Beta
শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৪

সাক্ষাৎকার

দেশে গণহত্যা নিয়ে বেশি কাজ হলে সেটাই হবে বড় স্বীকৃতি

মুনতাসীর মামুন

২০১৭ সাল থেকে জাতীয় গণহত্যা দিবস পালন করছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বাংলাদেশে একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিও জোরদার হচ্ছে। সুযোগ তৈরি হয়েছে গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণের কাজের পরিধি বাড়ানোর এবং বিষয়টিকে সঠিকভাবে জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপনের। এর আগে ২০১৪ সালে খুলনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে সকাল সন্ধ্যার সঙ্গে কথা বলেছেন ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশফাকুর রহমান

দেশে গণহত্যা নিয়ে বেশি কাজ হলে সেটাই হবে বড় স্বীকৃতি

মুনতাসীর মামুন

২০১৭ সাল থেকে জাতীয় গণহত্যা দিবস পালন করছে বাংলাদেশ। পাশাপাশি বাংলাদেশে একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবিও জোরদার হচ্ছে। সুযোগ তৈরি হয়েছে গণহত্যার স্মৃতি সংরক্ষণের কাজের পরিধি বাড়ানোর এবং বিষয়টিকে সঠিকভাবে জাতীয়-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উপস্থাপনের। এর আগে ২০১৪ সালে খুলনায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘর’। মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে সকাল সন্ধ্যার সঙ্গে কথা বলেছেন ১৯৭১: গণহত্যা-নির্যাতন আর্কাইভ ও জাদুঘরের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আশফাকুর রহমান

সকাল সন্ধ্যা: বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই যুদ্ধাপরাধ ও গণহত্যার বিচার করতে ১৯৭৩ সালে পাস হয়েছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) আইন। করা হয়েছিল যুদ্ধাপরাধীদের তালিকা। আপনার স্মৃতি থেকে সেই দিনগুলোর কথা জানতে চাই।

মুনতাসীর মামুন: আমাদের সেই স্মৃতি কিছুটা মনে আছে, কিছুটা মনে নেই। কিছুটা আবার পরবর্তীকালে পড়াশোনা করে জেনেছি। মনে নেই এই কারণে যে, ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ খুব ঝঞ্ঝাময় একটি সময় ছিল আমাদের জীবনে। একেবারে শূন্য থেকে যাত্রা— মানে বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়-স্বজন সবাই ছিন্নবিছিন্ন একটা অবস্থা— খাদ্যাভাব, অর্থাভাব। সবকিছু মিলিয়ে যন্ত্রণাময় একটা পরিস্থিতি। সেই পরিস্থিতিতে প্রতিনিয়ত যে কাজগুলো হচ্ছে, সেগুলোই যে বাংলাদেশের ভিত্তি স্থাপন করছে সেটা কিন্তু আমরা বুঝতে পারিনি। কারণ আমরা তখন প্রতিদিনের সমস্যায় জর্জরিত।

এর মধ্যে একটা জিনিস লক্ষ্যণীয়, শুধু বঙ্গবন্ধু নয়, ১৯৭১ সালে যে বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়েছিল তারা প্রথম থেকেই বলেছে— ‘‘বিচার হবে’’। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত এমন কোনও দিন নেই যে তিনি বলেননি— ‘‘বিচার হবে’’। সিমলা চুক্তির পরও তিনি কিন্তু বলে যাচ্ছেন— ‘‘বিচার হবে’’। তারপরও যখন অনেকের শাস্তি মওকুফ করা হলো, আমরা তখন অনেকে ক্ষুব্ধ হয়েছি। কারণ আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সবকিছু চেয়েছি। কিন্তু পরবর্তীকালে দলিলপত্র ঘেঁটে দেখেছি, বাধ্য হয়ে তিনি এ কাজটি করেছেন। কারণ ভারত পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের চুক্তিটি করে ফেলেছে। ভারতও আর যুদ্ধবন্দিদের রাখতে চাচ্ছে না। তাদের রাখতে বিপুল খরচ আছে। সবাই বলবে, ‘‘তোমরা আটকে রেখেছো।’’ তাদেরকে যে রাখবে সেই অবস্থাও বাংলাদেশের ছিল না। ড. কামাল হোসেন যদিও বলছিলেন, ‘‘তিনি দলিলপত্র জোগাড় করেছিলেন।’’ কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, সংখ্যাটা ৪৫০ থেকে ১১৮-তে নামিয়ে আনা হয়েছে। পরবর্তীকালে তাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘‘এগুলো কোথায় আছে?’’ আমি তখন দলিলপত্রগুলোর খোঁজ করছিলাম। কেউ একজন বলেছিলেন, ‘‘এস আর পালের কাছে দলিলপত্রগুলো ছিল।’’ তাকে বোধহয় প্রসিকিউশনের প্রধান করা হয়েছিল। কিন্তু সেই দলিলপত্রগুলোর খোঁজ আমরা পাইনি। কোথায় সেই ট্রাঙ্ক গেল— কী গেল— সেটা আমরা জানি না।

প্রথম থেকেই কিন্তু বিচারের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু এটা যে একটা মতাদর্শ, এটাকে প্রতিষ্ঠিত করতে বঙ্গবন্ধু চেষ্টা করেছিলেন— যতটা পেরেছিলেন তিনি করেছিলেন। পরবর্তীকালে সেই চেষ্টাটা আর হয়নি। কিন্তু পুরো সমাজের যে প্রতিরোধটা দরকার ছিল— সমাজ সেটা করেনি। মুক্তিযোদ্ধারা অনেক ছাড় দিয়েছে, পরিবারগুলো অনেক ছাড় দিয়েছে। এটা আমরা সবাই জানি।

কিন্তু বঙ্গবন্ধু একটা কারণে বাধ্য হয়েছিলেন, পাকিস্তানে বাঙালি যারা ছিলেন— তাদের ফেরত আনা নিয়ে প্রবল জনমত গড়ে উঠেছিল। তাই তিনি বাধ্য হয়েছিলেন, অনেক যুদ্ধাপরাধীকে ছেড়ে দিতে। মওলানা ভাসানীও এ ক্ষেত্রে একটা বড় কারণ। এ কথাটা আমরা বলি না। অথচ তিনি এমন রাজনীতিবিদ যার অনেক অনুসারী ছিল। আর বারবার তিনি মত বদলেছেন। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পটভূমি তৈরি করতে ভাসানীর পরোক্ষ অবদান আছে। কারণ তিনি যেসব কথা বলেছেন ‘হককথা’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন বিবৃতিতে গুজব ছড়িয়েছেন। মারুফ রসুলের বইতে এই বিষয়ে আলোচনা আছে। আজকাল আমরা এগুলো ভুলে যাই।

সকাল সন্ধ্যা: যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে যে সামাজিক প্রতিরোধের কথা আপনি বললেন, সেটি আমরা জাহানারা ইমামের মধ্য দিয়ে গত শতকের নব্বইয়ের দশক থেকে দেখতে পাই। এর আগে কি কোনও প্রতিরোধ হয়েছিল?

মুনতাসীর মামুন: সেই সময় হয়ত নানাকারণে সামাজিক প্রতিরোধ হয়নি— হওয়া উচিত ছিল। আজকের সমাজ দেখলে আমি বুঝি, বঙ্গবন্ধুর আমলে কতটা সহিষ্ণুতা ছিল। বঙ্গবন্ধুর আমলে যতটা কার্টুন ছাপা হয়েছে, সেটা গত ৫০ বছরে ছাপা হয়নি। এই একটি জিনিস দিয়ে বোঝা যায় অবস্থাটা কেমন হয়েছে এখন।

আমাদের আলোচনায় সবসময় বিজয়ের কথা এসেছে— গণহত্যার কথা আসেনি। গণহত্যার কথা আমরা বলা শুরু করলাম গত শতকের নব্বইয়ের দশকে। জাহানারা ইমাম এলেন, আরও অনেকে এলেন। কিন্তু এর পেছনে মূল শক্তি ছিল শেখ হাসিনা, যেটা অনেকে জানেন না।

একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির কাজে সেই সময়, এমনকি রেসকোর্সে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) যে সভা হয়েছিল, সেই সময় আমি দেশে ছিলাম না— জাপানে ছিলাম। কিন্তু আমি জানি যে, শেখ হাসিনার প্রত্যক্ষ সহায়তা না পেলে এতটুকু পর্যন্ত আসা যেত না।

সকাল সন্ধ্যা: অনেক দেরিতে হলেও, সমাজ ও রাষ্ট্রে গণহত্যার বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে। গত প্রায় ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে এ চর্চাটি হচ্ছে…

মুনতাসীর মামুন: এটা বিবেচনা করতে হবে জিয়া ও খালেদা জিয়ার শাসনামল দিয়ে। তারা যদি গণহত্যার কথা বলে তাহলে জামায়াত আর ধর্মান্ধ দলগুলোর কথা চলে আসে। ওই সময় শুধু বিজয়ের কথা বলা হয়েছে— গণহত্যার কথা বলা হয়নি। বিজয়ের কথা বলা হয়েছে এই কারণে যে, এর সঙ্গে জিয়াউর রহমান যুক্ত। এটা কিন্তু রাজনীতির ব্যাপার।

আমরাই গণহত্যা ও ঘাতকদের বিচারের কথা বলা শুরু করলাম। আমরা লেখালেখি করলাম এই বিষয় নিয়ে। শাহরিয়ার কবির লেখা দিয়ে ঘাতকদের ওপর যে বইটি প্রকাশ করল, তারপরই নির্মূল কমিটি হলো। এই কমিটি থেকে আমরা ঘাতকদের কথা বলে এসেছি। কিন্তু আমার মনে হয়, গত ১০ বছরের বেশি সময় ধরে আমি বা শাহরিয়ার গণহত্যা নিয়ে কথা বলেছি ও লিখেছি— গণহত্যা নিয়ে জাদুঘর হয়েছে।

সকাল সন্ধ্যা: ২০১৭ সাল থেকে আমরা জাতীয় গণহত্যা দিবস পালন করে আসছি। এই দিবসের কোনও প্রভাব আমাদের জাতীয় জীবনে পড়েছে?

মুনতাসীর মামুন: এটা খুব মজার ব্যাপার যে, আমাদের দেশে কীভাবে কাজ হয়। মুক্তিযুদ্ধে সারা বিশ্বের লোকজন যুক্ত ছিল তাদের সম্মাননা দিয়েছে বাংলাদেশ। এই কাজটি কীভাবে হয়েছিল? প্রথমে আমি কয়েকটি প্রবন্ধ লেখার মধ্য দিয়ে কাজটি শুরু হয়েছিল। সংসদে প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। তারপর আমলাতন্ত্রের বিভিন্ন পর্যায় ঘুরে মুক্তিযোদ্ধাদের এই সম্মাননা দেওয়া সম্ভব হলো।

গণহত্যা দিবসের ক্ষেত্রেও তাই। আমি লিখেছি, ‘‘আপনারা হাত ধোয়া দিবস পালন করেন, গণহত্যা দিবস পালন করেন না।’’ নির্মূল কমিটি কিন্তু গণহত্যা দিবস, সংবিধান দিবস, স্বীকৃতি দিবস পালন করে আসছে। প্রত্যেকটিই দিবসই কিন্তু এখন জাতীয়ভাবে গৃহীত হচ্ছে। এই কালরাত পালন— এটাতো নির্মূল কমিটির করা। কিন্তু আমরা এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারিনি।

মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করে জুনায়েদ আহমেদের লেখা বই প্রকাশ করেছিল পাকিস্তান। যেটা পাকিস্তান বিভিন্ন দেশে বিলি করেছে। আমার ও শাহরিয়ারের কাছে বইটি এল। বইটিতে প্রকাশিত মুক্তিযুদ্ধে শহীদের লাশের আলোকচিত্র বিষয়ে বলা হয়েছে, ‘‘এগুলো বিহারীদের লাশ। মুক্তিযোদ্ধারা এদের হত্যা করেছে।’’ একদম সম্পূর্ণ বিকৃত একটা ইতিহাস। ২০১৭ সালে এ নিয়ে তখন খুব একটা কথা বলা হয়নি। আমি এ বিষয়ে লিখলাম। আমরা এটা নিয়ে একটা সেমিনার আয়োজন করলাম। শাহরিয়ার কবির মূল বক্তা। বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদকে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানালাম।

একজন বক্তা হিসেবে সেমিনারে আমি বললাম, ‘‘আমরা কত ধরনের দিবস পালন করি। আর তোফায়েল আহমেদ, একজন মুক্তিযোদ্ধা— আমরা একটা গণহত্যা দিবস পালন করতে পারলাম না।’’ তোফায়েল আহমেদ তখন বললেন, ‘‘মুনতাসীর এই কথাটা বলল। আমিতো একজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মাথায় কেন এটা আসল না। আমাকে বলেন মুনতাসীর কী করতে হবে?’’ তার বইতে তিনি লিখেছেনও এ কথা।

আমাকে তিনি খুব স্নেহ করেন। আমি তাকে বললাম, ‘‘সংসদে অধিবেশন চলছে। জুনায়েদ আহমেদের বইটি নিয়ে যান। আপনি সেখানে গিয়ে বলেন।’’ তিনি বইটি নিয়ে গেলেন। সংসদে তিনি আবেগময় একটি বক্তৃতা দিলেন। সেই সময় বইমেলা চলছিল। আমি তখন বইমেলায়। সন্ধ্যায় আমাকে লোকজন বলছেন, ‘‘তোফায়েল আহমেদ আপনাকে সংসদ থেকে খুঁজেছেন। টেলিফোনে পাচ্ছেন না আপনাকে।’’ পরে ফোনে তিনি আমাকে বললেন, ‘‘গণহত্যা দিবস পালন হবে। এটা সংসদে পাস হয়ে গিয়েছে।’’ এর আগে শিরীন শারমিন চৌধুরী একটি প্রস্তাব এনে রেখেছিলেন। তিনি নির্মূল কমিটির একজন। তিনি সেই প্রস্তাবটি সংসদে এনে এ বিষয়ে আলোচনা হওয়ার পর গণহত্যা দিবস পালনের বিষয়টি পাস হয়। বাংলাদেশে কখনও কখনও আন্দোলন করে কিছু হয় না। কিন্তু এইভাবেও কাজ হয়। এর সঙ্গেও আমরাও জড়িত। যদিও এই বিষয় নিয়ে আমরা খুব একটা বলি না।

গণহত্যা দিবসের পালনের প্রভাব কিছুটা পড়েছে। কিন্তু পুরোপুরি হয়নি। এর পর দিনই তো স্বাধীনতা দিবস। তাই দুটো একসঙ্গে মিলে গেছে। আবার যেভাবে সরকারের দিনটি পালন করা উচিত সেভাবেও হচ্ছে না। আসলে গণহত্যা দিবস যথাযথভাবে পালন করতে না পারলে দিনটির তাৎপর্য বোঝা যাবে না।

সকাল সন্ধ্যা: ‘গণহত্যা দিবস’ না ‘গণহত্যা স্মরণ দিবস’— কোন ধারণাটি আমরা এক্ষেত্রে বিবেচনা করব?

মুনতাসীর মামুন: দিবস যখন পালিত হয় তখনই তা স্মরণ হয়। এসব বিষয়ে তর্ক করার কোনও মানে নেই। আমরা যখন স্বাধীনতা দিবস পালন করি, বিজয় দিবস পালন করি— আমরা কি স্বাধীনতা বা বিজয় স্মরণ দিবস পালন করি? আমরাতো আমাদের মতো করে গণহত্যা দিবস পালন করছি। অন্য দেশের উদাহরণ এক্ষেত্রে প্রয়োজন নেই।

সকাল সন্ধ্যা: সমাজে-রাষ্ট্রে গণহত্যা বিষয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা হচ্ছে— বিভিন্ন ধরনের আয়োজন হচ্ছে। বিভিন্ন আলোচনায় বাংলাদেশ গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবির বিষয়টি উঠে এসেছে…

মুনতাসীর মামুন: আমাদের এটা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। অনেকে মনে করেন, বিভিন্ন রাষ্ট্র ও তাদের সংসদ বলবে— বাংলাদেশে গণহত্যা হয়েছে। আমি সেটাকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মনে করি না। বিষয়টি কী এরকম, যুক্তরাষ্ট্র বলবে ফিলিস্তিনে গণহত্যা হচ্ছে— এরপর সব দেশ বলবে গণহত্যা হচ্ছে! যুক্তরাষ্ট্র না বললে কেউ এটা বলবে না। রাজনীতি ক্রমেই জটিল হয়ে গেছে।

আমরা যদি এতই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথা বলি, তাহলে রাষ্ট্র— পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কেন উদ্যোগ নিচ্ছে না? এই কাজটাতো সার্কভুক্ত দেশগুলো দিয়েই শুরু হতে পারে। এই জোটের সদস্য দেশগুলো তাদের সংসদে বিষয়টি উপস্থাপন করুক। এই বিষয়টি আসলে কথার কথা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির বিষয়টি হচ্ছে এই, গণহত্যা নিয়ে সব জায়গায় আলোচনা হবে। এনসাইক্লোপিডিয়ায় যাবে, ক্লাসে পড়ানো হবে— সবাই স্বীকার করবে। এটাকে স্বীকার করা হয়নি দুটো কারণে— রাজনৈতিক কারণেও। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত ও আর দুই-একটি দেশ ছাড়া সবাই আমাদের বিরুদ্ধে ছিল। এখন যদি সব দেশ স্বীকার করে, স্মরণ করে, লেখালেখি করে, বিচারের কথা বলে— তাহলে তারাও কিন্তু ‘বিপদে’ পড়ে যাবে। যে কারণে ১৯৭২ সাল থেকেই বিশ্ব থেকে মুছে গেল বাংলাদেশ গণহত্যার কথা। কিন্তু কম্বোডিয়ারটা থেকে গেল। কারণ কী? পল পটকে যেহেতু যুক্তরাষ্ট্র পছন্দ করেন না সেহেতু এটা গণহত্যা হিসেবে আলোচনায় এল— স্বীকৃতি পেল। সেখানে গণহত্যা জাদুঘর হয়েছে। সবাই সেখানে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পাশ্চাত্যের দেশগুলো এখানে কাজ করছে। কিন্তু বিশুদ্ধভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে, বাংলাদেশে প্রকৃত অর্থে গণহত্যা হয়েছে।

এই বিষয়টি জানাতে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ দরকার। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও সংস্থায় এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলতে হবে। দীর্ঘদিন এ বিষয় নিয়ে আলোচনা না থাকায় এটি অনেকটা চাপা পড়ে গিয়েছিল। এখন আমরা যখন বলছি, গণহত্যা দিবস হয়েছে— প্রধানমন্ত্রীর পৃষ্ঠপোষকতায় গণহত্যা জাদুঘর হয়েছে। এখন এটা এশিয়ার অন্যতম গণহত্যা জাদুঘর। অন্য অনেক জাদুঘর থেকে এটা অনেক সমৃদ্ধ। জাদুঘর বলতে যা বোঝায় এটা তাই।

আমরা এই জাদুঘর থেকে গত কয়েক বছর ধরে যে আন্তর্জাতিক সেমিনার করেছি সেটি নিয়ে ভারতসহ অনেক জায়গায় বাংলাদেশ গণহত্যা আলোচিত হচ্ছে। এই জাদঘুর থেকে ইংরেজি ও বাংলায় দুটি গবেষণা পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। যার ফলে এখন বিষয়টি একাডেমিভাবে আলোচনা হচ্ছে। বাংলাদেশ গণহত্যার বিষয়টি আমরা ডিজিটালাইজড করেছি। গণহত্যা জাদুঘরের ওয়েবসাইটে সেগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত আছে। পাকিস্তানি লেখক আনাম জাকারিয়ার যে বইটি কানাডা থেকে প্রকাশ হয়েছে, সেখানে এই জাদুঘর নিয়ে আলাদা একটি অধ্যায় আছে।

এখন আমরা একটি জেনোসাইড ইনডেক্স করেছি। অর্থাৎ প্রতিটি জেনোসাইডের ওপর একটি বই। এমন কাজও বিশ্বে প্রথম। আমরা একটি জরিপ করেছি ৬৪টি জেলায়— বিষয়টি শনাক্তও করেছি। ৫০টির মতো বধ্যভূমিতে ফলক নির্মাণ করা হয়েছে। এখন ২৫শে মার্চ এসব জায়গায় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হচ্ছে— স্মরণ করা হচ্ছে। এমন কাজও বিশ্বে প্রথম। আসলে আমাদের দেশে এগুলো নিয়ে যত বেশি কাজ হবে— এটাই তখন হবে বড় স্বীকৃতি।

সকাল সন্ধ্যা: আপনি যুক্ত ছিলেন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত অনেকগুলো জাদুঘরের সঙ্গে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা নগর জাদুঘর, বঙ্গবন্ধু জাদুঘর, টাকা জাদুঘর। সর্বশেষ আপনি করলেন খুলনায় গণহত্যা জাদুঘর। জাদুঘর প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আপনার এই গভীর আগ্রহের কারণ সম্পর্কে জানতে চাই।

মুনতাসীর মামুন: আমরা বারবার আমাদের ঐতিহ্যের কথা বলি— সংস্কৃতির কথা বলি। যেসব নিয়ে আমি কাজ করেছি, এগুলোতে আমাদের সংস্কৃতির অঙ্গ। আমি ইতিহাসের ছাত্র বটে— কিন্তু আমার যদি আগ্রহ না থাকে তাহলে কার থাকবে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়েও আমি মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটি জাদুঘর করেছি। সেটার কিছুই এখন অবশিষ্ট নেই। ঢাকা নগর জাদুঘর গড়ার পর অন্যের ব্যবস্থাপনায় চলে গিয়েছে। টাকার জাদুঘরেও আছে অব্যবস্থাপনা। এখানে গড়াটা সহজ, কিন্তু আমরা সেটা রাখতে পারি না। গণহত্যা জাদুঘরটা আমরা নিজেরা গড়েছি— নিজেরাই রক্ষণাবেক্ষণ করছি— দেখাশোনা করছি।

সকাল সন্ধ্যা: খুলনায় গণহত্যা জাদুঘর করতে উদ্যোগী হলেন কেন?

মুনতাসীর মামুন: এটা করেছি অনেকটা রাগ থেকে— জেদ থেকে। আজ থেকে আমি ১৫-২০ বছর আগে খুলনায় গিয়েছিলাম। দেখলাম যে, সবচেয়ে বড় রাস্তাটার নাম ‘খান-এ-সবুরের’ নামে। যশোর রোড কীভাবে খান-এ-সবুরের নামে হয়? শাহরিয়ার কবিরকে এ কথাটা বললাম। এ নিয়ে আমি একটি মামলা করলাম। রিটে আমি জয়ী হলাম। তারপর রাস্তার নামটি ‘যশোর রোড’ হলো। ওই সময় আমি ইতিহাস সম্মিলনী করছিলাম। সেখান থেকে খুলনায় গণহত্যা জাদুঘরের কথা এল। চুকনগর বধ্যভূমি নিয়ে আমিই প্রথম বই লিখেছিলাম— বলা যায় অনেকটা পুনঃআবিষ্কারের মতো। আজ নিজস্ব জমিতে নিজস্ব ভবনে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

সকাল সন্ধ্যা: এই জাদুঘরে গণহত্যার স্মৃতি কীভাবে উপস্থাপিত হয়েছে?

মুনতাসীর মামুন: জাদুঘরে উপস্থাপিত সব সামগ্রীতে এই স্মৃতি আছে। আমি চেষ্টা করেছি, গণহত্যার শিকার ও ঘাতক— তাদের সবার প্রমাণপত্র ও উপাত্ত সবকিছু জোগাড়ের চেষ্টা করেছি। যেমন শান্তি কমিটির কার্যধারা এই জাদুঘরে আছে। যার ফলে এখন কেউ অস্বীকার করতে পারবে না, শান্তি কমিটি বলে কিছু ছিল না।

সকাল সন্ধ্যা: আপনার কথাই থেকেই জেনেছি, এটি এশিয়ার একটি বড় গণহত্যা জাদুঘর…

মুনতাসীর মামুন: আমি যদি বিভিন্ন তথ্যের সাহায্য নিয়ে দেখি, এশিয়াতে এত বড় গণহত্যা জাদুঘর নেই। চীনে থাকা উচিত ছিল। কোরিয়াতেও থাকা দরকার ছিল। কম্বোডিয়ায় আছে। সেই ক্ষেত্রে আমি বলেছি, আমাদের জাদুঘর আছে, যেটা নিয়মিতভাবে চলছে। আকার, আয়োজন ও সংগ্রহের দিক থেকে এটা এশিয়ার বড় গণহত্যা জাদুঘর। এ দাবি আমরা করতেই পারি।  

সকাল সন্ধ্যা: আপনি বলেছেন, জাদুঘরের পক্ষ থেকে বধ্যভূমি বিষয়ে জানতে ৬৪টি জেলায় জরিপ করা হয়েছে। ডিজিটালাইজেশন করা হয়েছে। এই জরিপ ও গবেষণা নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

মুনতাসীর মামুন: মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না— ভাসাভাসা জানি। যেমন মুক্তিযুদ্ধের সময় আমি ঢাকায় ছিলাম। কিন্তু খুলনায় কী হয়েছে সেটা আমি জানি না। এই কাজ করতে গ্রামে-গঞ্জে গিয়ে দেখেছি, প্রতি বর্গমাইলে পাকিস্তানি বাহিনী মানুষ হত্যা করেছে। তাদের দোসররা যায়নি এমন কোনও জায়গা নেই। প্রত্যেকটি জায়গায় ধর্ষণ হয়েছে, প্রত্যেকটি জায়গা পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। আমার মনে হয়, ৩০ লাখ শহীদ সংখ্যাটি কম। শরণার্থী হয়ে বা হতে গিয়ে পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত ৪২ জেলার প্রতিবেদন প্রকাশ করেছি। এ পর্যন্ত আমরা ১৭ হাজার ঘটনা উদ্ঘাটন করেছি। যার মধ্যে রয়েছে— গণহত্যা, গণকবর, বধ্যভূমি এবং টর্চার সেলের তালিকা। এসব ঘটনার মধ্যে ১১-১২ হাজার গণহত্যার ঘটনা রয়েছে।

সকাল সন্ধ্যা: গণহত্যার ইতিহাস নতুন করে জানছে মানুষ আপনাদের মাধ্যমে। ভবিষ্যতে এই ইতিহাসকে কীভাবে দেখা উচিত বলে আপনি মনে করেন?

মুনতাসীর মামুন: ১০০ বছর পর হলেও বাংলাদেশ যে হয়েছে— এটি তখন ইতিহাসের উপাদান ও বস্তু। এ নিয়ে গবেষণা করলেই আমাদের মৌলিক যে বিষয়টি ‘গণহত্যা’ সেটিও আসবে। তখন এই তথ্যটি সবার কাজে লাগবে। আমাদের সবার মনে রাখা দরকার, একটি দেশের এমনি এমনি জন্ম হয় না। বাংলাদেশের এমনি এমনি জন্ম হয়নি। এই ইতিহাস জানতে নতুন প্রজন্মের কাছে নিশ্চয়ই খুলনার এই গণহত্যা জাদুঘর চিরস্থায়ী অভিঘাতের সৃষ্টি করবে।

সকাল সন্ধ্যা: আপনাকে ধন্যবাদ।
মুনতাসীর মামুন: আপনাকে ধন্যবাদ।

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist