Beta
মঙ্গলবার, ১৬ এপ্রিল, ২০২৪

তিন কারণে জলদস্যুদের কবলে ‘এমভি আবদুল্লাহ’

আবদুল্লাহ
এই ছোট জলযানটিতে চেপেই এমভি আবদুল্লাহয় এসেছিল সোমালি জলদস্যুরা

ভারত মহাসাগরে জলদস্যুদের কবলে পড়া বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজ ‘এমভি আবদুল্লাহ’ ৫০ হাজার টন কয়লা নিয়ে আফ্রিকার মোজাম্বিকের মাপুতো বন্দর থেকে সংযুক্ত আরব আমিরাতের হামরিয়াহ বন্দরে যাচ্ছিল। ১৯ মার্চ সেই বন্দরে কয়লা খালাসের কথা ছিল। কিন্তু হামরিয়াহ বন্দরে যাওয়ার পথেই মঙ্গলবার সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়ে জাহাজটি, জিম্মি করা হয় ২৩ নাবিকসহ কয়লাভর্তি পুরো জাহাজটি।

জলদস্যুদের কবলে পড়ার সময় জাহাজটির অবস্থান ছিল সোমালিয়ার রাজধানী মোগাদিসু উপকূল থেকে সাড়ে ৬শ’ নটিক্যাল মাইল দূরে, ভারত মহাসাগরে। জাহাজটি ভারত মহাসাগরের যে পথ পাড়ি দিচ্ছিল তা ‘অতি ঝুঁকিপূর্ণ’ কিংবা ‘ঝুঁকিপূর্ণ’ কোনোটিই ছিল না। আবার জাহাজ চলাচলের নিয়মিত পথও ছিল না এটি।

সেই পথে দস্যুতা প্রতিরোধে ছিল না কোনও আন্তর্জাতিক টহল বাহিনী। ফলে সোমালিয়ার দস্যুরা কোনও ধরনের বাধা বা প্রতিরোধ ছাড়াই ‘এমভি আবদুল্লাহ’কে নিজেদের কবজায় নিতে সক্ষম হয়।

বিদেশি জাহাজে কর্মরত বর্তমান ও সাবেক ক্যাপ্টেন এবং দেশি-বিদেশি জাহাজ পরিচালনাকারী অন্তত ১০ জনের সঙ্গে ‘এমভি আবদুল্লাহ’র দস্যুদের কবলে পড়ার বিষয়ে কথা বলেছে সকাল সন্ধ্যা। তাদের প্রায় সবারই অভিমত, মোটাদাগে তিনটি কারণে দস্যুদের কবলে পড়ে বাংলাদেশি মালিকানাধীন জাহাজটি।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় কারণটি হচ্ছে- সেই এলাকায় দস্যুতা প্রতিরোধে সাগরে টহল বাহিনী না থাকা। অন্য দুটি কারণ হচ্ছে, জাহাজটির গতি কম থাকা এবং জাহাজের ড্রাফট বেশি থাকা ও জাহাজে কোনও নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকা।

কেন ছিল না আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা টহল

জাহাজটি যে পথে ভারত মহাসাগর পাড়ি দিচ্ছিল সেই এলাকায় নিরাপত্তা টহল না থাকার একটি বড় কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমুদ্রপথে নিরাপত্তা দেওয়া আর্ন্তজাতিক বাহিনীগুলোর এখন মূল দৃষ্টি পাশে থাকা লোহিত সাগরে হুতি বিদ্রোহীদের ঠেকানো। সব আর্ন্তজাতিক বাহিনী সেদিকে মনোযোগ দেওয়ার কারণেই এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলে নিরাপত্তা ঘাটতি তৈরি হয়েছে। আর সেই সুযোগটিই নিয়েছে সোমালিয়ার জলদস্যুরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “নৌ সার্ভেলেন্স বাড়ানোর কারণে ভারত মহাসাগরের এই পথে জলদস্যুতা অনেক কমে এসেছিল। নভেম্বর থেকে সেটি আবার বাড়তে শুরু করে।

“গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধ ও হুতি বিদ্রোহীদের আক্রমণের কারণে লোহিত সাগর এখন হটস্পট। ফলে সাগরে নিরাপত্তা দেওয়া বিদেশি বাহিনীর মনোযোগ, নেভাল সার্ভিলেন্স লোহিত সাগরের দিকে বেড়ে গেছে। এই সুযোগটা সোমালিয়ান জলদস্যুরা কাজে লাগাচ্ছে। আমরাই তাদের শিকার হয়ে গেলাম।”

তিনি বলেন, “শুধু তাই নয়, সোমালিয়া অঞ্চলে ইউরোপ-আমেরিকার একটি জোট দস্যুতা প্রতিরোধে কাজ করে দারুণভাবে সফল হয়েছিল। কিন্তু এক বছর আগে সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। ফলে সেখানে তাদের কিছুটা নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে।”

ছিল না নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থাও

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের নভেম্বর থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বেশ কয়েকটি জাহাজ সোমালিয়ার জলদস্যুদের কবলে পড়েছে।

অস্ত্রসজ্জিত সোমালিয়ান দস্যুরা রশি বেয়ে জাহাজে উঠে নিয়ন্ত্রণ নেয়।

পূর্ব আফ্রিকার উপকূলে সামুদ্রিক নিরাপত্তায় কাজ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নৌবাহিনী বা ইইউন্যাভ ফর আটালান্টা। তাদের হিসাবে, ২০২৩ সালের নভেম্বরে থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে সোমালিয়া উপকূলে অন্তত ১৪টি জাহাজ ছিনতাই করা হয়েছে।

গত তিনমাসে ভারত মহাসাগরের এই পথে জাহাজ ছিনতাই ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে, বলছে রয়েল ইউনাইটেড সার্ভিস ইনস্টিটিউট। এ কারণে এই পথ পাড়ি দেওয়ার সময় অবশ্যই বাড়তি সতকর্তা নেওয়ার দরকার ছিল বলে মনে করছেন মেরিটাইম সেক্টরের বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, যেহেতু এই পথে এর আগে ২০১০ সালে বাংলাদেশের একই কোম্পানির আরেকটি জাহাজ (এমভি জাহান মনি) সোমালিয়ান দস্যুদের দ্বারা আক্রান্ত হয়েছিল, তাই তাদের আরও বেশি সতর্ক থাকা উচিত ছিল। জাহাজটিতে নিজস্ব নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার কারণে দস্যুরা কোনও বাধা ছাড়াই জাহাজে উঠে সহজেই এর নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়।

বিদেশি একটি জাহাজে কর্মরত বাংলাদেশি ক্যাপ্টেন মারুফের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “জাহাজটি সাগরের যে স্থানে আক্রমণের শিকার হয়েছে সেটি সোমালিয়া উপকূল থেকে ৬শ’ নটিক্যাল মাইল দূরে। ভারত মহাসাগরের এই পথ পাড়ি দিতে সম্প্রতি বেশ হাইজ্যাক হচ্ছে। একইসাথে এই পথে তাদের নিজেদের জাহাজ দস্যুতার কবলে পড়ার রেকর্ড আছে। এতকিছুর পর সেইফটি মেজারস নিল না কেন, সেটিও একটি প্রশ্ন।”

বাংলাদেশি একটি জাহাজে কর্মরত আরেকজন ক্যাপ্টেন বলেন, “এই রুট দিয়ে হয়ত আগে-পরে আরও অনেক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করেছে। কিন্তু টার্গেটে পড়েছে এমভি আবদুল্লাহ। অবশ্য এই টার্গেটে পড়ার জন্য নিরাপত্তা টহল না থাকাও একটি কারণ।

গতি কম থাকলেই হয় আক্রমণ

মেরিটাইম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি জাহাজে যখন জলদস্যুরা আক্রমণ করে, তখন তারা কিছু কৌশল অবলম্বন করে। প্রথমে ফিশিং বোটে করেই মাছ ধরার নাম করে তারা সাগরে থাকে। নির্দিষ্ট জাহাজকে টার্গেট করে ফিশিং বোট থেকেই ছোট ছোট জাহাজে করে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে টার্গেট জাহাজের কাছাকাছি যায়। চারিদিক থেকে ঘিরে ফেলে এবং দ্রুত জাহাজের ডেকে উঠে নাবিকদের জিম্মি করে ফেলে।

তাদের মতে, দস্যুরা যখন কোনও জাহাজকে টার্গেট করে তখন প্রধানত দুটি বিষয়ে তারা লক্ষ্য রাখে। একটি হচ্ছে, জাহাজের গতি কম কিনা। আরেকটি হচ্ছে, জাহাজের ডেকে দ্রুত ওঠা যাবে কিনা।

নাম না প্রকাশ করার শর্তে একটি বিদেশি জাহাজে কর্মরত বাংলাদেশি এক সিনিয়র ক্যাপ্টেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “অবশ্যই এমভি আবদুল্লাহ জাহাজটির চলার গতি কম ছিল। এই গতি সর্বোচ্চ ১৪ নটিক্যাল মাইল এবং জাহাজটি বেশি পণ্যভর্তি থাকার কারণে গতি ধীর ছিল।”

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ডেকের উচ্চতাও ছিল কম

৫৫ হাজার টন কয়লা থাকায় জাহাজটি বেশি পরিমাণে লোডেড ছিল। বেশি পণ্য থাকায় জাহাজটির ড্রাফট (জাহাজের নিচের যে অংশ ডুবে থাকে) ছিল বেশি। ড্রাফট বেশি থাকায় সমুদ্রপৃষ্ঠের সঙ্গে জাহাজটির উচ্চতা ছিল খুব কম, যেটাকে ফ্রিবোর্ড বলা হয়।

মেরটাইম বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফ্রি বোর্ড কম থাকা জাহাজকেই প্রধানত টার্গেট করে জলদস্যুরা। এর প্রধান কারণ জাহাজের ডেকে সহজে উঠে যাওয়ার সুযোগ। একটি ছোট শিপিং বোট নিয়ে জাহাজের কাছে গিয়ে রশি বেয়ে উঠে যাওয়া যায়। এমভি আবদুল্লাহ জাহাজে ফ্রি বোর্ড ছিল একেবারেই কম। ফলে ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন দস্যু অনায়াসেই রশি বেয়ে জাহাজে উঠে পড়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাগরের ওপরে এমভি আবদুল্লাহ জাহাজের ভেসে থাকা অংশের উচ্চতা ছিল ৪-৫ মিটারের মতো। সাধারণত ৮-৯ মিটার উচ্চতা থাকলে জাহাজের ডেকে ওঠা দস্যুদের জন্য কঠিন হয়।

এ বিষয়ে বিদেশি জাহাজে কর্মরত বাংলাদেশি ওই সিনিয়র ক্যাপ্টেন বলেন, “জাহাজটিতে ৫০ হাজার টন পণ্য থাকার কারণে ড্রাফট বেশি ছিল। অর্থ্যাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে জাহাজের ডেকের উচ্চতা ছিল একেবারেই কম, সম্ভবত ৫ মিটার।

“ফলে সাগরে থাকা ফিশিং বোট দিয়ে আবদুল্লাহ জাহাজের কাছাকাছি পৌঁছে জাহাজে উঠে যাওয়া সহজ হয়েছে। ভিডিওতে সেটি দেখা গেছে। যদি ৮ মিটার উচ্চতা থাকত তাহলে জাহাজের ডেকে ওঠা সেই দস্যুদের জন্য অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হত। আর এত উচ্চতা হলে জাহাজটি দস্যুদের টার্গেটে পরিণত হতো না।”

বিদেশি জাহাজে কর্মরত ক্যাপ্টেন মারুফও একই ধরনের অভিমত দেন। তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ডেকের উচ্চতা বেশি হলে কোনো দস্যু জাহাজটি আক্রমণের সাহস পায় না। এই জাহাজটির উচ্চতা ছিল ৪ থেকে ৫ মিটার। ফলে দস্যুরা অনায়াসেই জাহাজে উঠতে সক্ষম হয়েছে।”

মালিকপক্ষ কী বলছে

বিশেষজ্ঞদের মতে, জাহাজটি পণ্য দিয়ে অতিমাত্রায় লোডেড থাকার কারণেই এর গতি ছিল কম। একই কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর ডেকের উচ্চতাও অনেক কম ছিল।

ফলে জাহাজটি এত পণ্য ভর্তি করে কেন যাত্রা শুরু করল, সেই প্রশ্নও এখন উঠছে। তবে জাহাজটির মালিকপক্ষ বলছে, জাহাজটি কেন দস্যুদের কবলে পড়ল সেটি নিয়ে তারা এখন ভাবছেন না। তাদের মূল ভাবনা এখন জাহাজের নাবিকদের উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনা।

জাহাজটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান এসআর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী মেহেরুল করিম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “কী কারণে জাহাজটি দস্যুতার কবলে পড়েছে সেদিকে আমাদের মনোযোগ নেই। আমরা আগে ২৩ নাবিককে কতটা নিরাপদে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করে নিয়ে আসতে পারব, সেটাই মূল চ্যালেঞ্জ। আমাদের ফোকাস এখন সেদিকেই।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist