Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

আরব ও মুসলিমরা ভোট না দিলে কতটা বিপাকে পড়বেন বাইডেন

মিশিগানের ডিয়ারবর্নে আরবদের বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি।
মিশিগানের ডিয়ারবর্নে আরবদের বিক্ষোভ। ছবি: এএফপি।

২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন মিশিগান রাজ্যে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে সামান্য ব্যবধানে হারিয়েছিলেন। তাদের ভোটের ব্যবধান ছিল ১ লাখ ৫০ হাজারের কিছু বেশি। বিভিন্ন জনমত জরিপ এবং পণ্ডিতদের পূর্বাভাসের চেয়ে অনেক কম ছিল এই ব্যবধান।

সেবার মিশিগান, পেনসিলভেনিয়া, উইসকনসিনসহ আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যে বাইডেনের জয়ের নেপথ্যে ছিল আরব-আমেরিকান ও মুসলিম-আমেরিকানদের ভোট।

চার বছর পর আগামী নভেম্বরে ফের বাইডেন ও ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়তে যাচ্ছেন। কিন্তু এবার ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী দেশটির আরব ও মুসলিম ভোটারদের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকে এমনকি বাইডেনকে আর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবেও দেখতে চান না।

ফিলিস্তিনের গাজায় নজিরবিহীন বোমাবর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের পরও ইসরায়েলের প্রতি বাইডেনের অকুণ্ঠ সমর্থনের কারণে ক্ষোভে অনেক আরব-আমেরিকান ও মুসলিম ভোটার ঘোষণা দিয়েছেন, তারা এবার নির্বাচন থেকে দূরে থাকবেন।

বাইডেনের প্রতিনিধিরা সম্প্রতি মিশিগানসহ কয়েকটি রাষ্ট্রের আরব ও মুসলিম নেতাদের সঙ্গে দেখা করে দুঃখ প্রকাশ করলেও তাদের ক্ষোভ প্রশমন হয়নি। অনেক আরব ও মুসলিম আগামী নির্বাচনে নো-শো ভোটিং বা অংশগ্রহণ না করে বাইডেন প্রশাসনকে শক্তিশালী সতর্ক বার্তা পাঠানোর প্রতিজ্ঞা করেছেন।

এমনকি তারা প্রাইমারি তথা প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ে ভোটে বাইডেনকে ‘আনকমিটেড’ (প্রতিশ্রুতিহীন বা অনিচ্ছুক) ভোট দিয়ে সতর্ক করা শুরু করেছেন। এরপরও যদি বাইডেন গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে থাকেন, তাহলে নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও বাইডেনকে ভোট না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আরব ও মুসলিম আমেরিকানরা।

গত ৭ অক্টোবর থেকে গাজায় ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা ৩০ হাজার ছাড়িয়েছে। তারপরও যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে অর্থ ও অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তা অব্যাহত রেখেছে।

আরব-আমেরিকান ও মুসলিম-আমেরিকানরা কী চায়, তাদের ভোট কেন বাইডেনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন রাজ্যে তারা সবচেয়ে প্রভাবশালী?

আরব-আমেরিকানরা কী চায়

আরব ও মুসলিম কমিউনিটিগুলো বলছে, তারা বাইডেন প্রশাসনকে গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞ বন্ধের জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের ডাকে সাড়া দেননি বাইডেন। তাদের অনেকের পরিবার এবং স্বজনরাও গাজায় আটকা পড়েছেন।

বাইডেন সরকারের প্রতি তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো

১. গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বন্দিদের পাশাপাশি ইসরায়েলি জিম্মিদের মুক্তির জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

২. ইসরায়েলকে অর্থ ও অস্ত্র সহায়তা বন্ধ করতে হবে।

৩. গাজায় ফিলিস্তিনিদের জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণ সহায়তা ঢুকতে দেওয়ার জন্য ইসরায়েলকে চাপ দিতে হবে। পাশাপাশি জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থী সংস্থা ইউএনআরডব্লিউর (ইউনাইটেড নেশনস রিলিফ অ্যান্ড ওয়ার্কস এজেন্সি ফর প্যালেস্টাইন রিফিউজিস ইন নিয়ার ইস্ট) স্থগিত আর্থিক সহায়তা পুনরায় চালু করতে হবে।

(গতমাসে ইসরায়েল সংস্থাটির কয়েকজন কর্মীর বিরুদ্ধে গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ তোলে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বের ধনী দেশগুলো অর্থ সহায়তা দেওয়া স্থগিত করলে সংস্থাটি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে। ইসরায়েলের অভিযোগ নিয়েও তদন্ত চলছে।)

৪. যুক্তরাষ্ট্রে আরব ও ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে বেড়ে চলা ঘৃণার প্রচার ও প্রসার থামাতে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।

কিন্তু আরব ও মুসলিম কমিউনিটিগুলোর দাবির প্রতি কর্ণপাত করছেন না বাইডেন। এতে ডিয়ারবর্ন, ডেট্রয়েটসহ কয়েকটি শহরের আরব-আমেরিকান ও মুসলিম-আমেরিকানরা স্থানীয় কাউন্সিল নেতাদের সঙ্গে সফলভাবে লবিং করে গাজায় যুদ্ধবিরতির একতরফা প্রস্তাব পাস করিয়েছেন।

এসব স্থানীয় প্রস্তাবের যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি বদলানোর ক্ষমতা নেই। তবে এগুলো থেকে সেখানকার সংখ্যাগরিষ্ঠ নাগরিকদের মতামত বোঝা যায়। ওয়াশিংটন ডিসি-ভিত্তিক তাহরির ইনস্টিটিউট ফর মিডল ইস্ট পলিসির (টাইমপি) পরিচালক মাই এল-সাদানি আল জাজিরাকে বলেছেন, “স্থানীয় প্রস্তাবগুলো প্রতীকী এবং আমেরিকান নাগরিকরা কী নিয়ে উদ্বিগ্ন ও কোন বিষয়কে অগ্রাধিকার দিচ্ছে তার নির্দেশক।”

সাদানি বলেন, “এই স্থানগুলো নাগরিকদের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে যেখানে তারা কোন ইস্যুটি গুরুত্বপূর্ণ এবং তা কীভাবে তাদের ও তাদের পরিবারকে প্রভাবিত করছে সে বিষয়ে ব্যাখ্যা করে বলতে পারেন।”

তিনি বলেন, “স্থানীয় কাউন্সিল সমমনা ব্যক্তিদের একত্রিত করে পররাষ্ট্র বিষয়ক নীতিনির্ধারকদের উপর তাদের নীতিগুলো পুনর্বিবেচনার জন্যও চাপ তৈরি করতে পারে।”

আরব-আমেরিকান ভোটাররা যেভাবে প্রতিবাদ জানাবেন

আরব-আমেরিকান ভোটারদের একটা অংশ চলমান ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারি বা প্রার্থী বাছাইয়ের নির্বাচন থেকেই ভোট না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তারপরও যদি বাইডেন গাজায় যুদ্ধবিরতির আহ্বান না জানান তাহলে নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনেও তারা তাকে ভোট দেবেন না।

মিনেসোটার আরব সম্প্রদায়ের নেতারা গত অক্টোবর থেকেই #AbandonBiden বা বাইডেনকে বর্জন করুন হ্যাশট্যাগে ইন্টারনেটে প্রচারণা শুরু করেছেন।

অনেকে বলছেন, প্রেসিডেন্ট কাউকে ভোট না দিয়ে তারা তাদের ব্যালট পেপারে ‘ফিলিস্তিনকে মুক্ত করো’ লিখে দিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন।

চলমান প্রাইমারিতে অংশগ্রহণ করলেও তারা বাইডেনকে ভোট না দিয়ে ব্যালটে ‘আনকমিটেড’ (প্রতিশ্রুতিহীন বা অনিচ্ছুক) অপশনে টিক দিয়ে আসবেন। এর মানে তারা ডেমোক্রেটিক পার্টিকে সমর্থণ করলেও ব্যালটে নাম থাকা কোনও প্রার্থীকে পছন্দ করেন না। আনকমিটেড ভোট কোনও প্রার্থীর পক্ষেই গণনা করা হয় না। এটা অনেকটা না ভোটের মতো।

গত মঙ্গলবার আরব-আমেরিকানদের রাজধানী হিসেবে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান রাষ্ট্রে ডেমোক্রেটিক পার্টির দ্বিতীয় প্রাইমারি (প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী বাছাই) নির্বাচন হয়েছে। এদিন মিশিগানের ডেট্রয়েট নগরীর ডিয়ারবর্ন শহরতলীর অধিকাংশ ডেমোক্র্যাট ভোটার ‘আনকমিটেড’ (প্রতিশ্রুতিহীন বা অনিচ্ছুক) ভোট দিয়েছেন।

শুধু ডিয়ারবর্ন শহর নয় পুরো মিশিগানজুড়েই বহু ভোটার ‘আনকমিটেড’ ভোট দিয়েছেন। গত বুধবার সকালে প্রকাশিত ভোটের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, রাজ্যজুড়ে ১ লাখ ১ হাজারের বেশি ভোটার ‘আনকমিটেড’ ভোট দিয়েছেন। ২০১৬ সালের নির্বাচনে মিশিগানে ডেমোক্রেট প্রার্থী হিলারি ক্লিনটনকে রিপাবলিকান প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প মাত্র ১০ হাজার ভোটে হারিয়েছিলেন।

ডিয়ারবর্ন সিটির ডেমোক্রেটিক মেয়র আবদুল্লাহ হাম্মুদ মিশিগানের প্রাইমারির ভোটের পর গত মঙ্গলবার রাতে বলেন, “ডিয়ারবর্ন শহরে আমরা দেখিয়ে দিয়েছি, গাজা ইস্যুটি শুধুমাত্র আরব আমেরিকান ও মুসলিম আমেরিকানদের নয় বরং সব আমেরিকানদের উদ্বেগের বিষয়।

মিশিগানের আরব ও মুসলিমরা লিসেন টু মিশিগান নামে একটি গ্রুপ তৈরি করে আন্দোলন করছে। মিশিগানের প্রায় ৩০ জন নির্বাচিত নেতাও এই প্রতিবাদে যোগ দিয়েছেন, যার মধ্যে মার্কিন কংগ্রেসের একমাত্র ফিলিস্তিনি আমেরিকান রাশিদা তালাইবও রয়েছেন।

আর নভেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে যেহেতু ব্যালটে তেমন কোনও বিকল্প থাকবে না তাই তারা ভোট না দিয়ে বা ব্যালট পেপারে সঠিকভাবে টিক না দেওয়ার মাধ্যমে প্রতিবাদ জানাবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কোন কোন রাষ্ট্র আরব-আমেরিকান ভোটের দুর্গ

আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউট এর হিসাব মতে, যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৩৫ লাখ আরব আমেরিকান রয়েছেন, যারা দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ১ শতাংশ। এদের মধ্যে প্রায় ৬৫ শতাংশ আরব খ্রিস্টান, আনুমানিক ৩০ শতাংশ মুসলিম এবং অল্প কিছু সংখ্যক ইহুদিও আছে। আরব আমেরিকানদের বেশিরভাগ অমুসলিম হলেও তারা ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মী।

ভার্জিনিয়ার ক্রিস্টোফার নিউমার্ক ইউনিভার্সিটির (সিএনইউ) জাতি ও ধর্ম বিষয়ক গবেষক ইউসেফ চৌহৌদ বলেন, “এই গোষ্ঠীগুলো সাধারণত বিভিন্ন স্বার্থের ভিত্তিতে ভোট দেয়। তথাপি তাদের মধ্যে গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে প্রায় সর্বসম্মত ঐকমত্য রয়েছে।”

মিশিগান স্টেটের ডিয়ারবর্ন শহর যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম আরব-আমেরিকান সম্প্রদায়ের আবাসস্থল। শহরটির জনসংখ্যার ৪০ শতাংশেরও বেশি আরব-আমেরিকান। জর্জিয়া, পেনসিলভেনিয়া, ফ্লোরিডা ও ভার্জিনিয়াও বিশাল আরব সম্প্রদায়ের আবাসস্থল।

যুক্তরাষ্ট্রের এই রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে অন্তত তিনটি- জর্জিয়া, মিশিগান ও পেনসিলভেনিয়া- নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে পাশা উল্টে দিতে পারে। এসব রাষ্ট্রকে ‘সুইং স্টেট’ বা দোদুল্যমান রাষ্ট্র বলা হয়। কারণ এসব রাষ্ট্রে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানদের ভোটের পার্থক্য অনেক কম। এসব রাষ্ট্রে অল্প কিছু ভোট হেরফের হলেই নির্বাচনের ফলাফলও বদলে যায়, এসব রাষ্ট্রে কে জিতবে তা আগে থেকেই ঠাহর করা কঠিন।

২০২০ সালের হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের নির্বাচনে আরবদের ভোট বড় পার্থক্য তৈরি করে দিয়েছিল। মিশিগানে বাইডেন ট্রাম্পকে ১ লাখ ৫৪ হাজার ভোটে হারিয়েছেন। মূলত আরব-আমেরিকানদের ভোটেই বাইডেন জয় পেয়েছেন। মিশিগানের ভোটারদের ৫ শতাংশ আরব-আমেরিকান। রাজ্যটিতে আনুমানিক ২ লাখ ৪০ হাজার আরব আমেরিকান বাস করেন।

জর্জিয়ায় বাইডেন মাত্র ১২ হাজারেরও কম ভোটে জিতেছেন। সেখানে ৫৭ হাজারের বেশি আরব-আমেরিকান রয়েছেন। এছাড়া মিনেসোটা ও ক্যালিফোর্নিয়াতেও কিছু আরব আমেরিকান আছেন।

যাইহোক, আরব-আমেরিকান সম্প্রদায়গুলোতে অসন্তোষ বাড়ার অর্থ হল ২৬ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো ডেমোক্রেটিক পার্টিকে আর অনেক আরব ভোটারের পছন্দ নয়, তা তারা হউক খ্রিস্টান বা মুসলিম। ২০২০ সালে আমেরিকান আরবদের মধ্যে বাইডেনের প্রতি সমর্থন ছিল ৫৯ শতাংশ, যা ২০২৩ সালের শেষদিকে ১৭ শতাংশে নেমে এসেছ।

অনারব মুসলিমরা কীভাবে ভোট দেবেন

যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪৫ লাখ মুসলিম-আমেরিকান রয়েছে। এদের বেশিরভাগই তথা প্রায় ৩৫ লাখ আমেরিকান-মুসলমানই অনারব। যাদের বেশিরভাগ আবার পাকিস্তানি ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত।

অনারব মুসলিমরা ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্র্যাটদেরকেই ভোট দিয়ে আসছেন। কিন্তু এবার তারাও বাইডেনের প্রতি বিশ্বাস হারাচ্ছেন।

২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ মুসলমান ভোট দিয়েছিলেন। এমনকি তাদের ৮০ শতাংশই বাইডেনকে ভোট দিয়েছেন। কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর) এর হিসাব মতে, ২০২৪ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রায় ২০ লাখ মুসলিম যুক্তরাষ্ট্রের ভোটার হয়েছেন।

কিন্তু এবার মাত্র ৫ শতাংশ মুসলমান-আমেরিকান বাইডেনকে ভোট দেওয়া কথা বলেছেন। এমগেজ নামের একটি মুসলিম সিভিক এঙ্গেইজমেন্ট গ্রুপের জরিপে এমন চিত্রই উঠে এসেছে।

আমেরিকান-মুসলমানরা প্রধানত নিউ ইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, ইলিনয়, নিউ জার্সি, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ওহাইও, ভার্জিনিয়া, জর্জিয়া ও মিশিগানে বসবাস করেন।

আরব ও মুসলিমরা ভোট না দিলে নির্বাচনে কতটা প্রভাব পড়বে

কিছু বিশ্লেষক বলছেন, তারা তাদের ভোট স্থগিত রাখুক বা ট্রাম্পের পক্ষে যাক না কেন, মুসলিম ও আরব-আমেরিকানদের ভোট বাইডেনের প্রার্থিতায় বড় কোনও ধাক্কা দিতে পারবে না। কারণ তারা যুক্তরাষ্ট্রের মোট ভোটারের মাত্র ২ থেকে ৩ শতাংশ।

তবে তাদের রিপাবলিকান প্রার্থী ট্রাম্পের পক্ষে যাওয়ার সম্ভাবনা কম। কারণ ট্রাম্পসহ রিপাবলিকানরাও গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।

কিন্তু সিএনইউর জাতি ও ধর্ম বিষয়ক গবেষক ইউসেফ চৌহৌদ বলেন, “তবে নভেম্বরের জাতীয় নির্বাচনে তাদের ভোট না পেলে দোদুল্যমান রাষ্ট্রগুলোতে বাইডেন সামান্য ব্যবধানে হারার ঝুঁকিতে পড়ে যাবেন। এতে ট্রাম্পের জন্য ফের হোয়াইট হাউজের রাস্তা পরিষ্কার হতে পারে।”

চৌহৌদ বলেন, “যৌক্তিকভাবেই বাইডেন ২০২০ সালে আরব ও মুসলিমদের কাছ থেকে সম্মিলিতভাবে যে ভোট পেয়েছিলেন, এবার তার ৫০ শতাংশেরও বেশি ভোট হারাবেন। কিন্তু এই সামান্য পরিমাণ ভোটও দোদুল্যমান রাষ্ট্রগুলোতে জয়-পরাজয় নির্ধারণ করে দিতে পারে।”

চৌহৌদ আরও বলেন, “তিনি তাদের ভোটের ওপর নির্ভর করতে পারবেন না।

“এমনটা ঘটলে ট্রাম্পের ফের প্রেসিডেন্ট হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে আখেরে মুসলিমদেরই লোকসান হবে। কারণ ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন, তিনি ক্ষমতায় আসলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের উপর বিতর্কিত সেই নিষেধাজ্ঞা ফিরিয়ে আনবেন।”

চৌহৌদ বলেন, “কিন্তু এর জন্য শুধু আরব বা মুসলিমদেরই দোষ দেওয়া উচিৎ হবে না। কারণ ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কর্তাব্যক্তিরা যদি সত্যিই ট্রাম্পের দ্বিতীয়বার প্রেসিডেন্ট হওয়ার ব্যাপারে যতটা তারা বলেন ততটা সতর্ক হতেন তাহলে তারা ভিন্ন কিছু করতেন। তারা আরব ও মুসলিমদের ক্ষোভ বোঝার চেষ্টা করতেন। সুতরাং ট্রাম্প ফের প্রেসিডেন্ট হলে তার দায় শুধু আরব ও মুসলিমদেরই নয়, তাই না?”

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য কমিউনিটির ভোটাররাও ব্যালট বাক্সে বাইডেনকে আঘাত করতে পারেন। পিউ রিসার্চ সেন্টারের জরিপগুলোতে দেখা গেছে, খোদ ডেমোক্রেটিক পার্টির ৪০ শতাংশ সমর্থকও গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলের প্রতি বাইডেনের অকুণ্ঠ সমর্থনের নীতিকে পছন্দ করেননি, বিশেষত তরুণরা।

রয়টার্স বলছে, “প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের গাজা যুদ্ধনীতি নিয়ে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ভেতরেও গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি হয়েছে। যা তার নির্বাচনী প্রচারণাকেও বাধাগ্রস্ত করছে এবং নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও তাকে হতাশ করতে পারে।”

এক ডজনেরও বেশি দল ও প্রচারণা কর্মকর্তা এবং পাঁচ ডজন ভোটার ও কর্মীর সঙ্গে রয়টার্সের সাক্ষাৎকারে এই চিত্র উঠে এসেছে।

ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টায় বাইডেন কতটা সফল

নির্বাচনী প্রচারাভিযানগুলোতে আরব ও মুসলিমদের পাশাপাশি গাজায় যুদ্ধবিরতি চাওয়া অন্যান্য আমেরিকানদের কাছেও গাজার পরিস্থিতি নিয়ে বাইডেনকে হতাশ হিসেবে উপস্থাপনে চেষ্টা করা হচ্ছে।

ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে এনবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাইডেন ব্যক্তিগতভাবে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর যুদ্ধবিরতিতে রাজি না হওয়ার বিষয়ে তার হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। নেতানিয়াহুকে বিভিন্ন ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় তিনি অন্তত তিনবার যুক্তরাষ্ট্রে বহুল প্রচলিত একটি গালি দিয়েছেন। এ ছাড়া ৮ ফেব্রুয়ারি হোয়াইট হাউজে এক সংবাদ সম্মেলনেও বাইডেন বলেন, ইসরায়েল গাজায় বাড়াবাড়ি করছে।

কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে বাইডেনের অবস্থান যাই হোক না কেন, ওয়াশিংটন এখনও গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের প্রতি সমর্থন বজায় রেখেছে। এমনকি ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে আলজেরিয়ার তোলা গাজায় অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবেও একমাত্র ভেটোদাতা ছিল যুক্তরাষ্ট্র।

এর আগে জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের সেনেট গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধে অর্থায়নের জন্য আরও ১৪ বিলিয়ন ডলারের প্যাকেজও অনুমোদন করেছে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনস বলছে, বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র যত অর্থসহায়তা দেয় এমনিতেই তার বড় একটা অংশ পায় ইসরায়েল। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ইসরায়েল বছরে প্রায় ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পায়। সেই অর্থেরও প্রায় পুরোটাই ইসরায়েলের সামরিক খাতেই ব্যয় হয়।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও বৈঠকে বাইডেনের প্রতিনিধিরা আরব ও মুসলিম নেতাদের শান্ত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু তাতেও সামান্যই সাফল্য এসেছে।

ডিয়ারবর্নের আরব ও মুসলিম নেতারা বাইডেনের প্রচারাভিযান ম্যানেজার জুলি শ্যাভেজ রদ্রিগেজের সঙ্গে বৈঠকে মিলিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। কিন্তু নির্বাচন সংক্রান্ত যে কোনও আলোচনার বিরুদ্ধে থাকা সম্প্রদায়গুলোর সাধারণ সদস্যদের চাপের কারণে শেষ মুহূর্তে তা বাতিল করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে বাইডেনের সিনিয়র উপদেষ্টাদের সঙ্গে আরেকটি বৈঠকে ডিয়ারবর্ন মেয়র হাম্মুদ জানিয়ে দিয়েছেন, তারা যুদ্ধবিরতির দাবি থেকে সরে আসছেন না।

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা, রয়টার্স, সিএনএন, এনবিসি নিউজ, এপি

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist