Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪
Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪

ট্রেনের জানালায় থাকা সেই যুবকের বিয়ে হয়নি, যাচ্ছিলেন ক্যাম্পাসে

গত ৫ জানুয়ারি রাতে ঢাকার গোপীবাগে আগুনে পোড়ে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনটি। ছবি : সকাল সন্ধ্যা
গত ৫ জানুয়ারি রাতে ঢাকার গোপীবাগে আগুনে পোড়ে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনটি। ছবি : সকাল সন্ধ্যা
Picture of সাজ্জাদ হোসেন

সাজ্জাদ হোসেন

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দুদিন আগে ঢাকার গোপীবাগে চলন্ত ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া চারজনের মরদেহ তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে বৃহস্পতিবার। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে নিহতদের পরিচয় শনাক্তের পরই মরদেহগুলো স্বজনদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

বেনাপোল এক্সপ্রেসে আগুনে পুড়ে মারা যাওয়া চারজনের একজন রাজবাড়ীর যুবক আবু তালহা (২৪)। গত ৫ জানুয়ারি রাতে ট্রেনটিতে আগুন লাগার পর জ্বলন্ত ট্রেনের জানালায় দগ্ধ অবস্থায় এই তালহাকেই হাত নাড়তে দেখা গিয়েছিল।

সেই সময় প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে অনেক সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছিল— ট্রেনে থাকা স্ত্রী-সন্তান আগুনে দগ্ধ হয়ে মারা যাওয়ায় তিনি আর ট্রেন থেকে নামতে চাননি। এ ধরনের বেশ কিছু সংবাদের শিরোনাম তখন ছড়িয়ে পড়েছিল সোশাল মিডিয়ায়।

তবে তালহার বাবা আবদুল হক মণ্ডল নিশ্চিত করেছেন, তালহা বিয়েই করেননি। আগুন লাগা বেনাপোল এক্সপ্রেসে তালহার স্ত্রী-সন্তান থাকার যে খবর সে সময় অনেক সংবাদমাধ্যমে এসেছিল, তা সঠিক নয়।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “তালহার পড়াশোনা শেষ হয়নি। সে সৈয়দপুর আর্মি ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষে পড়ত। তার বিয়ে হয়নি, ফলে স্ত্রী-সন্তান থাকার তথ্য সঠিক নয়।”

রাজবাড়ীর ছেলে তালহার ফরিদপুর থেকে ঢাকা হয়ে সৈয়দপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে যাওয়ার কথা ছিল জানিয়ে তার বাবা বলেন, “গত ৫ জানুয়ারি ঢাকার উদ্দেশ্যে ফরিদপুর স্টেশন থেকে বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে যাত্রা করেছিল তালহা। ঢাকায় নেমে সেখান থেকে তার সৈয়দপুরের ট্রেনে ওঠার কথা ছিল। কিন্তু ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে তার আর কোনও খোঁজ পাইনি আমরা। ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তার মরদেহ শনাক্ত করে প্রায় ১ মাস ৯ দিন পর তার মরদেহ হস্তান্তর করা হয়েছে।”

মোবাইলে ছেলে আবু তালহার ছবি দেখাচ্ছিলেন বাবা আব্দুল হক মণ্ডল। ছবি : সকাল সন্ধ্যা

শুক্রবার সকাল ১০টার দিকে রাজবাড়ী সদর উপজেলার কালুখালীর মৃগী ইউনিয়নের বড়ইচারা গ্রামে তালহার মরদেহ দাফন করা হয় জানিয়ে আব্দুল হক মণ্ডল বলেন, “ওরে নিজে গিয়ে ট্রেনে উঠিয়ে দিয়ে এসেছি। আমি বুঝতে পারিনি ওটাই আমার ছেলেকে শেষ দেখা হবে।”

কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, “বাঁচার আকুতি জানানো যে ছবিটি ভাইরাল হয়েছিল, সেটিই ছিল আমার ছেলে আবু তালহা। একটা নিষ্পাপ ছেলে আগুনে দগ্ধ হয়ে কী মারাত্মক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে মারা গেল। ভাবতেই কষ্ট হয়। কী দোষ ছিল আমার তালহার?”

নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে বিএনপির ডাকা হরতালের আগের রাতে বেনাপোল থেকে পদ্মা সেতু হয়ে ঢাকার কমলাপুর রেল স্টেশনে আসার পথে আগুন লাগা বেনাপোল এক্সপ্রেসের ‘চ’ বগিতে তালহার সঙ্গে পুড়ে মারা যায় আরও তিনজন।

রেলওয়ে থানা পুলিশের ওসি ফেরদৌস আহমেদ বিশ্বাস সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, বেনাপোল এক্সপ্রেস ট্রেনে আগুনের ঘটনায় জানালায় পুড়ে যাওয়া সেই ছেলেটির বাড়ি রাজবাড়ী।  তার নাম আবু তালহা। অন্য লাশগুলো তিন নারীর। ট্রেনে আগুনের ঘটনায় নিখোঁজের আর কোনও দাবিদার নেই।

তালহার মতো অপর তিনজনের মরদেহও বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাদের স্বজনদের কাছে। তারা হলেন— রাজবাড়ী সদর উপজেলার লক্ষ্মীকোল গ্রামের সাইদুর রহমান বাবুর মেয়ে এলিনা ইয়াসমিন (৪০), একই উপজেলার খানগঞ্জ বেলগাছির চিত্তরঞ্জন প্রামাণিকের মেয়ে চন্দ্রিমা চৌধুরী সৌমি (২৪) এবং ঢাকার গেণ্ডারিয়া বাসিন্দা নাতাশা জেসমিন নেকি।

নিহত এলিনা ইয়াসমিনের মামাতো ভাই কাজী পলাশ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ডিএনএ টেস্টের মাধ্যমে তার মামাত বোনের মরদেহ শনাক্ত করার পর বৃহস্পতিবার ঢাকা মেডিকেল থেকে মরদেহ তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।”

সৌমির চাচা অতনু প্রামাণিক বলেন, “বৃহস্পতিবার আমরা পরিবারের লোকজন নিয়ে ঢাকা মেডিকেল থেকে সৌমির মরদেহ নিয়ে এসেছি।”

ট্রেনে আগুনের ঘটনায় নিহত ঢাকার গেণ্ডারিয়ার নাতাশা জেসমিন নেকির মরদেহ বুঝে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তার ভাই খুরশিদ আহমেদ। তিনি জানান, নাতাশা ঢাকায় একটি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। ট্রেনের আগুনে তার স্বামী আসিফ মোহাম্মদ খানও দগ্ধ হয়েছেন। চিকিৎসক জানিয়েছেন, আসিফের সুস্থ হতে ২ -৩ মাস সময় লাগবে।

আসিফের চাচা আবদুল হাই জানান, ফরিদপুরের ভাঙ্গায় ঘুরতে গিয়েছিলেন এই দম্পতি। আসার সময় ট্রেনে আগুনের ঘটনা ঘটে। স্ত্রীকে বাঁচানোর অনেক চেষ্টা করেছেন আসিফ, কিন্তু জ্ঞান হারিয়ে ফেলায় পারেননি। পরে আশপাশের লোকজন আসিফকে টেনে বের করেন। কিন্তু ততক্ষণে দুই পাসহ আসিফের শরীরের অনেক জায়গা পুড়ে যায়।

(প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহায়তা করেছেন সকাল সন্ধ্যার আঞ্চলিক প্রতিবেদক, ফরিদপুর)

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত