Beta
বুধবার, ২২ মে, ২০২৪
Beta
বুধবার, ২২ মে, ২০২৪

গুরুত্বের কারিগরি শিক্ষায় সমস্যার অন্ত নেই

বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড।
Picture of মেরিনা মিতু

মেরিনা মিতু

সনদ বাণিজ্য চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি গ্রেপ্তার হন বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান আলী আকবর খানের স্ত্রী; দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে আকবর খানকেও।

ওই ঘটনার পর কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে নতুন নতুন প্রশ্ন সামনে আসছে। সেসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে সকাল সন্ধ্যা।

মুখস্থনির্ভর ও গৎবাঁধা পাঠ্যসূচির প্রচলিত ধারার বাইরে শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে দক্ষ করতে দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের স্বপ্নও দেখা হচ্ছে। ঠিক এমন সময় সনদ বাণিজ্যের ঘটনায় বেরিয়ে এসেছে অন্য চিত্র।

দেশে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষক ও প্রশিক্ষক সংকট অনেক। ল্যাব বা গবেষণাগারও অপর্যাপ্ত। অনেক প্রতিষ্ঠানে ল্যাব থাকলেও যন্ত্রপাতি নেই। যাও আছে, তা পুরনো।

বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবস্থা আরও নাজুক। শিক্ষার নামে এসব প্রতিষ্ঠানগুলো সনদ বাণিজ্যকেই প্রাধান্য দিচ্ছে।

এছাড়া কারিগরি শিক্ষার পাঠ্যক্রম-পাঠ্যসূচিও সেকেলে। ফলে কোর্স শেষ করে শিক্ষার্থীরা সনদ পেলেও কার্যকর কারিগরি শিক্ষা থেকে বঞ্চিত থাকছে।

এমন বহুমুখী সংকটে ধুঁকছে দেশের সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো।

অর্থায়ন বাড়লেও কমছে শিক্ষার্থীর হার

দেশে কারিগরি শিক্ষার প্রসার ও উন্নয়নে পুরনো কারিগরি শিক্ষা আইন, ১৯৬৭ এ পরিবর্তন এনে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষাবোর্ড আইন, ২০১৮ প্রণয়ন করে সরকার।

কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, বর্তমানে দেশের ‘১০০টি উপজেলায় ১টি করে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ স্থাপন’ নামে একটি প্রকল্প চালু আছে। এছাড়া উপজেলা পর্যায়ে আরও ৩২৯টি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন প্রকল্পও নেওয়া হয়েছে।

দেশে এরইমধ্যে টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজগুলোতে কারিগরি শিক্ষায় ৬ষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় সরকার।

তবে সরকারের অর্থায়ন ও উদ্যোগ থাকলেও তেমন কোনও প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। অর্থায়ন বাড়লেও প্রতিবছরই কমছে কারিগরি শিক্ষার্থীর সংখ্যা।

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

বর্তমানে দেশে কারিগরি শিক্ষায় অংশগ্রহণের হার (এনরোলমেন্টে) ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশের কারিগরি শিক্ষার ডিপ্লোমা স্তরে সরকারের ব্যয় ১৫০ কোটি ৬৯ লাখ ৬৩ হাজার ৮৬৮ টাকা। বিপরীতে ওই শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ৯১ হাজার ২৬ জন।

এর আগে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে কারিগরি শিক্ষায় সরকারের ব্যয় হয় ৭৬ কোটি ৯৩ লাখ ৩৮ হাজার ৩৯১ টাকা। বিপরীতে শিক্ষার্থী সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১১ হাজার ১২০ জন।

২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষে শিক্ষার্থীদের এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ১ লাখ ৬ হাজার ৪১৮ ও ৯৩ হাজার ৩০৯ জন। ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৯১ হাজার ২৬ জন।

কারিগরি শিক্ষায় গত পাঁচ বছরে সরকারের ব্যয় বেড়েছে ৭৩ কোটি ৬৬ লাখ ২৫ হাজার ৪৭৭ টাকা। আর শিক্ষার্থী কমেছে ২০ হাজার ৯৪ জন।

অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে কারিগরি শিক্ষায় সরকারের ব্যয় দ্বিগুণের কাছাকাছি বেড়েছে। বিপরীতে শিক্ষার্থী সংখ্যা বাড়ার কথা থাকলেও উল্টো কমেছে।

এছাড়া শিক্ষার্থী কমছে কারিগরির মাধ্যমিক স্তরেও। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে মাধ্যমিক স্তরে ২ লাখ ৭৬৩ জন শিক্ষার্থী ছিল। কিন্তু ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭৭ হাজার ৫৬৪ জনে।

শিক্ষক সংকট চরমে

সরকারি তথ্যমতে, দেশে তিনটি স্তরে কারিগরি শিক্ষার পাঠদান কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এগুলো হলো– সার্টিফিকেট স্তর (এইচএসসি ভোকেশনাল, এইচএসসি বিজনেস ম্যানেজমেন্ট, এসএসসি ভোকেশনাল, দাখিল ভোকেশনাল ও বেসিক ট্রেড কোর্স); ডিপ্লোমা স্তর (বিভিন্ন বিষয়ে ডিপ্লোমা-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং) ও ডিগ্রি স্তর (বিভিন্ন বিষয়ে বিএসসি-ইন-ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিপ্লোমা-ইন-টেকনিক্যাল এডুকেশন)।

বর্তমানে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে দেশে চার বছর মেয়াদি বিভিন্ন প্রশিক্ষণ বা শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিং, এগ্রিকালচার, ফিশারিজ, ফরেস্ট্রি, লাইভস্টক, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি, ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (নেভাল), ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং (আর্মি) ও ডিপ্লোমা ইন মেডিকেল টেকনোলজিতে ডিপ্লোমা কোর্স পরিচালিত হচ্ছে।

এছাড়া ‘জাতীয় দক্ষতামান’ (বেসিক ৩৬০ ঘণ্টা) নিয়েও তিন থেকে ছয় মাস মেয়াদি শিক্ষাক্রম পরিচালনা করছে।

এই প্রতিষ্ঠানগুলো ৮১ শতাংশের বেশি শিক্ষকের পদ শূন্য রেখেই শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের প্রশাসন শাখা বলছে, দেশের সরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ১৫ হাজার ৫৯৭টি পদের মধ্যে কর্মরত আছে মাত্র ২ হাজার ৮৯৩ জন শিক্ষক। বাকি ১২ হাজার ৭০৩টি পদই শূন্য। এছাড়া ৬ হাজার ৭০টি কর্মচারী পদও ফাঁকা।

চট্টগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, পিএসসির মাধ্যমে শিক্ষক, জুনিয়র ইনস্ট্রাক্টর ও ইনস্ট্রাক্টর মিলিয়ে মোট ৫ হাজার ২৬৫টি পদে নিয়োগের কার্যক্রম চলছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, শিক্ষক নিয়োগের কার্যক্রম চলমান থাকলেও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও দুর্নীতির কারণে বারবার তা পিছিয়ে পড়ছে।

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমরা মিলেমিশে বিভাগীয় ক্লাস নিই। ধরে নেন, বাংলার শিক্ষক যদি অঙ্ক পড়ায়, তাহলে কী হবে? শিক্ষকের এই ঘাটতি এভাবেই পূরণ করা হয়।”

রংপুর টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঘুরে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠান থেকে ইলেকট্রিক্যাল, ইলেকট্রনিক্স, কম্পিউটার, সিভিল, পাওয়ার, ওয়েল্ডিং, ফার্মেসিনারি, মেশিনারিজ, অটোমোবাইল, আরসিএসহ মোট ১০টি ট্রেড চালু রয়েছে। শিক্ষার্থী রয়েছে মোট আড়াই হাজার। এছাড়াও চার মাস মেয়াদি শর্ট কোর্স এনটিভিকিউএফ (ন্যাশনাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল কোয়ালিফিকেশন ফ্রেমওয়ার্ক) এর অধীনে বিভিন্ন লেভেলে অকুপেশন চালু আছে মোট আটটি।

রংপুর টেকনিক্যাল স্কুল এন্ড কলেজের প্রিন্সিপাল আইয়ুব আলী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “সবকিছু হিসেবে রেখে এখানে ১০০ জন শিক্ষকের পোস্ট রয়েছে। কিন্তু শিক্ষক রয়েছে ৫০ থেকে ৬০ জন। শিক্ষক সংকট থাকলেই শিক্ষার্থীদের পাঠদানে বিঘ্ন হয়। এটা হাতে কলমে শিক্ষা। ফলে সামান্য কম জানা থাকলে জাতির জন্য সেটা বিপত্তিকর হবে।”

চট্টগ্রাম মহিলা পলিটেকনিক ইন্সটিটিউটের শিক্ষক কবির হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমি এই প্রতিষ্ঠানে আছি চার বছর। ৪০ বার শুনেছি, শিক্ষক নিয়োগের কথা। এখনও হয়নি। এখন আর এই বিষয়ে আগ্রহ দেখাই না। এভাবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চলতে পারে না।”

কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, ফেনী কম্পিউটার ইনস্টিটিউট, শরীয়তপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, কিশোরগঞ্জ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটসহ সরকারি অধিকাংশ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অবস্থা একই রকম।

কুড়িগ্রাম পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ফারুক হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “প্রত্যেক সেক্টরে সংশ্লিষ্ট বিভাগের দুই বা ততোধিক লোকবল থাকতে হবে, এমন আইন করা এখন সময়ের দাবি। ১৯৮৪ সালে প্রেসিডেন্ট এরশাদ ফার্মাসিউটিক্যালস চালাতে হলে কমপক্ষে দুইজন ফার্মাসিস্ট থাকতে হবে আইন পাস করেছিলেন। এভাবে যদি প্রতিটি সেক্টরে করা হয়, তাহলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ বাড়বে।”

অপর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি-শ্রেণিকক্ষ ও মান নিয়ে প্রশ্ন

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের সরকারি ও বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশ ল্যাবে নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি। যা আছে, সেগুলো আধুনিক নয়। কিছু ল্যাবের সব যন্ত্রপাতিই অকার্যকর। আবার যেসব প্রতিষ্ঠানে ল্যাব ও যন্ত্রপাতি আছে, সেখানে শিক্ষক সংকটের কারণে হাতে-কলমে শিক্ষা দেওয়া সম্ভবপর হচ্ছে না।

১৯৬৪ সালে যাত্রা শুরু করে কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

ঢাকা ও এর বাইরে দেশে সরকারি বেসরকারি মিলিয়ে ১৭টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঘুরে একই রকম চিত্র দেখা যায়। ল্যাব ও যন্ত্রপাতি না থাকার কারণে ডেমো ক্লাস নেন শিক্ষকরা।

রাজধানীর পান্থপথে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজিতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটিতে ছোট একটি ল্যাব থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাখা ব্যবস্থাপক কবির হোসেন কিছু বলতে রাজি হননি।

ঝিনাইদহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ল্যাব ঘুরে দেখা যায়, সেখানেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিই নেই, যা আছে তার অধিকাংশই অচল।

ইনস্টিটিউটের চিফ ইনস্ট্রাক্টর (নন-টেক) গণিত ও একাডেমিক ইনচার্জ মো. মাহবুব উল ইসলাম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির চাহিদা দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে।”

রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইনস্ট্রাক্টর কবির আহমেদ বলেন, “আদতে কোনও পড়াশোনা হচ্ছে না। এর বেশি কিছু বলার নেই।”

গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার শ্যামপুর পলিটেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সেখানে প্রতি ট্রেডে ২০ জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি হলেও ক্লাস করেন দুই-একজন। তবে পরীক্ষার সময় সব শিক্ষার্থী অংশ নেন। পাসের হারও প্রায় শতভাগ। এ প্রতিষ্ঠানে ল্যাব থাকলেও নেই কোনও ধরনের যন্ত্রপাতি।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. তারিকুল হাকিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।

গাইবান্ধা টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এ এস এম মোস্তাফিজুর রহমান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “অনেকেই কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে অনুমোদন নিয়ে ব্যবসা খুলেছেন। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে ল্যাব আছে কিন্তু যন্ত্রপাতি নেই। শিক্ষার্থীদের তারা কী শেখাচ্ছে, তা আমার বোধগম্য নয়।”

শিক্ষকদের অভিযোগ, কারিগরি শিক্ষার সিলেবাস যুগোপযোগী করা হচ্ছে না। এতে চাকরির বাজারের জন্য যোগ্য হতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মনোযোগ বেশি সার্টিফিকেট বাণিজ্যে।

পলিটেকনিক শিক্ষক সমিতির সাবেক সভাপতি নির্মল চন্দ্র সিকদার সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “প্রতিনিয়ত টেকনোলজির পরিবর্তন হচ্ছে। কিন্তু আমরা সেই পথে নেই। আগের সিলেবাসকেই আঁকড়ে আছি। একাডেমির সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির যোগসূত্রেও আমাদের গুরুতর ঘাটতি রয়েছে।

“দীর্ঘদিন ধরে অপর্যাপ্ত শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব না থাকা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইন্টার্নশিপসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা না থাকায় কারিগরি শিক্ষার মান নিম্নমুখী। আর এই সনদ বাণিজ্যের চিত্র তো এখন উন্মুক্ত। শিক্ষা ছাড়া আর বাদ বাকি সব আছে এখানে।”

ঝিনাইদহ পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

কী বলছে শিক্ষার্থীরা

ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে ২০১৭ সালে পাশ করা শিক্ষার্থী জুবায়ের আলী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এসএসসির পর ভর্তি হয়েছিলাম এখানে। জানতাম, পড়াশোনা শেষ করেই কাজ ও বিদেশে যাওয়ার সুযোগও রয়েছে। পরিবারে আর্থিক সংকট ছিল। আগে আগে সংসারের হাল ধরতে চেয়েছিলাম। এখন কপাল চাপড়াচ্ছি।

“যে চাকরিতে আবেদন করতে চাই, সেখানেই ন্যূনতম যোগ্যতা স্নাতক পাশ। আমি তাহলে চার বছর কী করেছি? এর মূল্যায়ন কোথায়? তখন এসব বুঝিনি। এর থেকে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক করলেও চাকরি পেতাম।

“পড়াশোনা শেষে অনেকদিন হীনমন্যতায় ভুগলাম। বিডি জবস থেকে হাজারের বেশি চাকরির বিজ্ঞপ্তি দেখলাম। আমার যোগ্যতা মূল্যায়নের কোনো বিজ্ঞপ্তি পেলাম না। এলাকায় এখন বাইকের গ্যারেজে কাজ করি। কাউকে বলি না যে ডিপ্লোমা করেছি।”

জুবায়েরের মতো এমন আরও অনেক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হয়। তারা সবাই দীর্ঘদিন বেকার থেকে পরে নামমাত্র কাজ করে সংসার চালাচ্ছেন।

একই প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সাজিদ ইসলাম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “প্রথম দিন প্রতিষ্ঠানে পা রাখার পর থেকে আমি আর শিক্ষার্থী নাই। আমি নেতার কর্মী হয়ে গেছি। মিটিং-মিছিল করি আর পোস্টার লাগাই। হতাশ, কিন্তু পকেটে চা খাওয়ার টাকা আছে।”

ফার্মগেইটের বেসরকারি ন্যাশনাল পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ভবন থেকে বের হওয়া একজন শিক্ষার্থী রাফিদ হোসেন নিজেকে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী দাবি করলেও কোন ট্রেডে পড়ছেন জিজ্ঞাসা করলে তা বলতে পারেননি।

এই প্রতিষ্ঠানের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থী সার্টিফিকেট নিতে আসেন। কখনও ক্লাসও করেন না, পরীক্ষাও দেন না।

বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢুকতে চাইলে, ভেতরে কথা বলার কেউ নেই এমনটি জানান সেখানকার নিরাপত্তাকর্মী নাজমুল।

ঢাকার বাইরের চিত্রও একইরকম। সিলেট পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ছাত্রী সুমাইয়া আকতার সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “কোনও রকমে ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ারিং কোর্স শেষ করলাম। না পেলাম শিক্ষক, না পেলাম আবাসিক হল। সার্টিফিকেট পেয়েছি, যেটা এখন কেবল কাগজ ছাড়া কিছুই না।”

রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট।

রংপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের ইলেক্ট্রিক্যালের তৃতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী কাওসার হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমাদের প্রাকটিক্যালের সময় ডেমো দেখে করি। যুগের সঙ্গে তাল রেখে আমাদের শিক্ষাপদ্ধতির পরিবর্তন দরকার। কিন্তু ফি বছর যন্ত্রপাতি পরিবর্তন করা কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে আমরা স্বপ্ন দেখছি দক্ষ হওয়ার, আদতে তা হয়ে উঠছি না।

“আমাদের কারিগরি শিক্ষায় আইন আছে, কোর্স কমপ্লিট হওয়ার পর বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ইন্টার্নশিপ করার। কিন্তু তা এখনও চালু হয়নি। যদি হতো তাহলে আমরা নতুন প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়ে দক্ষ হতে পারতাম।”

কী বলছে কারিগরি শিক্ষাবোর্ড

কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের কারিকুলাম পরিচালক প্রকৌশলী মো. রাকিব উল্লাহ বলছেন, কারিকুলামের উন্নয়নে তারা গবেষণা করছেন।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ফোর আই আর চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো পুরোপুরি প্রস্তুত। কোন পরিকল্পনা নিলে কারিগরি শিক্ষা আরও এগোবে, তা নিয়ে আমাদের গবেষণা হচ্ছে।

“আমরা মূলত ডেমো দিয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করাই। যারা ভালোভাবে পড়াশোনা করছে, তারা ডেমো দেখে যা শিখছে, কর্মক্ষেত্রে গিয়ে প্রয়োগ করে। তাই খুব একটা সমস্যা হওয়ার কথা নয়।”

শিক্ষক স্বল্পতা নিয়ে তিনি বলেন, “শিক্ষক স্বল্পতা সব জায়গাতেই আছে। এটা ধীরে ধীরে কভার করা হবে।”

কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আসা মো. মামুন উল হক সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “সবকিছু খতিয়ে দেখছি। শিগগিরই সব সমস্যার সমাধান হবে।

“সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মান যথাযথ নয়। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রোগ্রামের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। প্রোগ্রামটি অনুমোদিত হলে বেসরকারি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের মান বৃদ্ধি, ল্যাব আধুনিকায়নে সহায়তা করা হবে। একই সঙ্গে নজরদারি বাড়ানোও সম্ভব হবে।”

শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বেশকিছু অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। যেমন এখানে প্রশিক্ষকের প্রয়োজন রয়েছে। সেক্ষেত্রে যারা ডিপ্লোমা শিক্ষার্থীরা রয়েছেন, তাদেরকে কীভাবে প্রশিক্ষিত করতে পারি, সে বিষয়ে কাজ চলছে।

“আমরা ২০৩০ সালের মধ্যে কারিগরি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীর এনরোলমেন্ট ৩০ শতাংশ করার জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এখন শুধু সময়ের ব্যাপার।”

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো।

প্রবাসে দক্ষতার ঘাটতি ও কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থায় হেলাফেলা

বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে গেছেন ১১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৭৩ শ্রমিক। এর মধ্যে মাত্র ২ লাখ ১ হাজার ৭৩১ জন (১৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ) দক্ষ। বাকি ৮২ দশমিক ২৪ শতাংশই অদক্ষ।

বাংলাদেশ থেকে স্বল্প দক্ষ (অদক্ষ হিসেবে বেশি পরিচিত) কর্মী অভিবাসনের হার গত বছরের তুলনায় এ বছর প্রায় ২৩ শতাংশ কমে ৬ লাখ ২৬ হাজারে দাঁড়িয়েছে।

বিএমইটির তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশ রেকর্ড ১২ লাখ কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছে। কিন্তু তাদের মধ্যে কতজন প্রশিক্ষণ পেয়ে ওই বছরেই বিদেশে গেছেন, তা জানে না কর্তৃপক্ষ।

বিএমইটির পরিচালক (ট্রেনিং অপারেশন) মো. সালাহ উদ্দিন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “যারা ট্রেনিং নেয়, তাদের অনেকে বছরখানেক দেশে কাজ করেন। তারপর সুযোগ বুঝে বিদেশে যায়। তবে তারা কতজন বিদেশে গেল, এই তথ্য আমাদের কাছে থাকে না।”

শিক্ষাবিদেরা বলছেন, বিদেশে কাজের ক্ষেত্রে এই ঘাটতি কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমেই দূর করা সম্ভব। কিন্তু জোড়াতালি দিয়ে চললে কারিগরি শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কোনোভাবেই পূরণ হবে না।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দা রোজানা রশীদ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “অর্থায়ন করা মানেই সব দায়িত্ব শেষ নয়। যে সমস্যা আমরা দেখতে পাচ্ছি খালি চোখেই, সেজন্য বড় দাগে কোনো উদ্যোগ আমি দেখি না।”

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কায়কোবাদ বলেন, “সহজ কথায় ‘ডিজিটাল রেভল্যুশন’ বলতে আমরা সাধারণত যা বুঝি, সেটাই চতুর্থ শিল্প বিপ্লব। আর সেটি কারিগরি শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেই আমরা লাভ করতে পারি।

“আমাদের কারিগরি শিক্ষা নানা সমস্যায় জর্জরিত। বলা যায়, অনেকটা জোড়াতালি দিয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। তাছাড়া শুধু দক্ষতার ঘাটতির কারণে আমাদের প্রবাসী শ্রমিকেরা কম বেতন পান। এ ঘাটতি কারিগরি শিক্ষার মাধ্যমেই পূরণ করা সম্ভব।”

এই শিক্ষাবিদ কারিগরি শিক্ষার বিভিন্ন সমস্যা দ্রুত নিরসনের পাশাপাশি পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি যুগোপযোগী করার তাগিদ দেন।

[প্রতিবেদনটি তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন সকাল সন্ধ্যার রংপুর, কুষ্টিয়া, বগুড়া, নোয়াখালীর আঞ্চলিক প্রতিনিধিরা]

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত