Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

কলাম

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র

আব্দুল্লাহ আল-ফারূক। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার

স্বাধীন বাংলাদেশে ২৬ মার্চ আর ১৬ ডিসেম্বরে এগিয়ে এলেই স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে এক ধরনের অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক উসকে দেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকে। এই প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করছি। বাংলাদেশে ইতিহাসের অমোঘ সত্যগুলোকে আড়াল করার জন্য স্বার্থবাদী মহলের অপেচষ্টা নতুন নয়। পাকিস্তান আমলে আমরা যারা সরকারি বেতারকর্মী ছিলাম এবং বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাকে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ব্রতী হয়েছিলাম তাদের উপর এইসব অপেচষ্টা প্রতিহত করার একটা দায়িত্ব বর্তায়। সেই তাড়না থেকেই আজকের এই লেখা। এটা খুব স্পষ্টভাষায় বলতেই হবে যে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার যে ঘোষণা, তার একেবারে প্রত্যক্ষ ফল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই কেন্দ্র স্থাপিত হয় ঠিক ২৬ মার্চ ১৯৭১। এবং তা চালিত হয় তিনটি পর্বে— চট্টগ্রামের কালুরঘাটে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় এবং চূড়ান্ত পর্বে বিপুল কর্মশক্তি নিয়ে কলকাতায়। এই লেখায় আমি কালুরঘাট পর্বের ঘটনাগুলোরই উল্লেখ করব। কালুরঘাট পর্বে আমরা দশজন কর্মী সম্পূর্ণ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে যুক্ত হয়ে গিয়েছিলাম পাকিস্তানি অপশাসন থেকে মুক্তির যুদ্ধে। প্রবলভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাকে। গড়ে তুলেছিলাম স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই দশজনকে কেউ বাধ্য করেনি সেই উত্তাল সময়ে অনিশ্চিত এক ভবিষ্যতের পথে যাত্রা করতে। বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা ছিল আমাদের চালিকা শক্তি। রাজনৈতিক চেতনা কমবেশি আমাদের সবার মধ্যেই ছিল বলে আমি মনে করি। স্বাধীনতার ডাক সেই চেতনাকে করেছিল সুসংহত। প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত আমাদের কেউই কোনোরকম দ্বিধাদ্বন্দ্বে ক্লিষ্ট হয়নি। ভাবেনি ফিরে যাওয়ার কথা। এক কাপড়ে সবাই বেরিয়ে এসেছিলাম। টাকা পয়সাও যা ছিল তা যৎসামান্য।

এটা খুব স্পষ্টভাষায় বলতেই হবে যে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার যে ঘোষণা, তার একেবারে প্রত্যক্ষ ফল স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। এই কেন্দ্র স্থাপিত হয় ঠিক ২৬ মার্চ ১৯৭১। এবং তা চালিত হয় তিনটি পর্বে— চট্টগ্রামের কালুরঘাটে, ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায় এবং চূড়ান্ত পর্বে বিপুল কর্মশক্তি নিয়ে কলকাতায়।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কাজে সংযুক্তির একটি পটভূমি তো আছেই। সেটার উল্লেখ না করলে বক্তব্য পূর্ণতা পাবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রজীবনে আমি ছিলাম বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানী পরিচালিত প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘ক্রান্তি’র সক্রিয় সদস্য। ঊনসত্তরের গণ অভ্যুত্থানের সময় আমি এম.এ ক্লাসের ছাত্র। ছাত্র ইউনিয়নের মেনন গ্রুপের সঙ্গেও যোগ ছিল। শ্লোগানে শ্লোগানে মুখরিত তখন ঢাকা। পুলিশের গুলিতে নিহত ছাত্র ইউনিয়নকর্মী আসাদের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে ছাত্র-জনতার উত্তাল মিছিল, আগরতলা মামলার বিচারাধীন অন্যতম বন্দি সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যা, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে পাকিস্তানি সেনাদের বুলেট আর বেয়েনট দিয়ে অধ্যাপক ড. শামসুজ্জোহাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যার ঘটনা, আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নিঃশর্ত কারামুক্তি — এই সব ঘটনা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত করেছিল আমাদের অনেকের মন। ঊনসত্তরের ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান শেখ মুজিব। ২৩ ফেব্রুয়ারি রমনার মাঠে এক বিশাল জনসমুদ্রে বাঙালি জাতির অবিসংবাদী নেতা হিসেবে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে অভিষিক্ত হন। ২৫ মার্চ প্রেসিডেন্ট আইউব খান পদত্যাগ করেন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা তুলে দেন জেনারেল ইয়াহিয়া খানের হাতে।

ছাত্রজীবন শেষ করে আমি ১৯৭০ সালে অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসেবে তখনকার রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রামে যোগ দেই। ব্রডকাস্টিং ভবন আগ্রাবাদে। ট্রান্সমিটিং কেন্দ্র শহর থেকে কিছু দূরে কালুরঘাটে। বেতারের পরিচালক প্রখ্যাত গল্পকার ও বেতার ব্যক্তিত্ব নাজমুল আলম। অনেকদিন পর বেতার ভবনে দেখা হলো যার সঙ্গে তিনি বেলাল মোহাম্মদ। বেতারে চুক্তিবদ্ধ লেখক তিনি। চট্টগ্রামের সুপরিচিত নাম। চট্টগ্রামে আমার কলেজ জীবেন তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। আমি তাঁর ভ্রাতৃপ্রতিম। সহকর্মী হিসেবে পেলাম মুস্তফা আনোয়ার এবং আমার স্কুল জীবনের বন্ধু শরফুজ্জামানকেও। কে জানত একদিন বেলাল মোহাম্মদ, মুস্তফা আনোয়ার, শরফুজ্জামান এবং আমি অন্যান্যদের সঙ্গে মিলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সূচনা করব! শরফুজ্জামানের মাধ্যমে পরিচয় হলো প্রকৌশল বিভাগে তার সহকর্মী রাশেদুল হোসেন, আমিনুর রহমান, রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে। বেতার প্রকৌশলী সৈয়দ আব্দুস শাকেরের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠতা হতে সময় লাগল না। বেতারে কথিকা পড়তে আসতেন আবুল কাসেম সন্দ্বীপ। চট্টগ্রাম ফটিকছড়ি কলেজের সহ-অধ্যক্ষ। বেলাল ভাইয়ের পরিচিত। দুজনেই সন্দ্বীপের লোক। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আমাদের সঙ্গে যুক্ত হবেন আর একজন — আমার পরিচিত তরুণ ব্যবসায়ী কাজি হাবিবুদ্দিন মনি। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে এই দশজনের নাম উল্লেখ করতেই হবে যারা কালুরঘাট পর্বে, আগরতলা পর্বে এবং কলকাতায় শেষদিন পর্যন্ত নিরবিচ্ছিন্নভাবে কাজ করেছেন।

পাকিস্তানের একটি সরকারি বেতার প্রতিষ্ঠানের কাজকর্মের ধারার সঙ্গে পরিচিত হচ্ছিলাম ক্রমশ। ত্রৈমাসিক অনুষ্ঠানমালার প্রস্তাবিত পরিকল্পনা ইংরেজিতে লিখে ইসলামাবাদে সদর দপ্তরে পাঠাতে হতো অনুমোদনের জন্য। আমার দায়িত্ব ছিল ইংরেজি কথিকা আর বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অনুষ্ঠান। বুঝতে অসুবিধা হতো না যে বেতারের কাজকর্মের সিংহভাগ ইসলামাবাদের কেন্দ্রীয় দপ্তরের উপর নির্ভরশীল। ফলে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা বেশ টেনশেন থাকতেন। কোনটা অনুমোদন পাবে, কোনটা পাবে না, এই ভাবনা তাঁদের তাড়িত করত। সত্তরের ১২ নভেম্বর পূর্বপাকিস্তানের উপকূলীয় এলাকায় প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের আঘাতে প্রায় দশ লক্ষ মানুষ প্রাণ হারায়। ইতিহাসের ভয়াবহতম এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্লিষ্ট অসহায় মানুষেদর জন্য জরুরি ত্রাণ সাহায্যের ব্যাপারে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সামরিক সরকার দেখায় চরম এক ঔদাসীন্য ও দীর্ঘসূত্রতা। বাঙালি জনমানসে তার এক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছিল। ইসলামাবাদে আসীন কোনো রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রীকে ঘূর্ণিঝড় উপদ্রুত এলাকায় দেখা যায়নি। দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার প্রথম পাতার একটি ছবি সেই সময় সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ন্যাপ নেতা মওলানা ভাসানী হাত তুলে আছেন পাকিস্তানের শীর্ষনেতাদের কয়েকজনের ছবির দিকে। ক্যাপশন ছিল: ‘‘ওরা কেউ আসেনি’’। পাকিস্তান সরকার তাদের ত্রাণ পরিকল্পনা ঘোষণা করার আগেই বিদেশী সাহায্য সংস্থাগুলো ত্রাণকর্মসূচী বাস্তবায়নে এগিয়ে আসে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বয়ং ত্রাণসামগ্রী নিয়ে নয় দিন ধরে দুর্গত এলাকায় ব্যাপক সফর করেন। ঢাকায় ফিরে এসে ২৬ নভেম্বর দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের সামনে লিখিত বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি বলেন: “শাসকদের মধ্যে যাঁরা মনে করেন যে, জনগণের ইচ্ছাকে উপেক্ষা করা যাবে, তাঁরা হুঁশিয়ার হোন, বাংলাদেশ আজ জেগেছে। বানচাল করা না হলে বাংলাদেশের মানুষ নির্বাচনের মাধ্যমে তাদের রায় ঘোষণা করবে। আর যদি নির্বাচন বানচাল হয়ে যায়, তাহলে ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে নিহত দশ লক্ষ লোক আমাদের উপর যে দায়িত্ব অর্পণ করে গেছে, তা সম্পাদেনর জন্য, আমরা যাতে স্বাধীন নাগরিক হিসাবে বাঁচতে পারি তার জন্য, আমরা যাতে নিজেদের ভাগ্যনিয়ন্তা হতে পারি তার জন্য, প্রয়োজনবোধে আরও দশ লক্ষ বাঙালি প্রাণ দেবে।’’ চট্টগ্রাম বেতারের অনুষ্ঠান প্রযোজক হিসাবে আমার উপর বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয় দৈনিক পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত দুর্গত মানুষদের অসহায় অবস্থা আর যন্ত্রণার নানা খবরের উপর ভিত্তি করে কথিকা লেখা। এই কাজ করতে গিয়ে পাকিস্তান নামের রাষ্ট্রটি নিয়ে মোহভঙ্গ হতে থাকে ক্রমশ।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হয় পকিস্তানের ইতিহাসে প্রথম এবং সম্ভবত একমাত্র নিরপেক্ষ সাধারণ নির্বাচন। আমাকে পাঠানো হলো পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি শহরে। নির্বাচনের ফল টেলিফোনে জানাতে হবে তাৎক্ষিণকভাবে। রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসক তখন এইচ. টি. ইমাম। পরবর্তীকালে তিনি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অধীনে ব্যাপক সাংগঠনিক তৎপরতা চালান। তাঁর দপ্তর থেকেই টেলিফোনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের ঢালাও জয়ের খবর পাঠিয়ে দিলাম সংবাদ বিভাগে। পূর্ব পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের মাত্র দুটি আসন ছাড়া সবকটি আসনে আওয়ামী লীগ বিপুল সংখ্যাধিক্য ভোটে বিজয়ী হয়। আর প্রাদেশিক পরিষদের ৩১০টি আসনের মধ্যে ২৯৮টি আসন জয় করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়া সত্ত্বেও বাঙালীদের হাতে শাসন ক্ষমতা তুলে না দেওয়ার নীল নকশা প্রস্তুত করতে থাকে ইসলামাবাদের শাসনকর্তারা।

অসহযোগের সেই সময় সমগ্র অনুষ্ঠানমালায় এলো নতুন এক চেহারা। শিল্পীরা এসে সমবেত কন্ঠে একের পর এক গণসংগীত রেকর্ড করে যাচ্ছেন। বেতার কেন্দ্রে তখন অবস্থান নিয়েছে বালুচ রেজিমেন্টের কিছু সৈন্য। ডিউটিরুমে একজন ক্যাপ্টেন আসীন। অফিসার-ইন-চার্জ হিসাবে একদিন ডিউটি করছি সেখানে। ফোন এলেই বলছি চট্টগ্রাম বেতার। ক্যাপ্টেন মৃদু হেসে প্রশ্ন করেন: ‘‘রেডিও পাকিস্তান আর বলছেন না আপনারা?’’ আমি জবাব না দিয়ে তাকাই দরজার সামনে স্টেনগান হাতে বিশালদেহী এক সৈনিকের দিকে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণের পর তাঁর নির্দেশমত বেতারেও আমরা কাজ চালিয়ে যেতে থাকি। রেডিও পাকিস্তান না বলে আমরা তখন বলছি চট্টগ্রাম বেতার। গঠিত হয়েছে কর্মীদের সংগ্রাম কমিটি। অসহযোগের সেই সময় সমগ্র অনুষ্ঠানমালায় এলো নতুন এক চেহারা। শিল্পীরা এসে সমবেত কণ্ঠে একের পর এক গণসংগীত রেকর্ড করে যাচ্ছেন। বেতার কেন্দ্রে তখন অবস্থান নিয়েছে বালুচ রেজিমেন্টের কিছু সৈন্য। ডিউটিরুমে একজন ক্যাপ্টেন আসীন। অফিসার-ইন-চার্জ হিসাবে একদিন ডিউটি করছি সেখানে। ফোন এলেই বলছি চট্টগ্রাম বেতার। ক্যাপ্টেন মৃদু হেসে প্রশ্ন করেন: ‘‘রেডিও পাকিস্তান আর বলছেন না আপনারা?’’ আমি জবাব না দিয়ে তাকাই দরজার সামনে স্টেনগান হাতে বিশালদেহী এক সৈনিকের দিকে। পরে অবশ্য বালুচ রেজিমেন্টের সৈন্যদের উঠিয়ে নিয়ে বেতার ভবনে পাঠানো হয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈনিকদের একটি দল। তাঁরা যখন বেতার ভবনে ঢুকতে যাবেন তখন দেখা গেলো পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকরা অস্ত্র হাতে তাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষে নামতে প্রস্তুত। দুই পক্ষের অফিসাররা কথা বলে শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেন।

২৫ মার্চ রাতে আগ্রাবাদ বেতার ভবন থেকে টাইগার পাস রেল কলোনিতে আমার বোনের বাসায় যাব। শহরের আলো হঠাৎ করে নিভে গেলো। দেখলাম বন্দর থেকে আসা এক মিলিটারি কনভয় যাচ্ছে আগ্রাবাদের প্রশস্ত সড়ক দিয়ে। বন্দুক দেখিয়ে মারধোর করে মানুষকে এই পথে বসানো সব ব্যারিকেড সরিয়ে ফেলতে বাধ্য করছে। ভেঙে ফেলছে রাস্তার পাশের দোকানপাট। ক্যান্টনমেন্টের দিকে কনভয় চলে যাওয়ার পর বিক্ষিপ্ত মনে বোনের বাসায় পৌঁছলাম। গভীর রাত পর্যন্ত শুনতে পেলাম সৈনিকদের বুটের শব্দ। ভোররাতে মাইকের আওয়াজে ঘুম ভাঙে। কেউ উচ্চকণ্ঠে বলছে: ‘‘বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন।’’ আমার কাছে তো স্বাধীনতার ঘোষণা সেই ৭ মার্চেই হয়ে গেছে— ‘‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’’

২৬ মার্চ খুব সকালে অল্প কিছু মুখে দিয়েই বেরিয়ে পড়লাম বেলাল মোহাম্মদের সন্ধানে। কে জানতো এই বাড়িতে আমি আবার পা দেবো বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর। জানতাম বেলাল ভাইকে কোথায় পাওয়া যেতে পারে। এনায়েত বাজারের মুশতারী লজ। বেগম মুশতারী শফী তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘বান্ধবী’ পত্রিকার সম্পাদক। মেয়েদের নিয়ে কাজ করেন। বেলাল মোহাম্মদ তাঁকে সম্পাদনার কাজে সাহায্য করেন। গৃহকর্তা চট্টগ্রামের বিশিষ্ট দন্তচিকিৎসক ডা. এম. শফী প্রগতিশীল উদারমনা মানুষ। কলেজ জীবন থেকেই এই বাড়িতে আমার যাতায়াত। দুজনেই আমার প্রতি অকুণ্ঠ স্নেহ বর্ষণ করে এসেছেন। মুশতারী লজেই পেয়ে গেলাম বেলাল ভাইকে। কিছুক্ষণ পর সেখানে এসে পৌঁছালো আবুল কাসেম সন্দ্বীপ। রেডিও টিউন করে আকাশবাণী কলকাতা থেকে শোনা গেলো ঘোষণা: ‘‘পূর্ববাংলায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে।’’ সেই সঙ্গে গান: ‘‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি।’’ আমাদের সবার চোখ তখন অশ্রুসজল। নানা ভাবনা তখন মনে। প্রতিরোধ চলছে নানা স্থানে। বেলাল ভাই মুক্তিযুদ্ধের কাজে বেতার চালু করা যায় কিনা তা নিয়ে কথা বলছিলেন বেগম মুশতারী শফীর সঙ্গে। চট্টগ্রাম বেতার তখন বন্ধ।

মুশতারী লজ থেকে বেরিয়ে একটা সময় বেলাল ভাই, আমি আর সন্দ্বীপ পৌঁছে গেলাম আগ্রাবাদ বেতার ভবনে। জানা গেলো, চট্টগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এম. এ. হান্নান কয়েকজন বেতার প্রকৌশলীকে দিয়ে কালুরঘাটের ট্রান্সমিটার চালু করান এবং স্বনামে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার উপর ৫ মিনিট বক্তব্য রাখেন। স্বাধীনতার সপক্ষে বেতার সচল করার দৃঢ় ইচ্ছা নিয়ে আমরা বেতার ভবন থেকে বেরিয়ে আওয়ামী লীগের কর্মী ডাক্তার আনোয়ার আলীর গাড়িতে রওয়ানা হই কালুরঘাট ট্রান্সমিটার স্টেশনের দিকে। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া গেলো সাইক্লোস্টাইল করা বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা সম্বলিত একটি প্রচারপত্র যা কিনা ওয়ারেলস মারফত এসে পৌঁছেছিল চট্টগ্রামের আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে। গাড়ীতে বেলাল ভাই, সন্দ্বীপ, আমি, চট্টগ্রাম বেতারের ঘোষিকা হোসেন আরা এবং স্থানীয় প্রবীণ কবি আব্দুস সালাম। তাঁর হাতে নিজের লেখা একটি কথিকা।

২৭ মার্চ সান্ধ্য অধিবেশনে স্বাধীনতার সপক্ষে বিবৃতি পাঠ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। বেলাল মোহাম্মদই তাঁকে পটিয়া থেকে নিয়ে এসেছিলেন ট্রান্সমিটার ভবনে। তাঁর কমান্ডে থাকা কিছু সৈন্যকে আমাদের সুরক্ষার জন্য ট্রান্সিমটার ভবনে রাখা হয়। বেলাল ভাইয়েরই অনুরোধে মেজর জিয়া স্বাধীনতার পক্ষে বিবৃতি দিতে রাজি হন। নিজেই ইংরেজিতে লেখেন তার বয়ান। এবং সে-বয়ানে ‘‘… on behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman …’’ কথাটার সুস্পষ্ট উল্লেখ ছিল।

ট্রান্সমিটার ভবনে পৌঁছলাম আমরা। এবার প্রস্তুতির পালা। সন্দ্বীপ দ্রুত তৈরি করে ফেলল একটি সংক্ষিপ্ত সংবাদ বুলেটিন। বেলাল ভাই নাম প্রস্তাব করলেন— স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র। সন্দ্বীপ যোগ করল বিপ্লবী কথাটা। স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র। সেখানে তখন চট্টগ্রাম বেতারের অনিয়মিত অনুষ্ঠান ঘোষক সুলতানুল আলমও উপস্থিত। বেলাল মোহাম্মদ তাঁর আত্মজৈবনিক ‘কত ঘরে ঠাঁই’ গ্রন্থে লিখেছেন: “চট্টগ্রাম বেতার কেন্দ্রের ১০ কিলোওয়াট মধ্যম তরঙ্গ ট্রান্সিমটার। এখান থেকে ঠিক সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটে আবুল কাসেম সন্দ্বীপের কন্ঠে প্রচারিত হলো: ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র থেকে বলছি।’ একই নাম ঘোষণা পরে আব্দুল্লাহ আল ফারুক ও সুলতানুল আলমের কন্ঠেও প্রচারিত হলো। বিভিন্ন কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুর নামাঙ্কিত ‚‘জরুরি ঘোষণা’টিও প্রচার করা হলো বারবার। এবং কবি আব্দুস সালামের ভাষণ।’’ বেলাল ভাইও তাঁর একটি লেখা পড়েন। কারোরই নাম প্রচার করা হয়নি। প্রচারের বিষয় বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা আর জনপ্রতিরোধ। এই অধিবেশনেই এম. এ. হান্নান দ্বিতীয়বারের মত বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণার উপর (আমাদের অনুরোধ মেনে) নিজের নাম উল্লেখ না করে বক্তব্য রাখেন। আধঘণ্টার অনুষ্ঠান। ট্রান্সমিটার চালিয়েছিলেন বেতারের মেকানিক আব্দুস শুকুর।

অধিবেশন শেষে আমরা যখন বাইরে এলাম তখন আর কেউ নেই। হান্নান সাহেবের জিপ স্টার্ট নিচ্ছে। আমরাও শহরে যাব। গাড়িতে জায়গা নেই— একথা বলে আমাদের তিনজনকে সঙ্গে নেয়ার অনুরোধ রাখলেন না তিনি। ধুলো উড়িয়ে চলে গেল জিপটি। আমরা স্তম্ভিত। তিন/চার মাইল পথ পায়ে হেঁটে রাত সাড়ে দশটার দিকে আমরা ঢুকলাম মুশতারী লজে। উষ্ণ অভ্যর্থনা পেলাম তিনজন। মুশতারী লজেই গভীর রাত পর্যন্ত চলল পরের দিনের প্রস্তুতি। বিদেশি বেতার শুনে খবর নোট করার কাজে সক্রিয় সাহায্য যুগিয়েছিলেন বেগম মুশতারী শফীর ছোট ভাই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র খন্দকার এহসানুল হক আনসারী। পরবর্তী সময়ে দখলিত চট্টগ্রামে পাকিস্তানি সেনারা ডাক্তার শফী ও তাঁর শ্যালককে ধরে নিয়ে যায়। তাঁরা আর ফেরেননি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম দুই শহীদ।

২৭ মার্চ থেকে ২৯ মার্চের মধ্যে আমাদের তিনজনের সঙ্গে যুক্ত হলেন আরও সাতজন — আমিনুর রহমান, শরফুজ্জামান, মুস্তফা আনোয়ার, সৈয়দ আব্দুস শাকের, রাশেদুল হোসেন, কাজি হাবিবুদ্দিন মনি ও রেজাউল করিম চৌধুরী। গড়ে ওঠে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দশজন সদস্যের প্রতিষ্ঠাকালীন দল। এই দল নিরলসভাবে কাজ করে গেছে বিজয়ের মাহেন্দ্রমুহূর্ত পর্যন্ত।

২৭ মার্চ সান্ধ্য অধিবেশনে স্বাধীনতার সপক্ষে বিবৃতি পাঠ করেন মেজর জিয়াউর রহমান। বেলাল মোহাম্মদই তাঁকে পটিয়া থেকে নিয়ে এসেছিলেন ট্রান্সমিটার ভবনে। তাঁর কমান্ডে থাকা কিছু সৈন্যকে আমাদের সুরক্ষার জন্য ট্রান্সিমটার ভবনে রাখা হয়। বেলাল ভাইয়েরই অনুরোধে মেজর জিয়া স্বাধীনতার পক্ষে বিবৃতি দিতে রাজি হন। নিজেই ইংরেজিতে লেখেন তার বয়ান। এবং সে-বয়ানে ‘‘… on behalf of our great national leader Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman …’’ কথাটার সুস্পষ্ট উল্লেখ ছিল। এর বাংলা অনুবাদে বেলাল মোহাম্মদকে সাহায্য করেন অধ্যাপক মমতাজউদদীন আহমদ। সান্ধ্য অধিবেশনে প্রচারিত হয় তাঁর বিবৃতি। বক্তব্যের বিষয় সংবাদ বুলেটিন হিসেবে প্রচার করেছিলেন আবুল কাসেম সন্দ্বীপ। অনুবাদ প্রথমে পঠিত হয় আমার কণ্ঠে। পরে একাধিক কণ্ঠে। ট্রান্সমিশনের দায়িত্বে ছিলেন আমিনুর রহমান ও আব্দুস শুকুর। অনুষ্ঠান ঘোষণার দায়িত্বও মূলত আমার উপর বর্তায়। অনুষ্ঠান শেষে বেলাল ভাই সন্দ্বীপ আর আমি ফিরে গিয়েছিলাম আবার এনায়েত বাজারের মুশতারী লজে। প্রস্তুতি নিয়েছিলাম পরের দিনের প্রভাতী অধিবেশনের জন্য।

২৭ মার্চ রাতে ঘটেছিল অপ্রত্যাশিত একটি ঘটনা। আমিনুর রহমানকে দিয়ে মেজর জিয়া আবার ট্রান্সিমটার চালু করান। এ প্রসঙ্গে আমিনুর রহমানের নিজের ভাষ্যই এখানে উল্লেখ করছি: “রাত ৯টা ৩০ মিনিটে আমি ও রেডিও মেকানিক আব্দুস শুকুর কালুরঘাটস্থ ট্রান্সমিটার ভবনে আসি। ট্রান্সমিটারের কাছেই ছিল আমাদের দু’জনের বাড়ি। মেজর জিয়াউর রহমান তখন চান্দগাঁওস্থ ট্রান্সমিটার ভবনে তাঁর সৈন্যসহ অবস্থান করছিলেন। মেজর জিয়ার সাথে পূর্বালাপের প্রেক্ষিতে রাত ১০টায় ট্রান্সমিটার পুনরায় চালু করি। ঐ সময় আরও কয়েকজন সামরিক কর্মকর্তার উপস্থিতিতে উক্ত অধিবেশনে মেজর জিয়াউর রহমান নিজেকে স্বাধীন বাংলা লিবারেশন গভর্নমেন্টের অস্থায়ী প্রধান হিসেবে ঘোষণা প্রদান করেন। পরে ‘জয় বাংলা’ বলে তিনি তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।’’ (বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র, আমিনুর রহমান : মুক্তি-সংগ্রামে স্বাধীন বাংলা বেতার — কামাল লোহানী পৃ: ১১৫)

পরদিন আমরা যখন এই খবর শুনলাম, আমাদের মনে হলো, এটা বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে। মেজর জিয়ার এই দ্বিতীয় ঘোষণাটি আপত্তিকর মনে হয়েছিল অনেকের কাছেই। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও রাজনীতিক এ. কে. খান প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এই ঘটনায়। ঘোষণাটি অবিলম্বে সংশোধন করার বার্তা পাঠিয়েছিলেন মেজর জিয়ার কাছে। কাজ হয়েছিল। নিজেকে আর কোনো কিছুর প্রধান বলে উল্লেখ করেননি তিনি। যথারীতি বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই বিবৃতি দেন। তাঁর লিখিত ইংরেজি বিবৃতি পাঠ করেন তখনকার তরুণ লেফটেন্যান্ট শমসের মুবিন চৌধুরী।

মেজর জিয়ার এই দ্বিতীয় ঘোষণাটি আপত্তিকর মনে হয়েছিল অনেকের কাছেই। চট্টগ্রামের বিশিষ্ট শিল্পপতি ও রাজনীতিক এ. কে. খান প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এই ঘটনায়। ঘোষণাটি অবিলম্বে সংশোধন করার বার্তা পাঠিয়েছিলেন মেজর জিয়ার কাছে। কাজ হয়েছিল। নিজেকে আর কোনো কিছুর প্রধান বলে উল্লেখ করেননি তিনি। যথারীতি বঙ্গবন্ধুর পক্ষেই বিবৃতি দেন। তাঁর লিখিত ইংরেজি বিবৃতি পাঠ করেন তখনকার তরুণ লেফটেন্যান্ট শমসের মুবিন চৌধুরী।

২৮/২৯ মার্চ থেকে আমরা ট্রান্সমিটার ভবনেই থাকতে শুরু করি। খাবার আসতো আশপাশের গ্রাম থেকে। স্থানীয় মোহরা গ্রামের দুই ভাই সক্রিয় রাজনৈতিক কর্মী সেকান্দার হায়াত খান ও হারুনর রশিদ খান এই কালুরঘাট প্রচার পর্বে আমাদের সর্বতোভাবে সাহায্য সহযোগিতা করেন। তাঁদের কাছে আমাদের অশেষ ঋণ কখনও শোধবার নয়। ২৬ এবং ২৭ মার্চের অধিবেশনেই শুধু বেতারের, ‘বিপ্লবী’ নামটি চালু ছিল। মেজর জিয়র নির্দেশে ‘বিপ্লবী’ কথাটা বাদ দেয়া হয়। ২৮ মার্চ থেকে শুধু স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র নামেই প্রচারকাজ চলেছে একেবারে শেষদিন পর্যন্ত। খুব সম্ভবত ২৯ মার্চ থেকে অনুষ্ঠানে সূচক সুর ও সমাপ্তি সুর হিসেবে যুক্ত করা হয় গাজী মজহারুল আনোয়ার রচিত এবং আনোয়ার পারভেজ সুরারোপিত সেই চিরায়ত গান ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’। আমাদের সহযোদ্ধা শরফুজ্জামান সংগ্রহ করে এনেছিল এই গানের রেকর্ডটি।

৩০ মার্চ দুপুরের অধিবেশনের পর আমরা সান্ধ্য অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি নিচ্ছি। বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, রেজাউল, কাজি হাবিবুদ্দিন মনি ও আমি মূল ট্রান্সমিটার ভবনে বসে আছি। বাকিরা রিসিভিং এলাকায়। বেলা দু’টার দিকে বিমানের শব্দ। ২টা বেজে ১০ মিনিটে দিগ্বিদিক প্রকম্পিত করে বোমার শব্দ। ট্রান্সমিটার ভবনের সুরক্ষায় নিয়েজিত সুবেদার সাবেত আলি ছেঁড়া কাপড় দিয়ে ছোট ছোট গুলি বানিয়ে আমাদের হাতে  দিয়েছিলেন কানে দেওয়ার জন্য। তাঁর নির্দেশে একটা টেবিলের নীচে স্থান নিয়েছিলাম আমরা। বুঝতে পারলাম বোমারু বিমান হামলা করছে। মনে হচ্ছিল পুরো ভবনটাই বোধহয় ঝাঁঝরা হয়ে যাবে। রেজাউল এতই কাঁপছিল যে কানের ফুটো আর খুঁজে পায় না। আমি নিজে তার কানে সেই কাপড় গুঁজে দেই। এক ধরনের শূন্যতা আমার মনে। ভয়ের বোধটাই যেন উবে গেছে। এমন সময় কাতর স্বরে সন্দ্বীপ বলে উঠল: ‘‘ফারুক ভাই, আমার পকেটে দেড়শোটা টাকা আছে, এটা নিয়ে নেবেন।’’

মুক্তিযুদ্ধে এটাই ছিল পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর প্রথম বিমান হামলা। দ্বিতীয়বার হামলা হয় ১৭ এপ্রিল ১৯৭১ পটিয়ায়। লক্ষ্য ছিলাম আমরাই। যদিও আমরা তখন পটিয়া ছেড়ে চলে গিয়েছি সীমান্ত শহর রামগড়ের দিকে। পটিয়ায় এক কিলোওয়াট শক্তিসম্পন্ন মোবাইল ট্রান্সমিটার নিয়ে পটিয়ার মাদ্রাসা এলাকায় আমাদের তিনদিন থাকার কথা ওরা জানতে পেরেছিল, তবে দেরিতে।

বোমার শব্দ মিলিয়ে যাওয়ার পর আমরা বাইের এসে দেখলাম ভবনের দেওয়ালে নানা জায়গায় বোমার চিহ্ন। বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিন্ন। অ্যান্টেনা অকেজো। এই ঘটনার পর আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাই। আশ্রয় নেই পাশের গ্রামে। ৩১ মার্চ আবার আমরা সবাই মিলিত হই ট্রান্সমিটার ভবনে। সিদ্ধান্ত হয় এক কিলোওয়াটের মোবাইল ট্রান্সমিটারটা তুলে নিয়ে যাওয়া হবে শত্রুমুক্ত কোনো অঞ্চলে। ট্রাকে ক’রে এই ট্রান্সমিটার প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয় পটিয়ায়। পরে সেখান থেকে ত্রিপুরার বাগাফা বেলোনিয়া ফরেস্ট হিলে। সেখানেই আমাদের প্রকৌশলী সহযোদ্ধারা কোনো রকম গাইডবুক ছাড়াই শুধু সার্কিট ডায়াগ্রাম দেখে চালু করেন এই ট্রান্সিমটার। দলের পাঁচজন সেখানে অনুষ্ঠানও প্রচার করেন।

বেলাল মোহাম্মেদর সঙ্গী হলাম সন্দ্বীপ আর আমি। বাকিরা রইলেন রামগড়ে। নৌকায় পার হলাম নদী। অন্ধকার চারদিকে। ওপাড়ে একটি জিপে করে নেয়া হলো আমাদের বাগাফায় বিএসএফ-এর একটি অস্থায়ী ঘাঁটিতে। অপারেটর একজন শিখ সৈনিক— অমর সিং। আমরা দ্রুত কাজে লেগে গেলাম। বাংলা সংবাদ তৈরি করল সন্দ্বীপ। ইংরেজি বুলেটিনের দায়িত্ব পড়ল আমার উপর। পড়লেন জনাব এ. কে. খান-এর পুত্র শামসুদ্দিন খান। তাকে চিনতেন বেলাল মোহাম্মদ। শর্টওয়েভ ৬১.৬৩ মিটার ব্যান্ডে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম অধিবেশনের সূচনা হলো এইভাবে।

৩ এপ্রিল সন্ধ্যার দিকে রামগড় পৌঁছই আমরা। রামগড় সীমান্তে ছোট্ট এক নদী। ওপারে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের সাব্রুম। রামগড়ে গিয়ে আমরা পেলাম রাঙ্গামাটির ডিসি তৌফিক ইমাম সাহেবকে। তিনি জানালেন, বিএসএফ-এর একটি ট্রান্সমিটার থেকে আমাদের প্রচার করতে হবে। বেলাল মোহাম্মেদর সঙ্গী হলাম সন্দ্বীপ আর আমি। বাকিরা রইলেন রামগড়ে। নৌকায় পার হলাম নদী। অন্ধকার চারদিকে। ওপারে একটি জিপে করে নেয়া হলো আমাদের বাগাফায় বিএসএফ-এর একটি অস্থায়ী ঘাঁটিতে। অপারেটর একজন শিখ সৈনিক— অমর সিং। আমরা দ্রুত কাজে লেগে গেলাম। বাংলা সংবাদ তৈরি করল সন্দ্বীপ। ইংরেজি বুলেটিনের দায়িত্ব পড়ল আমার উপর। পড়েলন জনাব এ. কে. খান-এর পুত্র শামসুদ্দিন খান। তাকে চিনতেন বেলাল মোহাম্মদ। শর্টওয়েভ ৬১.৬৩ মিটার ব্যান্ডে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের দ্বিতীয় পর্যায়ের প্রথম অধিবেশনের সূচনা হলো এইভাবে। এক ঘণ্টার অনুষ্ঠান। শেষ হবার পর আমাদের অবাক করে দিয়ে সেখানে উপস্থিত হলেন খোদ মেজর জিয়াউর রহমান। তাঁর সঙ্গেই ফিরে এলাম আমরা রামগড়ে। সেখানেই তখন তাঁর ঘাঁটি। তখনও মুক্তাঞ্চল। বাকি বন্ধুদের সঙ্গে মিলিত হলাম। রাত্রিবাস রামগড় বাজারের ছোট এক হোটেলে বাঁশের তক্তার উপর মলিন বিছানায়। তারপর ২৪ মে ১৯৭১ পর্যন্ত চলবে আমাদের প্রচারের আগরতলা পর্ব। ২৫ মে থেকে কলকাতায় শুরু হবে ঢাকা এবং অন্যান্য জায়গা থেকে পালিয়ে আসা বেতারকর্মী, সাংবাদিক, লেখক, শিল্পীদের মিলিত শক্তি দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের চূড়ান্ত প্রচারপর্ব। আমরাও সেখানে যোগ দেবো বৈকি।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণাকে আশ্রয় ক’রেই কালুরঘাটে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র চালু করেছিলাম আমরা চট্টগ্রামের কালুরঘাটে। এমন একটা সময় যখন সবকিছুই অনিশ্চিত। সেই অনিশ্চয়তার মাঝে বেতারে স্বাধীনতার পক্ষে প্রচারকাজ সাধারণ মানুষের মাঝে আশার সঞ্চার করেছিল সন্দেহ নেই। তাঁরা জানতে পারছিলেন হানাদার পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আর লড়াইয়ের খবর। কালুরঘাট পর্বে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই আমাদের সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন। আমাদের খাবার সরবরাহ করতেও দ্বিধা করেননি তাঁরা। আমাদের সহযোদ্ধাদের মধ্যে ছয় জন বিদায় নিয়েছেন — বেঁচে নেই বেলাল মোহাম্মদ, আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, মুস্তফা আনোয়ার, সৈয়দ আব্দুস শাকের, রাশেদুল হোসেন, কাজি হাবিবুদ্দিন মনি। স্বাধীনতা দিবসের এই মহান দিনে স্মরণ করি তাঁদের।

লেখক: স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম সংগঠক-সাংবাদিক। ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগের সাবেক প্রধান।
ইমেইল: abdafq@protonmail.com

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist