Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

কলাম

রাজনীতি থাকলে বুয়েট চলবে না?

জায়েদুল আহসান পিন্টু। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার।

বিতর্ক চলছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্র রাজনীতি থাকবে কি না! একদল শিক্ষার্থী সরাসরি রাজনীতির বিরুদ্ধে আর সরকারি দলের সমর্থক ছাত্র সংগঠন রাজনীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। এই পক্ষ-বিপক্ষ এখন জাতীয়ভাবেও আলোচিত হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সাবেক শিক্ষার্থীদের অনেকেই বলছেন, বুয়েটকে সামলাতে হবে ভিন্নভাবে। তারা মনে করছেন রাজনীতি বুয়েটের সমস্যা বাড়বে। 

প্রশ্ন হলো সমস্যা কি ছাত্রলীগে? রাজনীতিতে? বুয়েটে? নাকি অন্য কোথাও? 

দেশের একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি করার অধিকার নিয়ে প্রশ্ন ওঠার মধ্য দিয়েই বোঝা যাচ্ছে কোথাও একটা গলদ আছে। সেটা বুয়েটের কাঠামোগত, নাকি রাজনীতির কাঠামোর, নাকি শুধু সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের? সেটাই আগে খুঁজে বের করা দরকার।

বিশ্ববিদালয় ক্যাম্পাস শেখায় রাষ্ট্র, সমাজ, জাতীয় নীতি বা ছাত্রদের স্বার্থ সংক্রান্ত নানা বিষয়ে নিজেদের মতামত তৈরি করা। সেই সাথে অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করতে শেখা। ছাত্রজীবনের শুরুতে যদি এসব শিক্ষা পায় সেটা তার বাকি জীবনে কাজে লাগে।

রাজনীতি নিষিদ্ধের সুযোগটা আসে ছাত্রলীগের ছেলেদের পিটুনিতে যখন আবরার ফাহাদ নামে একজন শিক্ষার্থী নিহত হয় ২০১৯ সালে। আর ২০২১ সালে এজন্য ২০ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন দণ্ডিতও করেছে আদালত। মেধাবী ছাত্র হত্যার দায়ে ২৫ জন মেধাবীই কিন্তু শাস্তি পেয়েছে। এদেশে শিক্ষার্থী হত্যার ঘটনা নতুন নয়। তবে শিক্ষার্থী হত্যার মধ্য দিয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে দেওয়াটা নতুনই বটে। 

২০১৯ সালে যখন বুয়েট ওই সিদ্ধান্ত নেয় তখন ভাবা হয়েছিল সিদ্ধান্তটা সাময়িক। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেক সময় অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তও নিতে হয়। কিন্তু প্রায় ৫ বছর পর একটি ছাত্র সংগঠনের নেতা বুয়েট ক্যাম্পাসে উপস্থিত হওয়ার পর সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়ে গেল। তখন বিষয়টা পরিষ্কার হলো যে কথিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে বুয়েটে এই মুহূর্তে মূল সমস্যা ছাত্রলীগ। 

২০১৯ সালে অপরাধটা করেছে ছাত্রলীগের ছেলেরা। ব্যবস্থা নিতে হলে তো ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা। পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া নিষিদ্ধ করা হলো কেন? ছাত্রলীগের বাইরে আর যেসব ছাত্র সংগঠন তারাই বা কেন রাজনীতি চালুর পক্ষে মুখ খুলছে না? তাহলে কী অপরাপর ছাত্র সংগঠনগুলো সেখানে খুবই দুর্বল বা তারা মনে করে রাজনীতি চালু হলে সরকার সমর্থক ছাত্র সংগঠনের দাপটে তাদের কিছু করার থাকবে না। যদি তাই হয় এমন পরিস্থিতির উদ্ভব হলো কেন? সেই কারণও অনুসন্ধান করতে হবে। 

ছাত্রলীগের ছেলেদের হাতে আবরার নিহত হওয়ার পর ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ হলো। কিন্তু এই বুয়েটেই মৌলবাদী হেফাজত সমর্থকের হাতে ছাত্রলীগের ছেলে দীপ নিহত হয়েছে, আবরার হত্যার ৫ বছর আগে। তখন মৌলবাদী রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি ওঠেনি কেন? বুয়েট কর্তৃপক্ষ আবরারের পরিবারকে আইনি সহায়তার পাশাপাশি অর্ধকোটিরও বেশি অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছে। আর দীপের পরিবার এখনো খুনির শাস্তি নিশ্চিতের দাবি জানিয়ে যাচ্ছে। বুয়েট তাদের পাশে নেই কেন?

এমন নানা প্রশ্নের মধ্যে জরুরি হলো একটি বিশ্ববিদ্যালয়, সেটা ‘মাধ্যমিক’ বা ‘মহা’ নয় একেবারে বিশ্ববিদ্যালয়— নামের সাথে ‘বিশ্ব’ জুড়ে দেওয়া একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি শুধু ডিগ্রি দেওয়ার জন্য? ওখানে কি আর কিছু শেখানোর দরকার নেই? সারাদিন শিক্ষার্থীরা পাঠ্যবই পড়বে আর প্রকৌশলী হবে। শুধু এটুকুই? ২০১৯ সাল পর্যন্ত তো ওখানে রাজনীতি ছিল তখন পর্যন্ত কি ওই বিশ্ববিদ্যালয় রসাতলে গিয়েছিল? বা ২০১৯ এর পর থেকে কি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অনেকে বেড়ে গেছে? তেমন তো না। বুয়েটেরই পাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ। সেখানে তো রাজনীতি বহাল, দেশের সেরা প্রকৌশলীরা বুয়েট থেকে যেমন বের হয় তেমনি সেরা চিকিৎসকরা তো এই মেডিকেল কলেজ থেকেও বের হচ্ছে। রাজনীতি তো তাদের আটকাচ্ছে না। 

ছাত্র রাজনীতি নৈতিকভাবে যে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল আজ সেটার উল্টো দিক দেখা যাচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির এই দিকটা ঠিক করতে হবে। এজন্য তো রাজনীতি খারিজ করে দেওয়া যায় না। 

পৃথিবীর প্রায় সবকটা নামিদামী বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্র রাজনীতি আছে। ওদের ওখানে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়। তারা তাদের মত মিছিল করে, বিতর্ক করে, বৈঠক করে। জাতীয় নেতারা তাদের ওখানে গিয়ে প্রচার চালায়। ছাত্র রাজনীতি মানে শুধু মিছিল সমাবেশ না, বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ক্রীড়া প্রতিযোগিতা, সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা থেকে শুরু করে নানা রকম কার্যকলাপ। এসব হয় ছাত্র সংসদেরই উদ্যোগে। আর বারবার ভোট চাইতে যেতে হয় শিক্ষার্থীদের কাছে। তখন বাধ্য হয়েই ছাত্রনেতাদের বিনয়ী হতে হয়। বিভিন্ন সংগঠন যার যার পক্ষে প্রচারণা চালায়, শেখা হয় পরমত সহিষ্ণুতা, আবাসিক হলগুলোতে ভিন্নমতের সকলের একসাথে থাকায় দেখা দেয় সহমর্মিতা।

বিশ্ববিদালয় ক্যাম্পাস শেখায় রাষ্ট্র, সমাজ, জাতীয় নীতি বা ছাত্রদের স্বার্থ সংক্রান্ত নানা বিষয়ে নিজেদের মতামত তৈরি করা। সেই সাথে অন্যের মতকে শ্রদ্ধা করতে শেখা। ছাত্রজীবনের শুরুতে যদি এসব শিক্ষা পায় সেটা তার বাকি জীবনে কাজে লাগে। আর যারা মনে করেন ছাত্র রাজনীতি মানেই মারামারি কাটাকাটি টেন্ডার দখল সেটা তো তাদের আচরণগত সমস্যা। এই সমস্যা দূর করার জন্য পুরো রাজনীতিই নিষিদ্ধ করে দিতে হবে?

এই যে আমরা বলছি ছাত্রলীগ বুয়েটে যেটা করেছে এটার প্রতিবাদ হওয়া উচিত। এই প্রতিবাদটা করবে কীভাবে? এজন্যও তো রাজনীতিটা উন্মুক্ত হওয়া উচিত। 

সরকারের শিক্ষানীতি নিয়ে কথা কে বলবে? যেমন ধরা যাক বুয়েটের মেধাবী শিক্ষার্থীরা যে ‘রাজনীতির কারণে নষ্ট হয়ে যাওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের’ শিক্ষার্থীদের সাথে বসে বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে পুলিশ বা কাস্টমস কর্মকর্তা হচ্ছেন—এই শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের কথা কে বলবে? কেন একজন প্রকৌশলীকে পুলিশ হতে হবে? এই প্রশ্নটা তো সরকারের নীতি নির্ধারকদের কাছে করতে হবে। প্রশ্নকারীদের মধ্যে বুয়েটের কেউ থাকবে না কেন?

এজন্যই রাজনীতি দরকার। রাজনীতি মানে এই নয় যে সবাইকে তা করতে হবে। রাজনীতি মানে এই নয় যে সবাইকে ছাত্রলীগই করতে হবে। রাজনীতি মানে সবাই যার যার কথা বলবে। আপনার পছন্দ হলে শুনবেন, গ্রহণ করবেন, পছন্দ না হলে শুনবেন না। আপনার যেমন রাজনীতি না করার অধিকার আছে, তেমনি আমার রাজনীতি করার অধিকার আছে। সরাসরি খারিজ করে দেওয়া মৌলবাদের লক্ষণ।

ছাত্রলীগ নিয়ে যদি আতঙ্ক থাকে সেটাও দূর করার দায়িত্ব ছাত্রলীগের। তাদেরও অনুধাবন করতে হবে কেন এই আতঙ্ক। কেন অন্য ছাত্র সংগঠন তাদের নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতি করার সুযোগ পাবে না? এবার যদি বুয়েটে কোনও অঘটন ঘটে তাহলে বুয়েটে কেন, ছাত্রলীগের রাজনীতিই নিষিদ্ধের দাবি উঠলে বলার কী থাকবে?

তাহলে বোঝা গেল সমস্যাটা রাজনীতি না। আর বুয়েটে রাজনীতি থাকলে বুয়েট চলবে না এমনও না। তাহলে ২০১৯ সাল পর্যন্ত বুয়েট চলে নাই স্বীকার করতে হবে। সমস্যা হলো রাজনীতি যারা করেন তাদের কারো কারো আচরণই। এটা জাতীয় সমস্যা। এই সমস্যা সর্বত্র।

গণতন্ত্রের দ্বিতীয় যাত্রা যদি এরশাদ পরবর্তী শাসনব্যবস্থাকে ধরি, অর্থাৎ ১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের পর চালু হওয়া শাসনব্যবস্থা থেকেই ছাত্র রাজনীতির ধরন পাল্টে গেছে। ছাত্রদের অধিকার আদায়, ছাত্রদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, জাতীয় রাজনীতিকে জবাবদিহির আওতায় আনা, রাষ্ট্রের অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সচেতনতা বাড়ানোর যে কাজটা ছাত্র রাজনীতি করে দিতো সেই কাজটা আজকাল তাদের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না। ছাত্র রাজনীতি নৈতিকভাবে যে শক্তিশালী অবস্থানে ছিল আজ সেটার উল্টো দিক দেখা যাচ্ছে। ছাত্র রাজনীতির এই দিকটা ঠিক করতে হবে। এজন্য তো রাজনীতি খারিজ করে দেওয়া যায় না। 

জাতীয় রাজনীতি যারা করেন তাদেরও ভাবতে হবে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কেন ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবি ওঠে! যখনই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাবে তখনই গোপন কার্যক্রম শুরু হবে। মৌলবাদের আবাদ হবে। মনে রাখতে হবে ছাত্র রাজনীতি একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে। আর এই প্রক্রিয়ায় গলদ কোথায় সেটা খুঁজে বের করে দূর করতে হবে।

লেখক: সাংবাদিক, শিক্ষক ও গবেষক। সম্পাদক, ডিবিসি নিউজ।

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist