Beta
শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪

আমদানি কমে ডলার বাঁচল; কতটা লাভ, কতটা ক্ষতি

দেশের আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম বন্দর।
দেশের আমদানি-রপ্তানির কেন্দ্রবিন্দু চট্টগ্রাম বন্দর।

ডলার সংকটের কারণে আমদানি ব্যয়ের লাগাম টেনে ধরতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছিল সরকার; তাতে সুফলও মিলেছে। ছয় মাসে আমদানি কমেছে ২০ শতাংশ। তাতে ডলারও কিছু সাশ্রয় হয়েছে।

কিন্তু প্রশ্ন আসছে, আমদানি কমার এই চিত্র দেশের অর্থনীতির জন্য লাভজনক, নাকি ক্ষতিকর? অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এর সুফল-কুফল দুটোই আছে।

তারা বলছেন, আমদানি কমে যাওয়ায় রিজার্ভের উপর চাপ কমলেও তা শিল্পায়নের জন্য দুঃসংবাদ, যার প্রভাব পড়বে কর্মসংস্থানেও। আর তা জিডিপিকে টেনে নিচে নামিয়ে আনতে পারে।

আমদানি কতটা কমেছে

বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৩-২৪ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাস অর্থাৎ জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ৩ হাজার ৫৮ কোটি (৩০.৫৮ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছে।

এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ২০ শতাংশ কম। ২০২২-২৩ অর্থবছরের এই ছয় মাসে ৩ হাজার ৮১৩ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল।

গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে সর্বমোট ৬৯ দশমিক ৪৯ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হয়েছিল, যা ছিল আগের অর্থবছরের চেয়ে ১৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ কম।

গত অর্থবছরে বাণিজ্যিক শিল্প খাতের পণ্য ও কাঁচামালের আমদানি ও এলসি খোলা দুটিই কমেছিল। গত অর্থবছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থবছরেও আমদানি ও এলসি খোলার নেতিবাচক ধারা অব্যাহত আছে।

এই অর্থবছরে প্রথমার্ধে এলসি খোলার পরিমাণ কমেছে ৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ।

কেন রাশ টানা হয়েছিল

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ২০২২ সালের মার্চ থেকে দেশে ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করে। তা মোকাবেলায় আমদানি কমাতে একের পর এক পদক্ষেপ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে দেশে ডলারের দাম ছিল গড়ে ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা। সেই ডলারের দাম বাড়তে বাড়তে এখন দাঁড়িয়েছে ১১০ টাকায়। এই সময়ে ডলারের দাম বেড়েছে ৩০ শতাংশ।

ডলার সংকট মোকাবেলায় ২০২২ সালের এপ্রিল থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আমদানিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ শুরু করে। জুনে নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়। আগস্টে ডলারের সংস্থান ছাড়া এলসি খোলা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে রপ্তানিকারক ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্যের এলসি খোলা ছাড়া অন্য সব পণ্য আমদানির এলসি খোলা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়।

সরকারের তখনকার পদক্ষেপ ভুল ছিল না বলেই মনে করেন পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এই সংকটের সময়ে আমদানির লাগাম টেনে ধরা ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক বা সরকারের অন্য কোনও উপায় ছিল না।

“আমদানি না কমালে রিজার্ভ হয়ত এতদিনে ১৫ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে আসত। তখন কিন্তু শ্রীলঙ্কার মতো আমাদের দেশেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত। সেটা সামাল দেওয়া কঠিন হতো।”

কুফল কতটা

শুধু ভোগ্য পণ্যই নয়, কাঁচামালসহ শিল্পের অন্যান্য উপাদানও বাংলাদেশকে আমদানি করতে হয়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে নতুন শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি, শিল্পের মধ্যবর্তী পণ্য, শিল্পের কাঁচামালসহ সব ধরনের পণ্যের আমদানি কমায় দেশে বিনিয়োগ কমবে। নতুন কর্মসংস্থান হবে না। তাতে সামগ্রিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “কাঁচামাল আমদানি কমার প্রবণতা অব্যাহত থাকলে শিল্প খাতে উৎপাদন কমতে থাকবে। আর ধারাবাহিকভাবে এই প্রবণতা কর্মসংস্থান ও জিডিপির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।”

আহসান মনসুরও বলেন, “শিল্পের কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে সব কিছুর আমদানি কমছে। এতে শিল্প উৎপাদন কম হবে। কর্মসংস্থান হবে না। সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। জিডিপি প্রবৃদ্ধি কম হবে।”

আমদানিনির্ভর শিল্পে নেতিবাচক প্রভাব এরই মধ্যে পড়েছে। এসব পণ্যের দাম বাড়ার পাশাপাশি এসব শিল্পে এখন কাঁচামাল সংকটে পণ্যের উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অনেক শিল্প কাঁচামাল সংকটে বন্ধের উপক্রম হয়েছে। বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শিল্পগুলো নিজেরা কাঁচামাল আমদানি করতে পারে না। তারা পাইকারি বাজার থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে উৎপাদন করে। এখাতের চাহিদার জোগান দিতে বাণিজ্যিক আমদানিকারকরা শিল্পের কাঁচামাল আমদানি করে। কিন্তু ডলার সংকটে এ খাতের আমদানি গত দুই বছর ধরে কমছে। এতে এসব শিল্প বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।

অনেক প্রতিষ্ঠান শিল্পের মধ্যবর্তী কাঁচামাল আমদানি করে সেগুলো দিয়ে ফিনিশড পণ্য উৎপাদন করে বাজারজাত করে। এ খাতের কাঁচামাল আমদানিও কমেছে।

চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে শিল্পের মধ্যবর্তী কাঁচামালের এলসি খোলা কমেছে ২৫ শতাংশ ও আমদানি কমেছে ১৬ শতাংশ।

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) সৈয়দ মাহবুবুর রহমান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ডলার সংকট আগের চেয়ে কিছুটা কমেছে। তবে সংকট এখনও চলমান। আমরা চাইলেও গ্রাহকের চাহিদামতো ঋণপত্র খুলতে পারছি না।”

চালু শিল্পের পাশাপাশি নতুন শিল্প স্থাপনেও মন্দা দেখা দিয়েছে। বৈশ্বিক মন্দা ও ডলার সংকটের কারণে অনেক উদ্যোক্তা হাত গুটিয়ে বসে আছেন। তারা নতুন বিনিয়োগে হাত দিচ্ছেন না।

এতে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহের প্রবৃদ্ধি কমে গেছে; ডিসেম্বরে এই প্রবৃদ্ধি ১০ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

অর্থনৈতিক মন্দায় মানুষের আয় কমায় এবং ডলারের দাম বাড়ায় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব মানুষের ক্রয় ক্ষমতার ওপরেও দেখা যাচ্ছে। মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের কোঠার কাছাকাছি যাওয়ায় মানুষ কেনাকাটায় কাটছাঁট করেছে। যার ফলে পণ্যের বিক্রিও কমছে। তার প্রভাবে উৎপাদনও কমছে।

সামনে কী

২০২২ সালে ডলার সংকট দেখা দিলে দাম বেঁধে দিয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। তাতে সংকট আরও বেড়ে যায়। পরে দাম নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয় ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) ও বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলারস অ্যাসোসিয়েশনকে (বাফেদা)।

এর পর থেকে এই দুই সংগঠন মিলে রপ্তানি ও প্রবাসী আয় এবং আমদানি দায় পরিশোধের ক্ষেত্রে ডলারের দাম নির্ধারণ করে আসছে। মূলত বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্ত কার্যকর করছে এই দুই সংগঠন।

তবে এবিবি ও বাফেদার সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রেই মানেনি ব্যাংকগুলো। অনেক ব্যাংক এই দুই সংগঠনের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়েও বেশি দামে রেমিটেন্স সংগ্রহ করেছে। এজন্য কয়েক দফায় কয়েকটি ব্যাংককে সতর্ক করার পাশাপাশি জরিমানাও করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

অর্থনীতি গবেষক আহসান এইচ মনসুর বলেন, “রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব সব দেশেই পড়েছে। সব দেশেই ডলারের দর বেড়েছে; মূল্যস্ফীতি বেড়েছিল। সামাল দিয়ে তারা কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সব দেশেই মূল্যস্ফীতি কমে সহনীয় পর্যায়ে নেমে এসেছে। শ্রীলঙ্কায় মূল্যস্ফীতি ৭০ শতাংশে উঠে গিয়েছিল; এখন ৪ শতাংশে নামিয়ে এনেছে তারা।

“কিন্তু আমাদের মূল্যস্ফীতি কমছে না। ডলার সংকট কাটছে না। রিজার্ভ কমছেই। তাহলে প্রশ্ন জাগে, সব দেশ পারলে আমরা পারছি না কেন? আমাদের গলদ কোথায়?”

দীর্ঘদিন ডলারের দর ধরে রাখাটা ভুল ছিল বলে তার মূল্যায়ন।

“আরেকটি ভুল হল, মূল্যস্ফীিত বেড়ে যাওয়ার পরও আমরা ৯ শতাংশ সুদ হার দীর্ঘদিন ধরে রেখেছিলাম। এখন অবশ্য সুদের হার বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এই দুই ভুলের মাশুলই আমাদের এখন দিতে হচ্ছে।”

আহসান মনসুর বলেন, “তবে আমি মনে করি, বর্তমান এই সংকটের সময়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির দিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরা এবং ডলারের বাজারকে সুস্থির করার দিকেই সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিৎ।

“এই সংকটের সময় যদি ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিও অর্জিত হয়, তাতেই আমি খুশি। এখন আমাদের যে অসুখ হয়েছে, সঠিক চিকিৎসা করে ঠিকমত ওষুধ দিয়ে আগে সুস্থ করতে হবে। তার পর জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানোর দিকে তাকাতে হবে।”

মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, “সুখবর হচ্ছে, রেমিটেন্সের পাশপাশি রপ্তানি আয়ও বাড়ছে। মনে হচ্ছে সংকট কেটে যাবে। স্বস্তি ফিরে আসবে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist