Beta
মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪
Beta
মঙ্গলবার, ২৫ জুন, ২০২৪

দীপু সানার মৃত্যু : সিমেন্টের ব্লকটি পড়ল কোথা থেকে

dipu-sana-bangladesh-bank--960x540-200124-01-960x540
Picture of সাজ্জাদ হোসেন

সাজ্জাদ হোসেন

চলতি পথে উপর থেকে ভারী একটি বস্তুর পতন ডেকে আনল বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা দীপু সানার মৃত্যু। প্রথমে ইট বলা হলেও এখন জানা যাচ্ছে, বস্তুটি ছিল সিমেন্টের ব্লক। কিন্তু কোথা থেকে এটি পড়েছে, তার স্পষ্ট উত্তর ১০ দিনেও মেলেনি।

দেশের রাজধানী ঢাকায় অরক্ষিত নির্মাণকাজ এর আগেও মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়েছে। এর সবশেষ ঘটনাটি ঘটল গত ১০ জানুয়ারি।

যা ঘটেছিল

দীপান্বিতা বিশ্বাস (দীপু সানা) বাংলাদেশ ব্যাংকের সদরঘাট কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। অফিস শেষে বাসে এসে শান্তিনগর নেমে ফুটপাত দিয়ে হেঁটে বাসায় ফিরছিলেন তিনি।

সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে ১১৭/১ নম্বর নিউ সার্কুলার রোডে ফখরুদ্দীন কমিউনিটি সেন্টারের সামনে আসা মাত্র হঠাৎ করে উপর থেকে ভারী একটি বস্তু তার মাথায় পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন তিনি।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ফখরুদ্দীন কমিউনিটি সেন্টারের নিরাপত্তকর্মী মো. হাবীব সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “সন্ধ্যা সাড়ে ৫টার দিকেই কমিউনিটি সেন্টার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর আমি গেইটে তালা দিয়ে ভেতরে বসেছিলাম।

“৭টার দিকে ‘ও মাগো’ চিৎকার শুনে ভবনের পকেট গেইট খুলে দৌড়ে বাইরে যাই। গিয়ে দেখি এক নারী রাস্তায় পড়ে আছেন। তার মাথা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। পাশেই একটা সিমেন্টের ব্লক পড়ে ছিল। সেটার ওজন ২ থেকে আড়াই কেজির মতো হবে। এরপর আশপাশের মানুষ এগিয়ে এসে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়।”

দীপুকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন ফখরুদ্দীন কমিউনিটি সেন্টারের বিদ্যুৎ মিস্ত্রি মো. মনিরুজ্জামান। তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “রিকশায় করে ওনাকে নিয়ে সিরাজুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রওনা হই। রিকশায় ওঠানোর সময় ওই নারী আমার হাত ধরা ছিলেন। এরপর তিনি একবার বড় করে শ্বাস নেন। কিন্তু ৫ মিনিটের মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছনোর পর চিকিৎসক বলেন, ওই নারী মারা গেছেন।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী পরিচালক (এডি) দীপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিলেন। তার বাড়ি খুলনায়।

ঘটনার পরদিন দীপুর স্বামী তরুণ বিশ্বাস বাদী হয়ে রমনা মডেল থানায় একটি মামলা করেন। তাতে আসামি করা হয়েছে অজ্ঞাতনামাদের।

৭ বছরের প্রেম, ৮ বছরের সংসার, এক নিমিষেই শেষ

মামলার পর পুলিশের কাছ থেকে কিছুই জানতে পারেননি দীপুর স্বামী তরুণ কুমার বিশ্বাস। তিন বছরের সন্তান ঋষিরাজকে নিয়ে তিনি এখন গ্রামের বাড়িতে রয়েছেন।

তরুণ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, মায়ের চাকরির কারণে জন্মের পর থেকেই বেশিরভাগ সময় মাসি ও ঠাকুরমার কাছেই থাকত ঋষি, এখনও সেখানেই রয়েছে।

তাদের সঙ্গে তরুণের মাও এখন রয়েছেন সেখানে। তরুণ বলেন, “সবাই মিলে শিশুটিকে মায়ের অভাব বুঝতে না দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু তারপরও মাঝেমধ্যেই মাকে খুঁজছে আর কান্নাকাটি করছে সে।”

দীপুর বাড়ি খুলনার পাইকাগাছা উপজেলার সোলদানা গ্রামে। ২০০৭ সালে তার সঙ্গে পরিচয় হয় পাশের তেরখাদা উপজেলার শ্রীপুর গ্রামের তরুণ কুমার বিশ্বাসের সঙ্গে। পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন তরুণ।

২০০৮ সালে দুজনের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। আট বছর পর ২০১৫ সালে বিয়ে করে সংসার পাতেন তারা।

তরুণ ভাটারায় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে চাকরি করছেন। বাসা নেন মগবাজারের গাবতলা এলাকায়।

তরুণ বলেন, “এক সন্তান নিয়ে সুখেই জীবন কাটছিল আমাদের। কিন্তু এক নিমিষেই সব শেষ হয়ে গেল!”

কী ছিল সেই বস্তুটি

ঘটনার পর ইট পড়ে মৃত্যুর খবর চাউর হলেও প্রত্যক্ষদর্শী মনিরুজ্জামান বলেন, দীপু সানার মাথায় পড়া বস্তুটি ছিল সিমেন্টের ব্লক। সেটার ওজন ২ কেজির মতো।

দীপুর স্বামীর করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা রমনা থানার এসআই মো. মোফাজ্জল হোসেনও জানান, বস্তুটি ইট ছিল না।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, এটা সিমেন্টের তৈরি ব্লক ছিল।

কোথা থেকে এটি পড়ল- জানতে চাইলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, “যে ভবনের সামনে এই ঘটনা ঘটেছে, সেটি একটি কমিউনিটি সেন্টার। ঘটনার সময় সেটিতে তালা দেওয়া ছিল।

“এই ঘটনার যে ভিডিও ফুটেজ পাওয়া গেছে, সেটা বিশ্লেষণ করে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ফ্লাইওভারের (মগবাজার-মৌচাক ফ্লাইওভার ) উপর থেকে সিমেন্টের ব্লকটি পড়েছে।”

স্বামী-সন্তানের সঙ্গে দীপু সানা। ছবি : পারিবারিক অ্যালবাম থেকে

প্রত্যক্ষদর্শী মনিরুজ্জামান বলেন, “এই ধরনের ব্লক কোনো বাসাবাড়িতে ব্যবহার হতে দেখিনি। এই ধরনের ব্লক ফ্লাইওভারেও ব্যবহার হয়নি। ব্লকটি সড়কের পাশের ফুটপাতে ব্যবহার করা সিমেন্টের ব্লকের মতো।”

রমনা থানা পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ও ডিবি আলাদাভাবে এই ঘটনার তদন্ত করছে। তদন্ত কর্মকর্তা আশাবাদী, এই মৃত্যুর পেছনে কার দায়, তা অচিরেই উদ্ঘাটিত হবে।

মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৮ ফেব্রুয়ারি তারিখ নির্ধারণ করেছে ঢাকার আদালত।

‘মৃত্যু নয়, হত্যাকাণ্ড’

দীপু সানার মৃত্যুকে ‘হত্যাকাণ্ড’ আখ্যায়িত করে এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবি জানিয়েছেন তার সহপাঠী ও সহকর্মীরা।

গত ১৩ জানুয়ারি দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০০৫-২০০৬ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সংগঠন ‘ব্রিজ’ মানববন্ধন করে।

তাতে যোগ দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ও সমাজ বিজ্ঞানের চেয়ারপারসন জিনাত হুদা বলেন, “এটি সাধারণ মৃত্যু নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এই হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবি করছি।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত