Beta
সোমবার, ৪ মার্চ, ২০২৪

পৃথিবীর ‘বারোটা বাজতে’ বাকি ৯০ সেকেন্ড

ছবি : বিবিসি

সমগ্র পৃথিবী কিংবা মানবজগত ধ্বংস হতে বাকি আর মাত্র ৯০ সেকেন্ড। এমনই তথ্য জানিয়েছেন পরমাণু বিজ্ঞানীরা। তবে তাদের গণনার এই ৯০ সেকেন্ড তথা দেড় মিনিট কিন্তু আমাদের সাধারণ ঘড়ির সময় নয়। বিজ্ঞানীরা এই সময় গণনা করেছেন প্রতীকী ‘ডুমসডে ঘড়ি’তে।

পৃথিবীর শেষ দিনের প্রতীক ধরা হয় ‘ডুমসডে ঘড়ি’কে। তবে এই ঘড়ির কাঁটা সবসময় স্থিরই থাকে। নির্দিষ্ট সময় পরপর ঘড়ির কাঁটা ঠিক কতটা পরিমাণে ঘুরবে তা ঠিক করে দেন পরমাণু বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীতে ঘনিয়ে আসা মানবসৃষ্ট বিপর্যয়, যুদ্ধ-বিগ্রহ, পারমাণবিক বোমা, অস্ত্রশস্ত্র ইত্যাদি বিবেচনা করে এর সময় নির্ধারণ করা হয়। ঘড়িতে যখন ঠিক রাত ১২টা বাজবে তখনই পৃথিবীতে ভয়ানক বিপর্যয় নেমে আসবে বলে মনে করা হয়। সেই বিপর্যয়ে ধ্বংস হবে সমগ্র পৃথিবী ও মানবজাতি।

২০২৪ সালের ২৩ জানুয়ারি ঘড়িটিতে সময় দেখাচ্ছে ১১টা বেজে ৫৮ মিনিট ৩০ সেকেন্ড। অর্থাৎ, ১২টা বাজতে আর মাত্র দেড় মিনিট বাকি। মঙ্গলবার ঘড়ির এই সময় জানিয়েছে ‘বুলেটিন অব অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’ নামের একটি সংস্থা। প্রতি বছরই সংস্থাটি ‘ডুমসডে ঘড়ি’র কাঁটা ঠিক কোথায় আছে তা বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেয়।

কীভাবে এলো ডুমসডে ঘড়ি

১৯৪৭ সাল থেকে পৃথিবী ধ্বংসের প্রতীকী ঘড়ি হিসেবে ‘ডুমসডে ঘড়ি’র গণনা শুরু হয়। পারমাণবিক বোমা আবিষ্কার থেকেই সূত্রপাত এই ঘড়ির।

সময় তখন ১৯৩৯ সাল। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন ও লিও সিলার্ড পারমাণবিক প্রযুক্তির অগ্রগতি ও নতুন আবিষ্কৃত এই বোমার শক্তি সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্টে একটি চিঠি লেখেন। এই চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৪২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন একটি বৈজ্ঞানিক ও সামরিক প্রকল্প হাতে নেয়, যার নাম দেওয়া হয় ‘ম্যানহাটান প্রজেক্ট’। পরবর্তী কয়েক বছরে এই প্রকল্পের কল্যাণে তৈরি হয় ভয়ানক শক্তিশালী এক বোমা। বোমাটি সে সময়ে পুরো একটি শহর ধ্বংসে সক্ষম ছিল। তার কিছু বছরের মধ্যে পুরো সভ্যতাকে ধ্বংস করতে সক্ষম এমন পারমাণবিক অস্ত্রাগারও তৈরি হয়। ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর হাতিয়ার আবিষ্কার করা বিজ্ঞানীরাই প্রথম এর সম্ভাব্য পরিণতি আন্দাজ করেন। ‘ম্যানহাটান প্রজেক্টে’র বিজ্ঞানীরা প্রকল্পটির রাজনীতিকরণ দেখে অনেকটা ভয়ও পেয়ে যান।

এমন পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিরাপদকরণে সংগঠিত হতে শুরু করেন পরমাণু বিজ্ঞানীরা। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৫ সালে বিপজ্জনক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিষয়ক সতর্কতা প্রতিবেদন পেশ করা হয় যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন প্রশাসনে। বিজ্ঞানীরা জাপানে পারমাণবিক হামলা না চালানোর অনুরোধও করেন। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন কোনোকিছু আমলে না নিয়ে জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে নিক্ষেপ করে পারমাণবিক বোমা।

হামলা চালানোর ঠিক চার মাস পর বিজ্ঞানীরা একটি বুলেটিন প্রকাশ করা শুরু করে। তারা এর নাম দেন ‘বুলেটিন অব অ্যাটমিক সায়েন্টিস্টস’। পারমাণবিক প্রযুক্তির ভয়াবহতা সম্পর্কে সবাইকে সচেতন করাই ছিল এর লক্ষ্য।

১৯৪৭ সাল থেকে ম্যাগাজিন আকারে এই বুলেটিনের প্রকাশ শুরু হয়, যার প্রথম প্রচ্ছদে ছিল ‘ডুমসডে ঘড়ি’।

কোন বছর কোথায় ছিল ডুমসডে ঘড়ির কাঁটা

১৯৪৭ সালে প্রথম যখন ‘ডুমসডে ঘড়ি’ সবার সামনে আসে তখন ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছিল ১১ টা বেজে ৫৩ মিনিট। অর্থাৎ, মধ্যরাত হতে বাকি ছিল মাত্র সাত মিনিট। দুই বছর পরে সোভিয়েতে প্রথমবারের মতো পরমাণু বোমার পরীক্ষা হয়। এতে ১৯৪৯ সালে ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে যায় আরও চার মিনিট। ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষার কারণে সময় আগায় আরও এক মিনিট।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তীকালে ১৯৪০ এর দশকের শেষদিক হতে ৯০ দশকের শুরু পর্যন্ত স্নায়ুযুদ্ধ চলমান ছিল। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের নিজ নিজ মিত্রদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সন্দেহ, অবিশ্বাস ও ঘৃণা থেকে সে সময় চলছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রচারণামূলক দ্বন্দ্ব। পরবর্তী সময়ে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির মাধ্যমে দীর্ঘদিনের এই দ্বন্দ্বের অবসান ঘটে। এর প্রভাবে ‘ডুমসডে ঘড়ির’ সময়ও পিছিয়ে যায় ১৫ মিনিট। ঘড়িতে সে বছর সময় দেখায় ১১টা বেজে ৪৩ মিনিট। অর্থাৎ, মধ্যরাত হতে বাকি ছিল আরও ১৭ মিনিট।

১৯৯৮ সালে ভারত ও পাকিস্তানে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা শুরু হলে ঘড়ির কাঁটা ৮ মিনিট এগিয়ে যায়। মধ্যরাত হতে তখন বাকি ছিল ৯ মিনিট। ২০০৭ সালে উত্তর কোরিয়ার পরমাণু পরীক্ষা পরিচালনার প্রভাবে সময় এগোয় আরও চার মিনিট। পরে ২০১৫ সালে জলবায়ু পরিবর্তন ও পরমাণু উদ্বেগের কারণে সময় দুই মিনিট বাড়ানো হয়। তখন মধ্যরাত হতে সময় বাকি ছিল তিন মিনিট।

২০২৩ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ, জীব বৈচিত্র্য ও জলবায়ু নিয়ে উদ্বেগের কারণে সময় কমে আরও দেড় মিনিট। অর্থাৎ, গতবছর পৃথিবী কিংবা মানবজাতি ধ্বংসের আর বাকি ছিল মাত্র ৯০ সেকেন্ড। গত বছরের উদ্বেগের সঙ্গে এ বছর নতুন করে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ঝুঁকি। তবে নতুন ঝুঁকি যুক্ত হওয়ার পরেও ২০২৪ সালে ঘড়ির কাঁটার অবস্থানে কোনও নড়চড় হয়নি।

সূত্র: বিবিসি ও আলজাজিরা

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist