Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

বুয়েটে ছাত্র রাজনীতির বন্ধ দুয়ার খুলল হাইকোর্টের আদেশে

ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার দাবি জানিয়ে আসছে  বুয়েটের
ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ রাখার দাবি জানিয়ে আসছে বুয়েটের

যে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) শিক্ষার্থীদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছিল, তার কার্যকারিতা স্থগিত করেছে হাই কোর্ট।

এর মধ্যদিয়ে দেশের প্রকৌশল শিক্ষার প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠটিতে পাঁচ বছর পর ছাত্র সংগঠনগুলোর কাজ চালানোর সুযোগ তৈরি হলো।

উচ্চ আদালতের এই আদেশ মেনে চলার কথা জানিয়েছেন বুয়েটের উপাচার্য অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদার।

বুয়েট শিক্ষার্থী এক ছাত্রলীগ নেতার রিট আবদনে সোমবার বিচারপতি মো. খসরুজ্জামান ও বিচারপতি কে এম জাহিদ সারওয়ার কাজলের বেঞ্চ ছাত্র রাজনীতির ওপর নিষেধাজ্ঞার বিজ্ঞপ্তিটি স্থগিত করে।

২০১৯ সালের অক্টোবরে জারি করা এই বিজ্ঞপ্তি কেন বেআইনি ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে আদালত রুলও দিয়েছে বলে জানিয়েছেন রিট আবেদনকারীর আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক।

শিক্ষা সচিব, বুয়েটের ভিসি ও রেজিস্ট্রারকে এই ‍রুলের জবাব দিতে হবে।

রিট আবেদনটি এই দিনই দায়ের করেন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ইমতিয়াজ রাব্বি রাহিম, যাকে রাজনৈতিক কার্যক্রমের জন্য সম্প্রতি শাস্তি দিয়েছিল বুয়েট প্রশাসন।

আর সব উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো দেশের প্রকৌশল শিক্ষার প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েটেও ছাত্র সংগঠনগুলোর সক্রিয়তা ছিল। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে (ইউকসু) ছাত্র সংগঠনের পরিচয়েই প্যানেল হতো।

তবে ২০১৯ সালে শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে এক জরুরি বিজ্ঞপ্তি জারি করে রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় বুয়েট প্রশাসন।

ছাত্রলীগের একদল নেতা-কর্মীর পিটুনিতে নিহত হয়েছিলেন আবরার। সেই হত্যাকাণ্ডের মামলায় সংগঠনটির ২০ নেতা-কর্মীর মৃত্যুদণ্ড ও পাঁচজনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা হয়।

গত পাঁচ বছর ধরে বুয়েটে রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা চললেও সম্প্রতি ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের বুয়েটে উপস্থিতি নতুন করে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়।

গত বুধবার মধ্যরাতে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেনসহ কয়েকজন নেতা-কর্মী বুয়েট ক্যাম্পাসে গেলে তার প্রতিক্রিয়ায় শুক্রবার থেকে শুরু হয় বিক্ষোভ।

আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বুয়েটে কোনও ছাত্র সংগঠনের তৎপরতা দেখতে চায় না।

আন্দোলনে নামা শিক্ষার্থীরা ছাত্র রাজনীতি বন্ধ রাখার পাশাপাশি ছাত্রলীগ নেতাদের আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে যাওয়া বুয়েট শিক্ষার্থীদেরও শাস্তির দাবি তোলে।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে বুয়েট প্রশাসন পুরকৌশলের শিক্ষার্থী ইমতিয়াজের হলের সিট বাতিল করে। তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা বর্জন করে ছয় দফা দাবিতে বিক্ষোভ চালিয়ে যায় দুদিন। উপাচার্য সত্য প্রসাদ মজুমদারের আশ্বাসে রবিবার থেকে কর্মসূচি বন্ধ রাখে।

এদিকে ইমতিয়াজের সিট বাতিলের প্রতিবাদ এবং বুয়েটে রাজনীতির পথ অবারিত করার দাবিতে রবিবার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ করে ছাত্রলীগ। পরে তারা মিছিল নিয়ে বুয়েট ঘুরে আসে।

ছাত্রলীগ দাবি করছে, বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের সুযোগে নিষিদ্ধ সংগঠন হিযবুত তাহরীর এবং জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির আস্তানা গেঁড়েছে। ছাত্র রাজনীতি বন্ধের আন্দোলনও তাদের মদদে হচ্ছে।

অন্যদিকে বুয়েটের আন্দোলনকারীরা এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, শিক্ষার্থীরা নির্দিষ্ট কোনও সংগঠনের বিপক্ষে নয়, সব রাজনৈতিক তৎপরতাই বিপক্ষে। শিবিরের প্রতিও তাদের কোনও সমর্থন নেই।

দুই পক্ষের পাল্টপাল্টি চলার মধ্যে হাই কোর্টে রিট আবেদন করেন ইমতিয়াজ রাব্বি। তার সঙ্গে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেনও আদালতে যান।

আদেশের পর অধ্যাপক সত্য প্রসাদ মজুমদারকে উদ্ধৃত করে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর এসেছে, তিনি আদালতের আদেশ ‘শিরোধার্য’ বলে মেনে নিয়ে বলেছেন।

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রবিবার ছাত্রলীগের সমাবেশে ইমতিয়াজ রাব্বি রাহিম (সবার সামনে বসা)

আইনজীবীরা যা বললেন

আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী শাহ মঞ্জুরুল হক এবং সাবেক রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন। তাদের সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী হারুন অর রশীদ, জগলুল কবির।

আদেশের বিষয়টি জানিয়ে শাহ মঞ্জুরুল হক সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা আদালতে বলেছি, বুয়েটের এই সিদ্ধান্ত দেশের সংবিধানের ৩৭, ৩৮ এবং ৩৯ এর পরিপন্থি। সমাবেশ করার, রাজনৈতিক দল করার এবং বাক স্বাধীনতার অধিকার আমাদের মৌলিক অধিকার।

“তবে বুয়েটের অর্ডিনেন্স ১৯৬১ এ ভিসি এবং প্রোভিসিকে একটা ক্ষমতা দেওয়া আছে, ছাত্র রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য কিছু পদক্ষেপ নিতে পারবেন। এর ফলে তারা মিছিল-মিটিং করার ক্ষেত্রে কিছু বিধি-নিষেধ আরোপ করতে পারবেন। তবে কোনও সংগঠন নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা তাদের নেই।”

তিনি বলেন, “আদালত আমাদের বক্তব্য শুনে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করে জরুরি ভিত্তিতে জারি করা নোটিস স্থগিত করে দিয়েছেন। এই নোটিস কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন।”

“এ আদেশের ফলে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি করতে আর কোনও বাধা রইল না,” বলেন মঞ্জুরুল।

আদেশের পরে সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন সাংবাদিকদের বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র রাজনীতি থেকে গণতান্ত্রিক ধারা এবং নেতৃত্ব বেরিয়ে আসে। যেখানে সংবিধানে আমাদের যে মৌলিক অধিকার সংরক্ষিত আছে, তা কোনও বিশ্ববিদ্যালয় বাধা দিতে পারে না। সংবিধান পরিপন্থি কোনও সিদ্ধান্ত কোনও বিশ্ববিদ্যালয় নিতে পারবে না।”

আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য সুজন বলেন, “বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের সুযোগ নিয়ে বিএনপি- জামায়াত সাধারণ ছাত্রদের ব্যবহার করছে। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তারা এটি করছে।”

হাইকোর্টের আদেশের পর সাংবাদিকদের মুখোমুখি ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম হোসেন।

ছাত্রলীগ সভাপতি যা বললেন

আদালত থেকে বেরিয়ে ছাত্রলীগ সভাপতি সাদ্দাম সাংবাদিকদের বলেন, এখন সাংবিধানভাবে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতি বুয়েটে আবার শুরু হবে বলে তিনি আশা করছেন। তারা নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতির পক্ষে।  

তিনি বলেন, “বুয়েটে গণতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতি লঙ্ঘনের যে ঘটনা ঘটছিল, সংবিধান প্রদত্ত আমাদের যে অধিকার আছে, সেগুলো লঙ্ঘনের কারণে এবং বুয়েট প্রশাসন যে সংবিধানবিরোধী, শিক্ষাবিরোধী, মৌলিক অধিকারবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, সেটির বিরুদ্ধে আমরা রাজনৈতিকভাবে আন্দোলন করছি। একই সঙ্গে রিট আবেদনের মাধ্যমে আইনের আশ্রয়ের নিয়েছি।”

বুয়েটের শিক্ষার্থীর গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা এবং শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায়ে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্র রাজনীতি প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান ছাত্রলীগ সভাপতি।

একাডেমিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছাত্র রাজনীতি নিশ্চিতের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার উপযোগী ও গবেষণা উপযোগী ছাত্ররাজনীতি তৈরি করার জন্য বুয়েট প্রশাসন যদি কোনও ধরনের নিয়মকানুন-বিধিবিধান জারি করে, যা সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, বুয়েট অর্ডিন্যান্সের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তাহলে সেটিকে আমরা স্বাগত জানাব।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist