Beta
সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৪

হাইতির নিরাপত্তা আবেদন : কার কী সাড়া

বিক্ষোভের সময় হাইতির পতাকা হাতে এক বিক্ষোভকারী।
বিক্ষোভের সময় হাইতির পতাকা হাতে এক বিক্ষোভকারী।

উত্তর আমেরিকার দেশ হাইতি। দেশটিতে গত কয়েক বছর ধরেই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি চলছে। সংঘবদ্ধ সশস্ত্র দলগুলোর হাতে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশটির মানুষ।

অবস্থা থেকে পরিত্রাণের জন্য এক বছর আগে দেশটির সরকার রাজধানী পোর্ট-আ-প্রিন্সের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারে একটি বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনে আনুষ্ঠানিকভাবে অনুরোধ করেছিল। কারণ গ্যাংগুলো রাজধানীর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে।

এই সময়ে দেশটির সামগ্রিক পরিস্থিতির তেমন কোনও উন্নতি হয়নি। তবু চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন হাইতির প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল হেনরি। গত সপ্তাহে তিনি কেনিয়া গিয়েছিলেন দেশটির নেতৃত্বের সঙ্গে তার দেশের নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে চুক্তি করতে।

হাইতির পরিস্থিতি ক্রমশ আরও খারাপ হচ্ছে। সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা সম্প্রতি কারাগার ভেঙে কয়েক হাজার বন্দিকে মুক্ত করে দিয়েছে। রাজধানীর অবস্থা নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে সরকার। নিজেদের জীবন বাঁচাতে সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র থেকে পালিয়েছে বহু মানুষ।

জাতিসংঘ বলছে, হাইতিতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতে কয়েক লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত ও কয়েক হাজার নিহত হয়েছে। ধর্ষণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণের জন্য অপহরণের মতো ঘটনাও ব্যাপকহারে ঘটছে।

হাইতির সশস্ত্র গ্যাং সদস্যরা।

ঘটনার প্রেক্ষাপট

প্রধানমন্ত্রী হেনরি ২০২২ সালের অক্টোবরে প্রথমবারের মতো হাইতিতে দ্রুত একটি বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনের আহ্বান জানান। তার উদ্দেশ্য ছিল দেশটির পুলিশকে শক্তিশালী সন্ত্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে সহায়তা করা। সন্ত্রাসীরা দ্রুত তাদের প্রভাব ও সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছিল। ফলে পোর্ট-অব-প্রিন্সে ভয়াবহ মানবিক সংকট দেখা দেয়।

এক বছর পর জাতিসংঘ একটি প্রস্তাব পাস করে বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনের অনুমোদন দিয়ে কাঠামো নির্ধারণ করে। প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, মিশনটি জাতিসংঘের নেতৃত্বে পরিচালিত না হলেও তত্ত্বাবধানে ভূমিকা রাখবে। এই লক্ষ্যে একটি তহবিল গঠন করা হবে। এতে সহায়তা দানে আগ্রহী দেশগুলোর কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি নেওয়া হবে।

বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনে দেশগুলো খুব একটা সাড়া দিচ্ছে না। অনেকেই হেনরির সরকারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। কারণ দেশটিতে এই সরকারের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভ চলছে। আর দেশটিতে আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে অনেকেই সতর্ক।

বিশেষ করে হাইতি ও বিদেশে অবস্থানরত হাইতির অনেক নাগরিক বহুজাতিক বাহিনী মোতায়েনের বিরুদ্ধে। কারণ এর আগের জাতিসংঘ মিশনগুলোর পরে দেশটিতে ভয়াবহ কলেরা মহামারি ও মিশনের সদস্যদের হাতে যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। এর জন্য কখনোই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়নি।

গত বছর কেনিয়া এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু হাইতির আদালত জানায়, এর জন্য হাইতির পক্ষ থেকে একটি পারস্পরিক চুক্তির প্রয়োজন। এই চুক্তি স্বাক্ষর করতেই প্রধানমন্ত্রী হেনরি তার দেশের সংঘাতময় পরিস্থিতির মধ্যেও নাইরোবিতে যান।

হেনরি গত মঙ্গলবার পুয়ের্তো রিকোতে পৌঁছান। সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়, ডমিনিকান প্রজাতন্ত্র হেনরিকে তাদের আকাশপথ ব্যবহার করে হাইতিতে প্রবেশ করতে বাধা দিয়েছে।

সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে অভিযানরত হাইতির সেনাবাহিনীর একাংশ।

সেনাবাহিনী

জাতিসংঘ গত মাসে জানায়, পাঁচটি দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ওই বাহিনীতে সৈন্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দেশগুলোর মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক সেনা পাঠানোর কথা বলেছে বেনিন, এই সংখ্যা দেড় হাজার। সাদ, বাংলাদেশ ও বার্বাডোসও আনুষ্ঠানিকভাবে সৈন্য পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এছাড়া বাহামাস আগে জানিয়েছিল যে তারা ১৫০ কর্মী পাঠাবে।

কেনিয়া ১ হাজার পুলিশ কর্মকর্তা দিয়ে এই বাহিনীর নেতৃত্ব দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গত বছরের শেষের দিকে কেনিয়ার সংসদ সদস্যরা বুরুন্ডি ও সেনেগাল থেকেও সহায়তা পাওয়ার পরিকল্পনার কথা জানায়।

এদিকে মধ্য আমেরিকার দেশ বেলিজের একটি সংবাদমাধ্যম জানায়, তাদের দেশও হাইতিতে ৫০ জন সেনা পাঠাবে। এর বাইরে অ্যান্টিগুয়া, বার্বুডা ও সুরিনামও সেনা ও কর্মী পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে।

জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী, এই বাহিনী মোতায়েনে রাষ্ট্রগুলোকে আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘের মহাসচিবকে জানাতে হবে। এই প্রক্রিয়ার জন্য কোনও নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়নি।

প্রসঙ্গত, ২০০৪-১৭ সালে হাইতিতে জাতিসংঘের মিনুস্তাহ মিশন ব্যাপক সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছিল। এই মিশনের জন্য প্রাথমিকভাবে ৬ হাজার ৭০০ সেনা মোতায়েনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।

ব্রাসেলসভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের গবেষকরা বলেছেন, কেনিয়ার মূল্যায়ন অনুসারে এই মিশনের জন্য ৫ হাজার সেনা-কর্মী এবং বছরে প্রায় ২৪০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় হতে পারে।

জাতিসংঘের সহায়তা হস্তক্ষেপ করে র‌্যালি।

তহবিল

যুক্তরাষ্ট্র এই বাহিনীর জন্য সবচেয়ে বেশি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেওয়া দেশ। তারা ২০০ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। দেশটি আরও জানায়, গায়ানাও অর্থায়ন করবে, তবে কতটা তা স্পষ্ট নয়।

এরপর কানাডা প্রায় ৫৯ ও ফ্রান্স ৩ মিলিয়ন ডলার অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দেয়। এছাড়াও ফ্রান্স মিশনের জন্য ফরাসি ও ক্রিওল ভাষা প্রশিক্ষণের জন্য আরও ৯ লাখ ২৪ হাজার ডলার দেবে।

জাতিসংঘের একজন মুখপাত্র জানান, গত ৫ মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৭৮ মিলিয়ন ডলার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কানাডা ও ফ্রান্স থেকে তহবিলে ১১ মিলিয়ন ডলারেরও কম জমা পড়েছে। জরুরি অবস্থা ঘোষণার পর থেকে কোনও পক্ষই আর তহবিলে অর্থ জমা দেয়নি।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বারবার আরও দেশকে, বিশেষ করে ফরাসি-ভাষী দেশগুলোকে তহবিল দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছেন।

হাইতি দীর্ঘ ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ফ্রান্স ও যুক্তরাষ্ট্রকে ক্ষতিপূরণ দিয়েছে। এই ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কারণ হাইতিয়ান বিপ্লবের সময় দেশটিতে থাকা ওই দেশ দুইটির সম্পত্তি (এর মধ্যে দাসও ছিল) নষ্ট হয়েছিল।

হাইতির ঋণের বোঝা অনেক ভারী ছিল। ঋণ পরিশোধের জন্য দেশটিকে পুনরায় ঋণ নিতে হয়েছিল। নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানে বের হয়, এই ঋণের বোঝার কারণে হাইতির উন্নয়ন ব্যাহত হয়। দেশটির ক্ষতি হয় কয়েক বিলিয়ন ডলার। হাইতি বর্তমানে পশ্চিম গোলার্ধের সবচেয়ে দরিদ্র দেশ।

অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি, স্পষ্ট সীমাবদ্ধতা

কয়েক ডজন দেশ হাইতিকে সমর্থনের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। উল্লেখযোগ্য দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পেন ও জ্যামাইকা।

দ্য মিয়ামি হেরাল্ড বলছে, মঙ্গোলিয়া, গুয়াতেমালা, ইতালি ও পেরুও সমর্থনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এল সালভাদর জানিয়েছে তারা নিজেদের নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত অভিজ্ঞতা বিনিময় করবে।

মিশনটি বাস্তবায়িত হয়েছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।

প্রতিবেশি ডমিনিকান রিপাবলিক স্পষ্ট করে বলেছে, তারা বহুজাতিক বাহিনীতে অংশ নেবে না। দেশটির প্রেসিডেন্ট বলেছেন, তাদের ভূখণ্ডে হাইতিয়ান শরণার্থী শিবির স্থাপন করতে দেওয়া হবে না।

চুক্তি সাক্ষর অনুষ্ঠানে বায়ে হাইতির পরিবেশমন্ত্রী জেমস ক্যাডেট, ডানে কেনিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিথুরে কিনডিকি।

বলপ্রয়োগ

জাতিসংঘ হাইতিতে ‘মাল্টিন্যাশনাল সিকিউরিটি সাপোর্ট মিশন’ নামে একটি নতুন নিরাপত্তা মিশন অনুমোদন করেছে। এর উদ্দেশ্য হলো – সম্ভাব্য গ্যাংগুলোর বিরুদ্ধে ‘প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ’ নেওয়া, মানবিক সহায়তার জন্য রুট নিরাপদ করা, মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া ও হাইতির পুলিশকে সহায়তা করা।

জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ স্কুলের জ্যেষ্ঠ কনফ্লিক্ট লেকচারার সিনিশা ভুকোভিচ বলেন, “জাতিসংঘের ম্যান্ডেট স্পষ্টভাবে বেসামরিক ব্যক্তিদের উপর সহিংসতাকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অনুমতি দেয়। কিন্তু দাতা দেশগুলো তাদের সেনাদের উপর কী ধরনের সীমাবদ্ধতা আরোপ করবে তা এখনও স্পষ্ট নয়।”

ভুকোভিচের মতে, অতীতে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ‘মিনুস্তাহ’ এর সদস্যদের কর্মকাণ্ডের ফলে কয়েক ডজন বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছিল। সেসময় একে আত্মরক্ষা হিসাবে ন্যায্যতা দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মিশনটি বেসামরিকদের নিরাপদ রাখার পাশাপাশি সহিংসতা মোকাবিলার জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না।

ভুকোভিচ প্রশ্ন রেখে বলেন, “এবার আসলে কী আলাদা হবে? এটা স্পষ্ট যে এটি হবে একটি ‘জোড়াতালি’ মিশন। এতে অবদান রাখা দেশগুলোর রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist