Beta
বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

বিস্তার

সুতা কাটা স্বদেশী ও চরকা স্বরাজ

বাংলার সুতাকাটনি। চিত্রাংকন: নিলয় কুমার বসাক।

‘তাঁতি কর্মকার করে হাহাকার, সুতা, জাতা ঠেলে অন্ন মেল ভার,

দেশী বস্ত্র অস্ত্র বিকায় নাক আর হলো দেশের কি দুর্দিন।

আজ যদি এ রাজ্য ছাড়ে তুঙ্গরাজ, কলের বসন বিনা কিসে রবে লাজ?

ধর্বে কি লোক তবে দিগম্বরের সাঁজ-বাকল্‌, টেনা, ডোর, কপিন?

সুই সুতো পর্যন্ত আসে তুঙ্গ হ’তে; দীয়াশলাই কাটি, তাও আসে পোতে

প্রদীপটি জ্বালিতে, খেতে, শুতে, যেতে; কিছুতেই লোক নয় স্বাধীন!’

                                                                     — মনমোহন বসু

সৃষ্টির পর থেকে মানুষ তার গাত্রাবরণ বা লজ্জা নিবারণের জন্য নিজেকে আবৃত করে রাখতে শুরু করে ঠিক কখন থেকে তা বলা কঠিন। জেনেটিক স্কিন-কালারেশন গবেষণা সূত্রে জানা যায় যে, প্রায় এক মিলিয়ন বছর পূর্বে মানুষ তার শরীরের অপ্রয়োজনীয় লোম হারাতে শুরু করে। সেই সময় থেকেই তারা গাত্রাবরণের দিকে ঝুঁকতে থাকে।

কাঠ দিয়ে বানানো চরকার চিত্র। চিত্রকর্মের সূত্র: উইকিমিডিয়া।

শুরুর দিকে বিভিন্ন ঘাস, লতাপাতা, ছাল-বাকল ও চামড়ার আচ্ছাদনকে পোশাক হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। তারপর একসময় সভ্যতার উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় তন্তু বা সুতায় তৈরি বস্ত্রের ব্যবহার। বিভিন্ন তন্তুকে পরিধেয়রূপে রূপান্তরিত করার উদ্ভাবনী কাজ সারা বিশ্বের নানা এলাকায় আলাদা আলাদাভাবে হয়েছে।

এমন ধারাবাহিকতায় ভারতীয় উপমহাদেশ তুলাকে সুতোয় রূপান্তরিত করার কাজটা করে ফেলেছিল প্রথম। ‘‘সিন্ধু সভ্যতার চাষিরা সর্বপ্রথম তুলো কেটে সুতো তৈরি করে এবং সুতো থেকে কাপড়। ১৯২৯-এ আজকের পাকিস্তানে মহেঞ্জোদারোর উৎখননে যে সুতোর ভগ্নাবশেষ উদ্ধার হলো, সেটির বয়স ৩২৫০ থেকে ২৭৫০ খ্রিস্টপূর্ব। কাছের মেহেরগড়ের তুলোর বীজের বয়স প্রায় ৫০০০ খ্রিস্টপূর্ব’’। (তথ্যসূত্র: তুলোর বিশ্ব ইতিহাস, স্বেন বেকার্ট, অনুবাদ: বিশ্বেন্দু নন্দ)

চরকা কাটলেই স্বরাজ’ 

‘চর্‌কায় সম্পদ্‌, চর্‌কায় অন্ন,

বাংলার চর্‌কায় ঝল্‌কায় স্বর্ণ!

বাংলার মস্‌লিন্‌ বোগদাদ্‌ রোম চীন

কাঞ্চন-তৌলেই কিন্‌তেন একদিন।

চর্‌কার ঘর্ঘর শ্রেষ্ঠীর ঘর-ঘর।

ঘর-ঘর সম্পদ্‌— আপনায় নির্ভর!

সুপ্তের রাজ্যে দৈবের সাড়া,—

দাঁড়া আপনার পায়ে দাঁড়া!’

— চর্‌কার গান, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত

তুলা থেকে বস্ত্রের প্রধান উপকরণ সুতার গঠনের আখ্যানভাগে যুক্ত নানা হস্তপ্রযুক্তি। হাতে কাটা সুতার একেবারে শুরুর প্রযুক্তি ছিল তকলি, টাকুয়া বা টাকু। তারপর উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় চরকা নামক প্রযুক্তি সুতাকাটার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য হয়ে থাকল। এই থাকা কেবল যে সুতা তথা বস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে নিছক কারিগরি ব্যবস্থা হিসেবে টিকে থাকল তা-ই শুধু নয়, বাংলা তথা ভারতের সুতা কাটার সঙ্গে রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ইতিহাস এমনকি পৌরাণিক সুত্রা-সূত্র এই অঞ্চলের সমাজ অর্থনীতির বিকাশের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে রইল।

এমন ধারাবাহিকতায় ভারতীয় উপমহাদেশ তুলাকে সুতোয় রূপান্তরিত করার কাজটা করে ফেলেছিল প্রথম। ‘‘সিন্ধু সভ্যতার চাষিরা সর্বপ্রথম তুলো কেটে সুতো তৈরি করে এবং সুতো থেকে কাপড়। ১৯২৯-এ আজকের পাকিস্তানে মহেঞ্জোদারোর উৎখননে যে সুতোর ভগ্নাবশেষ উদ্ধার হলো, সেটির বয়স ৩২৫০ থেকে ২৭৫০ খ্রিস্টপূর্ব। কাছের মেহেরগড়ের তুলোর বীজের বয়স প্রায় ৫০০০ খ্রিস্টপূর্ব’’। (তথ্যসূত্র: তুলোর বিশ্ব ইতিহাস, স্বেন বেকার্ট, অনুবাদ: বিশ্বেন্দু নন্দ)

চরকার সুতা কাটা তথা তাঁতশিল্পের সঙ্গে সমাজ, বাণিজ্য, অর্থনীতি, ক্ষমতার উত্থান পতনসহ আছে বহু বহু যুগ-শতাব্দীর কারিগরি উৎকর্ষের প্রেক্ষাপট। যেমন ছিল চরকার যুগ—সুতা কাটা, কাপড় বোনা— আর সেই কাপড় পরিধানের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে প্রতিফলিত হয়েছিল ভারতবর্ষের স্বাধীনতার অজ্ঞাত স্বরূপের আকাঙ্ক্ষা। যার ফলে একদা ‘চরকা কাটলেই স্বরাজ’-এর মন্ত্র চালু হয়।   

চরকায় সুতা কাটছে এক নারী এবং তাঁতে কাপড় বুনছে এক পুরুষ। চিত্রকর্মটি উনিশ শতকে আঁকা।
চিত্রকর্মের সূত্র: ক্লিভল্যান্ড মিউজিয়াম অব আর্ট, যুক্তরাষ্ট্র।  

ব্রিটিশ কর্তৃত্ব বর্জনে ভারতে সুতা কাটা আর স্বরাজ সমার্থক ভেবে তখন চরকা কাটার চল হলো। সব চরকার চক্রে হয়তো সুতা ওঠে না, কিন্তু স্বরাজ উচ্চকিত হয়ে ওঠে যেন। রব ওঠে ‘চরকার গুঞ্জনধ্বনি মেশিনগানের শব্দ ছাপিয়ে যাক’! ঘোষিত, ভাষিত হয় বয়কট, বিলিতি বর্জন। অতি সামান্য কাঠের তৈরি চরকা ভারতবর্ষের স্বাধিকারের প্রতীক হয়ে ওঠে। একদা চরকা হয়ে ওঠে নারীর শ্রম, অর্থনীতি ও ক্ষমতায়নের প্রতীক—‘সুতা কাট চরকা চালাও চরকাই সম্বল’। এই সব মিলে তৈরি হয় স্বতন্ত্র এক চরিতকথা অর্থাৎ ‘চরকার চক্রাবর্তী’ থাকবার কথা।

চরকা প্রায় উঠে গেছে দেশ থেকে চরকা বুড়িও এখন চুপ! নেই দাদু-দিদি-ঠাকুমার দল, নেই আগেকার সেই একান্নবর্তী পরিবার। কিন্তু এতো নেই এর মাঝেও আছে ইতিহাস, কথকতা। চরকার কথা। তার চক্রাবর্তী থাকার কথা।

চরকার অচর্চিত কাহিনী

এ রচনা চরকা বিষয়ে স্বল্পশ্রুত ও অচর্চিত কাহিনী। স্বল্প পরিচিত আখ্যানের মধ্যে নিহিত চতুর উপনিবেশিক বাণিজ্য রাজনীতি। যা এক কথায় পশ্চিমা বাণিজ্য মাস্তানি, দখলদারি। আমাদের বয়ন ঐতিহ্যের অতীতের কারিগরি প্রযুক্তির সব অনামী, অজ্ঞাত, অখ্যাত মানুষদের কীর্তির অবিনাশী গাঁথায় আলো ফেলে দেখতে চাওয়া। এ এমন এক অভিপ্রায়ের কথা তা যেন ‘অমাবস্যার শ্মশানে ভীরু ভয় পায়— সাধক সেখানে সিদ্ধি লাভ করে গোছের’। বাঙলার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্র কারিগরি শিল্পে চরকা তথা সুতা কাটা স্বদেশিকতার প্রতীক এবং শিল্প সাহিত্যে, রাজনীতিতে চরকার উপস্থিতির, বিশ্লেষণের বয়ান ধরা রইল আলোচ্য রচনায়।

আনুমানিক উনিশ শতকে আঁকা চিত্রকর্মে চরকায় সুতা কাটছে এক ভারতীয় নারী।
চিত্রকর্মের সূত্র: আই স্টক।

চরকা নামের এই একটি বস্তুর মাধ্যমে সাম্য ভাবনা অসংখ্য সাধারণ লোকের জীবনে একটি বাস্তব সত্য হয়ে উঠতে সহায়ক হলো। কোথায় ইংরেজকে খেদিয়ে দেওয়া, আর কোথায় চরকা কাটা!

চরকার দৌলতে দুয়ারে হাতি বাঁধা না থাকলেও গ্রাম-ঘরের অভাবগ্রস্ত পরিবারগুলিতে এটাই যে বেঁচে-বর্তে থাকার একটা মস্তবড় নির্ভরযোগ্য উপকরণ ছিল— সে বিষয়ে কোনই সন্দেহ নেই। চরকা ক্রমশ একটা ধর্মানুষ্ঠানের রূপ নিতে থাকল। চরকা ধ্যান, চরকা জ্ঞান, চরকাই মুক্তি, এই হল নব নামপ্রচার। স্বদেশী চেতনার প্রতিফলন, ‘‘বউমা আমার সেয়না মেয়ে চরকা কিনেছে ঘরের কোনে আপন মনে সুতো কেটেছে।’’ 

‘‘ঘর ঘর ঘর চরকা ঘোরে জাগে সুতোর বাণ,

রাত জাগিয়া চরকা কাটি বেলায় ভাঙি ধান।’’

                             — কৃষাণ ব’য়ের গান

হিন্দু-মুসলমানের মিলনসূত্র চরকা

‘‘চরকা কাটা যেন ছিল তখন রাজনীতিতে মাথা গলাবার পাসপোর্ট। ‘চরকার গান’ গান্ধীজীর চরকা আন্দোলনকে উপলক্ষ্য করে রচিত। নজরুল একদা গান্ধীজীর চরকা প্রবর্তন ব্যবস্থাকে হিন্দু-মুসলমানের সৌভ্রাত্র এবং মিলনসূত্র বলে মনে করেছিলেন। এই চরকার কথা কত গান, কত রূপকথা, গাথাসাহিত্য— প্রতি যুগের সাহিত্যে দেখা গেছে। বাংলাদেশে অর্থাৎ অখণ্ড ভারতবর্ষে ইংরেজ রাজত্বের পূর্ব পর্যন্ত চরকা, তাঁত বাংলার বস্ত্রশিল্পের প্রধানতম সম্বল। … হাতের কাজ ছাড়াও বাংলার তাঁতের প্রয়োজনীয় সুতোর বেশিরভাগ মহিলারাই সরবরাহ করত। চরকা ও টাকুতে গৃহকর্মের ফাঁকে ফাঁকে সুতো কাটা চলত। এজন্য তাঁতিরা অগ্রিম টাকা দিত বা তুলা সরবরাহ করত। আমাদের দেশে পূর্বে যখন চরকার প্রচলন ছিল, তখন কেহ অন্নের জন্য রাস্তায় রাস্তায় হাহাকার করে বেড়ায়নি। চরকা দেশবাসীর বস্ত্রের সমাধান করত, চরকা দেশবাসীকে কাজ দিত, চরকা দেশবাসীর আলস্য দূর হইত।’’ (তথ্যসূত্র: জীবনের ঢেউ, নাজিমুদ্দিন আহমদ)

পাল্টে গেল বস্ত্র বয়ন

১৭৬৫ থেকে ১৭৮৭ এই ২২ বছরে বয়ন যন্ত্রপাতি আবিষ্কার বিশ্বের বস্ত্র বয়ন ব্যবস্থাকে পাল্টে দেওয়ার জন্য ছিল যথেষ্ট। এর মধ্যে ১৭৬৫ সালে জেমস হারগ্রিভস এর সুতাকাটার যন্ত্র, ১৭৬৯ সালে রিচার্ড আর্করাইটের ওয়াটার ফ্রেম, একই বছরে জেমস ওয়াটের স্টিম ইঞ্জিন, ১৭৭৯ সালে স্যামুয়েল ক্রম্পটনের সুতা কাটার যন্ত্র (স্পিনিং মিউল), ১৭৮৪ সালে এডমন্ড আর্করাইটের পাওয়ার লুম। আর তারপর থেকেই শুরু ভারতে বিলেতি সুতা ও বস্ত্রের অবাধ আমদানি। স্বভাবতই দেশীয় বস্ত্রশিল্পের তখন মরণ বাঁচন দশা সমুপস্থিত।

ব্রিটিশ কর্তৃত্ব বর্জনে ভারতে সুতা কাটা আর স্বরাজ সমার্থক ভেবে তখন চরকা কাটার চল হলো। সব চরকার চক্রে হয়তো সুতা ওঠে না, কিন্তু স্বরাজ উচ্চকিত হয়ে ওঠে যেন। রব ওঠে ‘চরকার গুঞ্জনধ্বনি মেশিনগানের শব্দ ছাপিয়ে যাক’! ঘোষিত, ভাষিত হয় বয়কট, বিলিতি বর্জন। অতি সামান্য কাঠের তৈরি চরকা ভারতবর্ষের স্বাধিকারের প্রতীক হয়ে ওঠে। একদা চরকা হয়ে ওঠে নারীর শ্রম, অর্থনীতি ও ক্ষমতায়নের প্রতীক—‘সুতা কাট চরকা চালাও চরকাই সম্বল’। এই সব মিলে তৈরি হয় স্বতন্ত্র এক চরিতকথা অর্থাৎ ‘চরকার চক্রাবর্তী’ থাকবার কথা।

শুধু তাই নয় ব্রিটিশরা ভারতের সামান্য চরকার প্রতি ‘মুতারফা কর’ নামে ট্যাক্স আদায় করে ‘নিজেদের চরকায় তেল’-এর ব্যবস্থা ঠিকই করেছিল। সুতা কাটা, বস্ত্র বয়ন শিল্পের ধস নামিয়ে এনে এই শিল্পের তথা বাণিজ্যের প্রভূত ক্ষতি সাধনে মত্ত উপনিবেশবিরোধী দেশের মানুষ এককাট্টা হয়ে স্বদেশী আন্দোলনে ব্রতী হয়। আমাদের ‘চরকা’ ও ‘স্বদেশী’ আন্দোলনের কথার যৎসামান্যই এখানে উদ্ধৃত হলো।

‘ত্রিশ হাজার চরকার গুঞ্জন ধ্বনি’

কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ তার স্বদেশ সঙ্গীতে বিদেশি কাপড় সুতাকে সর্বনেশে আখ্যায়িত করে তাঁর প্রতিবাদে লেখেন—

‘‘এস দেশের অভাব ঘুচাও দেশে।

সবার আহার বিহার বিলাস বেশে।

ধুতি চাদর ম্যাঞ্চেষ্টারের চেয়ে দেখ সব সর্বনেশে

তবে, জাহাজগুলো, তোদের তুলো

তোরাই কিনিস সেই জিনিসে॥’’

নজরুলের গানে গান্ধীজীর অসহযোগের আদর্শে তিনি স্বাধীনতার স্বাক্ষর পেলেন। চরকার শব্দে তিনি স্বরাজের আগমনী শুনতে পেলেন। লিখলেন তিনি চরকার গান—

‘‘তোর ঘোরার শব্দে ভাই সদাই শুনতে যেন পাই

এ খুল্ল স্বরাজ-সিংহদুয়ার আর বিলম্ব নাই।’’

অশ্বিনীকুমার দত্ত লিখেছেন—

‘‘মাঞ্চেষ্টার হতে এসে, ঘরের টাকা নেয়রে শুষে,

এদিকে দেশের তাঁতি অনাহারে মরে।

এই কি দেশের ভালবাসা,

তাঁতি ভাইদের এই দশা,

তাদের এই দুঃখ তোরা, দেখিস কেমন করে;

আয়রে চেষ্টা করি সবে,

দেশী কাপড় বিক্রী হবে,

সাজারে দেশী তাঁতি সবে, ধন রত্ন হারে।

ইংরাজ শিল্পী দেখ গিয়ে, বাঙ্গালীর টাকা নিয়ে,

তেতালা চৌতালায় কেমন, সুখে বিরাজ করে।

(আর) বাঙ্গালী শিল্পী যারা, অনাহারে মরে তারা,

দেখে তাদের এ দুর্দ্দশা প্রাণ যে কেমন করে।

নাহিরে পূর্ব্ব ভারত, গেছে সেদিন জন্মের মত,

ছি ছি বলে দেখে সবে, ভারত সন্তানে।’’

মনোমোহন বসুর ‘ভিক্টোরিয়া গীতি’ তার আরেক নিদর্শন। কত বিবিধ উপায়ে ভাবতবাসীর ‘রক্তশোষণ’ ও ‘লুঠ’ চলেছে, তার বর্ণনা পাই গানটিতে—

‘‘প্রধান লুট দমকা কলে, যারে বলে,

হোম-চাৰ্কু আর কনটিবিউশন? ।।

তা ছাড়া যোজন-যোড়া লম্বা তোড়া,

সাহ্বে পাড়ার পেন্সন বেতন।।

ম্যাঞ্চেষ্টার ধর্লে আব্দার কাপড় সূতার 

ডিউটি অম্নি হয় রেমিশন।।

তাদের পেট পুরিয়ে তখন, দেখছি এখন

আয়-করের দায় মোদের মরণ।।’’

‘‘ত্রিশ হাজার চরকার গুঞ্জন ধ্বনি মেশিনগানের শব্দ ছাপিয়ে যাক; ঘরে ঘরে সূতা কাটা শুরু হোক; বিলাতী কাপড় বর্জন কর; বিলাতী দ্রব্য যতদূর সম্ভব পরিহার কর; আমাদের তাঁতে খদ্দরের কাপড় ব্যাপক ভাবে বোনা হোক;’’। (তথ্যসূত্র: সূর্যসেনের স্বপ্ন ও সাধনা, অনন্ত সিং, পৃষ্ঠা ১১০, বিশ্ববানী প্রকাশনী, কলিকাতা-১৯৭৭)

‘‘উহাদের দে-সেনাপতি পরে ছেঁড়া কটিবাস আধ হাতি।

সেনাদল হল চরকা-বুড়ি গো, তরুণেরা হ’ল জোলা তাঁতি!

মাথা কেটে আর অস্ত্র হেনেও হয় না স্বাধীন আর সকল;

সুতা কেটে আর বস্ত্র বুনিয়া কেল্লা করিবে তোর দখল।’’

— কাজী নজরুল ইসলাম, নজরুল রচনাবলী খণ্ড দুই, পৃষ্ঠা-৩৭২।

চরকা নিয়ে চাপানউতোর

চরকা নিয়ে চাপানউতোর কিন্তু কম হয়নি। সাহিত্যিক শরৎ চন্দ্রকে নিয়ে নিচের উক্তিতে ও তারই প্রমাণ দেখতে পাওয়া যায়, ‘‘তিনি (শরৎচন্দ্র) চরকা ছেড়ে কলম ধরেছেন, তাতে আমি খুশি হয়েছি এইজন্য যে, তাঁর কলম থেকে দেশোন্নতির যে সূত্রপাত হবে চরকা থেকে তা হবে না— কিন্তু খেয়ালের বলে যদি তিনি চক্রধর হয়েই থাকেন, তা হলেও তার বিরুদ্ধে আমি কখনই চক্রান্ত করব না।’’ (তথ্যসূত্র: শরৎতর্পন, সুকুমার দাস, পৃষ্ঠা-৮৬, প্রকাশকাল: ১৯৭৬)

তাই চরকা নিয়ে সঙ্গীতে লেখা হয়—

‘‘আরো জোরে ঘোরাও চরকা, আরো সুতা চাই

তিরিশ কোটি লোকের লজ্জা রাখতে হবে ভাই ;

ঘোরাও চরকা আপনার মনে একলা নিশীথ-রাতে,

ঘোরাও চরকা সববাই মিলে’ কৰ্ম্ম-পাগল প্ৰাতে ;

ঘোরাও চরকা কৰ্ম্মের মাঝে কৰ্ম্মের অবসরে,

ঘোরাও চরকা কৰ্ম্ম ফেলে” একান্ত অন্তরে;

শব্দ উঠুক আকাশ ছেয়ে ঘর্ঘর ঘর্ঘর

সেই ঘর্ঘরে একহয়ে যাক পর-ঘর ঘর-পর ।

চাকায় চাকায় আগুন উঠুক, হাতে পড়ুক ঘাটা,

চোখের দৃষ্টি আসুক ফিরে’ বাড়ুক বুকের পাটা!

একশ’ বচ্ছর দেখা গেছে উল্টো বয়ের পাতা,

একশ’ বচ্ছর লেখা গেছে গোলামখানার খাতা ;

একশ’ বচ্ছর কম বড় নয়, জাতির ইতিহাসে, –

ফল যা হ’ল, দেখা গেল চোখ ফেটে জল আসে!’

               — চরকা-সঙ্গীত, যতীন্দ্রমোহন বাগচী

শিল্পীর আঁকা ১৭৫৭ সালে শান্তিপুরে তাঁতঘর। চিত্রকর্মের সূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স

চরকা আন্দোলনের সমালোচনা

অন্যদিকে দেশ সেরা বুদ্ধিজীবী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই চরকা আন্দোলনের সমালোচনা করতে গিয়ে কড়া কথা বলেন। চরকার দ্বারা যে ভারতে স্বরাজ আসতে পারে না এই সিদ্ধান্তকে পরিবেশন করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন,“স্বরাজ সাধনের নাম করে তেত্রিশ কোটি লোককে চরকা কাটতে বলা জগন্নাথকে বিলিতি বেগুন দেওয়া।’’ 

রবীন্দ্রনাথের চরকা বিরোধী চিন্তাধারার জন্য প্রফুল্লচন্দ্র তাঁর তীব্র সমালোচনা করেন। সমালোচনার উত্তরে ‘সবুজপত্র’-র ভাদ্র ১৩৩২ সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথ লেখেন ‘চরকা’ নামক প্রবন্ধটি যেখানে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “ভারতবর্ষের তেত্রিশ কোটি লোক স্বভাবস্বাতন্ত্র্যনির্বিচারে এই ঘূর্ণ্যমান চরকার কাছে যে যতটা পারে আপন সময় ও শক্তির নৈবেদ্য সমর্পণ করবে— চরকার কি প্রকৃতই সেই মহিমা আছে।”

‘‘এই সময় অসহযোগ-আন্দোলন প্রবল বেগে চলছিল। মহাত্মা গান্ধী তখন চরকা-মন্ত্র প্রচার করছিলেন। আচার্য্য রায় প্রথমে চরকা ও খদ্দরের পক্ষপাতী ছিলেন না। প্রথমে তিনি চরকার বিরুদ্ধে নিজের মত ব্যক্ত করেন। কিন্তু এই খুলনা দুর্ভিক্ষ তাঁর মতের পরিবর্তন ঘটায়। যখন খুলনা দুর্ভিক্ষের প্রকোপ কমে এল, তখন তিনি চিন্তা করতে লাগলেন দুর্ভিক্ষ পীড়িত লোকদের কি কাজ দেওয়া যেতে পারে, যাতে তারা সমস্ত দিন ব্যাপৃত থাকতে পারে ও তাদের জীবিকারও সংস্থান হতে পারে। তিনি যখন দেখলেন যে, যদি দুর্ভিক্ষপীড়িত নরনারীরা অবসর সময়ে চরকা কাটে, তবে তাতে তাদের অনেক সাহায্য হবে, তখন তিনি নিজে চরকা মন্ত্রে দীক্ষিত হলেন। তাঁর উৎসাহে ও চেষ্টায় খুলনার ঘরে ঘরে চরকা চলতে লাগল।’’ (তথ্যসূত্র: আচার্য্য প্রফুল্লচন্দ্র, শ্রী ফণীন্দ্রনাথ বসু, এম-এ, পৃষ্ঠা-৯৮, কলিকাতা ১৩৩৩।)

তাই চরকাকে ভারতের বিধির সঙ্গে তুলনা করে নজরুল লিখলেন—

‘‘ঘোর – ঘোর রে ঘোর ঘোর রে আমার সাধের চরকা ঘোর

ওই স্বরাজ-রথের আগমনি শুনি চাকার শব্দে তোর॥

                         তুই ভারত-বিধির দান,

                    এই কাঙাল দেশের প্রাণ,

আবার ঘরের লক্ষ্মী আসবে ঘরে শুনে তোর ওই গান।

আর লুটতে নারবে সিন্ধু-ডাকাত বৎসরে পঁয়ষট্টি ক্রোড়॥’

— চরকার গান, কাজী নজরুল ইসলাম, বিষের বাঁশি (১৯২৪)

তাইতো চরকার শব্দকে ভালো সুর আর মুক্তির বাণী মনে করে লেখা হলো—

‘‘গুন গুন গুঞ্জন ঐ শোন চরকার।

এর চেয়ে ভাল সুর আর কিবা দরকার ?

মুক্তির বাণী বাজে আজ সারা দেশ মাঝে,

 লুপ্তির ত্রাসে কাপে বিদেশীয় সরকার।

গুন গুন গুঞ্জন ঐ শোন চরকার !’’

                                 — প্রভাত বসু 

শুধু তাই নয় ব্রিটিশরা ভারতের সামান্য চরকার প্রতি ‘মুতারফা কর’ নামে ট্যাক্স আদায় করে ‘নিজেদের চরকায় তেল’-এর ব্যবস্থা ঠিকই করেছিল। সুতা কাটা, বস্ত্র বয়ন শিল্পের ধস নামিয়ে এনে এই শিল্পের তথা বাণিজ্যের প্রভূত ক্ষতি সাধনে মত্ত উপনিবেশবিরোধী দেশের মানুষ এককাট্টা হয়ে স্বদেশী আন্দোলনে ব্রতী হয়।

মুসলমান সমাজে চরকা কাটার বাহাস ও নাগরী পুঁথি

মুসলমান সমাজে চরকায় সুতা কাটা তথা চরকা চালানোর উপকারিতা ও বিধিনিষেধ সম্পর্কে পক্ষে বিপক্ষে আলোচনার প্রেক্ষিতে কয়েকটি রচনা উল্লেখযোগ্য। এর মধ্যে নাগরী ভাষায় রচিত পুঁথি বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে। বিশেষত ‘চরকার ফজিলত’ ও ‘আহকামে চরকা’ পুঁথিতে তৎকালীন সমাজে চরকা কাটা বিষয়ে মুসলমান দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত।

মওলানা জৌনপুরী এ মর্মে হযরত আবূ কাতাদার একটি হাদিস পেশ করেন যে, ‘‘আল্লাহর নিকট স্ত্রীলোকের চরকা কাটার আওয়ায আর কুরআন পাঠের আওয়ায সমার্থক। চরকা কাটা স্ত্রীলোকদের জন্য জিহাদ স্বরূপ।’’ (তথ্যসূত্র: মাওলানা আব্দুল আউয়াল জৌনপুরি, মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, পৃষ্ঠা-২৪)। চরকা স্বরাজ আন্দোলনে বর্ণ ধর্ম নির্বিশেষে কতটা প্রভাব ফেলেছিল তার প্রমাণ এ বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে পাওয়া যায়।

চরকার ফজিলত নিয়ে কবি মৌলবী আকবর আলীরও কোনও দ্বিমত নেই। তখনকার দিনে চরকা নিয়ে অনেকেই আলাপ করতেন, এমনকি ওয়াজ ও বক্তৃতায়ও চরকা বিষয়টি আলোচিত হতো। কিন্তু পুরুষ ও স্ত্রীলোক ভেদাভেদ ছাড়াই সকলে চরকা চালানোর বিষয়ে বিপত্তি—

‘আহকামে চরকা’য় মৌলবী আকবর আলী লিখলেন—

‘‘মছলমান ভাইগণ জানিবে শকল।।

জানি বুজি শব লুকে করিবে আমল*

দেখ ভাই শব দেশ বিদেশ হইতে।।

চরকার বএআন পাই শুনিতে*

দেশ দেশান্তরে আর জাগাএ জাগাএ।।

শব লুকে বলিতেছেন তুমাএ আমাএ*

কত লুকে তারিফ করেন কত মত।।

শুতা কাটা কাজে হএ বড় ফজিলত*

কেহত ওয়াজ করি শবাকে বুঝাএ।।

কেহ লেকচার দিআ তাতে শকলকে জানাএ*

শুতা কাটার ফজিলত করিয়া বএআন।।

জনানা মরদানাএ চরকা কাটিতে জানান*’

সুতরাং কবি জানাতে চেয়েছেন, চরকার ব্যাপারে ধর্মীয় বিধান কী? এ কাজ কি সবার জন্য উন্মুক্ত, না কি শুধু পুরুষরাই করবে, না কি কেবল মহিলারাই করতে পারবে? তাই তিনি আরও লিখেছেন—

‘‘কিন্তু দেখি কেহ নাই ধিআন কিছু করে।।

চরকা কাটা জরুর হএ কাহার উপরে*

মরদের উপরে হুকুম কি আওরতের তরে।।

শরার হুকুম কি মত বএআন নাহি করে*’

তার বক্তব্যের সমর্থনে কতিপয় হাদিস উল্লেখ করেছেন। আবু নইম, আবু মুছা ও ইবনে মন্দাবকর নবীজি (সা.) এর বরাত দিয়ে বলেছেন, নবীজির হুকুম হলো— পুত্র সন্তানদের সাঁতার ও তীর চালনা শিখাবে, পক্ষান্তরে মেয়েদের চরকা কাটা শিক্ষা দিবে—

‘‘আবু নইম, আবু মুছা ও ইবনে মন্দাবকর।।

আব্দুল্লাহর বিটা আল্লা রাজি রহে তান উপর*

রছূলুল্লা হইতে তিনি বএআন করিলা।।

নবিজির হুকুম তাতে শবে জানাইলা*

আপন আপন বেটাকে তালিম করিতে বলিলা

শাতার দেওআ তির চালন বেটাকে শিখাইবে।।

মুমিন আওরতে চরকা কাটা শিক্কা দিবে*’’

সতেরো শতকের একেবারে শেষের দিকের কবি সীতারাম দাসের ‘মনসামঙ্গল’ কাব্যের ‘হাসন-হোসেন’ পালায়  (বিশ্বভারতী পুঁথি, সং ৬২১৭) ‘পাঠান পাড়ার’ বর্ণনায় মুসলমান রমণীদের সুতা কাটার বর্ণনা পাওয়া যায়—

‘‘লাল চরকা      সূতা কাটেন

      ছেল্যা পিএ মাঞ্রি।

ফটক দুয়ার    ফাক পড়্যাছে

তাহে খবর নাঞ্রি।।’’

— বিশ্বভারতী পুঁথি, সং ৬২১৭ প. সং. ১৩ খণ্ড

অন্যত্র পাওয়া যায়

‘‘নকড়ী বিবি কাটন কাটেন

     ছুকড়ি আছেন খাড়া।’’

—বিশ্বভারতী পুঁথি, সং ৬২১৭ প. সং. ১৬খণ্ড

গান্ধীর ‘পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম’

গান্ধীর ‘হিন্দ স্বরাজ’-এর মূল কথাই হলো সামগ্রিকভাবে আধুনিক সভ্যতা তথা পাশ্চাত্য সভ্যতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম। এই ঘোষণার প্রধান ও প্রথম যুক্তি হচ্ছে ‘… India, as so many writers have shown, has nothing to learn from anybody else, and this is as it should be.’ (তথ্যসূত্র: ‘হিন্দ স্বরাজ’, পৃষ্ঠা-৫৬)।

ভারত থেকে প্রকাশিত ডাকটিকিটে মহাত্মা গান্ধী ও চরকা।

এই যে ভারতীয় সভ্যতার প্রতি প্রায়-মৌলবাদী ঝোঁক; এই যে ভারতবর্ষের জানলা দিয়ে আসা অন্যান্য সভ্যতার আলোকে জোর করে বন্ধ করে রাখার চেষ্টা; তার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: “আমাদের সমগ্র হৃদয়মনকে পাশ্চাত্যের প্রতি বিদ্বিষ্ট করিয়া তুলিবার এই যে বর্তমান সংগ্রাম ইহা একটা আধ্যাত্মিক আত্মহত্যার চেষ্টা মাত্র। আমাদের দম্ভের মোহে আমরা আমাদের গৃহচূড়া হইতে যদি চিৎকার করিয়া বলিতে থাকি যে মানুষের জন্য অসীম মূল্যবান কোনো কিছুই পশ্চিম উৎপাদন করিতে পারে নাই, তবে প্রাচ্যমনের যাহা কিছু দান তাহার মূল্য সম্বন্ধেও সন্দেহের বিশেষ কারণ ঘটাইয়া তুলিব।” (তথ্যসূত্র: ‘হিন্দ স্বরাজ’ ও গান্ধীর শিল্পভাবনা, দেবোত্তম চক্রবর্তী, চারনম্বর প্লাটফর্ম, তৃতীয় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, ১লা নভেম্বর, ২০১৯।)

দেশকে ভালোবাসার প্রতীক চরকা

চারণ কবি মুকুন্দ দাস চরকা কাটার আন্দোলনে শরিক হন তাঁর গানে—

‘‘মুকুন্দ দাসে বলে,

ভাল সুযোগ পেলে,

মা বোনেরা সব ধর চরকা

বন্দে মাতরম ব’লে

হবে সুখ কপালে।’’

— কর্মক্ষেত্রের গান, শ্রীমুকুন্দ দাস, ষষ্ঠ সংস্করণ, বরিশাল ১৯৩২

দেশাত্মবোধের প্রতীক হয়ে উঠেছিল চরকা, সুতি সুতা, খদ্দর। স্বরাজের আবাহন  খদ্দর, চরকার গুণ উঠে আসে গানে, যেমন—

‘‘খদ্দর পর খদ্দর বোলো গাও খদ্দর বাণী

খদ্দর মোদের দেশের রাজা চরখা মোদের রাণী।।’’

— দেশাত্মবোধক ও ঐতিহাসিক বাংলা নাটক, প্রভাত কুমার গোস্বামী, পৃষ্ঠা-২৭০

অন্যত্র লীলা মিত্র লিখেন—

‘‘পর ভাই খদ্দর

ব্রাহ্মণ শুদ্দর,

চরকায় ঘর্ঘর,

কর ভাই দিনভর!

বল সব এক স্বর ছোটলোক ভদ্দর,

স্বদেশের যাহা কিছু

সব চেয়ে সুন্দর!

বলে সব ভাই ভাই,

জাতিভেদ নাই নাই,

স্বদেশীর দিন আজ

পুত হোক অন্তর!’’

— চরকার গান, লীলা মিত্র

কবি দেশাত্মবোধের প্রতীক হিসাবে চরকা আন্দোলনের কথা অবলম্বন করে যে বাণী রচনা করেন তা এক পর্যায়ে স্বাধীনতার কথা বলে। সেসব কথা উঠে আসে হেমেন্দ্র লাল রায়ের রচিত গানে যেমন—

‘‘চরকা কাটো- চরকা কাটো, একটা জাতি উঠছে জেগে,

নুতন দিনের হচ্ছে সুরু তরুণ ঊষার অভ্যাস লেগে।

চেয়ে আছে গোটা ভারত, বোনো তোমার বসন বোনো,

নুতন দিনের বরণ লাগি’পোষাক চাহি,-সবাই শোনো!

…………………………………………. 

নগ্ন জনে বস্ত্র দেহ, বোনো- বোনো- বসন বোনো,

চরকা দিয়ে ক্ষুধার্ত্তেরি অনশনের অন্ন গোণো।

চরকা কাটো অতীত দিনের পেপার ছাপে মোছার লাগি’,

চরকা কাটো অধীনতার বন্ধনেরি মুক্তি মাগি’।

চরকা কাটার ছন্দ বাজুক মন্দিরে ও মসজিদেতে;

চরকা গানের মন্ত্র গাছক ‘পারিয়া’ আর ব্রাহ্মণেতে;

ইস্কুলেতে চরকা চলুক,-বেসাদ যে এ মুক্তি পণের,

চরকাতে আজ ভিড়তে হবে পতিত জাতের পুত্রগণের।

………………………………………..  

স্বাধীনতার দেব যা যিনি চরকা চাকায় বসত করেন,

গোলাগুলি বদলে’ আজি অস্ত্র তাঁহার ‘টানা-পোড়েন’।

বসন বোনো- বুনুনীতে হাসি তাঁহার পড়ছে বোনা,

ঘরের ছেলে-মেয়ের মুখে ফুটছে খুশির নিরেট সোনা।

………………………………………………………… 

চরকা চালাও- চরকা চালাও- গড়ে’ তোলো স্বর্গ নুতন,

সত্য এবং সুন্দরেরি দোলাও বিরাট বিজয় কেতন।

চরকা এবং তাঁতের গানে দাও দোলা দাও চিত্ত দোলায়,

বিবাদ- ভরা বিশ্ব এসে মিলবে তোমার মনের তলায়।

চালাও চালাও- চরকা চালাও, পাঁজের সাথে মিলাও পাঁজে

সূতার ফেরে পড়ছে ধরা পরিশ্রমের প্রাপ্যটা যে।

ধৈর্য্য এবং নিষ্ঠা এবং ত্যাগের সাথে চরকা কাটো,

দেশের মাটি ধন্য হবে – চরকা নহে তুচ্ছ, খাটো।’’

                         — চরকার গান, শ্রী হেমেন্দ্র লাল রায়

চরকা নিয়ে গান্ধী

শুধু কি তাই? এই শ্রমিক-কারিগররা মজুরিতে ঠকেন, মহাজনদের শোষণের শিকার হন। মহাত্মা গান্ধী নিজেই লিখেছেন, ‘‘যাঁরা সুতো কাটেন তাঁরা মজুরিতে ঠকেন। মজুরি যথাসম্ভব কমানো হয়’’ (হরিজন ১৩.৭.১৯৩৫)। এমনকি অবিকল ধনতান্ত্রিক রীতিতে ছাঁটাই-এরও প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় (হরিজন ১০.৮.১৯৩৫)। কুটিরশিল্পের এই ধনতান্ত্রিক চরিত্রে রূপান্তর সম্পর্কে গান্ধী নিজেই স্বীকার করে লিখেন, “What we do today is to go to the villagers with a money-bag like bankers and promise four or six annas for spinning” (CWMG: ‘Collected Works of Mahatma Gandhi’). ৮৫/৪৯)। পাশাপাশি দেশ ছেয়ে যায় নকল খদ্দরে।

ইয়েরওয়াদা কারাগারে চরকায় সুতা কাটছেন মহাত্মা গান্ধী। আলোকচিত্র: উইকিমিডিয়া।

এই তিক্ত অথচ বাস্তব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে গান্ধী চেষ্টা করেন খদ্দরের গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রাখতে, কিন্তু তাতেও যে তিনি সম্পূর্ণ আস্থাশীল হতে পারেন না সেটা স্পষ্ট হয় যখন তিনি লিখতে বাধ্য হন, “Letters are coming in from everywhere telling me that greedy persons have been selling foreign or mill-made cloth by passing it off as khadi and they also put up the price of such cloth. This does not surprise me. When the entire system of government is based on fraud, what else can we expect from people? … The easiest safeguard against this is that every village should produce its own khadi and that people in the cities should buy only such khadi as does not look like mill-made cloth, and that too preferably stamped with a Congress mark. Even if all these precautions are taken, there is no guarantee that there would be no danger of fraud” (CWMG: ‘Collected Works of Mahatma Gandhi’) ২৪/১৭০)।’’ (তথ্যসূত্র: হিন্দ স্বরাজ’ ও গান্ধীর শিল্পভাবনা, দেবোত্তম চক্রবর্তী, চারনম্বর প্লাটফর্ম, তৃতীয় বর্ষ, সপ্তম সংখ্যা, ১লা নভেম্বর, ২০১৯।)

পরাধীন ভারতে খদ্দর চরকা দেশি কাপড়কে বিষয় করে স্বদেশী আন্দোলনের যে জোয়ার উঠেছিল তাতে জনগণকে উদ্দীপিত করতে রচিত হয়েছে অজস্র গান কবিতা। হেমেন্দ্র কুমার রায় এর দীর্ঘ কবিতার বয়ান এখানে উল্লেখ করা যাক—

‘‘জন্ম তোমার নয় বিদেশে, অবহেলায় মেশিন-তাঁতে,

এই ভারতের কালো ছেলে রচল তোমায় আপন হাতে।

নওকো তুমি যেমন-তেমন যা-হোক তা-হোক তুচ্ছ যা তা-

প্রতি-গেছি সূতোর সোনে আছে প্রাণের যত্ন গাঁথা!

পথে ঘাটে, রেল-হোটেলে সদাই যাদের খাচ্ছি লাঠি,

পরব তাদের দেওয়া কাপড়- এতই মোর ঘৃণ্য জাতি?

এই অপমান ঘৃণা থেকে জানচি দেবে মুক্তি তুমি,

তাই তো তোমায় বরণ করে আজকে নিখিল ভারত তুমি!

মাঠের চাষী লাঙল নিয়ে শুকনো মাটি শ্যামল করে,

যাদের দয়ায় বেঁচে আছি, যাদের দোয়ায় জঠর ভরে,

‘নিম্ন’ ব’লে লজ্জা দিলেও যারা মোদের লজ্জা ঘোচায়,

তারাই রোদে দিন-দুপুরে কাপাস-গাছে কুসুম ফোটায়।

সেই ফসলের তুলো নিয়ে চরকা ঘোরায় হোথায় কারা?

বৌ-মেয়ে আর মা-বোন আমার-প্রাণের নিধি আছেন যাঁরা!

চরকা-পাকে সূতোয়- সূতো- যার তরে ঐ বা’সে তাঁতি’

ঐ সূতোতে রোচবে খাদি-গভীর প্রেমে দিবস-রাতি।

চরকা ঘোরে! সঙ্গে ঘোরে ভারতবাসীর জীবন-চাকা,

চরকা ঘোরে বনবনিয়ে, যাচ্ছে সূতো ঝাঁকা ঝাঁকা!

চরকা ঘোরে লক্ষ হাতে, চরকা ঘোরে ভারত জুড়ে,

চরকা ঘোরে ঘরে ঘরে- দুঃখ পালায় কপাল খুঁড়ে!

চরকা ঘোরে মায়ের হাতে,- ঘোরান আমার প্রিয়তমা,

চরকা ঘোরে যাহার ঘরে শান্তি সেথায় নিরুপমা!

চরকা ঘোরে জমছে সূতো- যে সূতোতে লক্ষ্মী বাঁধি,

চরকা ঘোরে বিনিয়ে সূতো- যে সূতোতে বুনব খাদি!

খাদির প্রেমে বিভোর হয়ে গান্ধী গেছেন কারাগারে,

সে কথা কি ভুলতে পারি? আমরা মানুষ-ভুলব না রে!

খাদির নিশান উড়িয়ে দেখ হাজার ছেলে ভারত-মাতার

অন্ধকারে বন্ধ হয়ে সইচে চাপন পেষণ-জাঁতার।

ভুলব না গো- ভুলব না গো- বুকের ভেতর রইল দাগা-

ওরে তোরা চরকা ঘোরা -ঘুমিয়ে যারা তাদের জাগা।

নিজের বসন বুনব নিজে, মানব না কো পরের বাঁধা-

পরের কাপড় বইব পিঠে- নইতো মোরা ধোপার গাধা!’

                  — খদ্দরের গান, শ্রী হেমেন্দ্রকুমার রায়

‘‘বেঁচে গেছি, বেঁচে গেছি-আর করে করি ভয়?

চরকার সাথে আসে আনন্দ অক্ষয়-

ভিক্ষার পাত্রটা দূর ক’রে ফেলে দাও,-

কাজ কর হাতে আর আনন্দে গান গাও!

চরকায় বস্ত্ররে, অন্ন সে চরকায়

চরকার পরশনে অধীনতা দূরে যায়-

ভেবেছিনু -কোন দিন ম’রে যাব অনাহারে-

চক্র ধরিয়া করে নারায়ণ হাসে দ্বারে।’’

— দেশ যাহা হইতেছে, কবি বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়, সর্বহারাদের গান (কাব্যগ্রন্থ) ১৯৩০।

শুধু কি তাই? এই শ্রমিক-কারিগররা মজুরিতে ঠকেন, মহাজনদের শোষণের শিকার হন। মহাত্মা গান্ধী নিজেই লিখেছেন, ‘‘যাঁরা সুতো কাটেন তাঁরা মজুরিতে ঠকেন। মজুরি যথাসম্ভব কমানো হয়’’ (হরিজন ১৩.৭.১৯৩৫)। এমনকি অবিকল ধনতান্ত্রিক রীতিতে ছাঁটাই-এরও প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় (হরিজন ১০.৮.১৯৩৫)। কুটিরশিল্পের এই ধনতান্ত্রিক চরিত্রে রূপান্তর সম্পর্কে গান্ধী নিজেই স্বীকার করে লিখেন, “What we do today is to go to the villagers with a money-bag like bankers and promise four or six annas for spinning” (CWMG: ‘Collected Works of Mahatma Gandhi’). ৮৫/৪৯)। পাশাপাশি দেশ ছেয়ে যায় নকল খদ্দরে।

বাউল-ফকিরের চরকা

কবি, সাহিত্যিক, রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবীদের সঙ্গে উপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বরাজ সাধনের আন্দোলনে বাউল ফকির গ্রাম্য গায়েনরাও পিছিয়ে থাকেননি। বেলা শাহ্ ফকির তাই গেয়ে উঠেন—

‘‘বেলা শাহ্ ফকীরে কঈন

চরকা বড় ধন

যে করিতে পারে জয়

দয়াল মুরশীদ মাওলার মন॥

সখী সূত কাটিও

হুশে রাখিও দম

চরকা সাবুদ রাখিও॥’’

বাংলার কার্পাস সূত্রবিদ্যার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি চরকা। এই চরকায় তাঁতির হাতে সুতা তুলে দিত বাংলার সুতা কাটনিরা। যে কারিগরি পেশা বাংলার বস্ত্রশিল্পকে দুনিয়ায় অতি উচ্চাসনে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। পারিবারিক, সামাজিক, দেশের সমৃদ্ধির সোপান হয়ে উঠেছিল কাটনিদের হাতে অত্যাশ্চর্য সূক্ষ্ম সুতা কাটার মুন্সিয়ানা।

বাংলার বস্ত্র ঐতিহ্যের অতীত সোপানে তার নিজস্ব চরকা প্রযুক্তি সমাসীন। চরকার এই কথকতা আদতেই সুতা, কাটনি, তাঁতি, বস্ত্র তথা বাংলার অতি উৎকর্ষ বস্ত্র শিল্পের ইতিহাসের কিঞ্চিৎ প্রশস্তি মাত্র।

লেখক: তন্তুশিল্পী, গবেষক ও লেখক। প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে: ‘তন্তুকলা ও ট্যাপেষ্ট্রি’ (২০০৪), ‘তন্তুবায় স্বরূপ সন্ধান’ (২০১৪), ‘দশদিশি ঐতিহ্যের বাখান’ (২০১৮), ও ‘গামছা চরিতকথা’ (২০২৩)। ইমেইল: bagartisan@gmail.com

শফিকুল কবীর চন্দন। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার।
ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত