Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

সেই গুড়া পেঁয়াজের খবর কী

বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী মাসুদ আলম তৈরি করেছেন রান্নায় ব্যবহারের গুড়া পেঁয়াজ।
বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী মাসুদ আলম তৈরি করেছেন রান্নায় ব্যবহারের গুড়া পেঁয়াজ।

কয়েক বছর আগে রান্নায় ব্যবহারের জন্য পেঁয়াজের গুড়া উদ্ভাবনের খবর দিয়ে সাড়া ফেলেছিলেন বগুড়ার মসলা গবেষণা কেন্দ্রের বিজ্ঞানী ড. মাসুদ আলম। দিন গড়াতে অনেক খবরের ভিড়ে তা চাপা পড়ে যায়।

তবে দেশে যখন পেঁয়াজের দাম বাড়ে, তখন আবার খবর পড়ে মাসুদের। কারণ তার উদ্ভাবন দেশীয় উৎপাদনে নষ্ট হওয়া পেঁয়াজের একটি অংশকে রক্ষা করে ব্যবহারের উপযোগী করার সম্ভাবনার দেখিয়েছিল।

বর্তমানে পেঁয়াজের দরের ঊর্ধ্বগতির মধ্যে খবর নিয়ে জানা গেল, এখনও পেটেন্টের অপেক্ষায় রয়েছেন পেঁয়াজের গুড়ার উদ্ভাবক মাসুদ আলম। ২০২২ সালের শুরুর দিকে পেটেন্টের আবেদন করেন তিনি।

এখন কী অবস্থায় জানতে চাইলে মাসুদ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “দেড় বছর পর জানতে পারি, আবেদন প্রক্রিয়া সঠিক ছিল না। কিন্তু ভুলটা কী ছিল, তা জানা যায়নি। শুধু আমার সময় নষ্ট হলো।

“পরে পেটেন্ট, শিল্প, ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরে যোগাযোগ করে ওদের নিয়ম ভালোভাবে দেখে আবার আবেদন করি। এখন সেটি সরকারি সাইটে প্রকাশ হবে। কারও কোনো দাবি বা অভিযোগ থাকলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তা জানাতে হবে। এরপর আরও কিছু ধাপ পূরণ করে পেটেন্ট পাব।”

সব ধরনের ধাপ পেরিয়ে মাসুদ আলমের গবেষণাটি পেটেন্ট পেলে দেশের অর্থনীতির নতুন একটি দুয়ার খুলতে পারে বলে মনে করছেন কৃষি বিভাগের ব্যক্তিরা।

তার পেটেন্টের আবেদনটি প্রক্রিয়াধীন বলে সকাল সন্ধ্যাকে জানিয়েছেন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক হাবিবুর রহমান।

একাধিক ধাপ পূরণ করে একটি উদ্ভাবনের পেটেন্ট দেওয়া হয় জানালেও মাসুদের আবেদনের বিষয়ে আর বেশি কিছু বলতে চাননি তিনি।

ড. মাসুদ বলেন, “আসলে আমরা বেশিরভাগই জানি না পেটেন্টের গুরুত্ব। আমিও বুঝতাম না। আমার উদ্ভাবন নিজের নামে চালিয়ে কেউ কিছু করছে কি না জানার বা বোঝার উপায় নেই। পেটেন্ট হলে আমি জানতে পারব, কারা এটা নিয়ে কাজ করছেন।”

এই গবেষক বর্তমানে বগুড়ার শিবগঞ্জের মসলা গবেষণা কেন্দ্রে মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তার দায়িত্বে আছেন।

যেভাবে শুরু

পেঁয়াজ
দেশে উৎপাদিত পেঁয়াজের অনেকটাই নষ্ট হয় বাছাইয়ে।

পেঁয়াজ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় বলে কৃষি বিভাগের দাবি, যদিও ইন্টারনেট ঘেঁটে তার সমর্থন মেলে না। নানা তথ্যে বিশ্বে এই কৃষিপণ্য উৎপাদনে ভারত, চীন, মিশর, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্কের পর বাংলাদেশের নাম পাওয়া যায়।

বাংলাদেশের কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, গত বছরে দেশে ৩৪ লাখ ৬০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। এবার পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৬ লাখ টন, যেখানে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৩০ টন পেঁয়াজ।

তবে সংরক্ষণ, বাছাই করতে গিয়ে এই উৎপাদিত পেঁয়াজের অন্তত ৩০ শতাংশ নষ্ট হয়। যার পরিমাণ প্রায় ১১ লাখ টন। এই ঘাটতি পূরণের জন্যই আমদানি করা হয়। আর আমদানিতে কোনও সমস্যা দেখা দিলে দাম চড়তে থাকে।

বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পেঁয়াজ উৎপাদন হয় পাবনা জেলায়, যা মোট উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ।

পাবনা জেলা কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের সহকারী প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমরা দেখেছি, প্রতি ১০০ মণে কৃষক ৬৫ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করতে পারে। বাকিটা পচে যায়।”

ড. মাসুদ আলমের পিএইচডি গবেষণার বিষয় ছিল খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ। পেঁয়াজের সমস্যা দেখে তিনি ২০১৪ সালে গুড়া উদ্ভাবনের দিকে মনোযোগ ফেরান। ২০১৭ সালে এসে সফলতা পান তিনি।

বাংলাদেশে রান্নায় মরিচ, হলুদসহ বিভিন্ন মসলার গুড়া ব্যবহার করা হলেও পেঁয়াজ কিংবা রসুন কাঁচা কিংবা বেটে ব্যবহারের চল রয়েছে।

পেঁয়াজ গুড়া যেভাবে হয়

পেঁয়াজ গুড়া তৈরির কাজে ড. মাসুদ আলম।

মাসুদ আলম জানান, পেঁয়াজের গুড়া সূর্যের তাপে ও যান্ত্রিক পদ্ধতি দুভাবেই করা যায়। এই প্রক্রিয়াজাত কাজে প্রয়োজন পেঁয়াজ কাটার যন্ত্র (স্লাইসার), প্লাস্টিকের পাত্র, লবণ, সোডিয়াম মেটা বাইসালফাইড, ড্রায়ার মেশিন (শুকানোর যন্ত্র), পলিব্যাগ।

কয়েকটি ধাপে কাজগুলো শেষ হয়। প্রথমে পেঁয়াজ সংগ্রহ করে বাছাই করতে হয়। বাছাই করা পেঁয়াজ পরিষ্কার করে খোসা ছাড়িয়ে নিতে হবে। পরে সেগুলো টুকরা করে কেটে নিয়ে ভাঁপ দিতে হয়। এরপর পেঁয়াজগুলো সোডিয়াম মেটা বাইসালফাইড দ্রবণে ডুবিয়ে রাখতে হবে। পরে ধাপে ধাপে শুকাতে হয়।

শুকিয়ে গেলে সেগুলো ব্লেন্ডিং বা গুড়া করলেই কাজ শেষ। এখন এই গুড়া মোড়কে ভরে সংরক্ষণ করা যায়।

মাসুদ আলম বলেন, যান্ত্রিকভাবে শুকিয়ে করলে সময় লাগবে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা। আর প্রাকৃতিকভাবে বাড়তি আর কয়েকদিন সময় লাগবে। দুটো পদ্ধতির খরচ খুব সীমিত।
পেঁয়াজকে গুড়া করে ভালোভাবে সংরক্ষণ করলে তা প্রায় দুই বছর ব্যবহার উপযোগী থাকে বলে জানান তিনি।

“পেঁয়াজ প্রক্রিয়াজাতকরণে গুড়া করলে এর গুণগত মাণ কমে না। আবার খাদ্যে ব্যবহারের পরিমাণ কোনোটাই কমে না।”

এক কেজি পেঁয়াজ শুকিয়ে গুড়া পাওয়া যাবে ১০০-২০০ গ্রাম। পেঁয়াজ রসালো হলে গুড়া পাওয়া যাবে কম।
এ ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য মসলার ব্যবহার জাপান, চীন, থাইল্যান্ডসহ বিশ্বের বহু দেশেই রয়েছে। বাংলাদেশে অন্য সব মশলার গুড়া ব্যবহার হলেও রান্নায় পেঁয়াজের গুড়ার ব্যবহার নেই।

সম্ভাবনা

মাসুদ আলম বলেন, “আমাদের দেশের অধিকাংশ কোম্পানি পণ্য তৈরিতে মসলার গুড়া আমদানি করে। কিন্তু দেশের আবহাওয়ায় কেউ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পেঁয়াজের গুড়া করে না। এ হিসেবে উদ্যোক্তারা দেশে পেঁয়াজের গুড়ার বাজার তৈরি করলে প্রচুর আয় করতে পারবে।”

পাবনার কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, মাসুদ আলমের উদ্ভাবন সংরক্ষণকালে পেঁয়াজ নষ্ট হওয়া যেমন রোধ করবে, তেমনি অর্থনীতির নতুন দিক উন্মোচন হবে।
তারিকুল ইসলাম বলেন, “পেঁয়াজের পাউডারের উদ্ভাবন যদি ব্যাপক হারে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে নষ্ট হয়ে যাওয়া পেঁয়াজ রক্ষা করা যাবে। এতে পাবনা, মেহেরপুরের কৃষকরা সরাসরি উপকৃত হবে। অনেক কৃষি উদ্যোক্তাও বাড়বে।”

মাসুদ আলম বলেন, এই উদ্ভাবনকে কাজে লাগিয়ে দেশে উদ্যোক্তা গড়ে তোলা সম্ভব। এখন গ্রীষ্মকালীন অনেক উচ্চফলনশীল জাত হয়েছে, সেগুলো গুড়া করে বাজারজাত করতে পারবে উদ্যোক্তারা।  

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist