Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪

বিষণ্নতার জন্য নিচ্ছেন মাস্ক, কী এই কেটামিন    

বিষণ্নতা সারাতে কেটামিন গ্রহণ করছেন ইলন মাস্ক। ছবি: গেটি ইমেজেস
বিষণ্নতা সারাতে কেটামিন গ্রহণ করছেন ইলন মাস্ক। ছবি: গেটি ইমেজেস
Picture of সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

আজকের যুগের যান্ত্রিক সমাজে কম-বেশি অনেকে বিষণ্নতা, উদ্বেগসহ মানসিক নানা সমস্যায় ভুগছেন। কেউ প্রতিকারের জন্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। আবার অনেকে জানেনই না, দিনের পর দিন বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভোগা এক ধরনের মানসিক অসুস্থতা। এই না জানার জন্য তাদেরকে কখনও কখনও চড়া মাশুল গুণতে হয়।   

এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, বিষণ্নতা, উদ্বেগ এসব মানসিক রোগ কাদের দেহে বাসা বাঁধে? তাহলে এক কথায় বলা মুশকিল।

বিষণ্নতা বা উদ্বেগ আসলে কাদের রেহাই দেয়, প্রশ্নটা এমন হলে বরং যথার্থ হয়। ধনী থেকে গরিব, ছয় ডিজিটের মাইনে পাওয়া কেতাদুরস্ত ব্যক্তি থেকে বেকার যুবক, স্বামী/স্ত্রী-সন্তান নিয়ে ‘সুখী’ জীবনযাপন করা ব্যক্তি থেকে নিঃসঙ্গ মানুষ-এমন অনেকে জীবনের কোনও না কোনও সময়ে বিষণ্নতা বা উদ্বেগের শিকার হন।

মানসিক রোগ বিষণ্নতা বা উদ্বেগের ব্যাপ্তি এতটাই বিস্তৃত যে তা ইলন মাস্ককেও ছুঁয়ে ফেলেছে। হ্যাঁ, বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তি ইলন মাস্কের কথা হচ্ছে। আর দশটা সাধারণ মানুষের মতো তিনিও বিষণ্নতায় ভুগছেন। এজন্য তাকে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। নিয়ম করে ওষুধ খেতে হয়।

মাস্ক মনে করেন, তার এই বিষণ্নতার রোগ জেনেটিক অর্থাৎ বংশগত।

বিষণ্নতা কাটাতে মাস্ক যে ওষুধ খাচ্ছেন, তার নাম কেটামিন। এ তথ্য সম্প্রতি নিজের সোশাল মিডিয়া এক্সে অকপটেই জানিয়েছেন মাস্ক। কেটামিন একসময় হাসপাতালে চেতনানাশক হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এখন বিষণ্নতা, উদ্বেগের মতো মানসিক রোগ সারাতে এটি সেবনের অনুমোদন দিয়েছেন চিকিৎসকরা।           

মাস্ক জানিয়েছেন, কেটামিন তিনি পরিমাণ মতোই গ্রহণ করেন। কারণ পরিমাণের বাইরে খেলে যে কাজের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে, তা তার অজানা নয়।

মাস্ক বলেছেন, “কেটামিন বেশি গ্রহণ করলে কাজকর্ম ঠিকঠাক করা কঠিন। আমাকে প্রচুর কাজ করতে হয়। দিনে ১৬ ঘণ্টা। এই দীর্ঘসময়জুড়ে কর্মক্ষম থাকতে আমার মানসিক স্থিরতা দরকার। কাজ করতে সমস্যা হবে, এমন কোনও পরিস্থিতি তৈরির সুযোগ আমার নেই।”

বিষণ্নতার ওষুধ কেটামিন তার প্রতিষ্ঠানের কাজে বা সরকারি যোগাযোগে বা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্কে কোনও ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলে না বলেও মনে করেন মাস্ক।

তিনি বলেন, “ওয়াল স্ট্রিট কাজের বাস্তবায়নকেই গুরুত্ব দেয়, অন্য কিছুকে নয়। বিনিয়োগকারীরা লাভ পাচ্ছেন কি না, এটাই মূল বিষয়। টেসলার বাজার মূলধন পুরো গাড়ি শিল্পের বাজার মূলধনের সমান। আমি যাতে কেটামিন গ্রহণ অব্যাহত রাখি, বিনিয়োগকারীদের এমনটাই চাওয়া উচিৎ।”

টেসলার নেতৃত্ব দিতে কেটামিন সহায়তা করছে বলে মনে করেন ইলন মাস্ক। ছবি: গেটি ইমেজেস

বিষণ্নতার ওষুধ হিসেবে কেটামিনের ব্যবহার নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় মাস্কের ওই পোস্টের পর এ বিষয়ে তার সাক্ষাৎকার নেন সিএনএনের সাংবাদিক ডন লেমন।

টেসলার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাস্ক কেটামিন সেবন সম্পর্কে ওই সাংবাদিককে বলেন, “আমার মস্তিস্ক কোনও কোনও সময় এক ধরনের নেতিবাচক রাসায়নিক অবস্থার মধ্যে পড়ে। এটা বিষণ্নতা বলে আমি মনে করি। নেতিবাচক এই মানসিক ব্যবস্থা থেকে বের হতে কেটামিন আমাকে সহায়তা করে।”

কী পরিমাণ কেটামিন সেবন করা হয়- লেমনের এই প্রশ্নের জবাবে মাস্ক বলেন, “দুই সপ্তাহে একবার অল্প পরিমাণে কেটামিন গ্রহণ করা হয়। একজন ‘সত্যিকারের চিকিৎসক’ আমাকে এটি নিতে বলেছেন।”  

গভীর রাতে বা কখনও কখনও খুব ভোরে তার মন ‘প্রায় সময়ই’ প্রশান্ত থাকে, এ কথাও সিএনএনের সাংবাদিককে জানান টেসলার সিইও মাস্ক। 

ধনকুবের ইলন মাস্ক যে বিষণ্নতার চিকিৎসায় কেটামিন সেবন করছেন, তা কয়েক সপ্তাহ আগে খবরের শিরোনাম হয়।

মাস্কের কেটামিন গ্রহণ এমন কোনও অস্বাভাবিক ব্যাপার না হলেও ওই খবর প্রকাশের পর এ নিয়ে চিন্তিত তার নিজের প্রতিষ্ঠান টেসলা ও স্পেসএক্সের পরিচালনা পর্ষদের বেশ কয়েকজন সদস্য।

কেটামিন প্রতিষ্ঠানের কাজে বা বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে না এমনটা মাস্ক মনে করলেও এ নিয়ে দুশ্চিন্তামুক্ত নন তারা।

টেসলা ও স্পেসএক্সের পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের ধারণা, মাস্কের কেটামিন সেবন তার শরীরের ওপর গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি তার বিশাল ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যও এর প্রভাব থেকে মুক্ত নাও হতে পারে।

অবশ্য পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদের এই উদ্বেগকে আমলে নিচ্ছেন না মাস্ক। তিনি বলেছেন, কেটামিন তাকে তার প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব দিতে সাহায্য করে।

মাস্কের এই বক্তব্যের পক্ষে সায় দিয়ে তার আইনজীবী অ্যালেক্স স্পাইরো জানিয়েছেন, স্পেসএক্সে নিয়মিত মাস্কের মাদক পরীক্ষা করা হয়। কখনও তার শরীরে মাদক পাওয়া যায়নি।

কেটামিন কী

গত শতাব্দীর ষাটের দশকে বেলজিয়ামে প্রথম চেতনানাশক ওষুধ হিসেবে প্রাণীদেহে কেটামিন ব্যবহার করা হয়। এরপর ১৯৭০ সালে চেতনানাশক হিসেবে মানুষের ওপর এই ওষুধ ব্যবহারের অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ)।

ভিয়েতনাম যুদ্ধে আহত সেনাদের চিকিৎসায় কেটামিন ব্যবহার করা হয়। একটা সময় পর উত্তেজিত রোগীদের ওপরও এটির প্রয়োগ শুরু হয়।

উত্তেজিত রোগী বলতে কাদের বোঝানো হচ্ছে? আত্মহননের পরিকল্পনা করা ব্যক্তি এক্ষেত্রে উদাহরণ হতে পারেন। ওই ব্যক্তির আত্মহননের সময় যদি তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, তাহলে তিনি স্বভাবতই উত্তেজিত ও ক্ষিপ্ত থাকবেন। তাকে তখন জরুরি ভিত্তিতে কেটামিন দেন চিকিৎসকরা।

সে সময়ই চিকিৎসকরা বুঝতে শুরু করেন, বিষণ্নতা ও আত্মঘাতী চিন্তা মোকাবেলায় কেটামিন বেশ কার্যকর।

এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো রাজ্যের সান্টা ফে শহরের চিকিৎসাকেন্দ্র ইনসাইট কেটামিনের প্রতিষ্ঠাতা ও জরুরি চিকিৎসক কেন স্টুয়ার্ট বলেন, “ধরেন, কেউ একটি সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে চাইলেন। সে সময় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার পথে অ্যাম্বুলেন্সেই কেটামিন দেওয়া হলো। এতে তিনি শান্ত হয়ে পড়লেন। নয় মাস পর তিনি চিকিৎসকদের জানালেন, এই নয় মাস তিনি আত্মহত্যার চিন্তা করেননি।

“এই যে কেটামিন দেওয়ার পর উত্তেজিতরা নির্লিপ্ত হয়ে পড়ছেন, এ ধরনের ঘটনা যখন বারবার ঘটতে থাকে, তখন চিকিৎসকরা উপলব্ধি করেন, কেটামিনের মধ্যে এমন কিছু আছে, যা উদ্বেগজনক মুহূর্ত দ্রুত সামাল দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।”

কেটামিন যারা গ্রহণ করেন, তাদের মস্তিষ্কে এটি এমন এক অনুভূতির জন্ম দেয়, যাকে চিকিৎসকরা ‘বিচ্ছিন্ন অনুভূতি’ বলছেন। অনেকে আবার এই অনুভূতিকে ‘ট্রিপ’-ও বলেন।

এভাবে কেটামিন একসময়ে ‘ক্লাব ড্রাগে’ পরিণত হয়। ক্লাব ড্রাগ বলতে সেসব মাদককে বোঝায় যেগুলো কিশোর ও তরুণ প্রাপ্তবয়স্করা বার, নাইটক্লাব, কনসার্ট বা পার্টিতে ইন্দ্রিয়গত উপলব্ধি বাড়াতে ও উদ্বেগ কমাতে সেবন করেন।

কেটামিনের প্রভাব সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল নিউ হ্যাভেন হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগের প্রধান জন ক্রিস্টাল বলেন, “কেটামিন বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি তৈরি করতে পারে। দেখার ও অনুভব করার বিকৃতি ঘটাতে পারে। ক্ষণস্থায়ী অস্বাভাবিক চিন্তা ও ধারণার জন্ম দিতে পারে। পাশাপাশি এটি উচ্ছ্বাস বা উদ্দীপনার অনুভূতি দেয়।”

এই অনুভূতি প্রায় দুই ঘণ্টা পর্যন্ত থাকতে পারে বলে জানান চিকিৎসকরা। তবে কেটামিন গ্রহণে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, উচ্চ রক্তচাপ, অস্বাভাবিক ধীর গতিতে শ্বাস নেওয়ার মতো গুরুতর ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেন তারা।

এছাড়া আলসার, মূত্রাশয়ে ব্যথা, কিডনিতে সমস্যা, পেটে ব্যথা, স্মৃতিশক্তি লোপ-এমন দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক সমস্যাও কেটামিনের কারণে দেখা দিতে পারে।

যারা অতিরিক্ত মদ্যপান করেন বা মদ্যপানের পর কিটামিন সেবন করেন, তাদের জন্য এটি মারাত্মক হতে পারে। এসব কারণে কেবল চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানেই কেটামিন ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়।

তথ্যসূত্র: সিএনএন, এনডিটিভি , ওয়েবএমডি

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত