Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

তেজ কমছে ডলারের, বাড়ছে টাকার মান

মার্কিন ডলার।
মার্কিন ডলার।

গত দুই বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঁচ ফেলতে থাকা ডলার তেজ হারাতে শুরু করেছে। তাতে মান বাড়ছে টাকার।

কয়েক দিন আগে যেখানে ১২৪ টাকা পর্যন্ত দরে রেমিটেন্সের ডলার কিনছিল ব্যাংকগুলো; এখন তা ১১৪ টাকায় কিনছে।

বুধবার আমদানি বিল নিষ্পত্তিতে ডলারের দাম নেওয়া হয়েছে ১১৮ থেকে ১১৯ টাকা, যা দুই সপ্তাহ আগেও ছিল ১২২ থেকে ১২৪ টাকা।

খোলা বাজার বা কার্ব মার্কেটেও ডলারের দরে বড় পতন হয়েছে। বুধবার প্রতি ডলার ১১৮ টাকা ৪০ পয়সায় বিক্রি হয়েছে। মাস খানেক আগেও তা ১২৬/১২৭ টাকায় বিক্রি হতো।

আমদানি ব্যয় কমায় এবং রপ্তানি আয় ও রেমিটেন্স বাড়ায় বাজারে ডলারের সরবরাহ বেড়েছে বলেই দাম পড়ছে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন। এই ধারা চললে ডলারের অস্থির বাজার সুস্থির হবে বলে আশা করছেন তিনি।

২০২২ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রায় এক দশক দেশে মুদ্রার বিনিময় দর একটি স্থিতিশীল অবস্থানে ছিল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো যার সুবিধা পেয়েছে। এর ইতিবাচক প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতিতেও পড়েছে।

কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্ব বাজারে পণ্য ও কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় মার্কিন ডলারের বিপরীতে দ্রুত টাকার অবমূল্যায়ন ঘটতে থাকে। ফলে মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই প্রতি ডলারের দাম ৮৫/৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ১০০ টাকা ছাড়িয়ে যায়।

রপ্তানিকারক, আমদানিকারক এবং রেমিটেন্স প্রেরকদের মতো বিভিন্ন খাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একাধিক বিনিময় হার বাস্তবায়ন সত্ত্বেও ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন অব্যাহত থাকে।

২০২৩ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশের মুদ্রাবাজারের বিনিময় দরে নজিরবিহীন অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। তবে ৭ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের পর বাজার কিছুটা সুস্থির হলেও সার্বিকভাবে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় অনেক ব্যাংকই আর চড়া দামে ডলার কিনছে না।

বিপরীতে দাম আরও বাড়বে আশায় যারা ধরে রেখেছিলেন, তারা ডলার বাজারে ছাড়তে শুরু করায় সরবরাহ বেড়ে গেছে।

মানি এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এস এম জামান বলেন, “চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি হলে স্বাভাবিক নিয়মে যে কোনো জিনিসের দাম কমে যায়। বেশ কিছুদিন ধরে খোলাবাজারেও ডলারের চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি বলে মনে হচ্ছে। সে কারণেই দাম কমে গেছে।”

বিদেশি মুদ্রা লেনদেনকারী ব্যাংকগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের (বাফেদা) চেয়ারম্যান ও সোনালী ব্যাংকের ব্যস্থাপনা পরিচালক আফজাল করিম বলেন, “অনেকেরই ধারণা ছিল ডলারের দাম আরও বাড়বে; কিন্তু আমরা বলেছিলাম দাম বাড়ার কোনো কারণ নেই। তার প্রতিফলন আমরা ইতোমধ্যে দেখতে পাচ্ছি।

“আমাদের চাহিদা-জোগানের গ্যাপ কমে আসার কারণে ইনফরমাল মার্কেটেও ডলারের রেট কমে এসেছে। আশা করছি সামনে আরও কমবে।”

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত ২০ ফেব্রুয়ারি দিনের শুরুতে ব্যাংকগুলোতে ডলারসহ অন্যান্য বৈদেশিক মুদ্রার নিট অবস্থান ছিল ৩১ কোটি ২০ লাখ ডলার। সেটা বুধবার বেড়ে ৭৫ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মেজবাউল হক বলেন, “ডলার সংকট কাটাতে বিভিন্ন সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেগুলোরই একটা প্রভাব এখন বাজারে পড়ছে। ব্যাংকগুলোতে সরবরাহ বাড়ায় দামও কমছে।”

ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “গত কয়েক মাস টানা বাড়ছে প্রবাসী আয়। রপ্তানি আয়ে ভালো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অন্যদিকে আমদানি ব্যয়ও কমে গেছে। এর প্রভাবে চলতি হিসাবেও উদ্বৃত্তাবস্থা বজায় রয়েছে। ব্যাংকগুলো এখন এলসি খুলতে আগ্রহ দেখাচ্ছে।”

দেশে গত পাঁচ মাসে (অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি) গড়ে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিটেন্স এসেছে। রোজা ও ঈদকে সামনে রেখে রেমিটেন্স আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত টানা তিন মাস ৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি রপ্তানি আয় দেশে এসেছে। এ সব মিলিয়ে রিজার্ভ পতনের ধারাও ঠেকানো গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু পদক্ষেপও মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা দূর করতে ভূমিকা রেখেছে। সম্প্রতি মুদ্রা অদলবদল বা সোয়াপ ব্যবস্থা চালু করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর মাধ্যমে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ডলারের সঙ্গে টাকার অদলবদল করতে পারছে।

বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ পুনর্গঠন এবং স্থানীয় মুদ্রার ওপর তারল্যের চাপ কমানো- মূলত এই দুই উদ্দেশ্যে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়।

একে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বলে মনে করেন জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, “তবে এটাও মনে রাখতে হবে, ডলারের বাজার অস্থির হওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু ভুলও ছিল। সংকটের মধ্যে দাম নির্ধারণের যেসব নীতিগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল, তা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছিল।”

“বর্তমান ধারা ধরে রাখতে পারলে দুই বছর ধরে চলা ডলারের অস্থির বাজারে স্বস্তি ফিরে আসবে, যার ইতিবাচক ধারা অর্থনীতিতেও পড়বে,” বলেন তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist