Beta
শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

সাক্ষাৎকার

সরকারের মানবাধিকার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে  

সুলতানা কামাল

টানা চতুর্থবার সরকার গঠন করা আওয়ামী লীগের সামনে অর্থনীতি-রাজনীতির পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ কতটা? মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা প্রশ্নের কোনও সদুত্তর কি নতুন সরকার দিতে পারবে? দুর্নীতি দমনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার কি বাস্তবায়িত হবে? বিরোধী দলহীন নতুন সংসদ কি নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারবে? এসব প্রশ্ন নিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, আইনজীবী-মানবাধিকারকর্মী ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের সঙ্গে কথা বলেছে সকাল সন্ধ্যা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সকাল সন্ধ্যার জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক আশফাকুর রহমান

সরকারের মানবাধিকার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে  

সুলতানা কামাল

টানা চতুর্থবার সরকার গঠন করা আওয়ামী লীগের সামনে অর্থনীতি-রাজনীতির পাশাপাশি গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ কতটা? মানবাধিকার ও বাকস্বাধীনতা প্রশ্নের কোনও সদুত্তর কি নতুন সরকার দিতে পারবে? দুর্নীতি দমনের রাজনৈতিক অঙ্গীকার কি বাস্তবায়িত হবে? বিরোধী দলহীন নতুন সংসদ কি নাগরিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখতে পারবে? এসব প্রশ্ন নিয়ে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা, আইনজীবী-মানবাধিকারকর্মী ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের চেয়ারপারসন সুলতানা কামালের সঙ্গে কথা বলেছে সকাল সন্ধ্যা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সকাল সন্ধ্যার জ্যেষ্ঠ সহ-সম্পাদক আশফাকুর রহমান

সকাল সন্ধ্যা: নতুন সরকার গঠন হয়েছে। সরকারের সামনে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ দৃশ্যমান। টানা চতুর্থবার দায়িত্ব নেওয়া আওয়ামী লীগ সরকারের সামনে আর কোন কোন চ্যালেঞ্জ রয়েছে?

সুলতানা কামাল: আরও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। শুধু অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ দিয়ে সব কিছু বোঝা যাবে না। আবার রাজনৈতিক বিষয়ে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালীভাবে গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এছাড়া তারা বারবার ঘোষণা করেছে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা দেখাবে। যদিও তারা এখনও সেটি করতে পারেনি। কারণ আমরা বিগত দিনে দেখেছি, দুর্নীতিবাজরা সবসময় ক্ষমতাসীনদের সাথে থাকে। ক্ষমতাবানদের সাথে থেকেই তারা সবসময় দুর্নীতি করে গেছে। নানাসময়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের মাধ্যমে আমরা এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে পেরেছি।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে, মানবাধিকার সম্পর্কে সরকার কিংবা ক্ষমতাসীনদের মনোভঙ্গি। সরকারের মানবাধিকার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। এই বিষয়টি তাদের পরিবর্তন করতে হবে। কারণ অনেকে মনে করেন, মানবাধিকার একটা পশ্চিমা ধারণা। যা সত্য নয়। আন্তর্জাতিক ফোরামে মানবাধিকারের দলিলটি রচিত হয়েছিল। শুধু পশ্চিমারা সেখানে ছিল না। কঠিন কিছু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে মানবজাতি জাতিসংঘ গঠন করে সেই দলিলটি তৈরি করেছে।

আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রেও আছে, আন্তর্জাতিকভাবে যে দায়দায়িত্ব সেটা আমরা গ্রহণ করব। আমরা জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র। এ সংস্থার সদস্যরা যেসব বিষয়ে সম্মত হয়ে স্বাক্ষর করেছে সেগুলো মেনে চলার একটা দায় সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের আছে।

এখন যারা সরকার গঠন করেছে, তারাই কিন্তু স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের সময় ‘তিন জোটের রূপরেখা’ প্রণয়ন করেছিল। সেখানে পরিষ্কারভাবে বলা ছিল, তারা একটি সুষ্ঠু নির্বাচন দেবে। বিরোধী দলের প্রতি সহনশীল হবে। বিরোধী দলকে তারা সমান সুযোগ দেবে। আরেকটি বিষয় তারা পরিষ্কারভাবে বলেছিল, গণমাধ্যমের ওপর যে নিয়ন্ত্রণ সেটি তারা আর রাখবে না। গণমাধ্যম যেন যথেষ্ট স্বাধীনতা ভোগ করতে পারে সে বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

তখন স্পষ্টভাবে নির্দিষ্ট কিছু আইনের কথাও বলা হয়েছিল, যে আইনগুলো ‘কালাকানুন’ বলে পরিচিত— সেগুলো তারা বাতিল করবে। এটিও তারা করেনি। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি সই করেছেন বর্তমান প্রধামন্ত্রী। সেটিরও পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়নি। সংখ্যালঘু ও সমতলের আদিবাসীদের দীর্ঘদিন ধরে একটা আবেদন ছিল— তাদের জমি, সম্পত্তি ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়ার। এ বিষয়ে একটি সংখ্যালঘু কমিশন ও আদিবাসী কমিশন এ সরকারকে করতে হবে।

আওয়ামী লীগ এবার তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, গণতন্ত্রের প্রতি তারা কিছুটা জোর দিবে। সুশাসন বিষয়টি নিশ্চিত করবে। এটি তাদের জন্য বিরাট একটি চ্যালেঞ্জ। অর্থপাচার বন্ধ করা তাদের জন্য বিরাট একটি কাজ। সিন্ডিকেট ভাঙাও একটি কাজ। এসব বিষয় নিশ্চিত করা বর্তমান সরকারের কর্তব্য।

মানুষ এখন অনেক বিষয়ে সহনশীল হয়ে গেছে। এ নির্বাচনটিও মানুষ মেনে নিয়েছে। কারণ মানুষ শান্তিপূর্ণ জীবন চায়। অশান্তির মধ্যে থাকতে চায় না। নৈরাজ্য যেখানে হবে, সেখানে মানুষ আর সম্পৃক্ত হতে চায় না। যে কারণে বিএনপি তার আন্দোলনে কাউকে যুক্ত করতে পারেনি। কিন্তু মানুষ একইসঙ্গে চায় তার দৈনন্দিন জীবনটা শান্তিপূর্ণ হবে— যে যেমন অর্থনৈতিক অবস্থানেই থাকুক না কেন— দুইবেলা খেয়ে, ছেলে-মেয়েদের শিক্ষা ব্যয় ও স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করতে পারবে। কারও কাছে যেন তাকে মুখাপেক্ষী হতে না হয়। এ চ্যালেঞ্জগুলো কিন্তু রয়েছে।

আরেকটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে, মানবাধিকার সম্পর্কে সরকার কিংবা ক্ষমতাসীনদের মনোভঙ্গি। সরকারের মানবাধিকার দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। এই বিষয়টি তাদের পরিবর্তন করতে হবে। কারণ অনেকে মনে করেন, মানবাধিকার একটা পশ্চিমা ধারণা। যা সত্য নয়।

সকাল সন্ধ্যা: আওয়ামী লীগের এবারের নির্বাচনী ইশতেহারের শ্লোগান— ‘স্মার্ট বাংলাদেশ: উন্নয়ন দৃশ্যমান, বাড়বে এবার কর্মসংস্থান’। ইশতেহারের বিশেষ অগ্রাধিকারগুলোর একটি— ‘কর্মোপযোগী শিক্ষা ও যুবকদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা’। নতুন সরকার এ বিষয়ে কতটা উদ্যোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারবে বলে মনে করেন?

সুলতানা কামাল: এটা এ সরকারের জন্য একটা চ্যালেঞ্জ। এটা তারা আগে মোকাবেলা করুক। আসলে বাস্তবায়ন করার অবস্থা সবসময় থাকে না, অবস্থা তৈরি করে নিতে হয়। অনেক অবস্থাই আমাদের ছিল না, আমরা তৈরি করে নিয়েছি।

মুক্তিযুদ্ধের আগে আমাদের দেশ কি স্বাধীন হওয়ার অবস্থায় ছিল? আমরা কিন্তু সেটা করে নিয়েছি। রাজনীতিবিদদের কাছে এসব চ্যালেঞ্জ হিসেবে আসে। তারা তাদের বুদ্ধি ও বোধ দিয়ে, জনসাধারণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা তৈরি করে এমনভাবে নীতি-নির্ধারণ করে যেন একটা একটা করে ধাপ পেরিয়ে সেই জায়গায় পৌঁছানো যায়। আমরা অন্তত পদক্ষেপগুলো দেখতে চাই। কিন্তু সেই পদক্ষেপগুলোও আমরা দেখছি না। বিগত সরকারগুলোর মধ্যেও সেই চিন্তা-ভাবনা কিংবা আন্তরিকতা আমি দেখিনি। সেই জন্যই এই প্রশ্নগুলো বারবার তুলে যাচ্ছি।

সকাল সন্ধ্যা: মানবাধিকার বিষয়ে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির কথা বললেন। যদিও বাংলাদেশ মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর প্রশ্নের মুখে রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে…

সুলতানা কামাল: মানবাধিকার বিষয়ে আপনারা শুধু পশ্চিমা দেশগুলোর মতামত নিয়েই বারবার প্রশ্ন করেন। আমরা, দেশের মানবাধিকার কর্মীরা যে এতদিন ধরে প্রশ্ন করছি— সেটি বলেন না কেন? আমরাও দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে আসছি। তার মানে, আমাদের প্রশ্নের কোনও মূল্য নেই? পশ্চিমারা প্রশ্ন তুললেই আপনাদের কাছে গুরুত্ব পায়? আমাদের প্রশ্নগুলো নিয়ে প্রশ্ন করেন না কেন?

সকাল সন্ধ্যা: মানবাধিকার নিয়ে প্রশ্নের মুখে থাকার পরও আমরা দেখছি, এবারের মন্ত্রিসভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং আইন ও বিচার মন্ত্রী বহাল আছেন। তাহলে কি বিচারবিভাগের কাজ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় সরকার সন্তুষ্ট বলেই তাদের স্বপদে রেখে দিয়েছে? আপনি কি মনে করেন, এ দুই ক্ষেত্রে কি রদবদলের প্রয়োজন ছিল?

সুলতানা কামাল: সরকারকে অতিরিক্ত তুষ্ট করেছে বলেই তারা টিকে গেছেন। সরকারকে তারা সন্তুষ্ট করেছেন ঠিকই; কিন্তু মানুষ সন্তুষ্ট আছে কিনা সেটা একটি দেখার ব্যাপার। আবার রদবদল যে হয়নি তার কারণ হয়ত, সরকার তাদের যেভাবে চালাতে বলেছেন— তারা সেভাবেই চালিয়েছেন।   

সকাল সন্ধ্যা: ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবি আছে বিভিন্ন পক্ষের। সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা এ বিষয়ে সরব। সরকার আগের আইনটি সংশোধন করে নতুন আইনও করেছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে গণমাধ্যম এবং নাগরিকদের বাক স্বাধীনতা কতটা অর্জিত হলো?

সুলতানা কামাল: সরকার এ আইন যতটা সংশোধন করেছে তা যথেষ্ট নয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, এই আইনটির ভেতরে নিবর্তনমূলক যে ধারাগুলো ছিল— সেগুলো কিন্তু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে অন্য নামে এ আইনের মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে। কাজেই মৌলিকভাবে এই আইনের চরিত্রের কোনও পরিবর্তন হয়নি। আগে বাক স্বাধীনতা খর্ব করতে, দুর্বল-সংখ্যালঘুদের ওপরে, সাংবাদিকদের ওপরে যেভাবে এ আইনের ব্যবহার হয়েছে— এটার যে খুব একটা পরিবর্তন হবে— সেটা আশা করতে পারছি না।

সকাল সন্ধ্যা: রাজনীতিবিদ ও আমলাদের অর্থ-সম্পদ বৃদ্ধি ও পাচার একটি সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। সমাজ ও রাষ্ট্রে যেন এ বিষয়ে এক ধরনের ‘বৈধতা’ রয়েছে। সংসদ নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের দেওয়া হলফনামা নিয়ে টিআইবি বলেছে, ‘ব্যবসা রাজনীতি ক্ষমতা একাকার হয়ে গেছে।’ এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। সরকার, সংসদ ও দুর্নীতি দমন কমিশন এ বিষয়ে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে?  

সুলতানা কামাল: আমি আসলে এ বিষয়ে সরকার, সংসদ ও দুর্নীতি দমন কমিশন— কোথাও কোনও পরিবর্তন দেখি না। একটা কাঠামোর ভেতরে কিছু ব্যক্তির নড়চড় হয়েছে। এছাড়া ওই একই ব্যাপার রয়ে গেছে। নেতৃত্বে যারা ছিল তারাই তো আছে। যারা নেতৃত্বের জন্য কাজকর্ম করেছেন, সুযোগ-সুবিধা নিয়েছেন তারাই তো আছে। কাজেই এ বিষয়ে আমি আশাবাদী হতে পারছি না। তবে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘অতীতের ভুল-ক্রটি আমরা যেন ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখি।’ দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতার কথা বলার পরও দুর্নীতি রয়ে গেছে। বলা হয়েছে, এগুলো তো এক একটা ভুল-ত্রুটি। সেখান থেকে যদি অবস্থার পরিবর্তন হয়— তখন আমরা বলতে পারব, একটা কাজের কাজ হয়েছে।

সকাল সন্ধ্যা: আপনি বাংলাদেশের সংবিধানে থাকা ক্রটি বা বৈষম্যের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলছেন। এ বিষয়ে কতটা অগ্রগতি হলো?

সুলতানা কামাল: কোনও অগ্রগতি হয়নি। বরং সংবিধান অনেক কাটাছেঁড়া করে এখন যে অবস্থায় এসেছে, যেমন— ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম দুটোই একসাথে রয়েছে। এছাড়া সব নাগরিককে বাঙালি পরিচয়ে পরিচিত হতে হবে— এটিও সংবিধানে রয়ে গেছে। একটার পর একটা যে সংশোধন আনা হয়েছে তাতে শাসকদের সুবিধা হয়েছে, জনগণের কোনও সুবিধা হয়নি। ফলে, আরও নতুন কোনও সংশোধনী হলে আমাদের দেখতে হবে— এগুলো তারা নিজেদের জন্য করছে, না জনগণের স্বার্থে করছে।

সকাল সন্ধ্যা: আপনি নিজে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় শক্তিশালী বিরোধী দলের কথা বলে আসছেন দীর্ঘদিন থেকে। ‘টিআইবি’ অকার্যকর সংসদের কথা বলেছে…

সুলতানা কামাল: আমাদের সংসদটা এমন, যেখানে বিরোধী দল বলে কিছু নেই। আমরা দেখেছি যে প্রতিটি নীতি-নির্ধারণের বিষয়েই প্রথমে আমলারা খসড়া করে। এরপর সেটি মন্ত্রিসভায় পাস হয়। তারপর তা নামকাওয়াস্তে সংসদে গেছে। সংসদও সেটি পাস করে দিয়েছে। আমরা এখন পর্যন্ত দেখিনি যে, একটা কোনও আইন প্রণয়নের আগে সংসদে সেটি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক হয়েছে— ভালো-মন্দ নিয়ে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। যে সকল পক্ষ কোনও আইনের সাথে জড়িত কিংবা যাদের জন্য এ আইন প্রযোজ্য তাদের সাথে মাঝে মাঝে আলোচনা হয়েছে বটে কিন্তু তাদের সুপারিশগুলো আইনের মধ্যে রাখা হয়নি। ফলে এ সংসদও যে খুব কার্যকর সংসদ হবে এমন আশা এখনও করতে পারছি না।

সকাল সন্ধ্যা: এবারের সংসদে ৬২ জন স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রয়েছে। এবার কি আমরা কার্যকর সংসদ আশা করতে পারি?

সুলতানা কামাল: এ বিষয়ে মন্তব্য করলে ব্যাপারটা খুব তড়িঘড়ি হয়ে যাবে। এখন দেখতে হবে, তারা কোন ভূমিকা পালন করে? তারা কি আওয়ামী লীগ বা সরকার পক্ষের সাথে মিশে যাবে? নাকি স্বতন্ত্র সংসদ সদস্যরা সত্যিকারের বিরোধী দলের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে ভূমিকা পালন করবে? আসলে এ বিষয়ে মন্তব্য করার মতো সময় এখনও হয়নি।

সকাল সন্ধ্যা: ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলগুলো এবার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেনি। এর ফলে কি রাজনীতির মাঠে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির চর্চা দুর্বল হবে বলে মনে করেন?  

সুলতানা কামাল: ইসলামপন্থী দলগুলো সরাসরি ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করে। তাদের বিষয়ে আমাদের মূল আপত্তি হলো, তারা অত্যন্ত সহিংস রাজনৈতিক কৌশল অবলম্বন করে। যখন তাদের কথা শোনা হয় না— তারা শারীরিকভাবে নির্যাতন করে, আক্রমণ করে, মানসিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করে। তারা নানা কিছুর দোহাই দিয়ে মানুষকে তাদের দলে নেওয়ার চেষ্টা করে। যেটা খুবই অন্যায়। ব্যক্তি মানুষ বা জনসাধারণকে মুক্তচিন্তার কোনও সুযোগ তারা দেয় না।

এছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলো— বিশেষ করে আওয়ামী লীগ, বিএনপিও তো ধর্মভিত্তিক রাজনীতির চর্চা করে। তারা তো এখন ধর্মকে রাজনীতিতে টেনে নিয়ে আসে। আওয়ামী লীগের মতো একটি দল— যারা এক সময় ধর্মভিত্তিক রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসেছিল, তারা যদি আবারও ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ত্যাগ করে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তবুদ্ধির রাজনীতির চর্চা নিজেদের মধ্যে শুরু করে এবং জনগণকেও সেই সুযোগ করে দেয়, তাহলে দেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতির চর্চা দুর্বল হওয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হতে পারে।

সকাল-সন্ধ্যা: এমন রাজনীতির প্রশ্নে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে দেশের জনগণের পক্ষে আসলে কতটা ভূমিকা রাখা সম্ভব বা রাষ্ট্রে এর কতটা সুযোগ আছে?  

সুলতানা কামাল: জনগণ কিন্তু যথেষ্ট সচেতন। সে যে খেতে পারছে না, ছেলে-মেয়েদের সুশিক্ষা দিতে পারছে না— এটা তারা খুব ভালো করে জানে। ছেলে-মেয়েকে বিদেশে পাঠাতে তাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে। যারা নিম্নবিত্তের মানুষ, জীবনের ঝুঁকি নিয়েও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশ যেতে চাচ্ছে। নারীরা নিযার্তিত হয়ে দেশে ফিরে আসলেও তারা আবার বিদেশ যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে যাচ্ছে। এই দেশে যে সাধারণ মানুষের জন্য এখনও কিছু হয়নি— এ সচেতনতা কিন্তু আমাদের আছে। এ সচেতনতা পরির্তন করতে যে রাজনৈতিক শক্তি দরকার সেটি আমাদের নেই।

আমাদের দুভার্গ্য যে, রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় গিয়ে অনেক শক্তি অর্জন করেছে, অনেক সুযোগ-সুবিধা নিয়েছে। রাজনীতিতে থাকা প্রধান বিরোধী শক্তিও জনগণের স্বার্থে কাজ করছে না। তাদেরও উদ্দেশ্য, কীভাবে ক্ষমতায় যাবে। জনগণ একা একা কোনও পরিবর্তন আনতে পারে না, তাদের একটা রাজনৈতিক শক্তি দরকার হয়। দুভার্গ্যবশত আমাদের এমন কোনও রাজনৈতিক দল বা শক্তি নেই যারা জনগণকে শক্তিশালী করবে। আমাদের একটা সংবেদনশীল জনস্বার্থপ্রেমী রাজনৈতিক শক্তি দরকার। এর জন্য আমাদের অনেক লম্বা পথ হাঁটতে হবে।

সকাল সন্ধ্যা: আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সুলতানা কামাল: আপনাকেও ধন্যবাদ।

ad

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist