Beta
রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪

গাজায় যুদ্ধবিরতির আলোচনার কেন্দ্রে ফিলিস্তিনি বন্দিরা

ইসরায়েলে ফিলিস্তিনিদের বন্দী করার প্রতিবাদে গত মাসে পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরের মানুষ বিক্ষোভ করেছে। ছবি: ইপিএ।
ইসরায়েলে ফিলিস্তিনিদের বন্দী করার প্রতিবাদে গত মাসে পশ্চিম তীরের নাবলুস শহরের মানুষ বিক্ষোভ করেছে। ছবি: ইপিএ।

ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরের ছোট শহর সিলওয়াদের একটি ধুলোময় গোলচত্বরের ক্যাফেতে পুরুষরা বসে তাস খেলছে, একটি চোখ বড় টিভির পর্দায় গাজার সর্বশেষ খবর দেখাচ্ছে। যখনই গাজায় সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি চুক্তির কোনও কথা বলা হয় তখনই নীরবতা নেমে আসে। কারণ এতে ইসরায়েলি কারাগার থেকে কয়েকশ ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তির সম্ভাবনাও থাকে।

৪৫ বছর বয়সী আখরাম দ্য গার্ডিয়ানকে বলেন, “আমাদেরকে কেউ আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলে না। আমরা যখনই যুদ্ধবিরতি চুক্তির কোনও খবর দেখি, আমরা ভাবি যে আমার ভাইকে হয়ত মুক্তি দেওয়া হতে পারে। এমনটা হলে সত্যিই খুব ভালো হবে এবং সবাই সত্যিই খুব খুশিও হবে; নইলে তাকে তার বাকি জীবন কারাগারেই কাটাতে হবে।”

 আখরাম পেশায় একজন কামার। তার ভাই তায়ের ২০০২ সালে সিলওয়াদের অদূরের একটি চেকপয়েন্টে সাত ইসরায়েলি সেনা ও তিন বেসামরিক ইসরায়েলিকে গুলি করে হত্যার দায়ে একাধিক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ভোগ করছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে গাজায় যে কোনও যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রধান শর্তই হয়ে উঠেছে ইসরায়েলের কারাগারে থাকা ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি।

ফিলিস্তিনি বন্দিদের নিয়ে একটি বই লিখেছেন লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহযোগী অধ্যাপক ড. জুলি নরম্যান। তিনি বলেন, “ফিলিস্তিনিদের জন্য এটি একটি বড় অধিকারগত সমস্যা আর ইসরায়েলের জন্য একটি প্রধান নিরাপত্তা সমস্যা। এটি সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলোর মধ্যেও একটি। তথাপি আমরা এই বিষয়ে তাদের মধ্যে আপস করার ইচ্ছাও দেখি।”

সম্প্রতি কয়েক সপ্তাহের ফলাফলহীন আলোচনার পর গত শুক্রবার খবর আসে, যুদ্ধবিরতির জন্য হামাস কিছু নতুন দাবি জানিয়েছে। এছাড়া হামাসের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনায় পুনরায় যোগ দিতে একটি ইসরায়েলি প্রতিনিধিদল কাতার সফর করবে। প্রথম যুদ্ধবিরতি থেকেই কাতার হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতা করে আসছে।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, হামাস ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি সব ফিলিস্তিনির মুক্তির দাবি থেকে সরে এসেছে। তার পরিবর্তে ৪০০ থেকে ১ হাজার সাধারণ বন্দি এবং খুনসহ গুরুতর অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত ৫৭ জনকে মুক্তি দিতে বলছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর হিসাবে, ইসরায়েলের কারাগারে ৯ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দি আছেন।

গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় ১২০০ জনেরও বেশি ইসরায়েলি নিহত হয়, যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক। এছাড়া হামাস ইসরায়েল থেকে প্রায় ২৪০ জনকে অপহরণ করে নিয়ে যায়।

নভেম্বরে একটি স্বল্পকালীন যুদ্ধবিরতির সময় ওই জিম্মিদের থেকে ১০০ জনকে মুক্তি দেয় হামাস। বিনিময়ে ইসরায়েলও ২৪০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেয়, যাদের বেশিরভাগই কিশোর বয়সী। তাদের অনেকেই সাজার অপেক্ষায় ছিল, অনেককে আবার কোনও অভিযোগ ছাড়াই আটকে রাখা হয়েছিল।

ইসরায়েলি কর্মকর্তারা বলছেন, গাজায় হামাসের হাতে এখনও তাদের ১৩৪ জন জিম্মি রয়েছে। তবে এর মধ্যে প্রায় ৩০ জন মারা গিয়ে থাকতে পারে।

ড. জুলি নরম্যান বলেন, কোনোও ফিলিস্তিনি বন্দির মুক্তি ইসরায়েলিদের জন্য সবচেয়ে তিক্ত বড়িটি গেলার মতো।

জুলি বলেন, “হামাস যা করেছে, তাতে ইসরায়েল আর তাদেরকে কোনও ছাড় দিতে চায় না। এছাড়া তারা এমন লোকদের মুক্তি দিতে চায় না, যারা ভবিষ্যতে ফের তাদের ক্ষতি করতে পারে। ৭ অক্টোবরের হামলার লক্ষ্যগুলোর মধ্যে একটি ছিল ইসরায়েলি কারাগার থেকে বন্দিদের জোরপূর্বক মুক্ত করা। হামাসের মতো একটি সংগঠনের জন্য এই বন্দিমুক্তি হবে একটি বড় রাজনৈতিক অর্জন।”

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হামাস ইসরায়েলি জিম্মিদের মধ্য থেকে নারী, ১৯ বছরের কম বয়সী এবং ৫০ বছরের বেশি বয়সী পুরুষ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের মুক্তি দিতে ইচ্ছুক। তবে এখন ৪০ জনের বেশি জিম্মিকে মুক্তি দেবে না তারা।

নতুন প্রস্তাবের ফাঁস হওয়া খসড়া থেকে জানা যায়, যুদ্ধবিরতির বিনিময়ে হামাস গাজায় ইসরায়েলের হামলা বন্ধ চায়। তবে আপাতত তারা ৪০ দিনের যুদ্ধবিরতি গ্রহণ করবে। গত পাঁচ মাসেরও বেশি সময় ধরে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় প্রায় ৩২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।

হামাসের অন্যান্য দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, গাজা থেকে ইসরায়েলি সৈন্য প্রত্যাহার, আরও বেশি মানবিক সহায়তা প্রবেশ এবং উত্তরাঞ্চল থেকে বাস্তুচ্যুতদের নিজেদের বাড়িতে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া। ইসরায়েলের হামলায় গাজার উত্তরাঞ্চলের প্রায় মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরের রামাল্লায় অবস্থিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের বন্দি বিষয়ক কমিশনের প্রধান কাদুরা ফারেস বলেছেন, “যুদ্ধক্ষেত্রে পরাজিত না হলে হামাস আলোচনার টেবিলেও পরাজয় স্বীকার করতে চায় না।”

তিনি বলেন, “ফিলিস্তিনিদের মানসিকতার কারণেই ইসরায়েলের কারাগারে তাদের কাছে বন্দিরা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যারা ত্যাগ স্বীকার করে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে তাদের প্রতি সংহতির একটি ঐতিহ্য রয়েছে। আপনি যদি দীর্ঘ বাক্য দিয়ে কারও স্বাধীনতা অর্জন করেন, তবে আপনি একজন মৃত ব্যক্তিকে জীবিত করেন। এটা আশা তৈরি করে।”

নভেম্বরে যুদ্ধবিরতির সময় মুক্তি পাওয়া ফিলিস্তিনি বন্দীদের মধ্যে আটজন ফের ইসরায়েলের কারাগারে গেছেন।

এদের একজন হলেন ওবেইদ হাম্মাদ, যিনি মুক্তি পাওয়ার আগে কোনও অভিযোগ ছাড়াই ১৭ মাস ইসরায়েলের কারাগারে আটক ছিলেন। নভেম্বরের শেষ দিকের যুদ্ধবিরতির সময় তিনি মুক্তি পান। কিন্তু সম্প্রতি তিন সপ্তাহ আগে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী সিলওয়াদে তার বাড়িতে ভোর ৪টায় অভিযান চালিয়ে তাকে ফের গ্রেপ্তার করে।

১৯ বছর বয়সী এই ফিলিস্তিনি কিশোরের মা বদরিয়া হাম্মাদ বলেন, মুক্তি পাওয়ার পর থেকে তার ছেলে ফের কারাগারে যাওয়ার ভয়ে কোনও অবৈধ কার্যকলাপে জড়ায়নি। তার কাছে কারাগার ছিল অসহনীয়।

বদরিয়া বলেন, “আমার ছেলে হতবাক হয়ে গিয়েছিল। তারা তাকে পোশাক পরতে এবং তার প্রয়োজনীয় ওষুধ খেতে বলে। তারপর হাতকড়া পরিয়ে তাকে নিয়ে যায়। এরপর থেকে আমরা আর কিছুই শুনিনি। কোনও অভিযোগও নেই, তাই আমরা জানি না যে সে কী ভুল করেছে।”

পশ্চিম তীরভিত্তিক বন্দিদের মানবাধিকার সংগঠন আদ্দামিরের আইনজীবী তালা নাসির বলেছেন, ইসরায়েল মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিদের পুনরায় গ্রেপ্তার করার ফলে আস্থার সমস্যা দেখা দিয়েছে। “ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনিদের কণ্ঠরোধ করার জন্য সম্ভাব্য সর্বাধিক সংখ্যক ফিলিস্তিনিকে জেলে পোরার চেষ্টা করছে। হামাসের সঙ্গে দর কষাকষির জন্যও ইসরায়েল ফিলিস্তিনি বন্দিদের ব্যবহার করে।”

হাম্মাদকে পুনরায় গ্রেপ্তারের বিষয়ে দ্য গার্ডিয়ানের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ কোনও মন্তব্য করেনি।

ফিলিস্তিনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মুক্তিপ্রাপ্ত ফিলিস্তিনিদের এভাবে নতুন করে আটকের ফলে হামাসের আলোচকরা ইসরায়েলের কাছে কোনও মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিকে ফের সরাসরি কারাগারে না পাঠানোর নিশ্চয়তাও চেয়েছেন।

কিন্তু ইসরায়েলের জন্য হামাসের এই দাবি মেনে নেওয়া কঠিন হতে পারে। হামাস গুরুতর অপরাধের দায়ে সাজাপ্রাপ্ত যে ৫৭ জনের মুক্তি দাবি করেছে তাদের মধ্যে রয়েছেন ইসরায়েলের একটি হোটেল ও শপিং মলে বোমা হামলার ফিলিস্তিনি ‘মাস্টারমাইন্ড’। ওই হামলায় ৬৫ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছিল। হামলাটিকে ইসরায়েলে সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার একটি হিসেবে দেখা হয়। তাদের মধ্যে এক ইসরায়েলি মন্ত্রীকে হত্যার পরিকল্পনাকারী একজনও রয়েছেন। আরেকজন আছেন যিনি ইসরায়েলে একটি আত্মঘাতী বোমা হামলার সংগঠক ছিলেন, যে হামলায় ৪৬ জন ইসরায়েলি নিহত হয়েছিল। এজন্য তাকে ৫৪টি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের সাজা দেওয়া হয়েছে।

এই ধরনের বন্দিদের মুক্তির কোনও চুক্তিতে রাজি হলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর জোট সরকারে ভাঙন দেখা দিতে পারে। জরিপে দেখা গেছে, ইসরায়েলিরা গভীরভাবে এই ধরনের ছাড়ের বিরোধিতা করে। অন্যদিকে, নেতানিয়াহু হামাসের হাতে আটক বেঁচে থাকা জিম্মিদের মুক্ত করার জন্য চাপের মধ্যেও রয়েছেন।

ইসরায়েলি ভাষ্যকাররা বারবার গাজায় ইসরায়েলি জিম্মিদের জন্য ‘সময় ফুরিয়ে যাওয়ার’ সতর্কতা জারি করেছেন। মুক্তিপ্রাপ্ত জিম্মিরা কঠোর অবস্থা, যৌন সহিংসতা ও সীমিত খাবার দেওয়ার মতো অভিযোগ করেছেন।

হামাস এমন ১৫ জন বন্দিরও মুক্তি চায়, যাদের ২০১১ সালে গাজায় অপহৃত সৈন্যের মুক্তির বিষয়ে আলোচনার সময় ইসরায়েল মুক্তি দিতে অস্বীকার করেছিল।

রামাল্লার কর্মকর্তারা বলেছেন, ওই ১৫ জনের মধ্যে ফিলিস্তিনের অন্যতম জনপ্রিয় রাজনীতিবিদ মারওয়ান বারঘৌতিও ছিলেন। তাকে ইসরায়েলি নাগরিক হত্যার জন্য দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং তিনি ২০ বছরেরও বেশি সময় কারাগারে কাটিয়েছেন। ৬৪ বছর বয়সী এই নেতা হামাসের প্রতিদ্বন্দ্বী ফাতাহ পার্টির সদস্য এবং তাকে সম্ভাব্য প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে ওই চুক্তির ফলে গাজার হামাস নেতা ইয়াহিয়া সিনওয়ার এবং গত বছরের ৭ অক্টোবরের হামলার মাস্টারমাইন্ড সহ ১ হাজার জনেরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেয় ইসরায়েল।

বিশ্লেষকরা বলছেন, হামাসের এই বন্দিমুক্তির দাবি রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। এর মাধ্যমে হামাস নিজেকে সমস্ত ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দেখাতে চায় এবং এমনকি শেষ পর্যন্ত হামাস মারওয়ান বারঘৌতির নেতৃত্বও মেনে নিতে পারে।

হামাস যে কোনও বন্দির মুক্তিকে বড় বিজয় হিসেবে চিত্রিত করে। গত বছরের নভেম্বরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর সংগঠনটির জনপ্রিয়তা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। আর বারঘৌতির মতো নেতাসহ অনেক বেশি সংখ্যক বন্দিদের মুক্তির প্রভাব আনুপাতিকভাবে আরও বেশি হবে। এতে হামাসের জনপ্রিয়তা আরও অনেক বেশি বাড়বে।

নরম্যান বলেন, “এটি হামাসের জন্য স্বল্পমেয়াদে ও দীর্ঘমেয়াদে উভয়ভাবেই একটি বড় জয় হবে।”

শিলওয়াদে রয়েছে প্রবল প্রত্যাশা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্যাফের তাস খেলোয়াড়দের একজন বলেছেন, “এখানে এমন কোনও পরিবার নেই যাদের কেউ ইসরায়েলের কারাগারে নেই। ইসরায়েলি জেলে সবারই বন্ধু বা ভাই অথবা মামাতো-চাচাতো-খালাতো-ফুফাতো ভাই আছে। একদিন সবাই মুক্তি পাবে।”

তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist