Beta
শনিবার, ২ মার্চ, ২০২৪
নতুন শিক্ষাক্রমের ১ বছর

শহুরে শিশুরা শিখছে অনেক, গ্রামে রান্নাতেই আটকে

শিল্পী: আনিসুর রহমান লিটন

স্কুলশিশুদের পাঠদান কিংবা গ্রহণ এবং মূল্যায়ন পদ্ধতি আমূল বদলে দিয়ে চালু হওয়া নতুন শিক্ষাক্রমের অধীনে শিক্ষার্থীরা এক বছর পার করল। সরকার এই শিক্ষাক্রম চালু করার পর থেকে শুরু হয় বিতর্ক। তা থেমে নেই এখনও। নতুন শিক্ষাক্রমে এক বছরে শিক্ষার্থীরা কী শিখল, শিক্ষকরা তাদের কতটুকু শেখাতে পারল, অভিভাবকদের উদ্বেগ কতটা কাটল- তা খুঁজতে চেয়েছে সকাল সন্ধ্যা। তারই ধারাবাহিক প্রতিবেদনের দ্বিতীয় পর্ব।

বাংলাদেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে বৈষম্য রয়েছে শুরু থেকেই। নতুন শিক্ষাক্রমেও তা থেকে উত্তরণের দিশা দেখা যাচ্ছে না।

আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে নতুন শিক্ষাক্রমে এক বছর পেরিয়ে এসেছে একদল শিক্ষার্থী। তাদের শেখার খবর নিতে গিয়ে দেখা যায়, নানা সুবিধার মধ্যে থাকা শহুরে শিক্ষার্থীরা যতটুকু শিখতে পারছে, গ্রামের শিক্ষার্থীরা তা পারছে না।

রাজধানীর হলিক্রস স্কুলের শিক্ষার্থী জেরিন ফ্লোরেন্স রোজারিও ষষ্ঠ শ্রেণিতে তার শেখার বিষয়গুলো তুলে ধরতে গিয়ে বলল, “আটা-ময়দা দিয়ে কীভাবে ফসিল বানানো যায়, সেটিা শিখেছি। সৌরচুল্লি বানাতে চিপসের প্যাকেটের উল্টো অংশকে ফয়েল পেপার হিসেবে ব্যবহার করেছি। আমাদের এক বন্ধু ছোট-বড় চুড়ি দিয়ে হাইড্রোজেনের ত্রিমাত্রিক পরমাণু মডেল বানিয়েছিল।”

বায়ুদুষণ নিয়ে কাজ করার কথা জানিয়ে শিশুটি বলল, “টিচার আমাদের গ্রুপ ওয়ার্কের মাধ্যমে শিখিয়েছিলেন। যেখানে রাস্তায় যানবাহন চালকদের সাথে কথা বলা এবং কোন যানবাহন থেকে কী ধরনের গ্যাস বাতাসে মিশে, সেগুলোর লিস্ট করাসহ নানা টাস্ক ছিল।

“আমি ৮ জন অটোচালক, দুজন বাসচালক এবং দুজন ট্রাকচালকের সাথে কথা বলেছি। সেগুলো ক্লাসে বর্ণনা করেছি। সবার হাততালি পেয়েছি।”

নৈতিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও আমুল পরিবর্তন নিজের মধ্যে লক্ষ করছে জেরিন। নিজ নিজ এলাকার নানা সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর ছবি এবং লেখা সংযুক্ত করে পোস্টারের মাধ্যমে তুলে ধরা, সেগুলো নিয়ে এলাকার বয়ঃজ্যেষ্ঠ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে সমাধানের একটি পরিকল্পনা করতে হয়েছে তাকে।

জেরিন বলল, “এই কাজ করতে গিয়ে আমার নিজেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়ছে। এখন দেখেন আমি খুঁজে পেলাম, সবাই যেখানে-সেখানে ময়লা ফেলে। এটা একটা সমস্যা।

“আমি ম্যাডামকে বলার পর তিনি বলেছেন, ব্যাগে পুরনো নিউজপেপার রাখতে। কোথাও হাতের কাছে ডাস্টবিন না থাকলে সেগুলো নিউজপেপারে মুড়িয়ে রেখে, পরে একসাথে নির্দিষ্ট জায়গায় ফেলতে।”

জেরিনের মতো অভিজ্ঞতা হয়নি নরসিংদী জেলার মনোহরদী থানার খাড়াব গ্রামের ঘোষগাও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের।

সেখানকার শিক্ষার্থী মাজহারুল ইসলাম রিফাত বলল, “সেভেনে নতুন পাঠ্যক্রমে প্রথম কয়েকমাস একটু বুঝতে অসুবিধা হয়েছে। ক্লাসে খালি গল্প করে কাটাইছি। আমরা বুঝতেছিলাম না কী পড়াবে। আমাদের টিচাররা অনেকদিন ক্লাসেও আসত না। বলতেন, কী পড়াবেন, জানেন না। আবার ক্লাসে এসে নাম ডেকেই চলে যেতেন অনেক টিচার।”

ব্যবহারিক ক্লাসে ঢাকার শিক্ষার্থীরা যখন অনেক বিষয় নিয়ে কাজ করেছে, সেখানে করার জন্য তেমন কিছু না পাওয়ার কথা বলল সিলেটের কলাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আব্দুল ফালেক।

“স্যাররা বলছেন, বিজ্ঞান বইয়ে যা বানাইতে বলছে, সেগুলা তোরা কই পাবি? তোরা তো পোস্টার বানাইতে দিলে সেই পোস্টারের কাগজটাও আনতে পারিস না। তার থেকে যা, রান্না করে নিয়ে আয়। পাঁচটা সাবজেক্টেই টিচাররা আমাদের রান্না করে আনতে বলছেন।”

ফালেকের মতো প্রায় একই কথা শোনা গেল সারাদেশের প্রায় ২০টি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৪০ জন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে।

রান্না করতে গিয়ে নরসিংদীর রিফাতের অবশ্য ভিন্ন রকম অভিজ্ঞতার মুখে পড়তে হয়। তাতে তার নতুন উপলব্ধিও হয়।  

সে বলল, “আমাদের প্রথম ব্যবহারিক ক্লাসে বাসা থেকে খাবার রান্না করে আনতে বলা হয়। সবাই প্রথমে এটা নিয়ে অনেক হাসাহাসি করেছে। আমাদের মেয়ে সহপাঠীরাও এটা নিয়ে আমাদের টিজ করেছে। আমাদের একটু লজ্জাও লাগতেছিল।

“বাড়িতে গিয়ে বলার পর বাড়ির মানুষও হাসাহাসি করছে। কিন্ত স্যার ম্যাডামরা বলছেন এটার করতেই হবে। আমাদের প্রধান শিক্ষক স্যার বলেছেন, সব থেকে বড় বড় যেসব হোটেলে যারা রান্না করেন, অনেক বিখ্যাত, তাদের বেশিরভাগই ছেলে।”

তবে এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে বলে জানায় রিফাত।

“আমিও ভাত ও মাছ রান্না করেছি। বাড়িতে আমার আব্বা বলছেন, সেটা খেতে অনেক মজা হইছে। এখন আমি মাঝেমধ্যেই মায়ের সাথে রান্না করি। মা নিজেও আমাকে সবজি কেটে দিয়ে বা অন্যভাবে তাকে সাহায্য করতে ডাকে।”

এখন ঘরে রান্না নিয়ে প্রতিযোগিতাও হয় বলে জানাল রিফাত।

নতুন শিক্ষাক্রমে ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে ‘জীবন ও জীবিকা’ বিষয়ে শিক্ষার্থীদের নিজে রান্না শেখার কথা বলা রয়েছে।

শুরুর দিকে এনিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও শিক্ষাবিদরা মনে করেন, এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদারতার পরিধি বাড়ছে। জেন্ডার সংবেদনশীলতার বিষয়ে সঠিক জ্ঞান পাচ্ছে তারা।

রিফাতের মতো চট্টগ্রামের হাজী মুহম্মদ মহসিন সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, সীতাকুণ্ড সরকারি আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম এইচ যে সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়, বান্দরবানের লামা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, রাজশাহী সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, রংপুরের পার্বতীপুর উচ্চ বিদ্যালয়সহ সারাদেশে প্রায় ২০টি স্কুলের শিক্ষার্থীরা এই বিষয়টি নিয়ে নিজেদের ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেন।

তবে এর বাইরে আর কী কী শিখেছে- এমন প্রশ্নের জবাবে বেশিরভাগই ছিল নীরব। অনেকের অভিযোগ, তাদের শিক্ষকরা জানেন না, কী পড়াতে হবে, কীভাবে পড়াতে হবে।

কারও কারও অভিযোগ, বিদ্যালয় থেকে যে কাজ দেওয়া হচ্ছে, তার জন্য যে উপকরণ লাগবে সেটি তারা পরিবার থেকে পাচ্ছে না।

প্রথম পর্ব পড়ুন : শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, কীভাবে শিখছে

তৃতীয় পর্ব পড়ুন : শিক্ষকরা ‘প্রস্তুতি ছাড়াই যুদ্ধে’

চতুর্থ পর্ব পড়ুন : অভিভাবকরা দিশাহারা

শেষ পর্ব পড়ুন : ধাক্কা সামাল দিতে পারছে কি কর্তৃপক্ষ

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist