Beta
শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪

গাজায় যুদ্ধে কতটা বিপাকে সৌদি আরব

গাজায় ইসরায়েলি ধ্বংসযজ্ঞ। ছবি- এএফপি।

ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে হামাস বিজয়ী হতে পারবে না তা প্রায় নিশ্চিত। তবে এই যুদ্ধে ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়া আকস্মিকভাবে থমকে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরায়েল-সৌদি চুক্তি হলে তা হত এক যুগান্তকারী ঘটনা। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পাশাপাশি এই চুক্তি সৌদি আরবকে আরও দৃঢ়ভাবে মার্কিন বলয়ে নিয়ে আসবে। কিন্তু এতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে দেওয়া ইসরায়েলের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন না হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হবে। আর সেই শঙ্কা থেকেই হয়তো গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামলা চালায় হামাস। যুক্তরাষ্ট্রও সেটাই বলেছে। ইসরায়েলে হামলার পরপরই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বাইডেন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেন, হামাসের এই হামলার মূল লক্ষ্য সৌদি-ইসরায়েল সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরন প্রক্রিয়াকে থামানো।

গাজা যুদ্ধের কারণে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান (এমবিএস) এক কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে তার প্রধান লক্ষ্য আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মাধ্যমে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন। এমবিএস সৌদি আরবকে তেল রপ্তানি নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে আনতে চান। সৌদি অর্থনীতিকে আরও বৈচিত্রময় করতে চান। আর এজন্য সবার আগে দরকার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। কিন্তু হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থির করে তুলতে পারে। এতে সৌদি আরবের অর্থনৈতিক অগ্রগতিও বাধাগ্রস্ত হবে।

গাজা-ইসরায়েল যুদ্ধ ঘিরে সৌদি যুবরাজ ঘরে-বাইরে দুই জায়গাতেই চাপের মুখে পড়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় দেশগুলো চায় হামাস পরবর্তী গাজায় সৌদি আরব বড় ভুমিকা রাখুক। অন্যদিকে, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের জনগন তাকে ফিলিস্তিনিদের পাশে চায়।

ফরেন অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণ মতে, এই দড়ি টানাটানিতে সৌদি আরব কোনো পক্ষকেই খুশি করতে পারবে না। কারণ যুদ্ধ পরবর্তী গাজায় পা রাখা বা গাজার পুনর্গঠনে অর্থায়ন করার ইচ্ছা বা সামর্থ্য কোনোটাই সৌদি আরবের নেই। গাজায় ইসরায়েলের হামলা বন্ধেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার আগ্রহ দেখায়নি সৌদি আরব। সৌদি আরব চাইলে তেল উৎপাদন বা রপ্তানি বন্ধ করে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধ বন্ধের জন্য চাপ দিতে পারত। কিন্তু সে পথে যাননি সৌদি শাসকরা।

হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধের কারণে সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি প্রক্রিয়া থমকে গেলেও তা পুরোপুরি বাতিল হয়নি। সৌদি আরব ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ভাবছিল মূলত নিজের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্যই। সৌদি যুবরাজের উচ্চাকাঙ্খী অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখাও জরুরি। দীর্ঘমেয়াদি সেই লক্ষ্যকে মাথায় রেখেই সৌদি যুবরাজ পদক্ষেপ নেবেন। সৌদি আরব গাজায় যুদ্ধ বন্ধের জন্য চীনের সহায়তাও চেয়েছে।

এক কদম এগিয়ে দুই কদম পেছানো

ইসরায়েলে হামাসের আকস্মিক হামলার আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি প্রক্রিয়া বেশ দ্রুত গতিতেই এগোচ্ছিল। যদিও তিন পক্ষেরই ভিন্ন ভিন্ন চাওয়া-পাওয়া ছিল। প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের নেতৃত্বাধীন ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) ক্ষমতা বাড়াতে ইসরায়েলের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানায় সৌদি আরব। দ্বি-রাষ্ট্রিক সমাধানের জন্য অন্তত আলোচনার দরজা খোলার দাবিও করেন সৌদিরা। কিন্তু ইসরায়েলে অতি-ডানপন্থীরা ক্ষমতায় থাকায় তার সম্ভাবনা ছিল ক্ষীণ। আর যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সৌদিদের চাওয়া ছিল একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং কোনও কঠোর শর্ত ছাড়াই সৌদি আরবের বেসামরিক পারমাণবিক অবকাঠামো নির্মাণে সহায়তা।

হামাসের হামলার প্রায় তিন সপ্তাহ আগে সৌদি যুবরাজ ফক্স নিউজকে বলেছিলেন, ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনায় “প্রতিদিন আমরা আরও ঘনিষ্ঠ হচ্ছি”। তবে সৌদি-ইসরায়েল আলোচনায় ফিলিস্তিন ইস্যু সবসময়ই একটি বাধা হিসেবে হাজির ছিল। কারণ, আরবের জনগণ এখনো ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহমর্মী। হামাসের হামলার আগেও সৌদি আরব ইঙ্গিত দেয়, সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে চাইলে ইসরায়েলেরও ফিলিস্তিনকে কিছু ছাড় দিতে হবে।

ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা চলাকালেই গত আগস্টে সৌদি আরব ফিলিস্তিনে প্রথম রাষ্ট্রদূত নিয়োগ দেয়। যা থেকে ধারণা করা হয় যে, ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতেও ইসরায়েলকে চাপ দেবে সৌদি আরব। বাহরাইন, মরোক্কো, সুদান এবং আরব আমিরাতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার সময় ইসরায়েল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল পশ্চিম তীরের ৩০% ইসরায়েল রাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা বাদ দেবে তারা। কিন্তু ফিলিস্তিনিদের জন্য ইসরায়েলের কাছে সৌদি আরব আরও বেশি কিছু চায়।

গাজায় ইসরায়েলের হত্যাযজ্ঞের ফলে বিষয়টা এখন আরও কঠিন হয়ে উঠবে। সৌদি আরব ইতিমধ্যেই ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তিপ্রক্রিয়া স্থগিত করেছে। ইসরায়েল গাজায় হামলা বন্ধ না করলে সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি প্রক্রিয়াও আর সামনে এগোবে না।

ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইচ্ছা মূলত সৌদিদের পররাষ্ট্রনীতিতে বৃহত্তর বাঁক বদলেরই একটি দিক। ২০১৫ সালে তার বাবার সিংহাসনে আরোহনের পরপরই সৌদি যুবরাজ এমবিএস দেশের অর্থনীতিকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর এক উচ্চাকাঙ্খী পরিকল্পনা নেন। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ইরানকে মোকাবেলায় বিভিন্ন পদক্ষেপও নেওয়া শুরু করেন। আরব-আমিরাতকে সঙ্গে নিয়ে ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের দমনে যুদ্ধ শুরু করেন। মুসলিম ব্রাদারহুড ও হামাসের মতো সুন্নি রাজনৈতিক সংগঠনগুলোকে সহযোগিতার দায়ে কাতারের বিরুদ্ধে অবরোধ আরোপ করেন।

এরপর ২০১৭ সালে লেবাননের জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী সা’দ হারারিকে রিয়াদে ডেকে নিয়ে পদত্যাগ করতে বলেন। উদ্দেশ্য ছিল, লেবাননে রাজনৈতিক সংকট তৈরির মাধ্যমে ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহকে বিপদে ফেলা। কিন্তু সা’দ হারারি দেশে ফিরে পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানান। ক্ষমতা পেয়েই ইরানের বিরুদ্ধে সুর চড়াতে থাকেন সৌদি যুবরাজ এমবিএস। ইরান সৌদি আরবের পবিত্র স্থানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিতে চাইছে বলে অভিযোগ এনে এমবিএস ঘোষণা করেন, “আমরা সৌদি আরবে যুদ্ধের জন্য অপেক্ষা করব না। তার পরিবর্তে, আমরা এমনভাবে কাজ করব যাতে যুদ্ধ ইরানেই হয়, সৌদি আরবে নয়।” ২০১৮ সালে সৌদি রাজবংশের সমালোচক সাংবাদিক জামাল খাশোগিকে হত্যার আদেশ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকেও অসন্তুষ্ট করেন এমবিএস। খাশোগি ছিলেন সৌদি বংশোদ্ভুত যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক এবং ওয়াশিংটন পোস্টের কলাম লেখক।

এমবিএসের আগ্রাসী পররাষ্ট্রনীতি সৌদিদের দিকেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে। এতে সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সমর্থন হারাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রও সৌদি আরবের কড়া সমালোচনা শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ২০২০ সালে ক্ষমতায় আসার আগে সৌদি আরবকে শায়েস্তা করার প্রতিশ্রুতি দেন। ফলে সৌদি আরব তার আঞ্চলিক পররাষ্ট্রনীতিতে পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়। এরপর সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ এবং স্থিতিশীলতার ওপর জোর দেওয়া শুরু করেন সৌদি যুবরাজ এমবিএস। ২০২১ সালের শুরুর দিকেই কাতারের ওপর থেকে অবরোধ প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। ২০২২ সালের এপ্রিলে ইয়েমেনের হুতিদের সঙ্গেও যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়ন করেন এমবিএস। এমনকি চীনের মধ্যস্থতায় ২০২৩ সালের শুরুতে ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চুক্তি করে সৌদি আরব। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সৌদি আরব ইরানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা আরও বাড়ায়।

এসবই করা হয় এমবিএসের অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি ভিশন-২০৩০ বাস্তবায়নের পথে সব বাধা-বিপত্তি দূর করার জন্য। ভিশন-২০৩০ এর প্রধান লক্ষ্য সৌদি আরবকে শুধু তেল রপ্তানি ভিত্তিক অর্থনীতি থেকে বের করে আনা। বিদেশি বিনিয়োগ, আঞ্চলিক সহায়তা এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নকে উৎসাহিত করার জন্যই মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায় সৌদি আরব। এই বৃহত্তর প্রেক্ষাপটেই ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদিদের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতাও শুরু হয়।

সৌদিদের স্বপ্নভঙ্গ

নিজেদের অর্থনৈতিক উন্নতির পথ বাধাহীন রাখার জন্যই সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা চায়। ইসরায়েলে হামাসের গত ৭ অক্টোবরের হামলা সৌদিদের সেই স্বপ্নে বাগড়া দিয়েছে। হামাসের প্রতি রিয়াদের নূন্যতম ভালোবাসা নেই। আরব বসন্তের সময় মিশর, তিউনিসিয়া এবং অন্যান্য আরব দেশে মুসলিম ব্রাদারহুড ও এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক বিজয়ের বিরোধিতা করেছিল সৌদি আরব।

আর হামাস হল সেই ব্রাদারহুডেরই ফিলিস্তিনি শাখা। তবে, ইসরায়েল যেভাবে গাজায় হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছে তাতে সৌদিরা চুপ থাকতে বা ইসরায়েলের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যেতে পারবে না। সৌদি আরব নিজের স্বার্থেই যুদ্ধ চায় না এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান চায়। কিন্তু এখন এই লক্ষ্য সামনে এগিয়ে নেওয়ার মতো কোনো চাবিকাঠি বা হাতিয়ার সৌদি আরবের হাতে নেই। ইসরায়েলের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়াও সৌদি আরবের পক্ষে সম্ভব নয়।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গাজার ‍পুনর্গঠনে আরব দেশগুলোর সহায়তা চেয়েছেন। এ ব্যাপারে কুটনৈতিক আলোচনাও শুরু হয়েছে। যুদ্ধের পরে গাজা শাসনে সামরিক এবং প্রশাসনিক লোকবল দিয়ে সহায়তার জন্য সৌদি আরবকে প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। গাজার পুনর্গঠনেও সৌদি আরবের অর্থায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু গাজায় ইসরায়েলের ধ্বংসযজ্ঞের ফলে যে জঞ্জাল জমা হয়েছে তা পরিষ্কারে সৌদিরা নিজেদের হাত লাগাবে না। সৌদি আরবের অভ্যন্তরীন নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর নিজেদের সীমান্তের বাইরে কাজ করার কোনো অভিজ্ঞতা নেই। ইয়েমেনের যুদ্ধেও সৌদি সেনারা ভালো করতে পারেনি। এমনকি সৌদি সেনাদের জাতিসংঘের অধীনে কোনো শান্তি মিশনে কাজ করার অভিজ্ঞতাও নেই।

তবে, সৌদি আরব হয়তো জাতিসংঘ-অনুমোদিত গাজার অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনে আর্থিক সহায়তা দিতে রাজি হবে। কিন্তু সৌদি আরবের সেই ভূমিকা অতীতের সৌদি অর্থসহায়তা চুক্তির মতো হবে না। সৌদি আরব এখন আর শুধু শুধু টাকা দেবে না। সম্প্রতি সৌদি আরব আর্থিক সংকটে থাকা মিশরের সঙ্গে আলোচনায়ও বিষয়টি স্পষ্ট করেছে। সৌদি আরব বলেছে, তারা মিশরকে আর নগদ অর্থসহায়তা দেবে না। বরং মিশরের ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ করবে। গাজায়ও সৌদিদের দৃষ্টিভঙ্গি একই রকম হবে। তবে যুক্তরাষ্ট্র যদি ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের বিনিময়ে সৌদিরা যা চায় তা দিতে রাজি হয় তাহলে হয়তো সৌদি আরব ভিন্নভাবে ভাববে। ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিনিময়ে সৌদিদের একটি বড় চাওয়া হলো পারমাণবিক শক্তি অর্জন।

রাজনীতির চেয়ে মুনাফাকে প্রাধান্য

১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর সৌদি আরবসহ তেলসমৃদ্ধ আরব দেশগুলো ইসরায়েলকে সমর্থন দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। এতে তেলের দাম চারগুণ হয়ে গিয়েছিল। সেসময় যুক্তরাষ্ট্রের পেট্রোল পাম্প ও গ্যাস স্টেশনগুলোতে লম্বা লাইনও দেখা যায়। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা এবং জেপিমরগান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডিমনসহ অর্থনৈতিক নেতৃবৃন্দ সতর্ক করেছেন, এবারও ১৯৭৩-৭৪ সালের মতো তেল সংকট তৈরি হতে পারে।

তবে, তাদের এই আশঙ্কা অতিরঞ্জিত বলেই মনে হয়। ১৯৭৩ সালের তেল সংকট নিয়ে যতটা বলা হয় বাস্তবে পরিস্থিতি ততটা খারাপ হয়নি। আরব দেশগুলো তেলের সরবরাহ বন্ধ করে দিলে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো দক্ষিণ আমেরিকা, পশ্চিম আফ্রিকা এবং ইরানের কাছ থেকে তেল আমদানি বাড়িয়ে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের তেল ও গ্যাস স্টেশনগুলোতে লম্বা লাইন তৈরি হয়েছিল মূল্য নিয়ন্ত্রণ, তেল-গ্যাস বিতরণে কঠোর নিয়ম এবং কাস্টমারদের আতঙ্কের কারণে। বাজারে তেলের সরবরাহ খুব বেশি কমেনি। আর তেলের দাম বেড়েছিল মূলত ১৯৭৩ সালের ডিসেম্বরে আরবরা হঠাৎ করেই তেলের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়ার ফলে। তেল উৎপাদন কমিয়ে দিয়ে আরবরা যে আতঙ্ক তৈরি করেছিল পুরো ৭০ এর দশকজুড়ে তার প্রভাব বজায় ছিল। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর তেলের বাজারে আরেকটি ধাক্কা আসে।

তবে বর্তমান পরিস্থিতি সে সময়ের চেয়ে অনেক ভিন্ন। ১৯৭৩ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েলের প্রধান দুই শত্রু মিশর এবং সিরিয়ার সঙ্গে সৌদিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত সৌদি আরবের সঙ্গে তার দেশের শত্রুতার অবসান ঘটান। ফলে সৌদিরা তার জন্য বড় ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল। কিন্তু গাজার সশস্ত্র সংগঠন হামাসের প্রতি সৌদিদের কোনো সহানুভুতি নেই। কারণ হামাস সৌদি রাজতন্ত্রের বিরোধী মিশর ভিত্তিক সুন্নি ইসলামি রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডের অনুসারি। সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানের সঙ্গেও হামাসের সখ্যতা রয়েছে।

অনেক পর্যবেক্ষক আরবদের তেলের উৎপাদন কমানোর ভয়ও পাচ্ছেন। তবে বাস্তবতা হল, ২০২২ সালের শেষদিক থেকে সৌদিরা ইতিমধ্যেই কয়েকবার তেলের উৎপাদন কমিয়েছে। এখন প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল কম উৎপাদন করছে দেশটি। তবে এতে আশঙ্কা অনুযায়ী তেলের দাম খুব বেশি বাড়েনি। প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ৮০-৮৫ ডলারের মধ্যেই রয়েছে। এখনো ১০০ ডলারের নিচেই আছে। অথচ তা ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল। সৌদি আরব তেলের উৎপাদন এর চেয়ে বেশি কমাতে পারবে না। কারণ এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতারাই নয় চীনের ক্রেতারাও অসন্তুষ্ট হবে। আর তাছাড়া তেলের উৎপাদন কমিয়ে সৌদি আরব তেমন কোনো সুবিধাও পাবে না। অন্য আরব দেশগুলোও আর তেলকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করবে না।

নভেম্বরের শুরুতে আরব-লীগ এবং ওআইসির যৌথ সম্মেলনে আলজেরিয়া, লেবাননসহ কয়েকটি দেশ ইসরায়েল ও তার মিত্রদের জ্বালানি তেল সরবরাহ বন্ধে হুমকির প্রস্তাব দেয়। একই সঙ্গে ইসরায়েলের সঙ্গে আরব লীগের দেশগুলোর কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার কথাও বলে। কিন্তু সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইনসহ অন্তত তিনটি দেশ প্রস্তাবটির বিরোধিতা করায় তা বাতিল হয়ে যায়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এমবিএস সৌদি আরবকে মুনাফার চেয়ে রাজনীতিকে বড় করে দেখার মতো জায়গা হিসেবে দেখার সুযোগ করে দিতে চান না। নিজ দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিই এখন তার প্রধান লক্ষ্য। বর্তমান অস্থিরতার মধ্যেও এমবিএস তার এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য দৃঢ় মনোভাব বজায় রেখেছেন। অক্টোবরের শেষদিকে গাজায় ইসরায়েলি হত্যাযজ্ঞ চলাকালেই সৌদি আরব বার্ষিক ভবিষ্যত বিনিয়োগ উদ্যোগ সম্মেলনের আয়োজন করে। ওই সম্মেলনে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় বিনিয়োগকারীরা উপস্থিত ছিলেন। এমবিএস সৌদি আরবকে ‘তেল অস্ত্র’ ব্যবহার করে সমস্যা সৃষ্টিকারী হিসেবে নয় বরং একটি নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করতে চান।

দীর্ঘমেয়াদি খেলা

সব সংকটের মতোই গাজা সঙ্কটও শেষ হবে। এতে হয়তো আরও কয়েকমাস সময় লাগবে। এই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাগুলোও বন্ধ থাকবে। যতদিন ইসরায়েলি সৈন্যরা গাজায় থাকবে, ততদিন সৌদি-ইসরায়েল সংলাপে গতি ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই।

তবে, সৌদি-ইসরায়েল আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল হয়নি। ইসরায়েল সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপন করতে চায়। অন্যদিকে, সৌদিরা ইসরায়েলের শক্তিশালি অর্থনীতি থেকে উপকৃত হতে চায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত যেভাবে আব্রাহাম চুক্তিতে স্বাক্ষর করে উপকৃত হয়েছে।

ইসরায়েল ও সৌদি আরব উভয়ই এখনও ইরানকে প্রধান আঞ্চলিক হুমকি হিসেবে দেখে। যা তাদেরকে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্কের দিকে নিয়ে যাবে। তবে সৌদি আরব চায় ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে ইসরায়েল দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করুক। সৌদিদের এই চাওয়া হয়তো চুক্তিতে একটি বাধা হয়ে থাকবে। তবে গাজায় যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর ইসরায়েলে উদার কোনও দল ক্ষমতায় আসলে সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার সম্ভাবনাই বেশি।

অতীতে ইসরায়েলের সঙ্গে প্রতিটি আরব চুক্তির সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও একটি করে আরব চুক্তি হয়েছিল। ১৯৭৯ সালের মিশর-ইসরায়েল শান্তি চুক্তির সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও মিশরের চুক্তি হয়। ওই চুক্তির মাধ্যমে মিশরের যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আর্থিক এবং সামরিক সহায়তা পাওয়া শুরু হয়। তেমনি ১৯৯৪ সালে ইসরায়েল-জর্ডান শান্তি চুক্তির সময়ও যুক্তরাষ্ট্র-জর্ডান চুক্তি হয়। যার মধ্যদিয়ে জর্ডান ফের যুক্তরাষ্ট্রের সুনজরে আসে। ১৯৯০-৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধে ইরাকের সাদ্দাম হোসেনকে সমর্থন করায় জর্ডান যুক্তরাষ্ট্রের কুনজরে পড়েছিল।

২০২০-২১ সালে বাহরাইন, আরব-আমিরাত, ওমান, মরোক্কো ও সুদান আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয়। ইসরায়েলের সঙ্গে আব্রাহাম অ্যাকর্ডে সাক্ষর করা এই দেশগুলোর সঙ্গেও যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি হয়েছে। আব্রাহাম চুক্তির বিনিময়ে পশ্চিম সাহারাকে মরক্কোর সঙ্গে যুক্ত করার ব্যাপারে স্বীকৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সন্ত্রাসবাদে মদদদাতা রাষ্ট্রের তালিকা থেকে সুদানের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। আব্রাহাম অ্যাকর্ডের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসন সংযুক্ত আরব আমিরাতকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তাদের কাছে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি করা হবে। তবে জো বাইডেন ক্ষমতায় আসার পর তা স্থগিত করা হয়।

একইভাবে ইসরায়েল ও গাজায় যাই ঘটুক না কেন সৌদি আরবও যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কিছু সুবিধা পেতে চায়। ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সৌদি আরবের চাওয়া দুটি। এক. ইরানের হুমকি মোকাবেলায় প্রতিরক্ষা সহায়তা এবং নিরাপত্তা গ্যারান্টি। দুই. কঠোর বিধি-নিষেধ ও শর্ত আরোপ ছাড়াই বেসামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের জন্য পারমাণবিক শক্তি অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা। কিন্তু গাজায় যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে সৌদি-ইসরায়েল চুক্তি সম্ভব হবে না। ফলে সৌদি আরবের স্বপ্নও আপাতত পুরণ হচ্ছে না।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist