Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

খোলা কলম

উন্নয়ন দৃশ্যমান, এখন চাই সুশাসন

আসিফ কবীর। প্রতিকৃতি অঙ্কন: সব্যসাচী মজুমদার

সমকালীন রাজনীতির পাঠ-পদ্ধতি ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন হতে পারে। নানাজন নানাভাবে রাজনৈতিক বিশ্লেষণ করতে পারেন। আমার কাছে মনে হয়, সাধারণ মানুষের কাছে সহজভাবে সমকালীন রাজনীতির পাঠ উপস্থাপনের একটি পদ্ধতি হতে পারে, ক্ষমতাসীন দলের জায়গায় বিরোধী দলগুলোকে বসিয়ে একটা তুলনামূলক চিত্র কল্পনা করা। ধরা যাক, বিগত ১৫ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জায়গায় বিএনপি বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আছে। তাহলে পরিস্থিতি কী হতো সেটা কল্পনা করে আমরা একধরনের মূল্যায়ন করতে পারি। আমরা ভাবার চেষ্টা করতে পারি আওয়ামী লীগের জায়গায় ওইরকম কোনও সরকার কিভাবে সঙ্কট মোকাবেলা করত বা আদৌ করতে পারত কি না?

আমরা বিএনপি-জামাত জোট সরকারের সময়কাল এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামল দেখেছি। সেই বিবেচনায় তাদের সক্ষমতা, কর্মপদ্ধতি, অনুসৃত নীতির ধারণা থেকে একেকটি বিশেষ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ ভিন্ন অন্যদের সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড কেমন হতে পারে তার পূর্বানুমান করা যেতে পারে।

করোনা মহামারীর মতো সম্পূর্ণ নতুন একটি বিশ্ববাস্তবতায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার যেভাবে ত্রাণ তৎপরতা, প্রণোদনা, টিকা আমদানি ও প্রদান, প্রটোকল প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় নীতিগত সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছে তেমনটা অন্যদের পক্ষে কতটা সম্ভব ছিল তা ভেবে দেখতে পারি। বিএনপি আমলে একটি লঞ্চডুবির পর লাশ উদ্ধারই সম্ভব হয়নি কয়েক দিনেও। সে আমলে এমন অনেক হতাশাজনক বাস্তবতা প্রত্যক্ষ করেছি আমরা। পদ্মা সেতু নির্মাণকে কেন্দ্র করে বিশ্ব ব্যাংকের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া এবং অন্যান্য বৈরী ঘটনাবলী স্মরণ করেও একইরকম মূল্যায়ন করতে পারি। দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলা করে নির্মিত পদ্মাসেতুর একটি নান্দনিক চিত্রকর্ম অন্য আর কোনও সরকার প্রধানের পক্ষে বিশ্ব ব্যাংকের প্রেসিডেন্টকে উপহার দেওয়া সম্ভব ছিল কিনা সেটাও ভেবে দেখতে পারি।

সর্বশেষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় অর্থনৈতিক বন্ধ্যাত্বে পড়েছিল দেশ। এর আগে, ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনে জয়ী হয় বিএনপি নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট। তখন পয়লা অক্টোবর ভোটের দিন থেকে ১০ অক্টোবর শপথ গ্রহণের সময় পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের নেতা-কর্মীদের নির্বাচনোত্তর হামলায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এবং আওয়ামী লীগের সমর্থকরা খুন, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, লুটতরাজ ও বাস্তুচ্যুতির শিকার হন। অথচ এই সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সহিংসতা দমন কিংবা নির্যাতিতদের নিরাপত্তা প্রদানে কিছুই করেনি।

স্বাধীনতাত্তোর বায়ান্ন বছরের বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকারের রাষ্ট্র পরিচালনা পর্যালোচনা করে বলা যায়, মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৃতিত্ব হলো— দুর্যোগ মোকাবেলা, আর্থ-সামাজিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সূচকে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এরপরও যেসব সঙ্কট এসেছে আওয়ামী লীগ সরকার দ্রুততার সঙ্গে সেসব মোকাবেলা করেছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২২ সালের জুলাই-আগস্টে দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে সাময়িক বিঘ্ন হলে নানারকম গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আলোচনা-সমালোচনা ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতির সাথে তুলনাসহ নানা নেতিবাচক কথাবার্তা ব্যাপকভাবে চাউর হয়। কিন্তু দ্রুতই সরকার সেই পরিস্থিতি সামলে নেয়। যা সরকারের সক্ষমতা ও পরিণত অবস্থাকেই স্পষ্ট করে।

এরপরও বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এমন উন্নতি ও অগ্রগতি সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ রয়েছে এবং জনমনে ক্ষোভও রয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান ও উপশম কঠিন হলেও অসম্ভব নয় নিশ্চয়ই। সেই কাজটিই বর্তমান সরকারকে করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সরকার নানা উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য যেমন সমাদৃত তেমনি নানাভাবে বিরোধীদের দ্বারা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এক্সপ্রেসওয়ে উদ্বোধনের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে তা সর্বাংশে প্রশংসিত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা সম্পূর্ণ প্রকল্প সম্পন্ন হওয়ার আগেই ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়ায় হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কার কথা বলেছেন। এক্সপ্রেসওয়ে থেকে নামার পর যানজটে আটকে থাকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিরূপ প্রতিক্রিয়া লেখা হয়েছে। যদিও পরের কয়েক মাসে এক্সপ্রেসওয়ের ব্যবহারিক সাফল্য আমরা দেখতে পেয়েছি। প্রকল্প উদ্বোধনের পর সরকার সমর্থকদের যে বাঁধভাঙ্গা উচ্ছ্বাস, তাকে কিছুটা সংকুচিত করা ছাড়া সেসব সমালোচনা আর কিছু করতে পারেনি। এক্সপ্রেসওয়ের যেটুকু সুফল সেটি কিন্তু রয়ে গেছে স্বমহিমায়।

আসলে কুতর্ক করে বা বিতর্ক সৃষ্টি করে বাস্তবতা বদলানো যায় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে মোবাইল ফোনের সিমকার্ড রেজিস্ট্রেশনের উদ্যোগ নেওয়ার পর ‘বিকলাঙ্গ মানুষের কী হবে’ তা নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছিল। কিন্তু হলি আর্টিজানে হামলাকারীদের পরিচয় দ্রুত বের করতে এই উদ্যোগটিই সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিয়েছিল।

আমরা যদি গত দেড় দশকে ঘটে যাওয়া হলি আর্টিজন হামলা, কোটাবিরোধী আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, হেফাজতের শাপলা চত্বর অবরোধ, রানা প্লাজায় ধ্বস, রোহিঙ্গা শরণার্থী সঙ্কটসহ নানা দুর্যোগ, দুর্ঘটনা, বিপর্যয় মোকাবেলার নির্মোহ বিচার করি, তবে বলতেই হয়— উদ্ধার কাজ বা দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ থেকে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠায় ভালো ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ অনন্য। আমাদের অভিজ্ঞতায় অন্য কোনও রাজনৈতিক দল বা বিশেষ সরকার এমন সব জাতীয় সঙ্কট অপেক্ষাকৃত ভালোভাবে মোকাবেলা করতে পারত, তেমন ভাবার কোনও নির্ভরযোগ্য কারণ বা নজির নেই।

একবার দেখা গেল, হজ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন সংকট। আবার দেখা গেল, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অপপ্রচার। আমরা এও দেখলাম যে প্রিয়া সরকার নামের একজন বাংলাদেশি, সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সাক্ষাতকালে ভিত্তিহীন তথ্য-উপাত্ত দিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির অবতারণা করলেন। কাছাকাছি সময়ে গুজব ছড়িয়ে এক নারী অভিভাবককে সন্তানের স্কুলের কাছেই পিটিয়ে হত্যার ঘটনা ঘটল। একসময় বিদেশি নাগরিকদের টার্গেট করে হত্যা করার মতো নৃশংস ঘটনা ঘটেছে। যার প্রত্যেকটিই সম্পূর্ণ অভিনব সমস্যা। পূর্ব প্রস্তুতি বা অভিজ্ঞতায় যার সমাধান করা সম্ভব নয়। কিন্তু সেসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায়ও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যে পারঙ্গমতা দেখিয়েছে সেটি অস্বীকার করা যাবে না। কারণ আওয়ামী লীগ কখনো হারে না। কিংবা আন্দোলন করে আওয়ামী লীগকে টলানো যায় না— এমন সিদ্ধান্ত ক্রমেই বদ্ধমূল হচ্ছে বিশ্লেষকদের।

করোনা মহামারীর ধকল ও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বময় মন্দায় আমাদের অর্থনৈতিক সাফল্যও গতি হারিয়েছে। করোনার প্রকোপ কমে এলেও যুদ্ধ এখনও চলছে। সরকার করোনাকালে মানুষকে আশ্বস্ত রেখেছে ও অকারণে ভীতিগ্রস্ত হতে দেয়নি। কিন্তু করোনায় ক্ষতিগ্রস্ত অর্থনৈতিক বাস্তবতার বিষয়ে একদমই ধারণা না দেওয়া এবং প্রস্তুত না করা বাস্তবসম্মত কাজ হয়নি। একইসাথে মুদ্রাস্ফীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে না পারার কথাও উঠে আসছে বিশ্লেষকদের আলোচনায়।

কাঠামোগত উন্নয়নে আওয়ামী লীগ সরকার অনেকদূর এগিয়েছে। এরই মধ্যে সরকারি অফিস আদালত সুরম্য ভবনে স্থানান্তরিত হয়েছে। অবকাঠামোর উন্নতি ও নিজস্ব ভবনে অফিস কার্যক্রম চালু হওয়ায় পরিসেবা প্রদানের আওতা বেড়েছে। ডেটাবেইজ তৈরি, তথ্য প্রযুক্তির অভিগম্যতা, কর্মপরিবেশ ভালো হওয়ায় সেবাদানের সক্ষমতা বেড়েছে একইসঙ্গে সময় সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে।

দৃশ্যমান উন্নয়ন ছাড়াও সন্ত্রাস দমন, জাতির পিতার হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, জঙ্গিবাদ নির্মূলে সাফল্যও আওয়ামী লীগ সরকারের বড় কৃতিত্ব। দেশব্যাপী বোমা হামলা, জনবহুল এলাকায় বোমা বিস্ফোরণ, গ্রেনেড হামলা, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সাংবাদিক হত্যা, বুদ্ধিজীবী নিধন ইত্যাদির মতো অরাজকতা ও মানবিক সঙ্কট জাতির জীবনে পুনরাবৃত্তি হওয়া কারোরই কাম্য নয়। এর বাইরেও গত ১৫ বছরে আইন সংস্কার ও নতুন আইন প্রণয়ন করে মানুষের যে দুর্ভোগ লাঘব হয়েছে সেটিও উল্লেখ করার মতো। ভূমি আইনের পরিবর্তন ও সংস্কার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা আর প্রায় স্থায়ী অসহায়ত্বের অবসান ঘটিয়েছে।

বিরোধীরা আওয়ামী লীগ সরকারকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে ব্যাপকভাবে গুজব ও বিদেশমুখিতার আশ্রয় নিচ্ছে। কিছুদিন আগে প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পদে নির্বাচন করার সময়ও তাকে প্রতিহত করতে এন্তার অপপ্রচার হয়েছিল। কিন্তু সে কৌশলও কাজ করেনি। আসলে গুজব ছড়িয়ে সরকার-বিরোধীরা নেতা-কর্মীদের চাঙ্গা রাখার যে কৌশল নেন দিনশেষে তা তেমন কিছু বয়ে আনে না। গুজব, বিদেশমুখিতা ও সহিংস রাজনীতি কোনও রাজনৈতিক নেতা, দল বা মতবাদকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেনা সেকথা ইতিহাসে প্রমাণিত। এর বিপরীতে দশকের পর দশক মতাদর্শের আবেদন ও নেতৃত্বের ক্যারিশমা অটুট রাখা বিরলতম ঘটনা। সেই বিবেচনায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রায় ৭৫ বছর ধরে এবং দলটির সভানেত্রী শেখ হাসিনা প্রায় ৪৩ বছর ধরে রাজনীতিতে যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান বজায় রেখে আলোচনার কেন্দ্রে আছেন তা সত্যিই অভূতপূর্ব।

এরপরও বাস্তবতা হলো, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এমন উন্নতি ও অগ্রগতি সত্ত্বেও অনেক ক্ষেত্রে জনদুর্ভোগ রয়েছে এবং জনমনে ক্ষোভও রয়েছে। এর কারণ অনুসন্ধান ও উপশম কঠিন হলেও অসম্ভব নয় নিশ্চয়ই। সেই কাজটিই বর্তমান সরকারকে করতে হবে। সাধারণ মানুষ অন্যায়কারীর সাজা চায়, ভালো লোককে উজ্জ্বল অবস্থায় দেখতে চায়, মন্দ লোকের ক্ষমতায়ন প্রত্যাখ্যান করে। জনমনের এই সহজাত আকঙ্ক্ষার প্রতিফলন দেখতে পেলে তারা আশ্বস্ত হতে পারেন। উন্নয়ন ও প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি এমন সব আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন ক্ষমতাসীনদের কাছে জনসাধারণের মৌলিক চাওয়া। এ ব্যাপারটিকেই বিশেষজ্ঞরা বলেন সুশাসন।

লেখক: প্রধানমন্ত্রীর সাবেক সহকারী প্রেস সচিব ও মিডিয়া কনসালট্যান্ট, মুজিববর্ষ।   

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist