Beta
শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

পডকাস্ট কতটা পাল্টে দিল সব

যখন পডকাস্ট শব্দের অস্তিত্বই ছিল না, তখনও পডকাস্ট চলছিল। এর কী মানে আবার?

তখন ২০০৩ সাল। ক্রিস্টোফার লাইডন ভাবছিলেন, অনলাইনে এমপিথ্রি ফাইল কী করে তোলা যায়?

লাইডনের ভাবনা বাস্তবায়নে সারথি হলেন পেশায় সফটওয়্যার ডেভেলপার এবং হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা ডেভ ইউনার।

সাংবাদিকতায় লাইডন তখন বেশ পরিচিতি কামিয়ে নিয়েছেন; নিউ ইয়র্ক টাইমসের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচন প্রচারণা নিয়ে প্রতিবেদন করেছেন, টেলিভিশনে টেন ও ক্লক নিউজ অনুষ্ঠানে খবর পরিবেশন করেছেন।

লাইডন ও ডেভ মিলে ওয়েবে নতুন ধারা দেখালেন। ২০০৩ সালের জুন মাসে সেই অডিও উঠল ওয়েবে। কী ছিল তাতে?

২০১৬ সালে গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে লাইডন বলেছিলেন, “আমরা আলাপ করছিলাম হার্ভার্ডে বার্কম্যান সেন্টার ফর ইন্টারনেট অ্যান্ড সোসাইটিতে বসে। সেসব কথাই রেকর্ড করা হলো। তারপর ওয়েবে তুলে লোকজনকে জানালাম আমরা।”

বাজারে এরও আগে অ্যাপলের ফার্স্ট জেনারেশন আইপড চলে এসেছিল। অন্যদিকে ২০০৩ সালে ডেভ উইনার  নিয়ে এলেন আরএসএস ২.০ সংস্করণ।

কিন্তু এমটিভি ভিডিও জকি অ্যাডাম কারি যেন আরেকটু বেশি কিছু ভাবছিলেন। ভাবতে ভাবতে নিজেই শুরু করলেন কোডিং।

আরএসএস ফিড কাজে লাগিয়ে অডিও ফাইল নামিয়ে, আইটিউনের এপিআই দিয়ে প্লেলিস্টে সেই ফাইল নিয়ে এলেন। আর তারপর তো আইপডে সহজে শোনা গেল সেই অডিও।

অ্যাডাম কারির এই কারিগরির নাম হলো পডক্যাচার; আইপডার বলেও চেনে অনেকে। আর অ্যাডাম কারি হয়ে উঠলেন পডফাদার।

তবে এই অডিওগুলোকে কী নামে ডাকা হবে?

এই ২০০৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে গার্ডিয়ানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সেই নামের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন বেন হ্যামার্সলে।

অ্যাপল আইপডের মতো পকেটে এঁটে যাওয়া এমপিথ্রি প্লেয়ার, সস্তা অথবা বিনা পয়সায় পাওয়া অডিও তৈরির সফটওয়্যার, ওয়েবব্লগিং মিলে রেডিও অধ্যায়ে নতুন কিছুর সূচনা হতে যাচ্ছে বুঝেই যেন বিশেষ নামে সম্বোধন জরুরি মনে করছিলেন এই সাংবাদিক।

গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে তাতেই উত্তরও রেখেছিলেন সবার জন্য।

“এখন যা হচ্ছে এর কী নাম দেব? অডিওব্লগিং? পডকাস্টিং? গেরিলামিডিয়া?”

ব্রডকাস্টিং আর আইপড মিশিয়ে নতুন ধারণা হয়ে উঠল পডকাস্টিং। নতুন নাম পেয়ে ওই বছর অগাস্টে অ্যাডাম কারির উপস্থাপনায় প্রথম পডকাস্ট হলো ’দ্য ডেইলি সোর্স কোড’।

এরপর থেকে গোটা দুনিয়াই মজে থাকল পডকাস্ট নিয়ে।

২০০৫ সালে প্রথম পডকাস্ট সার্ভিস সেবা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ওডিও। এই বছরই নিউ অক্সফোর্ড আমেরিকান ডিকশনারি ঘোষিত বর্ষসেরা শব্দ হয় পডকাস্ট।

২০১৩ সালে অ্যাপলের পডকাস্ট সাবস্ক্রাইবার সংখ্যা ১০০ কোটির ঘরে পৌঁছে।

২০২০ সালে দ্য জো রোগান এক্সপেরিয়েন্স ছিল সবচেয়ে বেশি বার ডাউনলোড হওয়া পডকাস্ট। প্রতি মাসে ১৯০ মিলিয়ন অর্থাৎ ১৯ কোটির বেশি বার ডাউনলোড হওয়া এই অনুষ্ঠান বিশ্বে জনপ্রিয়তার সারিতে সবার আগে নাম লিখিয়েছিল।

পডকাস্ট কি এখনও প্রিয়?

যুক্তরাষ্ট্রে পডকাস্ট নিয়ে মাতামাতি একটু বেশিই। গত বছরের এক পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি মাসে ১৬ কোটি পডকাস্ট শ্রোতা মেলে এক যুক্তরাষ্ট্রেই।

পডকাস্ট সম্পর্কে দেশটির ৭৮ শতাংশ জনগোষ্ঠী সচেতন। এরমধ্যে ২৮ শতাংশ অন্তত প্রতি সপ্তাহে নিয়ম করে পডকাস্ট শুনে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ পডকাস্ট শ্রোতার বয়স ১২ থেকে ৩৪ বছর, ৪৩ শতাংশের বয়স ৩৫ থেকে ৫৪ বছর এবং ২২ শতাংশের বয়স ৫৫ বছরের উপরে।

পডকাস্ট সেবা নিয়ে অ্যাপল, স্পটিফাই, সাউন্ডক্লাউড, গুগল পডকাস্ট, ইউটিউবের মতো বড় প্ল্যাটফর্মগুলো বেশ এগিয়ে রয়েছে।

অমিতাভ নাতনির পডকাস্ট জয়

বিগ বি অমিতাভ বচ্চনের নাতনি নাভিয়া নাভেলি নান্দা সমাজের অসমতা এবং নারীস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে ‘হোয়াট দ্য হেল নাভিয়া’ নামে পডকাস্ট অনুষ্ঠান নিয়ে আসেন ২০২২ সালে। একাধিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে শোনা যায় তার এই পডকাস্ট। নিজের ইউটিউব চ্যানেলেও তুলেছিলেন এই  অনুষ্ঠান। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালে ইন্ডিয়া অডিও সামিট অ্যান্ড অ্যাওয়ার্ডস আয়োজনে এই পডকাস্ট অনুষ্ঠানের জন্য পুরস্কার বাগিয়ে নেন বচ্চন পরিবারের তরুণ সদস্য নাভিয়া ।

হুমায়ূন পুত্রের প্রথম পডকাস্ট

গত ২৯ ডিসেম্বর মেহের আফরোজ শাওন ছেলে নিষাদ হুমায়ূনকে নিয়ে ফেইসবুকে লিখলেন, “ছেলে আমার লায়েক হয়েছে!  পডকাস্ট না কি যেন একটা করেছে। এখন লজ্জায় লজ্জায় আমাকে পাঠিয়েছে তার পডকাস্ট দেখে আমার মন্তব্য দেওয়ার জন্য।”

নন্দিত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ ও অভিনয়শিল্পী মেহের আফরোজ শাওনের বড় ছেলে নিষাদ হুমায়ূনের ইউটিউব চ্যানেলে পাওয়া গেল সেই পডকাস্ট। প্রায় ২৬ মিনিটের আলাপ পর্বকে নিষাদ বলছে, ‘দুষ্টামি পডকাস্ট’। কী ছিল এই পডকাস্টে? সঞ্চালক ছিল টিনএজ বয়সী নিষাদ। আর সঙ্গে ছিলেন কাছেপিঠে বয়সী দুজন অতিথি। দুষ্টামি পডকাস্টের প্রথম পর্বে বাংলা ও ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা ব্যবস্থা ও মানসিকতা নিয়ে তিন জনে বেশ ভারী ভারী কথাও বলেন।   

বিজ্ঞাপনের বড় বাজার পডকাস্টে

পডকাস্টে পণ্য ও ব্র্যান্ডের বিজ্ঞাপন থেকে খুব পসার হওয়ার সুযোগ নেই – এমন ভাবনা এখন বেশ তামাদি হয়েছে।   

২০২০ সাল থেকে ২০২১ সাল পডকাস্ট বিজ্ঞাপনে বিনিয়োগ বেড়েছে ৭২ শতাংশ; যা ১৪৪ দশমিক আট কোটি ডলারের মত। ২০২৪ সালে পডকাস্ট বিজ্ঞাপনের বাজার ৪৩০ কোটি ছুঁতে পারে বলে ধারণা করছে যুক্তরাষ্ট্রের বিজ্ঞাপন গবেষণা সংস্থা ইন্টারেক্টিভ অ্যাডভার্টাইজিং ব্যুরো (আইএবি)।

গবেষণা থেকে সংস্থাটি বলছে, পডকাস্ট সঞ্চালকের কণ্ঠে শুনলে শ্রোতাদের পণ্য ও ব্র্যাণ্ডে আস্থা বাড়ে। এরকম সঞ্চালকের পড়ে শোনানো বিজ্ঞাপন থেকে মোট আয়ের ৫৫ শতাংশ আসছে।      

গাড়ি চালাতে চালাতে, হাঁটতে হাঁটতে, ঘরদোর পরিষ্কার করতে করতে পডকাস্ট শোনা শ্রোতারা বিজ্ঞাপনও শোনেন। তারমানে পডকাস্টের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের স্মৃতিতে গেঁথে যাচ্ছে এসব বিজ্ঞাপনও।  

যারা পডকাস্টিং করেন, তাদের পডকাস্টের শ্রোতা সংখ্যা এবং কতবার ডাউনলোড হলো ভিত্তিতে  বিজ্ঞাপন নিয়ে উপার্জন করার সুযোগ রয়েছে।

ধরা যাক, পডকাস্টের প্রতি পর্ব ১০ হাজার বার ডাউনলোড হলে সেটি থেকে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ৫০০ থেকে ৯০০ ডলার আয় করতে পারেন একজন পডকাস্টার। খুব ভালো পরিচিতি রয়েছে এমন হলে, তার আয় বছরে তিন কোটি ডলারও হতে পারে।

সাংবাদিকতায় পডকাস্ট যোগ

টেলিভিশন ও এফএম রেডিওর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পডকাস্টকেও এখন গণমাধ্যমের জায়গা দেওয়া হচ্ছে।

২০১৭ সালে দ্য ডেইলি নামে পডকাস্ট শুরু করে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস। এই অনুষ্ঠানের কণ্ঠ ছিলেন মাইকেল বারবারো। প্রতিদিন এই পডকাস্ট অনুষ্ঠানে পত্রিকার খবর, সাংবাদিকদের সাক্ষাৎকার পরিবেশনে থাকতো বৈচিত্র্য। ২০১৮ সালে অ্যাপল পডকাস্টে সবচেয়ে বেশি ডাউনলোড হয়েছিল এই অনুষ্ঠান।

বিবিসি এবং সিএনএনের মতো সংবাদসংস্থাও বিশ্বের খবর, সংস্কৃতি, ইতিহাস জানাতে পডকাস্ট মুখী হয়েছে।

পডকাস্টের মধ্যে দিয়ে সাংবাদিক ও শ্রোতার মধ্যে যোগাযোগ এক ধাপ গাঢ় হয়। ঘড়ি ধরে চলা জীবনে স্ক্রিনে চোখ রেখে দেখার সময়ের অভাব যাদের, তাদের কাছে খবর শুনতে পডকাস্টই পছন্দ। 

২০২০ সালের দিকে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ‘অনলাইন জার্নালিজম’ কোর্সের অংশ হিসেবে শুরু হয়েছিল ’এমসিজে পডকাস্ট’। ফেইসবুক পেইজে তোলা হতো এসব পডকাস্ট।

এর উদ্যোক্তা এই বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান কাজী এম আনিছুল ইসলাম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “শিক্ষার্থীদের পডকাস্টের ধরনের সঙ্গে পরিচিত করাতে চেয়েছিলাম মূলত।

“ভিডিও ফরম্যাটে তুলতে হতো ফেইসবুকে। রেডিওতে যেমন টকশো হয়, তেমন কিছু ইন্টারভিউ, টকশো করতাম আমরা। এখানে ভয়েস, মিউজিক, ছবি দিয়ে করা হতো।”

দেশীয় সাংবাদিকতায় পডকাস্ট চর্চা কেমন চলছে?   

প্রত্যাশার মাত্রা জানিয়ে  সাংবাদিকতার এই শিক্ষক সকাল সন্ধ্যাকে বললেন, “আমার কাছে পডকাস্ট একটা অডিও মাধ্যম। শ্রোতাকে টানার জন্য, বিশেষ করে তরুণদের জন্য ভিন্ন ভাবে অনুষ্ঠান পরিবেশনা হয়।

“সাংবাদিকতায় পডকাস্ট যে নতুন মাত্রা আনতে পারতো সেটা আমাদের এখানে মনে হয় ঠিকমত ধরতে পারা যায়নি। মাধ্যম পাল্টে গেলে পরিবেশনার ধরনও বদলাতে হবে।“

“হয়ত বিবিসি যে পডকাস্টগুলো করছে সেসব দেখে আমাদের ধারণা নেওয়ার সুযোগ আছে। কনটেন্ট নির্বাচন ও পরিবেশন দুটোতেই নজর দিতে হবে পডকাস্টে শ্রোতাদের টানতে।”

বাংলাদেশের জন্য পডকাস্ট পরিসংখ্যান সহজ ভাবে খুঁজে পাওয়া মুশকিল হবে। বিষয়টি আরও খোলাসা হলো কাজী এম আনিছুল ইসলামের কথায়।     

তিনি বলেন, “দেশে পডকাস্ট নিয়ে তেমন কোনো গবেষণা আছে কি না আমার জানা নেই।

“তবে কয়েক বছর আগে এফএম রেডিও নিয়ে মেতে ছিল তরুণরা। তরুণরা রাত জেগেও এফএম রেডিও শুনত। এসব নিয়ে গবেষণা আছে। এসব থেকে তরুণ প্রজন্ম পডকাস্টকে কীভাবে নিতে পারে তা নিয়ে ধারণা  করা যেতে পারে।”

“এফএম রেডিও এবং পডকাস্ট শ্রোতাদের ধরনের মধ্যে মিল রয়েছে। কানে হেডফোন দিয়ে কেউ হয়ত ব্যায়াম করছে, কেউ আরাম করছে।”

দেশে সাংবাদিকতার পড়াশোনায় পডকাস্ট কি আবশ্যিক হয়ে উঠবে? এর  উত্তর নির্ভর করছে গণমাধ্যমে পডকাস্টের পসারের উপর। কীভাবে?

ব্যাখ্যা করে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক কাজী এম আনিছুল ইসলাম সকাল সন্ধ্যাকে বললেন, “সাংবাদিকতা বিভাগে পডকাস্ট ঠিক সেভাবে যুক্ত হয়নি। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাংবাদিকতা বিভাগে যে অনলাইন জার্নালিজম কোর্সে সেখানে পডকাস্ট একটা টপিক হিসেবে রাখা হয়েছে। তাতে পডকাস্ট নিয়ে আলাপ হয়, এটা নিয়ে প্রশ্ন আসে।

“তবে পডকাস্ট নিয়ে পেশাদার ক্ষেত্র গড়ে তুলতে হলে গণমাধ্যমকেই এগিয়ে আসতে হবে। এটা একাডেমি ও পেশার মধ্যে একটা  রেসিপ্রোকাল রিলেশনশিপ। শিক্ষার্থীরা যদি দেখে পেশাদার কাজে পডকাস্ট বলে একটা বিষয় চলছে তখন তো তারা আগ্রহী হবে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist