Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

শরীফার গল্প নিয়ে বিতর্কের মধ্যে হিজড়ারা ভয়ে

সপ্তম শ্রেণির এই বইয়ে রয়েছে শরীফার গল্প।
সপ্তম শ্রেণির এই বইয়ে রয়েছে শরীফার গল্প।

কেউ কথা বলতে চাইছে না। না বলছে হিজড়াদের কেউ, না বলছে তাদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর কেউ। সবাই মুখ বন্ধ করে পরিস্থিতি বুঝতে চাইছে।

তাদের এই পরিস্থিতির মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে সপ্তম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের ‘শরীফার গল্প’ নিয়ে ওঠা সাম্প্রতিক বিতর্ক।

নতুন শিক্ষাক্রমে সপ্তম শ্রেণির বইটিতে ‘মানুষে মানুষে সাদৃশ্য ও ভিন্নতা’ শিরোনামের অধ্যায়ে যুক্ত হয়েছে শরীফার গল্প। এর উদ্দেশ্য পুরুষ ও নারীর পাশাপাশি তৃতীয় লিঙ্গের একজন মানুষকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়।

এক বছর পর এই অধ্যায়টির বিরোধিতা করে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক খণ্ডকালীন শিক্ষকের বক্তব্য এবং তার বই ছেঁড়ার ভিডিও সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে তা নিয়ে শুরু হয় তুমুল আলোচনা-সমালোচনা। এর পক্ষে বিপক্ষে নানা মতও তৈরি হয়ে যায়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে অধ্যায়টি পর্যালোচনায় একটি কমিটি গঠন করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কিন্তু সে কমিটিতে সবার প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়নি বলেও উঠেছে সমালোচনা।

এরই মধ্যে রংপুরে এক হিজড়াকে পরিবার থেকে নির্যাতন করে বের করে দেওয়ার ঘটনা ঘটার পর তা নিয়ে অনুসন্ধান চালাতে গেলে হিজড়াদের শঙ্কিত হওয়ার বিষয়টি বেরিয়ে আসে।

তৃতীয় লিঙ্গের সরকারি স্বীকৃতি মেলার ১০ বছর পরও উত্তরাধিকার সূত্রে সম্পত্তি পাওয়া নিশ্চিতসহ নানাভাবে এখনও বঞ্চনার শিকার হিজড়ারা।

সমাজে প্রান্তিক অবস্থানে থাকা এই জনগোষ্ঠীর বিচরণ ঢাকাসহ নানা স্থানে হরহামেশাই মেলে। টাকা চেয়ে তাদের পথে পথে মানুষের পথ আটকানো কিংবা বাড়িতে ঢোকাকে নাগরিক জীবনে উৎপাত হিসেবেই দেখেন অনেকে।

সেই তৎপরতায় থাকা হিজড়াদের অন্তত ১৫ জনের সঙ্গে শরীফার গল্প নিয়ে বিতর্কের প্রতিক্রিয়া সকাল সন্ধ্যার পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হলে তাদের কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি।

এক গুরুমা (হিজড়াদের গোষ্ঠী প্রধান) এবং হিজড়া সদস্যদের নিয়ে গঠিত এক সংগঠনের প্রধান বলেন, কথা বলতে ‘নিষেধ আছে’।

কারা নিষেধ করেছে- প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই গুরুমা বলেন, “আমাদেরকে উপর থেকে কথা না বলতে নিষেধ করা হয়েছে।”

এই ‘উপর’ কারা, সেটাও তিনি বলতে চাননি।

হিজড়াদের নিয়ে কাজ করতে অনেক চড়াই-উৎরাই পার হওয়া আরেকজন বলেন, এবারের মতো অভিজ্ঞতা তার আগে কখনও হয়নি।

“মুখ একেবারেই বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে। এমনকি আমাদের অনেকের ফোনও বন্ধ পাবেন আপনি। আমাদের সবাইকে একসঙ্গে থাকতে বলা হয়েছে, দূরে যেতে এবং একা থাকতে নিষেধ করা হয়েছে।”

হিজড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে অনেক বছর ধরে কাজ করে দেশের একটি বেসরকরি সংস্থা। তার কর্মকর্তারাও কথা বলতে রাজি হননি।

সংস্থার একজন নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ রেখে বলেন, “সিকিউরিটি মেইনটেইন করতে হচ্ছে, কারও ফোন এখন খোলা পাবেন না। খোলা রাখলেও কেউ ফোন ধরবে না। কেউ কথা বলবে না আপাতত এই সময়ে।”

কেন- প্রশ্ন করলে তার উত্তর আসে, “দেশে জেন্ডার ইস্যুতে কোনও ঘটনা ঘটলেই আমাদের উপর থ্রেট আসে। জুলহাজ-তনয়ের মৃত্যুর পরেও এমন অবস্থা হয়েছিল।”

বাংলাদেশে ব্লগার-অনলাইন অ্যাক্টিভিস্টদের উপর জঙ্গি আক্রমণের মধ্যে ২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকার কলাবাগানের বাড়িতে কুপিয়ে খুন করা হয়েছিল সমকামী অধিকারকর্মী জুলহাজ মান্নান এবং তার বন্ধু মাহবুব তনয়কে।

ওই হত্যাকাণ্ডের জন্য নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের ছয়জনের ফাঁসির রায়ও হয়েছে।

হিজড়াদের নিয়ে কাজ করা সংস্থার ওই কর্মকর্তা জুলহাজ-তনয় হত্যাকাণ্ডের পরের পরিস্থিতির সঙ্গে এখনকার অবস্থার তুলনা করে বলেন, “এখন একদমই চুপ আমরা। সময় এখন পক্ষে না।”

হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি দেওয়া সরকার এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সচেষ্ট হবে বলে আশা করছেন তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist