Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

নিজের কাঁটায় বিদ্ধ গোলাপ

আব্দুস সোবহান গোলাপ।

রিয়াদ মাহমুদ বরাবরই ভোট দেন আওয়ামী লীগকে। মাদারীপুর-৩ আসনের ভোটার তিনি। সেখানে এবার নৌকার প্রার্থী ছিলেন আব্দুস সোবহান গোলাপ। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক তিনি। তাকেই ভোট দিয়েছেন রিয়াদ। তবে মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে।

কেন- প্রশ্ন করলে রিয়াদ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমাদের এলাকায় কোনোদিন গোলাপ ভাইকে দেখি নাই। সে আসেও নাই কোনোদিন। শাজাহান দাদার (শাজাহান খান) খানের কথায় আমার ভোট গোলাপকে দিছি। শাজাহান দাদা যদি গোলাপকে সমর্থন না দিত, তাহলে কোনোদিন আমি গোলাপকে ভোট দিতাম না।”

কালকিনি ও ডাসার উপজেলা নিয়ে গঠিত মাদারীপুর-৩ আসনে আওয়ামী লীগের এই পাঁড় সমর্থকের মতো অনেকেরই গোলাপকে নিয়ে ছিল অসন্তোষ।

তাহমিনা বেগম

আর তার প্রভাবই দেখা গেল নির্বাচনে। গত ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে হারতে হল কেন্দ্রে প্রভাবশালী নেতা গোলাপকে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে তাকে হারিয়ে দেন কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি তাহমিনা বেগম।

একাদশ সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি তাহমিনা ঈগল প্রতীক নিয়ে পান ৯৬ হাজার ৬৩৩ ভোট। আসনটির বিদায়ী সংসদ সদস্য গোলাপ পান ৬১ হাজার ৯৭১ ভোট।

আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর ফরিদপুরের মাদারীপুরের এই আসনটিতে নৌকার হার অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য ঠেকছে। পাশাপাশি জাতীয় অঙ্গনে চেনা গোলাপের কাছে অনেকটাই অচেনা তাহমিনার জয়কে।

এই নির্বাচনে বিএনপি না থাকলেও আগে কখনও তাদের ভোট জয়-পরাজয়ে তেমন প্রভাব রাখতে পারেনি।

তাহলে কেন হারলেন গোলাপ- এই কৌতূহল রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ জোরাল।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, গোলাপ নিজেই নানা কারণে নিজেকে বিতর্কিত করে তুলেছিলেন, স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গেও তৈরি করেছেন দূরত্ব। যার প্রভাব পড়েছে ভোটের বাক্সে।

গোলাপ দাবি করছেন, ‘সুক্ষ্ম কারচুপি’ করে তাকে হারানো হয়েছে। কেন্দ্র দখল করে ব্যালটে সিল মেরেছেন তাহমিনার সমর্থকরা।

তাহমিনা অবশ্য সেই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, গোলাপ তার ‘অপকর্ম আর দুর্নীতি’র জবাবই পেয়েছেন ভোটে।

গোলাপ এলেন যেভাবে

কালকিনি ও ডাসার উপজেলার সঙ্গে মাদারীপুরের সদরের ৫ ইউনিয়নও এই আসনটিতে অন্তর্ভুক্ত। এখানে সংসদ সদস্য ছিলেন সৈয়দ আবুল হোসেন। পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর মন্ত্রিত্ব হারানোর পাশাপাশি ২০১৪ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন থেকেও বাদ পড়েন তিনি।

দশম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমকে আসনটিতে সংসদ সদস্য হন। কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের বড় একটি অংশ নিয়ে টানা পাঁচ বছর কাজ করেন তিনি। তবে আবুল হোসেনের সমর্থকদের কাছে পাননি তিনি। হোসেন ও নাছিম সমর্থকদের রেষারেষিতে ২০১৮ সালে দৃশ্যপটে গোলাপের আগমন। তখন তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী। গোলাপ নৌকা প্রতীকে ভোটে দাঁড়িয়ে বিপুল ভোটে জেতেন।

তবে এবার মনোনয়ন দেওয়ার আগে তৃণমূলের পছন্দের তালিকায় তার নাম ছিল না। তৃণমূল থেকে পছন্দের প্রার্থী হিসেবে শুধু নাছিমের নামই পাঠানো হয়েছিল। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে নাছিমকে ঢাকার একটি আসনে প্রার্থী করে মাদারীপুরে নৌকা দেওয়া হয় গোলাপকে।

হতে থাকেন বিতর্কিত

পাঁচ বছর আগে গোলাপ প্রথম এমপি হওয়ার পর নিজের নানা কর্মকাণ্ডে নিজেকে বিতর্কিত করে তোলেন।

অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্টের (ওসিসিআরপি) এক প্রতিবেদনে গোলাপের বিরুদ্ধে নির্বাচনের হলফনামায় তার যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগ আসে। সেই ঘটনাটি স্থানীয় ভোটারদের মধ্যেও আলোচনার জন্ম দেয়।

কালকিনিতে নিজের গ্রামে বিভিন্ন জনের জমি দখল, নিজেকে ভূমিহীন দাবি করে কালকিনি পৌর এলাকায় ১২ শতাংশ জমি ইজারা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তার প্রতিষ্ঠিত কলেজের নামে টিআর বরাদ্দ নিয়ে স্ত্রী গুলশান আরাকে সিপিসি কমিটির সভাপতি করে টাকা আত্মসাতের অভিযোগও ওঠে।

এছাড়া পুরো সংসদীয় এলাকায় গভীর নলকূপ বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রতিটি থেকে সর্বনিম্ন ১০ হাজার টাকা করে উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগও করেন কেউ কেউ।

আব্দুস সোবহান গোলাপ

এমপি হওয়ার পর পৌর ও ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেও বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন গোলাপ। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি প্রতিটি ইউনিয়নে একাধিক নেতাকর্মীকে নৌকার মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে কোটি কোটি টাকা নিয়েছেন।

এটাই তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের কাছে তাকে সবচেয়ে বিতর্কিত করে তোলে। কোভিড মহামারীর সময় তিন বছর এলাকায় তার না আসাও তৃণমূলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করে।

সবশেষ দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রচারে স্বতন্ত্র প্রার্থী তাহমিনার সমর্থক লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সদস্য এসকান্দার খাঁ হত্যাকাণ্ডের জন্য গোলাপ সমর্থকদের বিরুদ্ধে ওঠে অভিযোগের আঙুল।

ডাসার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা কাসেম হাওলাদারকে কালকিনি উপজেলা পরিষদে লাঞ্ছিত করাও গোলাপকে করে সমালোচিত।

এছাড়া এলাকায় আরও সন্ত্রাসী ঘটনার নেপথ্যেও গোলাপকে দায়ী করেন উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের নেতারা। এসব কর্মকাণ্ডের জন্য কালকিনি ও ডাসারের আওয়ামী লীগে নেতা-কর্মীদের সঙ্গে গোলাপের বিরোধ তৈরি হয়।

কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে ৬৭ পৃষ্ঠার একটি অভিযোগ নামাও যায় কেন্দ্রে।

গোলাপ ঠেকাতে একাট্টা

কালকিনিতে অভ্যন্তরীণ বিভেদে নাছিম ও প্রয়াত আবুল হোসেনের অনুসারী আওয়ামী লীগ নেতারা গোলাপকে ঠেকাতে তাহমিনার পক্ষে নেমেছিলেন।

মাদারীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শাজাহান খান পাশের আসনের গোলাপের পক্ষে কাজ করলেও কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের ৭১ সদস্যের কমিটির ৬৮ জন নেতাই তাহমিনাকে সমর্থন দেন।

মাদারীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ মোল্লার কথায়ও স্পষ্ট, তারা তাহমিনার পক্ষেই ছিলেন।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “গত ৩০ নভেম্বর আমার প্রাণের নেত্রী শেখ হাসিনা কালকিনিতে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকের জন্য জনসভা করেন। সেই জনসভায় যোগদান করার জন্য জেলা আওয়ামী লীগের ১১ জন নেতার নাম প্রস্তাব দেওয়া হয়।

আব্দুস সোবহান গোলাপ

“কিন্তু আবদুস সোবহান গোলাপ সাহেব আমাদের জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেন। এটা জেলার নেতা-কর্মীদের মনক্ষুন্ন করতেই পারে। তবে কালকিনিতে তাহমিনা বেগমের প্রতি আমাদের সমর্থন ছিল। তিনি গত প্রায় ৫০ বছর ধরে কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগকে একটি পরিবারের মতন আগলে রেখেছেন।”

“তিনি জয়লাভ করায় আমরা মনে করি, এখানে আওয়ামী লীগ হারেনি। আওয়ামী লীগের বিজয় হয়েছে। হেরেছেন একজন বিতর্কিত নৌকার মাঝি,” বলেন তিনি।

কালকিনি উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তৌফিকুজ্জামান শাহিনও তোলেন গোলাপের বিরুদ্ধে অভিযোগের ঝাঁপি।

তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “করোনাকালে তিনি কালকিনিতে একটি বারের জন্য আসেননি। তিনি সব সময় ঢাকায় থেকেছেন। এতে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয়।

“তিনি আমাদের এলাকার এমপি হলেও এই এলাকার তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের সাথে তার কোনও সম্পর্ক নেই। কর্মীদের তিনি চেনেনও না। তাই নির্বাচনে তার শোচনীয় পরাজয় হয়েছে।”

কালকিনি পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এনায়েত হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “টিআর এবং কাবিখাসহ বিভিন্ন সরকারি বরাদ্দে এমপি গোলাপ ও তার স্ত্রী গুলশান আরা বেগম ব্যাপক অনিয়ম করেছেন।

“বিভিন্ন অনিয়মের ফিরস্তি তুলে ধরে ৬৭ পৃষ্ঠার একটি অভিযোগ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এর কাছে পেশ করা হয়। তিনি একজন দুর্নীতিবাজ এমপি। জনগণের টাকা মেরে আমেরিকায় ৮/৯টি বাড়ি কিনেছে। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের শেষ নেই। তাই জনগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।”

ডাসার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক বিদ্যুৎ কান্তি বাড়ৈ বলেন, “এখানে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়নি। পরাজিত হয়েছেন গোলাপ। তার বিভিন্ন অন্যায় ও অনিয়মের কারণে জনগণ ফুঁসে উঠেছিল। তার জবাব জনগণ ব্যালটের মাধ্যমে দিয়েছে। একারণেই হেরেছেন তিনি।”

সদরের বাসিন্দা রিয়াদের মতো ডাসার উপজেলার বাসিন্দা রাকিবুল হাসানও সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এই নির্বাচনে ডাসার উপজেলা শহরে তাকে একদিনও দেখিনি। এখানকার মানুষজন তাকে তেমন চেনেও না। তাই তাকে আমি ভোট দিইনি। ভোট দিয়েছি ঈগল প্রতীকে।”

কালকিনি উপজেলার শহরের বাসিন্দা নাসির উদ্দিন সকাল সন্ধ্যাকে বললেন, “কালকিনিতে গোলাপ ভাইর কর্মী সমর্থক তেমন নেই। আওয়ামী লীগ যারা করেন, তাদের সাথেও তার উঠাবসা নেই।

“গোলাপ সাহেব বলেন, করোনার সময় প্রধানমন্ত্রীর অফিসে বসে সবসময় অফিস করতেন, তাই এলাকায় আসতে পারেনি। এসব কথা আমাদের জনগণকে বলে কোনও লাভ নাই। জনগণ হিসাব করে ভোট দিছে, তাই সে ফেল করছে।”

গোলাপের দাবি, সুক্ষ্ম কারচুপি

নানা অনিয়মের অভিযোগ বরাবরই প্রত্যাখ্যান করে আসছেন গোলাপ। তার দাবি, এসব তার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে প্রতিপক্ষের প্রচার।

ভোটের প্রচারে আব্দুস সোবহান গোলাপ

ভোটে হারার দুদিন পর ৯ জানুয়ারি মাদারীপুর প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে আসেন তিনি; বলেন, ‘সুক্ষ্ম কারচুপি’ করে তাকে হারানো হয়েছে। তার সঙ্গে শাজহান খানও ছিলেন, জিনি পাশের আসনে জিতেছেন।

গোলাপ বলেন, ঈগল প্রতীকের প্রার্থী পক্ষে একটি ‘অদৃশ্য’ শক্তি প্রভাব বিস্তার করে সুক্ষ্ম কারচুপি করে তাকে হারিয়েছে।

“আর আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার করে আমার ভাবমূর্তি নষ্ট করেছে তারা।”

তিনি অভিযোগ করেন, নৌকার ভোটারদের বাধা দিয়েছে তাহমিনার সমর্থকরা। কালকিনি পৌরসভাসহ বিভিন্ন কেন্দ্রে নৌকার পোলিং এজেন্টদের বের করে দিয়েছে।

কালকিনি পৌরসভার ১৬টি কেন্দ্রের মধ্যে ১২টি কেন্দ্র ঈগলের প্রার্থী দখল করেছিল।

“এই ১২টা কেন্দ্রে আমাদের নৌকার কোনো এজেন্ট ছিল না। এ কারণে ঈগল একচেটিয়া ওখানে ভোট কেটে নিয়ে গেল। অন্য কয়েকটি ইউনিয়নেও তারা একচেটিয়া ভোট নিয়ে“েছ।”

তবে তাহমিনা এসব অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে বলেন, “আবদুস সোবহান গোলাপ সাহেবের অন্যায়, অপকর্ম ও দুর্নীতির কারণে মাদারীপুর-৩ আসনের জনগণ তাকে প্রত্যাখ্যান করেছে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist