Beta
রবিবার, ২১ এপ্রিল, ২০২৪

কলাম

একাত্তরে গণহত্যার প্রথম প্রতিবেদনের শ্বাসরুদ্ধকর গল্প

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধরত বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা যে জাতিগত নিধনযজ্ঞ ও মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটিয়েছে এখনও তা ‘বাংলাদেশ জেনোসাইড-১৯৭১’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায়নি।

“In the name of ‘God and a united Pakistan’ Dacca is today a crushed and frightened city. After 24 hours of ruthless, cold-blooded shelling by the Pakistan Army as many as 7,000 people are dead, large areas have been leveled and East Pakistan’s fight for independence has been brutally put to an end.”

উপরের এই সংবাদ সূচনা বা ইনট্রো একাত্তরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের বর্বর গণহত্যার প্রথম প্রতিবেদনের। যে প্রতিবেদনে ঢাকার বুকে বর্বর হানাদার বাহিনীর নৃসংশতার প্রকৃত চিত্র উঠে এসেছে। পাকিস্তানি সেনাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলেন বৃটিশ সাংবাদিক সাইমন জন ড্রিং। পকিস্তানিদের জেনোসাইডের এই চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছিল সায়মনকে। ২৭ মার্চ সকালে বাতাসে মরদেহ পোড়ার উৎকট গন্ধের ভেতরে কিভাবে ‘Tanks crush revolt in pakistan’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি তৈরি করেছিলেন সেই শ্বাসরুদ্ধকর গল্প তুলে ধরা হলো সকাল সন্ধ্যা’র পাঠকদের জন্য।

সায়মন জন ড্রিং যুদ্ধ ও সংঘাত সংক্রান্ত সাংবাদিকতায় এক সুপরিচিত নাম। ১৯৭১ সালে ছিলেন বাংলাদেশের পরম বন্ধু। বিশ্বের প্রভাবশালী বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রতিবেদক, সংবাদ উপস্থাপক ও প্রযোজক হিসেবে ৩০ বছরের বেশি সময় কাজ করেছেন। তবে তাঁর বড় পরিচয় ১৯৭১ সালে তিনি ইয়াহিয়া খানের জান্তা বাহিনীর বর্বর গণহত্যার কথা বিশ্ববাসীর কাছে প্রথম তুলে ধরেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে ক্র্যাকডাউনের পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা শহরের হত্যাকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরেছিলেন সায়মন। বৃটিশ দৈনিক ডেইলি টেলিগ্রাফের মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়েছিলেন পাকিস্তানিদের বর্বরতার কথা। যাতে জাগ্রত হয়েছিল বিশ্ব বিবেক। দ্যা টেলিগ্রাফে প্রকাশিত ‘Tanks crush revolt in pakistan’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল ইয়াহিয়া খানের গণহত্যার সার্বিক চিত্র। সায়মন ড্রিং ঢাকার পরিস্থিতির যে বর্ণনা দিয়েছিলেন তার ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল ওয়াশিংটন পোস্টও। প্রভাবশালী মার্কিন ঐ দৈনিকটি সায়মন ড্রিং এর বর্ণনা অনুযায়ী প্রকাশ করে ‘How Dacca Paid for a United Pakistan’ শিরোনামের প্রতিবেদন। মার্কিন জনমত তৈরিতে যার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী।

তবে তাঁর বড় পরিচয় ১৯৭১ সালে তিনি ইয়াহিয়া খানের জান্তা বাহিনীর বর্বর গণহত্যার কথা বিশ্ববাসীর কাছে প্রথম তুলে ধরেছিলেন। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে ক্র্যাকডাউনের পর জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ঢাকা শহরের হত্যাকাণ্ডের চিত্র তুলে ধরেছিলেন সায়মন। বৃটিশ দৈনিক ডেইলি টেলিগ্রাফের মাধ্যমে বিশ্বকে জানিয়েছিলেন পাকিস্তানিদের বর্বরতার কথা। যাতে জাগ্রত হয়েছিল বিশ্ব বিবেক। দ্যা টেলিগ্রাফে প্রকাশিত ‘Tanks crush revolt in pakistan’ প্রতিবেদনে উঠে এসেছিল ইয়াহিয়া খানের গণহত্যার সার্বিক চিত্র।

একাত্তরের ঢাকায় সায়মন ড্রিং-এর প্রতিবেদনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার আগে জানিয়ে রাখি, ২০০৯ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার সায়মন ড্রিং-কে ১৯৭১ সালে তাঁর অবদানের জন্য বিশেষ সম্মাননা জানায়। এর কিছু পর তিনি সে সময় সম্প্রচারের অপেক্ষায় থাকা ‘চ্যানেল টুয়েন্টিফোর’-এ উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করেন এবং টানা দেড় বছরের বেশি সময় কাজ করেন ২৪ ঘন্টার সংবাদভিত্তিক আরেকটি টিভি চ্যানেল যমুনা টেলিভিশনে। এই স্টেশনেই এই লেখকের সায়মন ড্রিং-এর সাথে কাজ করার সুযোগ হয়েছিল। অফিসের ফাঁকে একদিন তাঁর কাছ থেকে লেখক শুনেছিলেন ১৯৭১ সালের যুদ্ধদিনের কথা। তাঁর সেই বিখ্যাত প্রতিবেদনের পেছনের গল্প।

১৯৭১ সালে ‘দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এর যুদ্ধ প্রতিবেদক হিসেবে পূর্ব এশিয়ার কম্বোডিয়ায় সংবাদ সংগ্রহ করছিলেন সায়মন। দেশটিতে তখন সরকারী বাহিনীর সাথে পলপটের খেমাররুজদের যুদ্ধ চলছে। ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে টেলিগ্রাফের সম্পাদক টেলিফোনে সায়মনকে ঢাকার পরিস্থিতি বর্ণনা করেন। এরপর তাঁর ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত হয়। তিনি ঢাকায় পৌঁছান ৬ই মার্চ ১৯৭১। ঢাকা তখন সায়মনের কাছে একেবারেই নতুন শহর। নতুন মানুষ, নতুন পরিবেশ, অজানা ভাষা। তবে একটা বিষয়ে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতার সাথে মিল ছিল। সায়মন সরেজমিন অনেক যুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করেছেন। যুদ্ধ-সংঘাত পূর্ববতী পরিস্থিতি তিনি ভালো বুঝতেন। এরইমধ্যে ৭ই মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের সংবাদ মাঠে উপস্থিত থেকে সংগ্রহ করেন। ৭ই মার্চের পর বঙ্গবন্ধুর সাথে তাঁর কয়েক দফা সাক্ষাৎ হয়। মধ্য মার্চে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় গিয়ে কয়েকবার দেখা করেন। এতে তাঁর রিপোর্ট তৈরি করতে বাড়তি সুবিধা হচ্ছিল।

২৫ মার্চ বিকেলেই সায়মনসহ ঢাকার অন্যান্য বিদেশি সাংবাদিকরা জানতে পারেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঢাকা ত্যাগ করেছেন। তখন প্রায় ২০০ সাংবাদিক হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। তাদের মধ্যে গুঞ্জন— আলোচনা ব্যর্থ হয়েছে। ইয়াহিয়া হয়ত সামরিক অভিযানের নির্দেশ দিয়েছেন। বিকেলেই সায়মন পরিষ্কার বুঝতে পারছিলেন, ‘chips are down’ (খুব খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে)।

সায়মন জানান, ২৫ মার্চ সন্ধ্যার দিকেই হোটেলের পাশে সৈন্যদের দেখা যায়। পরিবেশটা এমন ছিল যে, যেকোনও সময় কিছু একটা ঘটতে পারে। এরপর তিনি ক্যান্টনমেন্ট থেকে সেনাদের একটা বহর বের হতে দেখেন। সে সময় কাউকে হোটেল থেকে বের হতে দেওয়া হচ্ছিল না। হোটেলের সামনে প্রচুর পুলিশ ও সেনা। এরইমধ্যেই ভেসে আসে গুলির শব্দ। এরপর আনুমানিক রাত ১১টার দিকে চারদিকে প্রচণ্ড গুলির শব্দ। শেলিং। শব্দ আসছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা থেকে। কিছুক্ষণ পর যুদ্ধাস্ত্রের গর্জন রাজারবাগ এলাকায়। ঢাকার সড়কগুলো তখন ফাঁকা। চারদিকে শুধুই গুলির শব্দ। কয়েকটি বড় অগ্নিশিখা লকলকিয়ে উঠে গেছে আকাশে।

২৫ মার্চ কালরাতে সায়মন ও অন্যান্য সাংবাদিক হোটেলের ছাদ থেকে ছবি তুলেছিলেন। ভিডিওগ্রাফাররা ভিডিও করছিলেন। এদিকে ওই দিন সন্ধ্যার পরই শেখ মুজিবের বাসায় ফোন করেন সায়মন। বঙ্গবন্ধুর প্রেস সেক্রেটারি বাদশার সাথে তাঁর কথা হয়। বাদশা তাঁকে জানান, শেখ মুজিবুর রহমান বাসাতেই থাকবেন। এরপর মধ্যরাতে আবার শেখ মুজিবের বাসায় ফোন করেন। তখন ফোনটি বিকল (ডেড) ছিল।

২৫ মার্চের ক্র্যাকডাউনের পর সব বিদেশি সংবাদিকদের ঢাকা থেকে বহিষ্কার করা হয়। জান্তা সরকারের এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করেন মেজর সিদ্দিক সালিক। তিনি ছিলেন গোয়েন্দা বিভাগের অফিসার। একইসাথে সামরিক সরকারের প্রেস লিয়াঁজো অফিসার। সালিক হোটেলে আসেন। সায়মনদের কড়া কড়া কথা শোনান। তখন এক সাংবাদিক সয়মনকে জানান— সাংবাদিকদের চলে যেতে বলা হচ্ছে, ব্যাগ গোছাতে বলা হয়েছে। কাল কারফিউ তুলে নেওয়া হবে। তখন ঢাকা ত্যাগ করতে হবে। এতে সায়মন খুবই রাগান্বিত হন।

এরপর সায়মন মেজর সিদ্দিক সালিকের কাছে যান। জিজ্ঞাসা করেন— মেজর কী হচ্ছে এসব? আমাদেরকে কি চলে যেতে হবে? সে তখন বলল, ‘‘না তো! যাদের ইচ্ছা তারা যাবেন! আর যারা থাকতে চান তারা থাকবেন।’’ তখন সায়মন তাঁকে জিজ্ঞাসা করেন— ‘‘যদি কেউ থাকতে চায়, তাহলে কোনও সমস্যা আছে কি ?’’ উত্তরে সিদ্দিক সালিক বলেন—‘‘না না কোনো সমস্যা নেই!’’ কিন্তু চতুর সিদ্দিক উল্লেখ করেন—‘‘এটা একটা গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি। এখানে থাকাটা খুবই ভয়ঙ্কর। আমরা তোমাদের নিরাপত্তার কথাই ভাবছি।’’

তরুণ বয়সে সায়মন ড্রিং এবং একাত্তরে দ্যা টেলিগ্রাফে ঢাকায় গণহত্যার নিয়ে তাঁর ঐতিহাসিক প্রতিবেদনের আলোকচিত্র।

এরপর সায়মন নিজের কক্ষে চলে যান। এমন ভাব করেন, যাতে মনে হয় তিনি ঢাকা ত্যাগ  করতে চান। ব্যাগ গোছান। তারপর ইচ্ছাকৃতভাবে বাস [মূলত ট্রাক হবে, কারণ ট্রাকে করে তাদের বিমানবন্দরে নেওয়া হয়েছিল] মিস করেন। পরে সায়মন পরিকল্পনা করেন কোথাও লুকিয়ে থাকার। প্রথমে হোটেলের ছাদে যান। সেখানে এয়ারকন্ডিশনারের জন্য বড় একটা কক্ষ ছিল। সেটার পেছনে লুকান।

সায়মন জানান, ঐ দিন পাকিস্তানিরা একটা ভুল করেছিল। তারা সাংবাদিকদের গণনা করেনি। তিনি ছাদ থেকে দেখেছিলেন সব বিদেশী সাংবাদিকদের ট্রাকে তোলা হচ্ছে। রাত ৯টার দিকে ট্রাকগুলো চলে যায়। কেউ তাঁর খোঁজ করেনি। কয়েক ঘণ্টা পর ছাদ থেকে নেমে সতর্কতার সাথে ফ্লোর হয়ে হোটেল লবিতে চলে আসেন। লবি ম্যানেজার আতঙ্কিত হয়ে তাকিয়ে বলেন—‘‘তুমি এখানে রয়ে গেছ?’’ তখন সায়মন জানতে পারেন— আরও একজন এখানে রয়ে গেছেন। তিনি একজন ফরাসি ফটোসাংবাদিক। এপি’র মিশেল লরেন্ট। দোতলার একটা কক্ষে তাঁর সাথে সায়মনের দেখা হয়। মনে মনে খুশিই হন সায়মন। চিন্তা করেন একজন রিপোর্টার আর ফটোগ্রাফার মিলে ভালো কাজ করা যাবে।  

সে সময় হোটেলের বাঙালী কর্মীরা সায়মনকে দারুণ সহযোগিতা করেছিলেন। সায়মন তাঁদেরকে প্রথম পর্যায়ের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মনে করেন। হোটেলের ঐ কর্মীদের সহযোগিতায় মিশেলকে সাথে নিয়ে হোটেলের একটা ছোট্ট গাড়িতে করে ২৭ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে গিয়েছিলেন। রাজারবাগ, ধানমণ্ডি আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঘুরে দেখেন। এরপর পুরান ঢাকা।

বিশ্ববিদ্যালয় ঢুকে হেঁটেই যান জগন্নাথ হলে। হলের দোতলায় বেশকিছু মরদেহ পড়ে ছিল। সেগুলোর মধ্যে এক যুবকের মরদেহের প্রতি দৃষ্টি আটকে যায় সায়মনের। সে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। শরীরের নিচ দিয়ে শুকনো রক্তের ধারা। মরদেহ ও রক্তের দাগ তাঁর কাছে একটা পেইন্টিংয়ের মতো মনে হচ্ছিল। এরপর সেখান চলে আসেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারেন— এই জায়গা থেকে জগন্নাথ হলে শেলিং করা হয়েছে। সেখানে একটা কোয়ার্টারে এক শিক্ষক দম্পত্তিকেও হত্যা করা হয়। সবকিছু দেখে তাঁর মনে হয়, ঠাণ্ডা মাথায় এক ভয়ঙ্কর গণহত্যা চালানো হয়েছে ঢাকায়। সেখান থেকে ইকবাল হল [বর্তমান জহুরুল হক হল] হয়ে হোটেলের দিকে ফিরছিলেন সায়মন ও মিশেল। সে সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর এক টহল দল ঐ এলাকা অতিক্রম করছিল। তাদের গাড়ি বহরটি বেশ দূর এগিয়েছিল। তবে খুব সম্ভবত তারা তাদের দেখে ফেলেন। আর তখন থেকেই তাদের সমস্যার শুরু।

২৭ মার্চ বিকেলে হোটেলে ফিরে তাঁরা জানতে পারেন সেনাবাহিনী হোটেলে এসেছিল। তারা পুরো হোটেল তল্লাশি করেছে। এরপর সায়মন ও মিশেল ঢাকা থেকে বের হওয়ার উপায় খুঁজতে শুরু করেন। তাদের কাছে প্রচুর স্টোরি আর ছবি ছিল। সেগুলো প্রকাশে তাঁরা উদগ্রীব ছিলেন। ঐ সময় পাকিস্তান এয়ারলাইন্স প্রচুর অতিরিক্ত ফ্লাইট পরিচালনা করছিল। যাত্রী পরিবহনের জন্য পাকিস্তান এয়ারলাইন্স তখন টিকিটের বিপরীতে নম্বর ইস্যু করত। সেই নম্বরের ভিত্তিতেই যাত্রী পরিবহন করা হতো। সায়মন ও মিশেলের টিকিট ছিল কিন্তু নম্বর ছিল না। তখন হোটেলে থাকা দু’জন জার্মান নাগরিক তাঁদের দুটো নম্বর দেন। সে নম্বর দুটি নিয়েই তারা ঢাকা থেকে বের হন।

বিশ্ববিদ্যালয় ঢুকে হেঁটেই যান জগন্নাথ হলে। হলের দোতলায় বেশকিছু মরদেহ পড়ে ছিল। সেগুলোর মধ্যে এক যুবকের মরদেহের প্রতি দৃষ্টি আটকে যায় সায়মনের। সে উপুড় হয়ে পড়ে ছিল। শরীরের নিচ দিয়ে শুকনো রক্তের ধারা। মরদেহ ও রক্তের দাগ তাঁর কাছে একটা পেইন্টিংয়ের মতো মনে হচ্ছিল। এরপর সেখান চলে আসেন ব্রিটিশ কাউন্সিলের সামনে। সেখানে গিয়ে বুঝতে পারেন— এই জায়গা থেকে জগন্নাথ হলে শেলিং করা হয়েছে। সেখানে একটা কোয়ার্টারে এক শিক্ষক দম্পত্তিকেও হত্যা করা হয়। সবকিছু দেখে তাঁর মনে হয়, ঠাণ্ডা মাথায় এক ভয়ঙ্কর গণহত্যা চালানো হয়েছে ঢাকায়।

বিমানবন্দরে সায়মন ও মিশেলের অভিজ্ঞতা ছিল ভয়াবহ। সায়মন জানিয়েছেন, বিমানবন্দরে তাঁরা সত্যিই খুব নার্ভাস ছিলেন। কিন্তু তাঁদের সৌভাগ্য বিমানবন্দরে দায়িত্বে ছিলেন বিমানবাহিনীর সদস্যরা। তারা তাদের চিনতে পারেনি। যাতে কেউ সন্দেহ না করতে পারে সেজন্য তিনি আর মিশেল আলাদাভাবে কাস্টমনে যান। শুল্ক বিভাগে সব ব্যাগ পরীক্ষা করা হয়। ব্যাগে তারা পূর্ব পাকিস্তানের কিছু মানচিত্র পায়। সন্দেহ করতে শুরু করে। চলতে থাকে জেরা। তবে এ যাত্রায় কিছু হয়নি। কিছু বই সে যাত্রায় তাদের রক্ষা করে। ব্যাগে পূর্ব পাকিস্তান সংক্রান্ত কিছু বই ছিল। সায়মন দাবি করেন তিনি পর্যটক হিসেবে বাংলাদেশ ঘুরতে এসেছেন। এতে দায়িত্বরত কর্মকর্তা আশ্বস্ত হন। সে যাত্রায় তাঁরা বেঁচে যান। মোজা আর টুথপেস্ট নিয়ে ইমিগ্রেশন পার হন সায়মন। যাতে ছিল ছবি আর রিপোর্ট তৈরির অমূল্য নোট।

১৯৭১ সালে বিমান চলাচল করত কলম্বো হয়ে। কলম্বোর ঘটনাপ্রবাহে সায়মন জানান, সিলনে এক ঘণ্টার ট্রনজিট ছিল। বিমানবন্দরে নেমেই তিনি কলম্বোর ব্রিটিশ হাইকমিশনে ফোন করেন। কামনা করেন রাজনৈতিক আশ্রয়। হইকমিশন থেকে জানান হয়, দুঃখিত! কোনওভাবেই সাহায্য করা সম্ভব নয়। টিপিক্যাল ব্রিটিশ বিহেভিয়ার! সায়মন উঠে পড়েন করাচিগামী প্লেনে।

করাচিতে শরীর তল্লশির জন্য সায়মনকে একটি বিশেষ কক্ষে নেওয়া হয়। সেখানে তাঁকে সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করা হয়। তবে এ সময় বেশ কৌশলে তিনি মোজা খোলেন। যাতে প্রতিবেদনের নোটগুলো মোজার ভেতরেই থাকে। অন্যদিকে মিশেলকেও একইভাবে তল্লাশি করা হয়। তাঁকেও বিবস্ত্র করা হয়েছিল। সায়মনের ধারনা সিদ্দিক সালিক তাঁদের ব্যাপারে জানতে পেরেছিল। তাই সে কোনও একটা ম্যাসেজ পাঠায় করাচিতে। যার ভিত্তিতে সেখানে বিভিন্ন পর্যায়ের চেকআপ চলছিল। ঐ কক্ষে তল্লাশির একপর্যায়ে সায়মনের পায়ুপথও পরীক্ষা করা হয়। তারপর মুক্তি মেলে। প্লেন ওড়ে আকাশে। পরের যাত্রা করাচি থেকে ব্যাংকক।

প্লেনে বসেই মোজার ভেতর থেকে নোটগুলো বের করেন সায়মন। সেগুলোর ভিত্তিতে শুরু হয় স্টোরি লেখা। বিমান থেকে নেমেই চলে যান ব্যাংককের টেলিগ্রাফ ব্যুরো অফিসে। সেখানে বসে স্টোরিটা ফাইনাল করেন। যা ৩০ মার্চ দ্যা টেলিগ্রাফ প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনটি ছিল বাংলাদেশের গণহত্যা নিয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমের প্রথম প্রতিবেদন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist