Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

‘মারণব্যাধি বললে ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইটা হবে কীভাবে’

প্রতীকী ছবি

“মৃত্যু অবধারিত। তাহলে কেন ক্যান্সারের আগে ‘মারণব্যাধি’ উপসর্গটির ব্যবহার আমরা বাদ দিচ্ছি না,” লিখেছিলেন একজন ক্যান্সার নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ-এ। ফেইসবুকেরে এই গ্রুপে ক্যান্সারাক্রান্ত রোগী, রোগীর স্বজনরা নিজেদের ভেতরে কথা বলেন, পরামর্শ বিনিময় করেন। এখানে প্রতিদিন যেমন মৃত্যুর কথা আসে, তেমনি আসে সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবন যাপনের গল্পগুলোও।

গ্রুপে ওই ব্যক্তি আরও লিখেছিলেন, “আর দশ-টা রোগের মতো ক্যান্সার রোগটিকে স্বাভাবিকভাবে নিতে পারলে রোগী এবং তার পরিবারের জন্য যুদ্ধটা চালিয়ে যাওয়া সহজ হয়। প্রথমেই যদি আমরা মনোবল হারিয়ে ফেলি, তাহলে যুদ্ধটা করব কীভাবে?”

তার এ পোস্ট ভারী হয়েছে কয়েকশ কমেন্টে। তার মধ্যে শতকরা ৯৮ শতাংশই তার কথাকে সমর্থন করেছেন।

সেখানে রিমা দত্ত নামের একজন জানান, তিনিও ব্লাড ক্যান্সারের একটি ধরন এএমএল (অ্যাকিউট মাইলয়েড লিউকেমিয়া)তে  আক্রান্ত ছিলেন, এখন সুস্থ। 

তাসলিমা আক্তার তন্বি নামে আরেকজন তার মায়ের সেরে ওঠার কথা জানিয়ে লিখেছেন, “মাকে নিয়ে এটা আমার যুদ্ধ ছিল। কিন্তু সেখানে পরাজিত হবই মনে করে যুদ্ধ করতে গেলে তো আমি আগেই মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে গেলাম। আর এই মানসিক দূর্বলতা শারীরিকভাবেও দুর্বল করে দেয়।”

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সময়মতো চিকিৎসা নিলে ক্যান্সার থেকেও সেরে ওঠা সম্ভব।

রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. গুলজার হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “যদি আর্লি স্টেজে ক্যান্সার শনাক্ত হয় এবং সঠিক চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে অনেক ধরনের ক্যান্সার থেকেই সুস্থ হয়ে ওঠা সম্ভব।”

তাই ক্যান্সার শব্দের আগে ‘মারণব্যাধি’ লেখা থেকে বেরিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি।

“সাধারণত লেখক, গণমাধ্যমকর্মীরা তাদের লেখায় এ শব্দ ব্যবহার করেন। সিনেমা নাটকে দেখা যায়, ক্যান্সারে আক্রান্তরা শেষ দৃশ্যে মারা যায়। এখানে এখন পরিবর্তন আনতে হবে।”

ক্যান্সার থেকে সেরে ওঠাদের সামনে আনার উপর জোর দিয়ে এই চিকিৎসক বলেন, “এতে অন্যরা অনুপ্রাণিত হবে। যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পাররেন মনোবল না হারিয়ে।”

সরকারি হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে আনুমানিক ২ লাখ ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে, মৃত্যু হচ্ছে এক লাখ মানুষের। সে হিসেবে প্রতিদিন ক্যান্সারে হারিয়ে যায় ২৭৩ জন।

জালাল আহমেদ।

তবে ক্যান্সার থেকে সেরে ওঠার নজিরও রয়েছে অনেক, তাদেরই একজন মীর জালাল আহমেদ। অবসরপ্রাপ্ত সরকারি এ কর্মকর্তার ক্যান্সার ধরা পড়ে ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি। পাঁচটা বছর পেরিয়ে ২০২৪ সালের ঠিক ৩ ফেব্রুয়ারিতে আরেকটি রিপোর্টে জানা যায়, তিনি আপাতত ক্যান্সারমুক্ত।

জালাল আহমেদ সিএমএল (ক্রনিক মায়েলয়েড লিউকেমিয়া) নামে এক ধরনের রক্ত ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন। আপাতত মুক্ত হলেও এই ক্যান্সার ফেরত আসার ঝুঁকি রয়েছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, সিএমএল দীর্ঘমেয়াদি ও ধীরগতির রোগ এবং সেইসঙ্গে এটি সহজে নিয়ন্ত্রণযোগ্য। ক্ষেত্রবিশেষে নিরাময়যোগ্যও। সিএমএলের রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে থাকলে এবং নিয়ম মেনে ওষুধ সেবন করলে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন।

মীর জালাল এখন স্বাভাবিক জীবন যাপন করলেও মাঝের পাঁচটি বছর তিনি এবং তার পরিবারকে এক ধরনের যুদ্ধের মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে।

ক্যান্সার থেকে সেরে ওঠা আরেকজন হোসনে আরা বিনু। স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি পাশের দেশ ভারতে গিয়ে চিকিৎসা নেন। এখন স্বাভাবিক জীবন-যাপন করছেন।

ডা. গুলজার বলেন, বর্তমানে সব ধরনের ক্যান্সারের চিকিৎসা রয়েছে। ব্ল্যাড ক্যান্সার তো বটেই, প্রস্টেট ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সার, থাইরয়েড ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, জরায়ুমুখ ক্যান্সারসহ আরও অনেক ক্যান্সার থেকেই মুক্ত হওয়া সম্ভব।

তবে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে কোন সময়ে সেটা শনাক্ত হয়েছে এবং তার সঠিক চিকিৎসা হচ্ছে কি না?

ডা. শুভাগত চৌধুরী।

এক ধরনের ব্ল্যাড ক্যান্সারে আক্রান্ত ছিলেন বারডেমের সাবেক পরিচালক ও বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত স্বাস্থ্যবিষয়ক লেখক অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী। তিনি ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়েছিলেন ২০১৮ সালে। বর্তমানে তিনিও রেনিশনে (উপশম) রয়েছেন।

সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “আগে বলা হতো, যক্ষ্মা হলে রক্ষা নাই, ক্যান্সারের অ্যানসার নাই। কিন্তু সে দিন এখন অনেকটাই অতীত। অনেক ক্যান্সারের ক্ষেত্রেই দেশে এখন উন্নত চিকিৎসা ও ওষুধ রয়েছে, যেটা অন্য ক্ষেত্রে হয়নি।”

তবে চিকিৎসার প্রাপ্যতার সংকট এখনও রয়ে গেছে মন্তব্য করে ডা. শুভাগত বলেন, “চিকিৎসার পথটা সুগম করতে হবে সবার জন্য। চিকিৎসা ব্যবস্থার মধ্যে যে বিভিন্ন ধরনের পার্থক্য রয়েছে, সেটা ঘোচাতে হবে। এখানে এখন নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে যারা রয়েছেন, তাদের দৃষ্টি দিতে হবে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist