Beta
শনিবার, ২ মার্চ, ২০২৪

নম্বর নিয়ে বিতর্কিত নাদির জুনাইদ ‘যৌন নিপীড়নে’ও

অধ্যাপক নাদির জুনাইদের শাস্তি চেয়ে কর্মসূচিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা।

নম্বর কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগের মধ্যে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের মুখে পড়লেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক নাদির জুনাইদ।

এক সঙ্গে দুই অভিযোগের বিষয়ে এই শিক্ষক দাবি করছেন, বিভাগীয় চেয়ারম্যানের পদে তার বসা আটকাতেই তাকে হেনস্থা করা হচ্ছে।

গত ৭ ফেব্রুয়ারি ব্যক্তিগত আক্রোশ ও উদ্দেশ্যমূলকভাবে একই বিভাগের মাস্টার্স চূড়ান্ত পরীক্ষায় নম্বর কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠে এই অধ্যাপকের বিরুদ্ধে।

তা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে গত শনিবার তার বিরুদ্ধে যৌন ও মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ করেন একই বিভাগের এক শিক্ষার্থী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. মাকসুদুর রহমানের কাছে চার পাতার লিখিত অভিযোগ দেন ওই শিক্ষার্থী। অভিযোগের সঙ্গে কিছু অডিও রেকর্ড ও মেসেজের স্ক্রিনশটও জমা দেন তিনি।

লিখিত অভিযোগে কী আছে

ওই নারী শিক্ষার্থীর অভিযোগ, ২০২২ সালে কোভিডকালীন বিধিনিষেধ ওঠার পর সশরীরে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু হলে অধ্যাপক নাদির জুনাইদ তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হতে বিভিন্নভাবে চেষ্টা চালান এবং তার সঙ্গে ‘বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক’ গড়ার প্রস্তাব দেন।

এরপর পড়াশোনা সম্পর্কিত কথা বলার ছলে ব্যক্তিগত বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে ফোন করতেন বলে তার অভিযোগ।

ওই শিক্ষার্থী বলছেন, মেসেঞ্জারে ও সাক্ষাতে যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ কথাবার্তা বলার চেষ্টা করেন শিক্ষক নাদির। পরের দিকে অশোভন নানা ইঙ্গিতও দেন।

ওই শিক্ষার্থী লিখেছেন, তিনি রোমান্টিক আলাপ-আলোচনা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু অধ্যাপক নাদির বিভাগে ক্ষমতাধর হওয়ায় ভয়ে তিনি পুরোপুরি যোগাযোগ বন্ধ করতে পারেননি।

এক পর্যায়ে যোগাযোগ বন্ধ করার চেষ্টা করলে অধ্যাপক নাদির শ্রেণিকক্ষে প্রকাশ্যে তাকে তিরস্কার করেন বলেও অভিযোগ করা হয়।

ওই শিক্ষার্থীর দাবি, অনেক বলার পর তিনি নাদির জুনাইদের জন্মদিনে তার বাসায় গিয়ে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছিলেন।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ওই শিক্ষকের কাছাকাছি আসার চেষ্টার অভিযোগও তুলে ধরেছেন প্রক্টরের কাছে জমা দেওয়া আবেদনে।

নাদির জুনাইদ তাকে বিয়ের প্রস্তাবও দেন বলে অভিযোগ করেছেন ওই শিক্ষার্থী।

২০২৩ সালের ঘটনাগুলো নিয়ে এতদিন পর অভিযোগ তোলার ব্যাখ্যায় ওই শিক্ষার্থী সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ডিপার্টমেন্টে খুবই প্রভাবশালী শিক্ষক। আমার ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যেত, ভয়ে আমি এতদিন কিছু বলতে পারিনি। অনেকবার ভেবেছি, আমি উনাকে এড়িয়ে চলে নিজেকে সেভ করতে পারব। কিন্তু দিনদিন সহ্যের সীমা পেরিয়ে যাচ্ছিল। আমার একসময় মনে হতো, যে আমি সুইসাইড করব।

“এখন যেহেতু এখান থেকে আমি আর মাস্টার্স করব না, তাই এই বিষয়টি সামনে আনার সাহস পেয়েছি। একইসাথে আমি চেয়েছি আমার ডিপার্টমেন্টের আর কাউকে যেন এটি ফেইস করতে না হয়। তাছাড়া এখন আরও অনেকেই উনার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলেছেন, সেটি আমাকে শক্তি জুগিয়েছে।”

শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা করবেন কি না- এ প্রশ্নের উত্তরে ওই শিক্ষার্থী বলেন, “আগে আমার বিশ্ববিদ্যালয় কি স্টেপ নেয়, সেটা দেখব। তাছাড়া আমার ডিপার্টমেন্টের সবাই আমার পাশে রয়েছেন। সবাই মিলে যেটা করা উচিৎ, সেই সিদ্ধান্তে আমি অটল থাকব।”

যা বলছেন নাদির জুনাইদ

অধ্যাপক নাদির জুনাইদ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, গত ২৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে তার বিরুদ্ধে এবারই এমন অভিযোগ আসা উদ্দেশ্যমূলক।

“আগামী জুনে বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পাওয়ার কথা রয়েছে। সেজন্যই আমার বিরুদ্ধে লাগাতার সব অভিযোগ করে আমাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে। আমি যেন চেয়ারম্যান হতে না পারি। আসলে এই পদটা তো একটি লোভনীয় পদ। আমি সেই দায়িত্ব যেন না পাই, তাই আমাকে নানাভাবে কোণঠাসা করা হচ্ছে।”

অভিযোগ দেওয়া হতে পারে, এমনটা আঁচ করে শুক্রবারই শাহবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করেন বলে জানান নাদির জুনাইদ।

“তবে অভিযোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যেভাবে গণমাধ্যমে নিউজ করা হচ্ছে, তাতে আমি মিডিয়া ট্রায়ালের শিকার হচ্ছি। সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছি। দু-এক বছর পরে হয়ত এ অভিযোগ অসত্য প্রমাণিত হবে, তখন আমার এই ক্ষতি কে পূরণ করবে?”

শাহবাগ থানার ওসি মোস্তাফিজুর রহমান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, বিভাগের শিক্ষার্থীদের নম্বর কম দেওয়ার অভিযোগকে ‘বানোয়াট ও ষড়যন্ত্র’ বর্ণনা করে ওই অধ্যাপক একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। তাতে তিনি আরও গভীর চক্রান্তের আশঙ্কার কথাও বলেন।

নাদির জুনাইদ বলেন, “চার দিন আগেই আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ আসল যে আমি পরীক্ষার নম্বর কমিয়ে দিয়েছি। সেটি নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছে, সেটির কার্যপ্রক্রিয়া চলমান। এরই মধ্যে নতুন আরেক অভিযোগ। এগুলো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার অংশ।

“ভাইভা নিয়েছে চারজন, খাতা দেখেছে দুইজন। সবাই মিলে নম্বর দিবে। কিন্তু আমার বিরুদ্ধে একা অভিযোগ। আমি একা নম্বর কমিয়েছি। আমি একা কমাই কী করে? আমি তো একা খাতা দেখিনি।”

নম্বর কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ

এই অধ্যাপকের কারণে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের দ্বাদশ ব্যাচের ফলাফলে ভয়াবহ ধস নেমেছে বলে অভিযোগ করা হয় গত বুধবার ৭ ফেব্রুয়ারি।

এর আগের দিন মঙ্গলবার ওই ব্যাচের (২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষ) স্নাতকোত্তরের চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশিত হয়।

পরীক্ষায় ৫৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ২৮ জন বুধবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামালের বাসভবনে গিয়ে তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।

তাতে বলা হয়, স্নাতকোত্তর দ্বিতীয় সেমিস্টারের কোর্সের সমন্বয়ক ছিলেন অধ্যাপক নাদির জুনাইদ। ফলে তিনি স্নাতকোত্তর পরীক্ষা কমিটির চেয়ারম্যান ও সমন্বিত কোর্সের (এমসিজে-৫২৭) প্রথম পরীক্ষক ছিলেন। একইসঙ্গে ওই কোর্সের ভাইভা বোর্ডেও ছিলেন তিনি।

স্নাতক পর্যায়ের ফলাফলে প্রথম ১০ জনের (যারা ভালো ফলের জন্য অধ্যাপক সিতারা পারভীন পুরস্কার লাভ করেছেন) মধ্যে ছয়জন স্নাতকোত্তরে ভর্তি হয়েছিলেন। তাদের মধ্যে মাত্র একজন ২.৭৫ গ্রেড পয়েন্ট পেয়েছেন। অন্যরা পেয়েছেন ২.৫০-এরও নিচে।

অভিযোগে বলা হয়, “সমন্বিত কোর্সে এমন ফল বিপর্যয় এর আগে কখনও দেখা যায়নি। এই ফল আমাদের সবাইকে হতবাক করেছে। স্বয়ং বিভাগের শিক্ষকরাও একে ‘নজিরবিহীন’ বলছেন।”

শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নাদির জুনাইদ শিক্ষক ফল প্রকাশের আগেই অন্য ব্যাচের ক্লাসে এই ব্যাচের শিক্ষার্থীদের ‘খারাপ ফলাফল’ নিয়ে মন্তব্য করেন। তাছাড়া মৌখিক পরীক্ষায় অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্ন করে পরীক্ষার্থীদের ভীতসন্ত্রস্ত করে তুলেছিলেন।

বিচারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন

গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষার্থীরা যৌন হয়রানির বিচার চেয়ে ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন করেছেন। রবিবার সকাল ১১টা থেকে বিভাগের চেয়ারপারসন অধ্যাপক আবুল মনসুর আহাম্মদের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেন।

শিক্ষার্থীরা বলেন, অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার না হওয়া পর্যন্ত তারা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম বর্জন করে যাবেন।

বিক্ষোভ থেকে শিক্ষার্থীরা তিন দফা দাবি জানান। এগুলো হলো- অধ্যাপক নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে আনা যৌন নিপীড়নের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন; যৌন নিপীড়ককে দ্রুততম সময়ের মধ্যে শাস্তির আওতায় আনা; তদন্ত চলাকালে বা অভিযোগ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম থেকে ওই শিক্ষককে বিরত রাখা।

আগের দিন সন্ধ্যায় ‍টিএসসিতে এক মানববন্ধনে নাদির জুনাইদের বিরুদ্ধে আসা যৌন হয়রানির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে বিচারের দাবি জানিয়ে মানববন্ধন হয়।

কী পদক্ষেপ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের

যৌন নিপীড়নের অভিযোগ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. মাকসুদুর রহমান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “গতকাল দুপুরে প্রথম আমি অভিযোগটি পাই। আমাদের উপচার্য স্যার ঢাকায় ছিলেন না। আজকে সকালে অভিযোগকারী ওই শিক্ষার্থী সাথে তিনজন বান্ধবীসহ উপাচার্য মহোদয়ের কাছে অভিযোগ নামা জানিয়ে গিয়েছেন।”

এনিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কি না- জানতে চাইলে তিনি বলেন, “এখনও তা করা হয়নি। তবে উপচার্য মহোদয় অভিযোগকারী শিক্ষার্থী ও ক্যাম্পাসে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেছেন যে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”

নম্বর নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে প্রক্টর বলেন, “সেটা পেয়েছি। আমাদের প্রো- উপাচার্য (শিক্ষা) বিষয়টি খতিয়ে দেখছেন।”

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ এস এম মাকসুদ কামাল রোববার সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমি অভিযোগ পেয়েছি। সংশ্লিষ্ট সবার সাথে কথা বলে দ্রুত ব্যবস্থা নিব। একটা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তো যাওয়া লাগবে। ন্যূনতম সময় সেখানে লাগবেই।

“অভিযোগের বিষয়ে সিন্ডিকেট সভায় সিদ্ধান্ত হবে। তার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষের সঙ্গে আলাপ করে প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। সেই প্রক্রিয়ায় যেতে পর্যালোচনার মধ্যে রয়েছি আমরা।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist