Beta
শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪

হুতিদের ওপর পাল্টা হামলা: লোহিত সাগর ঘিরে বাড়ছে শঙ্কা

ইয়েমেনে হুতি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে গতকাল বৃহস্পতিবার বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য। ছবি: সংগৃহীত

শেষ রক্ষা হলো না। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য যৌথভাবে ইয়েমেনে হুতিদের ওপর হামলা করেছে। লোহিত সাগরে হুতি হামলার জবাব দিতেই এই বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ফলে হুতিদের কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে যে সংকট চলছে, তা আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।

ইয়েমেনের রাজধানী সানা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় সাদা ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ধামার শহরে গতকাল বৃহস্পতিবার এ হামলা করা হয়। লোহিত সাগর উপকূলে ইয়েমেনের প্রধান বন্দর হুদায়দাতেও হামলার খবর পেয়েছে বিবিসি।

ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর পর লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে হুতিরা ক্রমাগত হামলা করছিল। এসব হামলা ঠেকাতেই পশ্চিমা দেশ দুটি এ হামলা চালাল। এই ঘটনাকে সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ওয়াশিংটন ডিসি প্রশাসন চায়নি ইয়েমেনে হামলা চালাতে। সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের যে যুদ্ধবিরতি চলছে, তা ভেস্তে যাক, এমন ঝুঁকি নিতে চাচ্ছিলেন না প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। লোহিত সাগরে সৌদি আরব, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও রাশিয়ার স্বার্থ রয়েছে। এখন হামলা পরবর্তী পরিস্থিতিতে এই দেশগুলোর যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

ইয়েমেনে হামলার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন জানিয়েছেন, লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজে হুতিদের হামলার জবাবে তিনি ইয়েমেনে ওই গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন।

হোয়াইট হাউজ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে বাইডেন বলেছেন, “আজ আমার পরিচালনায় যুক্তরাজ্যকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী একযোগে ইয়েমেনে হুতি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোতে সফলভাবে হামলা করেছে। এই অভিযানে অস্ট্রেলিয়া, বাহরাইন, কানাডা ও নেদারল্যান্ডস আমাদের সহযোগিতা করেছে।”

“বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলপথে যাতে স্বাধীনভাবে জাহাজ চলাচল করতে পারে, তা নিশ্চিতে প্রয়োজনে আরও পদক্ষেপ নিতে আমি দ্বিধা করব না।”

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাক ইয়েমেনে হামলার বিষয়ে বলেছেন, “মধ্যপ্রাচ্যের দেশটিতে বিমান হামলা প্রয়োজনীয়, সীমিত ও সমানুপাতিক। আত্মরক্ষার্থে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।”

ইয়েমেনে বিমান হামলার ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হুতি উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী হুসেইন আল-ইজ্জি। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “ইয়েমেনে ভয়াবহ আগ্রাসনের জন্য যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়কেই চরম মূল্য দিতে হবে।”  

আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দিনকে দিন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা হুতি কারা? কেনই বা তাদের নিয়ে চিন্তিত পরাশক্তিরা?     

হুতি মুভমেন্ট কী?

ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের সাদা জেলায় জাইদি শিয়া মুসলমানদের বসবাস। ১৯৯০ সালের দিকে দেশটির দক্ষিণে সৌদি আরবের ছত্রছায়ায় কট্টর সুন্নি মুসলিমদের প্রভাব বাড়ে। এর বিপরীতে তখন জাইদি শিয়াদের নেতা বাদরেদ্দিন আল হুতি একটি আন্দোলন শুরু করেন। তার নামেই হুতি আন্দোলনের ভিত্তি গড়ে ওঠে। এরপর এটি রাজনৈতিক ও সামরিক সংগঠন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

২০ হাজারের মতো যোদ্ধা আছে সংগঠনটিতে, যারা ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলের বিশাল অংশজুড়ে বেশ সক্রিয়। লোহিত সাগর উপকূলও তাদের নিয়ন্ত্রণে।   

হুতিদের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক কেমন?

মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের শত্রুতা দীর্ঘদিনের। তাই হুতিদের প্রতি তেহরানের সমর্থন থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। এরই ধারাবাহিকতায় ফিলিস্তিনের সশস্ত্র সংগঠন হামাসকে সমর্থন দিচ্ছে হুতিরা। গত বছরের ৭ অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে হামাসের পক্ষে কাজ করছে সংগঠনটি।

যুদ্ধ শুরুর পর হুতি নেতা আব্দুল মালিক আল-হুতি বলেছিলেন, “ফিলিস্তিনিদের সংগ্রামে যোগ দিতে আমাদের হাজারো যোদ্ধা প্রস্তুত।”   

লোহিত সাগরে কী হচ্ছে?

লোহিত সাগর সুয়েজ খালের দক্ষিণে অবস্থিত। এটি ইউরোপের সঙ্গে এশিয়া ও পূর্ব আফ্রিকাকে যুক্ত করেছে। ভারত মহাসাগর থেকে ইউরোপ যেতে হলে লোহিত সাগরই সবচেয়ে সহজ ও কম খরচের পথ।

এই সাগরের দক্ষিণ-পূর্বে ইয়েমেনের অবস্থান। ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধ শুরুর কয়েকদিন পর হুতিরা লোহিত সাগরে আন্তর্জাতিক জাহাজ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাতে শুরু করে। তাদের অধিকাংশ হামলাই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল প্রতিহত করে।

লোহিত সাগর ঘিরে উত্তেজনা বাড়ে গত বছরের ১৯ নভেম্বরে। সেদিন হুতিরা হেলিকপ্টারের সাহায্যে একটি জাপানি কোম্পানির ভাড়া করা জাহাজ জব্দ করে এবং ক্রদের অপহরণ করে। ওই জাপানি কোম্পানির সঙ্গে এক ইসরায়েলির ব্যবসায়িক সম্পর্ক ছিল।

হুতিরা তখন জানিয়েছিল, ইসরায়েল ও তার মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কিত সব জাহাজ তাদের হামলার লক্ষ্য হবে।

এরপর বেশ কয়েকবার লোহিত সাগরে জাহাজে হামলা হয়। এর অধিকাংশ ব্যর্থ হলেও বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জাহাজ কোম্পানিগুলো লোহিত সাগরে তাদের জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়।

লোহিত সাগর এড়িয়ে কোম্পানিগুলো তাদের জাহাজ আফ্রিকার উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে মহাদেশটির পশ্চিম দিক দিয়ে ঘুরে ইউরোপে চলাচল শুরু করে। এতে সময় ও খরচ বেড়ে যায়। এজন্য জাহাজ ভাড়া বেড়ে যায়।

বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়ে। জাপানি জাহাজ কোম্পানি ওয়ান লাইন বাংলাদেশ থেকে ইউরোপমুখী ২০ ফুট দীর্ঘ পণ্যবাহী প্রতি কন্টেইনারের ভাড়া ৫শ’ ডলার বাড়ায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া কী?

লোহিত সাগরে হুতিদের হামলার প্রতিক্রিয়ায় গত ১৮ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র একটি সামরিক জোট গঠন করে। এর নাম দেওয়া হয় অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান। যুক্তরাজ্য, কানাডা, ডেনমার্ক, গ্রিস, নরওয়ে, নেদারল্যান্ডস, বাহরাইনসহ ২০টির বেশি দেশ এতে যোগ দেয়।

যুক্তরাষ্ট্র ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত হুতিদের সরাসরি মোকাবিলা করা থেকে বিরত ছিল। কিন্তু ৩১ ডিসেম্বর লোহিত সাগরে একটি জাহাজে হুতিরা হামলা করলে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী পাল্টা হামলা করে। এতে ১০ জন হুতি নিহত হয়।

এই ঘটনা লোহিত সাগরের চলমান সংকটে নতুন মাত্রা যোগ করে। গত ৯ জানুয়ারি হুতিদের ছোড়া ২১ টি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের যুদ্ধজাহাজ।

গাজায় যুদ্ধের আগে ইয়েমেনের পরিস্থিতি কেমন ছিল?

ইয়েমেনের শিয়াদের সমর্থন আছে হুতিদের প্রতি। দেশটির সাবেক কর্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট ও সৌদি আরবের মিত্র আলি আব্দুল্লাহ সালেহ’র দুর্নীতি ও নিষ্ঠুরতায় ক্ষুব্ধ ছিল তারা।

বিশেষ করে নাইন ইলেভেনের হামলা ও ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রাসন, এই দুই ঘটনায় প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ সালেহ’র অবস্থান শিয়াদের ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে। রাজপথে বিক্ষোভ শুরু করেন ইয়েমেনিরা। সালেহকে বেশ কয়েকবার হত্যাচেষ্টাও করা হয়। একপর্যায়ে ২০১২ সালে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন তিনি।

ইয়েমেনের সাবেক প্রেসিডেন্ট আলি আব্দুল্লাহ সালেহ। ছবি: এএফপি

২০১৪ সালে হুতিরা সালেহ’র সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক গড়ে তোলে। উদ্দেশ্য, রাজধানী সানা দখল ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আব্দরাব্বুহ মনসুর হাদিকে ক্ষমতাচ্যুত করা।

হুতিদের তৎপরতায় হাদি একপর্যায়ে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন। নির্বাসিত ইয়েমেনি সরকার তখন তাদের মিত্র সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বারস্থ হয়। হুতিদের রাজধানী থেকে হটাতে ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালাতে দেশ দুটিকে অনুরোধ করে।

শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। জাতিসংঘের হিসাব অনুযাযী, ২০২১ সাল পর্যন্ত এই যুদ্ধে ৩ লাখ ৭৭ হাজার মানুষ মারা যায়। বাস্তুচ্যুত হয় ৪০ লাখ ইয়েমেনি।

হুতিদের হামলাকে কীভাবে দেখছে ইয়েমেন ও সৌদি আরব?

ইয়েমেনিদের অনেকেই মনে করেন, ফিলিস্তিনের বেসামরিকদের রক্ষায় ইসরায়েল ও তার মিত্রদের চাপে রাখতে লোহিত সাগরে হামলা ঠিক আছে।

বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েল-হামাস যুদ্ধে হুতিদের হস্তক্ষেপের ফলে তাদের প্রতি ইয়েমেনিদের সমর্থন বাড়বে। আর হুতিরা মনে করছে, লোহিত সাগরে হামলা তাদের আরও গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক খেলোয়াড়ে পরিণত করবে।

তাকানো যাক সৌদি আরবের দিকে। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালাচ্ছে দেশটি। তেহরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তিও চূড়ান্ত করেছে তারা। সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে হুতিদের নিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দিতে পারে সৌদি আরব।

তবে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন সৌদি আরব। হোয়াইট হাউস কড়া প্রতিক্রিয়া দেখালে ইয়েমেন থেকে নিজেদের সেনা প্রত্যাহারের চেষ্টা রিয়াদের জন্য জটিল হতে পারে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist