ানক অবস্থা হয়ে গিয়েছিল।”

নিচ তলায় আগুনের সূত্রপাত হওয়ায় ওপরের তলাগুলোর রেস্তোরাঁয় থাকা কেউ নিচের দিকে আর নামতে পারেননি। সবাই হুড়োহুড়ি করে উপরের দিকে উঠতে থাকেন। এরমধ্যে ধোঁয়াও উপরের তলাগুলোতে ছড়াতে থাকে। ফলে দমবন্ধ হয়ে অনেকের মৃত্যু ঘটে।

আগুন দেখে সড়কের বিপরীত পাশের ভবন নাভানা বেইলি স্টার থেকে ছুটে যাওয়া নিরাপত্তাকর্মীরা বলেন, ফায়ার সার্ভিস আসার আগে তারা মই লাগিয়ে ১০-১৫ জনকে নামিয়ে আনতে পারেন।

আব্দুল কুদ্দুস নামে এক নিরাপত্তাকর্মী বলেন, “যখন আমরা মই দিয়ে আর নামাতে পারছিলাম না, তখন সবাইকে বলেছিলাম, আপনারা ছাদের দিকে চলে যান। যারা ছাদের দিকে গেছে, তারা বাঁচতে পারছে, আর যারা ছাদে উঠতে পারে নাই, তারা পারে নাই।”

স্বাস্থ্যমন্ত্রী সামন্ত লাল সেন গভীর রাতে শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে গিয়েছিলেন আহতদের দেখতে।  

তিনি সেখানে সাংবাদিকদের বলেন, “যারা মারা গেছেন, তাদের প্রায় প্রত্যেকের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে। যে ২২ জন চিকিৎসাধীন তাদেরও প্রত্যেকের শ্বাসনালীও পুড়ে গেছে এবং সবার অবস্থা আশঙ্কাজনক।”

এখানে পুড়ে মৃত্যুর সংখ্যা কম জানিয়ে র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) এম খুরশীদ হোসেন বলেন, “অক্সিজেনের অভাবে বা সাফোকেশনে মারা গেছে বেশি।”

আগুনে দমবন্ধ হয়েই বেশি মানুষ মারা যান।

অপ্রতুল অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা

বাণিজ্যিক ভবন গ্রিন কোজি কটেজে অগ্নি নির্বাপন সামগ্রী ছিল বলে জানা গেলেও তা কাজ করছিল না বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ভবনটির একটি মোবাইল ফোনের দোকানের মালিক রাহাত মিয়া শুভ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এই ভবনে আগুন লাগলে তা নেভানোর যথাযথ ব্যবস্থা ছিল না। কয়েকটা মেশিন ছিল, কাজ করে কি না, আমরা জানি না।”

কাচ্চি ভাই রেস্তোরাঁর কর্মচারী সিয়ামও বলেন, “কয়েকটা আগুন নেভানোর যন্ত্র ছিল, কিন্তু ওই সময় অনেকগুলোই কাজ করছিল না বলে সবাই বলাবলি করছিল। আমরা পেছনের গ্রিল ভেঙে লাফিয়ে নেমেছি।”

ভবনটিতে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপন সরঞ্জাম না থাকার কথা জানিয়েছেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ফায়ার সার্ভিসের কয়েকজন কর্মকর্তাও।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) ঢাকা দক্ষিণ বিভাগের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান সেলিম সাংবাদিকদের বলেন, “এ ভবনে আগুন নিয়ন্ত্রণের কী কী ব্যবস্থা ছিল, তা জানতে চেয়েছি আমরা।”

এর আগে দেখা গেছে, কোনও ভবনে আগুন লাগার পর সেখানে অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থায় ত্রুটিসহ নানা অনিয়ম বের হয়।

গ্রিন কোজি কজেট ভবনটির মালিক কর্তৃপক্ষের কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে সেখানে অগ্নি নির্বাপনে কতটুকু ব্যবস্থা ছিল, তাও জানা যায়নি।

এই অগ্নিকাণ্ড তদন্তে ইতোমধ্যে পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন করেছে ফায়ার সার্ভিস।

বাহিনীর জনসংযোগ কর্মকর্তা আনোয়ার ইসলাম দোলন জানিয়েছেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের পরিচালক (অপারেশন্স ও মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম চৌধুরী এই কমিটির প্রধানের দায়িত্বে থাকছেন।

কমিটিতে সদস্য সচিব হিসেবে রয়েছেন ফায়ার সার্ভিস ঢাকা বিভাগের উপপরিচালক মো. ছালেহ উদ্দিন। অন্য সদস্যরা হলেন- ফায়ার সার্ভিসের সংশ্লিষ্ট জোনের ডিএডি, সিনিয়র স্টেশন অফিসার ও ওয়্যারহাউজ ইন্সপেক্টর।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist