Beta
মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০২৪
Beta
মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০২৪

খৎনা: ঐতিহ্য, ধর্ম, স্বাস্থ্য ও বিতর্ক

Tintoretto-Circumcision
Picture of সৈয়দ ফরহাদ

সৈয়দ ফরহাদ

খৎনা মানব ইতিহাসের প্রাচীনতম অস্ত্রোপচার হিসেবে স্বীকৃত। সেই খৎনা করাতে গিয়ে চেতনানাশক ব্যবহারে ভুল হওয়ায় অল্পদিনের ব্যবধানে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বাংলাদেশে।

খৎনা হলো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে শিশ্নের অগ্রভাগের চামড়া অপসারণ। শব্দটি এসেছে আরবি ভাষা থেকে। প্রাচীন আরবে সপ্তম দিনে নবজাতকের খৎনা ও নামকরণ করা হতো। সুন্নতে খৎনা বা মুসলমানি নামেও বাংলাদেশে এটি বহুল পরিচিত। ইহুদি ধর্মেও খৎনা প্রচলিত রয়েছে।

বাংলাদেশের অনেক এলাকায় শিশুদের খৎনার সময় ভোজের আয়োজন করা হয়। ইন্দোনেশিয়ায়ও খৎনা করার পর ‘পেরাইয়ান সুনাতান’ নামে একটি ভোজের আয়োজন করা হয়। তুরস্কেও এটি ব্যাপকভাবে উদযাপন করা হয়। এটি ‘সুন্নেত তোরেনি’ ‘সুন্নেত মেভলুদু’ নামে পরিচিত। 

খৎনা কবে থেকে

খ্রিস্টের জন্মের দুই হাজার তিনশ বছর আগে প্রাচীন মিশরীয়দের মধ‍্যে খৎনার প্রচলন ছিল- নানা ঐতিহাসিক নথি ও পুরাকীর্তির ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞরা এই মত দিচ্ছেন। এছাড়া আদিবাসী অস্ট্রেলিয়ান, আফ্রিকার কিছু জাতিগোষ্ঠী ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু আদিবাসী সম্প্রদায়েও খৎনা প্রচলিত ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে।

বিবর্তনের ধারায় ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা হিসেবে ইহুদিরাই খৎনা প্রথা চালু করে, যার আবশ্যিকতা তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ তাওরাত এর ১৭ অধ্যায়ে পাওয়া যায়। তবে মুসলিমদের ধর্মগ্রন্থ কুরআনে খৎনার কথা আসেনি। হাদিসে এসেছে। এই দুই ধর্ম অনুযায়ী, খৎনা নবী ইব্রাহিমের (আ.) সময় থেকে চলে আসছে। 

মুসলিম সমাজে এই সংস্কৃতি শত শত বছর ধরে চলে আসছে। বিখ্যাত মুসলিম হাদিস ফিকহ শাস্ত্রবিদ এবং মদিনার প্রখ্যাত সাত ফুকাহার একজন হযরত সাইদ ইবনে মুসাইয়াব (রহ.) তার মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা গ্রন্থেও বলেছেন, হযরত ইব্রাহিম (আ.) হলেন খৎনার সুন্নত পালনকারী সর্বপ্রথম ব্যক্তি। 

সেমেটিক ধর্মগুলোর মতে, ইব্রাহিম (আ.) এর পর সব নবী-রসুল খৎনা করিয়েছিলেন। 

সাহাবী হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেছেন, “তিনি (হযরত মুহাম্মদ সা.) বলেন, ফিতরাত, অর্থাৎ মানুষের জন্মগত স্বভাব পাঁচটি, খৎনা করা, নাভির নিম্নদেশে ক্ষুর ব্যবহার করা, বগলের পশম উপড়ে ফেলা, নখ কাটা ও গোঁফ খাটো করা।” (বুখারি-৫৮৮৯)

খৎনার সুফল কী

খৎনার সুফল নিয়ে অস্ট্রেলীয় মেডিকেল সায়েন্সের অধ্যাপক ব্রায়ান মরিস গবেষণা করেছেন। তার সেই গবেষণায় উল্লেখ করা হয়, যেসব ছেলে শিশুর খৎনা করা হয়নি, তাদের কিডনি, মূত্রথলি ও মূত্রনালির ইনফেকশন চার থেকে ১০ গুণ বেশি হয়। 

তিনি মনে করেন, খৎনার মধ্য দিয়ে মূত্রনালির সংক্রমণের শঙ্কা এক-চতুর্থাংশ কমে যায়। 

খৎনা নিয়ে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএনএইডস পরিচালিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। কেনিয়ার কিসুমু শহরে নাইরোবি, ইলিনয় ও ম্যানিটোবা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের সম্মিলিত ওই গবেষণায় দেখা গেছে, খৎনা করা পুরুষদের মধ্যে এইচআইভি সংক্রমণের হার, যারা খৎনা করেননি তাদের চেয়ে ৫৩ শতাংশ কম।

সংস্থাটি আরও জানাচ্ছে, বিশ্বে ১৫ বছর বয়সের বেশি ৩৩ শতাংশ পুরুষের খৎনা করা। খৎনা করা প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৬ জনই মুসলিম এবং ১ জন ইহুদি।

খৎনার বিপক্ষেও অবশ‍্য মত আছে। বিরোধিতাকারীদের বক্তব‍্য হলো, খৎনা শারীরিক স্বায়ত্তশাসনের লঙ্ঘন এবং একটি অপ্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচারের ঝুঁকি। এটি করা হয় শিশুদের সম্মতি ছাড়াই। এছাড়া সঠিক স্বাস্থ্যবিধি এবং নিরাপদ যৌন অনুশীলনের মাধ্যমে খৎনা না করেও সুস্থ থাকা যায়। 

খৎনার বিরোধিতা প্রাচীন যুগেও দেখা গেছে। যদিও তার কারণ ছিল রাজনৈতিক। ১৬৮ খ্রিস্ট পূর্বাব্দে সেলিউসিড সম্রাট চতুর্থ অ্যান্টিওকাস প্রাচীন মিশরে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে ইহুদিদের খৎনা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

খৎনাবিরোধী সাম্প্রতিক আন্দোলনটি ‘দ্য ইনঅ্যাকটিভিস্ট মুভমেন্ট’ নামে পরিচিত। এ আন্দোলনকারীরা চিকিৎসাবিজ্ঞানের আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের যুক্তি হচ্ছে, শিশ্নের অগ্রভাগের চামড়াটি কেটে ফেলায় এখানের প্রায় ৪ হাজার স্নায়ু উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। ফলে যৌন তৃপ্তি কম এবং অস্থায়ী হয়। স্নায়ু উন্মুক্ত হলে স্পর্শকাতর অঙ্গ শিশ্ন আঘাতপ্রাপ্তও হতে পারে। আবার এ ধরনের অস্ত্রোপচার প্রকৃতি বিরুদ্ধও বটে!

সনাতনী পদ্ধতিতে খরচ

সনাতন পদ্ধতিতে খৎনার সঙ্গে জড়িতরা বাংলাদেশে ‘হাজাম’ নামে পরিচিত। আগে শহরে এবং গ্রামে খৎনার জন্য হাজামরাই ছিলেন একমাত্র ভরসা। যে বাড়িতে কোনও ছেলে শিশুর খৎনা হতো- সে বাড়িতে থাকত উৎসবের আমেজ। এখনও এ প্রথা বাংলাদেশের গ্রামাঞ্চলে ভালোই প্রচলিত রয়েছে। 

ঐতিহ্য অনুযায়ী, খৎনার দিন সকালে ছেলে শিশুদের গোসল করিয়ে লুঙ্গি ও স্যান্ডো গেঞ্জি পরিয়ে অস্ত্রোপচারের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এরপর ঠিক খৎনা করার আগে আবার ওজু করানো হয়। এরই মধ্যে হাজাম তার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ভেষজ তেল দিয়ে কাপড় পুড়িয়ে ছাই করেন হাজামরা। কলাপাতার নিচে কাঠি, ছুরি এইসব লুকিয়ে রাখেন যাতে খৎনা করার আগেই শিশুরা ঘাবড়ে না যায়।

আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিতে নানাভাবে খৎনা করা হয়। এদের মধ্যে অস্ত্রোপচার এবং লেজার পদ্ধতি বাংলাদেশে প্রসার লাভ করেছে।

সনাতন পদ্ধতিতে খৎনার খরচ দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। তবে এখন অনেক হাজামই খৎনা করার সময় এক ধরনের ডিভাইস ব্যবহার করেন। এ ধরনের খৎনার খরচ পড়ে ৫ হাজার টাকার মধ্যে। 

নারায়ণগঞ্জের হাজাম মো. কবির হোসেন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “সনাতনি পদ্ধতিতে খৎনা করাতে হাদিয়া নেই ১৫০০ টাকা। তবে আধুনিক ডিভাইস পদ্ধতিতে নেই ৩৫০০ টাকা। 

এতো স্বল্প সম্মানীর কারণ জানতে চাইলে ৩৭ বছর ধরে এই পেশায় থাকা কবির হোসেন অভিযোগ করে বলেন, “ক্লিনিকগুলো অযথাই অনেক বেশি টাকা রাখে।”

সনাতনী পদ্ধতিতে খৎনা করাতে অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ করেন কি না এমন প্রশ্নের জবাবে কবির বলেন, “লোকাল অ্যানেস্থেসিয়া প্রয়োগ করে তবেই খৎনা করানোর প্রক্রিয়া শুরু করি। এটি সম্পূর্ণ ব্যথামুক্ত।” 

হাসপাতালে খরচ

রাজধানী ঢাকায় বেশ কয়েকটি বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খৎনার ধরন অনুযায়ী খরচ পড়ে ১২ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে। 

স্কয়ার হাসপাতাল জানিয়েছে, সাধারণ অস্ত্রোপচার করে খৎনা করলে খরচ ২৭ হাজার টাকা। আর লেজার দিয়ে খৎনার খরচ ৩৭ হাজার টাকা। 

শমরিতা হাসপাতালে খৎনার খরচ ১২ হাজার টাকা। পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয় শিশুকে পুরো অচেতন করে। তবে অভিভাবক যদি না চান সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে নিতে হয়।

বিআরবি হাসপাতালে যোগাযোগ করলে জানানো হয়, শিশুর খৎনার সময় পুরো অচেতন করেই অস্ত্রোপচার করা হয়। এই হাসপাতালে খৎনা খরচ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। 

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, খৎনা করানোর আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের সঙ্গে শিশুটিকে দেখা করাতে হবে। এরপর চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, কিছু টেস্টও করাতে হয়। টেস্টের ফলাফল দেখে চিকিৎসক ঠিক করেন খৎনার দিনক্ষণ। 

পান্থপথের আরেক বেসরকারি হাসপাতাল ‘হেলথ অ্যান্ড হোপ’ এর জরুরি সেবা নম্বরে যোগাযোগ করলে খৎনার খরচ ১৭ থেকে ১৮ হাজার টাকা পড়বে বলে জানানো হয়। এখানেও চিকিৎসকের পরামর্শে প্রথমে কিছু টেস্ট করতে হয়। শিশুর শারীরিক পরিস্থিতি বিষয়ে টেস্টের ফলাফল দেখেই অস্ত্রোপচারের সময় বা দিনক্ষণ ঠিক হয়। হেলথ অ্যান্ড হোপ কর্তৃপক্ষও খৎনার সময় পুরোপুরি অচেতন করে নেওয়ার পদ্ধতির কথাই জানায়।

গ্রিন লাইফ হাসপাতালে অবশ্য খৎনা খরচ একটু বেশি পড়ে। পুরো প্যাকেজের খরচ ৩৫ হাজার টাকা।

এসব হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, খৎনার জন্য আলাদা করে বেডের খরচ দিতে হয় না। সরাসরি অপারেশন করিয়ে শিশুদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় ডে-কেয়ারে। যেখানে শিশুর পাশে অভিভাবকরাও অবস্থান করতে পারেন। অ্যানেস্থেসিয়ার কারণে সৃষ্ট অচেতন অবস্থা কেটে গেলে শিশুকে নিয়ে যেতে পারেন বাড়িতে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত