Beta
সোমবার, ৪ মার্চ, ২০২৪

এক যুগেও বদলায়নি গোঁজামিলের বিপিএল

বিপিএলের ট্রফি উন্মোচন। ছবি : বিসিবি

বুধবার দশম বিপিএল শুরুর আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে হঠাৎ হাসির রোল উঠল। কারণ বিসিবি সরবরাহ করা প্রেস রিলিজ। সেখানে ‘বিপিএল’কে বিশ্বের সেরা ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেট লিগ উল্লেখ করা হয়েছে। এটা বিসিবি কর্তারা বিশ্বাস করেন কিনা, কে জানে। বিসিবির মিডিয়া কমিটির চেয়ারম্যান তানভীর আহমেদ টিটু এই প্রশ্ন শুনে একটু অপ্রস্তুত হয়ে বিপিএল ‘‘ভালোর দিকে যাচ্ছে’’ বলে সামলে নিয়েছেন তিনি। ২০১২ সাল থেকে এক যুগে ৯টি আসর পার করলেও এই টুর্নামেন্টটি গোঁজামিলের আসরই হয়েই থেকে গেল।

অধিনায়কই চূড়ান্ত হয়নি

টাইটেল স্পন্সর ঘোষনার দিন সকালে ট্রফি উন্মোচনের ছবি তোলে বিসিবি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিরোচীত সাহসিকতার জন্য সম্মান পাওয়া সাত বীরশ্রেষ্ঠের সামনে সাত দলের প্রতিনিধি। টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র একদিন বাকি অথচ সাত অধিনায়ককে নিয়ে ট্রফি উন্মোচন করতে পারেনি বিসিবি। পাঁচ দলের অধিনায়ক এলেও বাকি দুই দল ফরচুন বরিশাল ও চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের যারা এসেছেন তারা অধিনায়ক নন। এই দুই দল আনুষ্ঠানিকভাবে অধিনায়কের নামও ঘোষণা করেনি।

বুধবার পর্যন্ত খুলনা টাইগারস এনামুল হক বিজয়, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স লিটন দাস, সিলেট স্ট্রাইকার্স মাশরাফি বিন মোর্তুজা, রংপুর রাইডার্স নুরুল হাসান সোহানকে আনুষ্ঠানিক ভাবে অধিনায়ক ঘোষণা করেছে। জানা গেছে ফরচুন বরিশাল মেহেদি হাসান মিরাজ ও দুরন্ত ঢাকা মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতকে নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও আসেনি। চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্সের নাকি অধিনায়কই চূড়ান্ত হয়নি।

তাই ট্রফি উন্মোচন অনুষ্ঠানে সাত দলের অধিনায়ক না বলে প্রতিনিধি বলতে হচ্ছে টুর্নামেন্ট শুরুর একদিন আগেও। এই সাত প্রতিনিধির গায়ে ছিল না জার্সি। টাইটেল স্পন্সর না হওয়ায় দলগুলো আনুষ্ঠানিক জার্সিও বানাতে পারেনি। ট্রফি উন্মোচনের ছবি তোলার সময়ই টাইটেল স্পন্সর ঘোষনা করা হয়। তাই অফিসিয়াল লোগো ছাড়া টিম জার্সি গায়ে হাজির হয়েছিলেন লিটন দাস, এনামুল হক, নুরুল হাসান, সিলেটের সহ-অধিনায়ক মোহাম্মদ মিঠুন ও তামিম ইকবাল। চট্টগ্রামের শুভাগত হোম আর ঢাকার মোসাদ্দেক হোসেন আসেন অনুশীলন জার্সি পরে।

দলগুলোর সঙ্গে আলোচনায় বিসিবির অনাগ্রহ

সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন সুজন বলেছেন, অধিনায়ক ঘোষণা ও জার্সি উন্মোচনের জন্য আনুষ্ঠানিক গাইড লাইন আছে। তার দাবি সঠিক সময়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিরা পেরে না উঠলে বিসিবি দলগুলোকে বাধ্য করতে পারেন না। কিন্তু বিপিএল দলগুলোর দাবি, ক্রিকেট বোর্ড বা বিপিএল গভর্নিং বডি আনুষ্ঠানিকভাবে আলোচনায় বসে না তাদের সঙ্গে।

বুধবার বর্তমান চ্যাম্পিয়ন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের মালিক নাফিসা কামাল বলেছেন,‘‘সবগুলো ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকের সঙ্গে যেন বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিল বসে, একটা মিটিং বা আলোচনা হয়, এটাই আমি চেয়েছিলাম। আইপিএলেও আছে, পিএসএলেও আছে। পিএসএলে ফ্র্যাঞ্চাইজিদের সঙ্গে কথা না বলে তারিখ ঘোষণা করতে পারে না। আমি মনে করি, এটা সম্মান দেখানোর একটা প্রক্রিয়া।’’

দলের নাম বদলেছে ২৮ বার

আইপিএল দলগুলোর নাম সাধারণ ক্রিকেটপ্রেমীদের মুখস্থ। প্রত্যেকের হয়তো একটা ফেভারিট দলও হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। পিএসএল, বিগ ব্যাশের দলগুলোকেও চেনে এদেশের ক্রিকেটপ্রেমীরা। এমনকি সূদুর উইন্ডিজের ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগেরও দল নির্দিষ্ট আছে। বাংলাদেশে সেটা হয় না। এক ঢাকাই খেলেছে ছয় নামে – ঢাকা গ্লাডিয়েটরস, ঢাকা ডায়নামাইটস, ঢাকা প্লাটুন, মিনিস্টার ঢাকা, ঢাকা ডমিনেটরস, দুরন্ত ঢাকা। কিন্তু বিপিএলের দল চিনতে হয় ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট নাম অনুসারে। নাম বদলানো ছাড়া কোনো দলই নেই বিপিএলে। এভাবে গত ৯ বিপিএল আসরে মোট ২৮টি নামে খেলেছে দলগুলো।

৯ আসরে বিপিএল দলগুলোর নাম বদল :

বরিশাল ৩টি – বরিশাল বার্নার্স, বরিশাল বুলস, ফরচুন বরিশাল।

চট্টগ্রাম ৩টি – চট্টগ্রাম কিংস, চট্টগ্রাম ভাইকিংস, চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স।

কুমিল্লা ২টি – কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্স ও কুমিল্লা ওয়ারিয়র্স।

ঢাকা ৬টি – ঢাকা গ্লাডিয়েটরস, ঢাকা ডায়নামাইটস, ঢাকা প্লাটুন, মিনিস্টার ঢাকা, ঢাকা ডমিনেটরস, দুরন্ত ঢাকা।

খুলনা ৩টি – খুলনা রয়্যাল বেঙ্গলস, খুলনা টাইটানস, খুলনা টাইগারস।

রাজশাহী ৩টি – দুরন্ত রাজশাহী, রাজশাহী কিংস, রাজশাহী রয়্যালস।

রংপুর ২টি – রংপুর রাইডার্স, রংপুর রেঞ্জার্স।

সিলেট ৬টি – সিলেট র‌য়্যালস, সিলেট সুপার স্টারস, সিলেট সিক্সার্স, সিলেট থান্ডার, সিলেট সানরাইজার্স, সিলেট স্ট্রাইকার্স।

লভ্যাংশ পায় না দলগুলো

বিপিএলে দলগুলোর মালিকানা বদলে যাওয়ার মূল কারণ লভ্যাংশ না পাওয়া। কোম্পানিগুলো লাভের আশায় বিপিএল ফ্র্যাঞ্চাইজি কেনে। কিন্তু এক মৌসুম খেলার পর লাভের তুলনায় ক্ষতির পরিমাণই বেশি দাঁড়ায়। বিপিএল থেকে আসা লভ্যাংশ শেয়ার হলে ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে সরে দাঁড়াতে হতো না বলে জানিয়েছেন মালিকরা। কিন্তু বিসিবি সেই পথে হাঁটবে না।

বুধবার এই ইস্যুতে কুমিল্লার মালিক নাফিসা কামাল বলেছেন, ‘‘আমার মনে হয় ২০১৯ সালে আমরা রেভিনিউ শেয়ার (লভ্যাংশ) নিয়ে কথা বলেছিলাম তখন আমাদেরকে বিসিবি বলেছিল এটা নিয়ে কাজ হবে। এত বছর হয়ে গেছে এখনও হয়নি। ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে আমরা বিপিএল গভর্নিং কাউন্সিলের সঙ্গে চুক্তি করেছি। এই চুক্তিটা আমাদের চালিয়ে যেতে হলে আমরা চাই, দলগুলোকে কিছু হলেও লভ্যাংশ দেওয়া হোক।”

বিপিএলের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি সময় ধরে আছেন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের মালিক নাফিসা। তার উপলব্ধি,‘‘ অন্যান্য দল এক-দুই বছর থাকছে, চলে যাচ্ছে। রংপুর ব্যাক করেছে, ওরাও ছিল না। সবগুলো দল যেন লম্বা সময় থাকতে পারে এজন্য আমাদের সবাইকে একই টেবিলে বসা উচিত এবং লভ্যাংশ ভাগাভাগিতে আসা উচিত গভর্নিং বডির। কিভাবে ভাগ হবে সেটা গভর্নিং কাউন্সিলই সিদ্ধান্ত নিতে পারে।”

বারবার দল চালিয়ে ক্ষতি, কেউ মেনে নিতে পারে না। কোনো না কোনোভাবে দলের মালিকের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি হতে হবে। এটা হয় না বলেই দেখা যায় নতুন মলিক। একে-তাকে ধরে এনে দল গছিয়ে দিতে হয়।

২০২৩ বিপিএল টাইটেল স্পন্সর ঘোষণার দিনে বিসিবির প্রধান নির্বাহী নিজামউদ্দিন আশা ব্যক্ত করেছিলেন দলগুলোর সঙ্গে বসার। কিন্তু এক বছরেও সেই আলোচনা হয়নি। বুধবারও সুজন জানিয়েছেন,সামনে তারা আলোচনায় বসবেন তবে লভ্যাংশ দেওয়া সম্ভব নয়, ‘‘বিদেশে যেসব লিগের উদাহরণ টানা হচ্ছে সেখানে একটা কোম্পানি ১০ বছরের চুক্তি করে। প্রতি বছর ২ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি করে একটা সময় তারা লাভের চিন্তা করে। কিন্তু বাংলাদেশের কোন কোম্পানির পক্ষে তা সম্ভব নয়। তাই আমরা বাংলাদেশের অবস্থা অনুযায়ী বিপিএল ফিন্যান্সিয়াল মডেল ঠিক করেছি।’’ সত্যি বললে,এটা কোনো মডেলই নয়। বার বার কেউ ক্ষতির মুখে পড়বে আর খেলবে, এটা আপনি আশা করতে পারেন না।

বিসিবির বিশ্বাস

এই গোঁজামিলের মডেলের কারণে শুরুর দিকে দল নেয়া ওরিয়ন গ্রুপ, বেক্সিমকো, জেমকন গ্রুপ বা আলিফ গ্রুপ এখন আর দল নিতে আগ্রহ দেখায় না। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের মালিক নাফিসা কামালও হুমকি দিয়ে রেখেছেন। সামনের মৌসুমে লভ্যাংশ না পেলে বিপিএলের সঙ্গে থাকবেন না তারা।

কিন্তু বিসিবি স্বপ্ন নিয়েই পড়ে আছে বড় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সঙ্গে থাকবে। বিসিবির প্রধান নির্বাহীর বিশ্বাস, ‘‘আমরা আশা করি সবাই থাকবে। আমরা সবাইকে নিয়েই বিপিএল করবো। আমরা যে মডেলে বিপিএল করছি সে আর্থিক কাঠামোতে লভ্যাংশ ভাগ করা যাচ্ছে না। তবুও আমরা চাই বড় প্রতিষ্ঠানগুলো থাকুক।’’

অথচ বিসিবি এই বিপিএল আয়োজন করে লাভবান হচ্ছে। টাইটেল স্পন্সর, সম্প্রচার স্বত্ব বিক্রি, বিজ্ঞাপনী বিলবোর্ড এবং টিকিট বিক্রিই হলো তাদের বড় আয়ের খাত। দলগুলো খেলছে বলেই এই আয়। কিন্তু দলগুলোকে লাভ দেওয়ার কথা বললে তারা মুখ ফিরিয়ে নেয়। পৃথিবীই এমন, অংশীদারদের বঞ্চিত করে নিজে খেতে পারলেই খুশি। এর চেয়ে “ভাল ফিন্যান্সিয়াল মডেল” কি আর হয় !

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist