Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

মিয়ানমার নিয়ে ভারতেরও উদ্বেগ আছে : পররাষ্ট্রমন্ত্রী

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। ছবি : সকাল সন্ধ্যা

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভালের সঙ্গে বৈঠকে মিয়ানমার পরিস্থিতি তুলে ধরেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ।

দিল্লি সফর নিয়ে সোমবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “মিয়ানমারের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছি। মিয়ানমারে এখন যে সংঘাত চলছে এটা আমাদের অঞ্চলে সমস্যা সৃষ্টি করছে, সেটা থেকে উত্তরণে আমরা একযোগে কাজ করব কীভাবে, সেটা নিয়ে আলোচনা করেছি।”

এসময় রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের কাছে আবারও সহায়তা চাওয়ার কথাও জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

মিয়ানমার পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশ-ভারত কীভাবে কাজ করবে জানতে চাইলে হাছান মাহমুদ বলেন, “দুই দেশ তাদের (মিয়ানমারের) সঙ্গে সীমান্ত শেয়ার করি। সুতরাং, মিয়ানমারে কোনও পরিস্থিতি হলে সেটা আমাদের যেভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও উদ্বিগ্ন করে তাদেরও (ভারতকে) করে। প্রতিবেশীকে নিয়ে দুজনের উদ্বেগ।

“সুতরাং আমাদের অনেকগুলো বিষয় আছে, একসঙ্গে কাজ করার মতো। বিশেষ করে, রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে সব সময় ভারতের সহায়তা চেয়েছি, এবারও চেয়েছি। আমরা আঞ্চলিক উপ-আঞ্চলিক ফোরামে একযোগে কাজ করি। সেটায় কীভাবে সহযোগিতা বাড়ানো যায়, আলোচনা করেছি।”

চলমান সংঘাতের কারণে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ (বিজিপি) বিভিন্ন সংস্থা ও তাদের পরিবারের সদস্যদের ‘সহসাই’ দেশটিতে ফেরত পাঠাতে পারবেন বলে আশা করছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তবে তাদের কবে নাগাদ ফেরত পাঠানো হবে সেই দিনক্ষণ প্রকাশ করতে রাজি নন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “মিয়ানমার থেকে তাদের যে সমস্ত বর্ডার গার্ড, সেনাবাহিনী এবং তাদের পরিবারের যারা বাংলাদেশে এসেছে তাদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে আমরা ঐক্যমতে পৌঁছেছি। মিয়ানমার তাদের নিয়ে যাবে।

“আমি দিনক্ষণ বলতে চাই না। কারণ এটা গোপনীয়। এটাতে নিরাপত্তার বিষয়টি জড়িত আছে। তবে খুব সহসাই মিয়ানমার তাদের ফেরত নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে সম্মত হয়েছে। আমরা আশা করছি, খুব সহসাই তাদের ফেরত পাঠাতে পারব।”

মিয়ানমারের নৌবাহিনীর জাহাজ বাংলাদেশে ভেড়ার ক্ষেত্রে সৃষ্ট জটিলতার প্রশ্নে হাছান মাহমুদ বলেন, “মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এবং এটা খুব সহসাই হবে। কখন কোন জাহাজ ভিড়বে সেটা- আমি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে বলতে পারি না। এটা টেকনিক্যাল পার্ট বা এটা বলার প্রয়োজন আছে বলেও আমি মনে করি না।”

মিয়ানমার ইস্যুতে বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিয়ে এক প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “দেখুন, আমরা এ ব্যাপারে আমাদের উদ্বেগ জানিয়েছি। আমরা মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেছি। তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে এখানে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হোক সেটা আমরা চাই না।

“আমাদের এখানে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কার কিছু নেই- সেটাও বলার সুযোগ নাই। আমাদের এখানে মর্টার শেল এসে পড়েছে। এটা গ্রহণযোগ্য নয়। আর সেটার কড়া প্রতিবাদ আমরা জানিয়েছি।”

চলমান সংঘাতের ফলে মিয়ানমারের বিজিপি সদস্যের সঙ্গে দেশটির সেনা সদস্যরা বাংলাদেশে এসেছে। এসব সেনা সদস্যের কেউ কেউ ২০১৭ সালে রোহিঙ্গা নিধনে জড়িত ছিলেন বলে যে অভিযোগ রয়েছে তা তদন্তের দাবি উঠছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “দেখুন, আমরা আপাতত তাদের ফেরত পাঠানো নিয়ে কাজ করছি। কারণ, আমাদের প্রথম অগ্রাধিকার তাদের নাগকিদের ফেরত পাঠানো। তারাও নিয়ে যেতে চায়। আমরা এ নিয়ে কাজ করছি।”

রাখাইনের রাজধানী সিত্তের বাংলাদেশ মিশন থেকে কূটনীতিকদের সরিয়ে নেওয়ার প্রসঙ্গে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমাদের মিশনে যারা কর্মরত আছেন তাদের সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।”

গত সপ্তাহের রবিবার থেকে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, বিজিপিসহ বিভিন্ন সংস্থা ও তাদের পরিবারের সদস্য মিলিয়ে দেশটির অন্তত ৩৩০ জন নাগরিক বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।

নেইপিদো তাদের নাফ নদী দিয়ে রাখাইনে ফেরাতে ঢাকাকে প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু রাখাইনের পরিস্থিতি বিবেচনায় ঢাকার পক্ষ থেকে তাদের উড়োজাহাজে করে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরে মিয়ানমার তাদের নাগরিকদের সমুদ্র পথে জাহাজে করে ফিরিয়ে নেওয়ার প্রস্তাব দেয়, বাংলাদেশও তাতে রাজি হয়।

সীমান্ত হত্যা কমাতে প্রাণঘাতী নয় এমন অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা সীমান্ত হত্যা নিয়ে আলোচনা করেছি। সীমান্তে যাতে নন লিথাল অস্ত্র ব্যবহার করা হয়, সেগুলো নিয়ে আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি।

“তিনি (জয়শঙ্কর) আমার সঙ্গে একমত যদি নন-লিথাল ব্যবহার হয় তাহলে সীমান্তে যে হত্যা হয় সেটা হবে না। অনেকটা কমে যাবে। সেটি কীভাবে অপারেশনাল করা যায় এবং সীমান্ত হত্যা কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছি। আমরা ঐক্যমত হয়েছি।”

ভারতের আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের পর দীর্ঘদিন আটকে থাকা তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তিসহ গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নিয়ে ঢাকা-দিল্লি কাজ করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বলে জানান পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “তিস্তা চুক্তি ও গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নিয়ে আলোচনা করেছি। তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের কোনও সমস্যা নেই। সমস্যাটা রাজ্যে। তার (ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী) সঙ্গে যেটা আলোচনা হয়েছে, নির্বাচনের পর এ বিষয়ে আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাব এবং একইভাবে গঙ্গার পানি বণ্টন নবায়নের বিষয়টি নিয়ে ভালোভাবে আলোচনা করেছি।”

গঙ্গা চুক্তি নিয়ে ভারতের অবস্থান জানতে চাইলে হাছান মাহমুদ জানান, “এটা নিয়ে তাদের দ্বিমত নাই। তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর (জয়শঙ্কর) সঙ্গে এ ব্যাপারে আলোচনা করেছি।”

ভারতের ভিসা পেতে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন সময়ে যেসব বিড়ম্বনায় পড়তে হয়, সে প্রসঙ্গ দিল্লি সফরে তোলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

হাছান মাহমুদ বলেন, “ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে কীভাবে মানুষে-মানুষে যোগাযোগ বাড়ানো যায়, সেটা নিয়ে আলোচনা করেছি। ভিসা ইস্যু নিয়ে আলোচনা করেছি। ভিসা দেওয়ার পরিমাণ বাড়ছে। ভিসা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি, যাতে আরও সহজ করা যায়।”

রোজার জন্য বাড়তি পেঁয়াজ-চিনির অনুরোধ

রমাজানের আগে ভারত বাংলাদেশে ২০ হাজার মেট্রক টন পেঁয়াজ ও ১০ হাজার মেট্রিক টন চিনি রপ্তানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

পরিমাণ বাড়িয়ে ৫০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ ও ১ লাখ মেট্রিক টন চিনি রপ্তানি করতে দিল্লিকে অনুরোধ করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ। এ প্রসঙ্গে ৯ ফ্রেবুয়ারি দিল্লিতে ভার‌তের বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী পীযুষ গয়ালের স‌ঙ্গে বৈঠকের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তিনি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা অনেক ভোগ্যপণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে, পেঁয়াজ, চিনি, ডাল এসব এবং মসলা কিছু জাতীয় কিছু পণ্য। ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করেছি।

“তাকে বলেছি, এসব ভোগ্য পণ্যে যেন বিশেষ কোটা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, যাতে কমপক্ষে আমরা তাদের থেকে এসব সঠিক মূল্যে এবং আমাদের প্রয়োজনে ইমপোর্ট করতে পারি।”

হাছান মাহমুদ বলেন, “রমজানের আগে তারা আমাদের দেশে ২০ হাজার মেট্রক টন পেঁয়াজ ও ১০ হাজার মেট্রিক টন চিনি রপ্তানির প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আমি সেটাকে বর্ধিত করে ৫০ হাজার মেট্রিক টন পেঁয়াজ ও এক লাখ মেট্রিক টন চিনিতে উন্নীত করার কথা বলেছি। তিনি (ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী) সেটা ভালোভাবে নিয়েছেন।”

ভারতের রাষ্ট্রপতিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ

নয়া দিল্লি সফরে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমি ভারতের রাষ্ট্রপতিকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছি। তিনি সেই আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন। আমি এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীকে (শেখ হাসিনাকে) অবহিত করেছি। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে লিখিত আমন্ত্রণপত্র পাঠাব।”

গত ৭ ফেব্রুয়ারি তিন দিনের প্রথম দ্বিপক্ষীয় সফরে ভারতে যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান। শুক্রবার নয়া দিল্লির রাষ্ট্রপতি ভবনে ভারতের রাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist