Beta
শনিবার, ২০ এপ্রিল, ২০২৪

ভারতে বিতর্কিত নাগরিকত্ব আইন চালু, প্রতিবাদে বিক্ষোভ

ভারতে বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন চালু হওয়ায় দেশটিতে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ভারতে বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন চালু হওয়ায় দেশটিতে অস্থিরতা বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ভারতে লোকসভা ভোটের আগেই বিতর্কিত সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন (সিএএ) চালু করল মোদী সরকার। সোমবার সন্ধ্যায় ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আইনটি কার্যকর হওয়ার সিদ্ধান্ত জানানোর পর থেকে দেশটির বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে।

২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে যেসব হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, শিখ, জৈন ও পার্সি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িক নির্যাতন ও নিপীড়নের কারণে ভারতে গেছেন, চালু হওয়া এই আইনে তাদের নাগরিকত্ব দেবে ভারত সরকার। তবে এই আইনে মুসলমানদের বিষয়ে কিছু বলা নেই, শুধু অমুসলিমদের সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে।

আইনটি চালু হওয়ায় এরই মধ্যে ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। সোমবার রাতে দিল্লিতে জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ শুরু হলে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা।

আসামসহ উত্তর-পূর্ব ভারতেও বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। রাতে আসামে বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা আইনের অনুলিপি পুড়িয়ে প্রতিবাদ জানায়। রাজ্যটিতে মঙ্গলবার ধর্মঘট ডেকেছে বিরোধী দলগুলো। পশ্চিমবঙ্গেও বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সিএএ চালু হওয়া নিয়ে দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল এক্সে লিখেছেন, “১০ বছর ধরে দেশ শাসন করে মোদী সরকার (লোকসভা) নির্বাচনের আগে সিএএ চালু করেছে। এমন সময়ে এটি করল যখন দেশের দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরা মূল্যস্ফীতির চাপে হাহাকার করছে। বেকাররা কর্মসংস্থানের জন্য দরজায় দরজায় ঘুরছে, লড়াই করছে। আসল সমস্যা সমাধান করার বদলে তারা ( মোদী সরকার) এই সিএএ নিয়ে এসেছেন।”

নরেন্দ্র মোদী দ্বিতীয়বার ভারতের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর দেশজুড়ে সহিংস বিক্ষোভের মধ্যে ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনটি পাস করা হয়। সেসময় সহিংসতায় ১০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছিল। মানবাধিকার কর্মী ও বিরোধী রাজনীতিবিদরাও এর তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন।

যারা আইনটির বিরোধিতা করছেন তাদের অভিযোগ, আইনটি ভারতের সংবিধানের মূলনীতির বিরোধী। কারণ, এই আইনে ধর্মীয় কারণে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য করা হচ্ছে।

তবে বিজেপির বলছে, এই আইনে অন্য ধর্মের কারও নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হবে না। যারা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিপীড়নের শিকার হয়ে অন্য দেশে থেকে ভারত গেছেন, শুধু তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার জন্যই এই আইন।

ভারতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র জানান, মঙ্গলবার থেকেই ওই তিন দেশ থেকে আসা মানুষ ভারতের নাগরিকত্ব পেতে অনলাইনে আবেদন করতে পারবেন। এর জন্য তাদের কাছ থেকে বাড়তি কোনও কাগজত্রও চাওয়া হবে না।

২০১৯ সালে বিজেপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির একটি ছিল এই আইন। তবে আইনটি পাসের পর ভারতজুড়ে তীব্র প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, দাঙ্গা ও দিল্লিতে দীর্ঘদিন ধরে অবরোধের কারণে তখন আইনটি কার্যকর করা যায়নি।

তবে এবার নির্বাচনের আগেই আইনটি কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দেন বিজেপির শীর্ষ নেতা ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তার ওই প্রতিশ্রুতির এক মাসের মধ্যেই আইনটি কার্যকর করার এই ঘোষণা এলো।

অমিত শাহ আইনটি মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হওয়ার আশঙ্কা নাকচ করে দিয়েছেন। আসামের এনআরসিও মুসলিমদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে না বলে জানান তিনি।

সিএএর আগে আসাম রাজ্যে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি (এনআরসি) তৈরি করেছিল বিজেপি সরকার। এনআরসির উদ্দেশ্য ছিল,অবৈধভাবে ঢোকা বিদেশিদের (বিশেষত মুসলিমদের) চিহ্নিত করে ফেরত পাঠানো। কিন্তু প্রতিবেদন পেশের পর দেখা যায়, আসামে মুসলমানের চেয়ে হিন্দু অনুপ্রবেশকারীর সংখ্যা বেশি। এরপর আসামে এনআরসির বাস্তবায়ন বাতিল হয়ে যায়।

তবে অমিত শাহ ২০১৯ সালে বলেছিলেন, প্রথমে নাগরিকত্ব বিল আনা হবে এবং তা পাস করা হবে। এর মাধ্যমে ধর্মীয় কারণে তিন দেশ থেকে চলে আসা সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব দেওয়া হবে। এরপর এনআরসি হবে এবং সেটা হবে সারা ভারতের জন্য।

সিএএর সবচেয়ে বড় বিরোধী পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেছেন, তার রাজ্যে তিনি কিছুতেই এই আইন চালু হতে দেবেন না।

সোমবার তড়িঘড়ি করে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে মমতা বলেন, তার সরকার ‘মানুষের বিরুদ্ধে (বৈষম্যমূলক) যেকোনো কিছুর’ বিরোধিতা করবে।

তিনি ঘোষণা করেন, “এই আইনে যদি কোনও বৈষম্য থাকে, আমরা তা মেনে নেব না। সেটা ধর্ম, বর্ণ বা ভাষাগত হোক। তারা দুই দিনে কাউকে নাগরিকত্ব দিতে পারবে না। এটা শুধুই ললিপপ আর শো-অফ।

“চার বছরে একাধিকবার সময় বাড়ানোর পর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার দুই থেকে তিন দিন আগে এটির বাস্তবায়ন থেকে প্রমাণিত হয় যে, এটি রাজনৈতিক ফায়দা লোটার উদ্দেশ্যে করা হচ্ছে।”

সিএএ, এনআরসি ও এনপিআর বা জাতীয় জনসংখ্যা নিবন্ধন বাংলা ও উত্তর-পূর্ব ভারতে খুবই সংবেদনশীল বিষয় এবং নির্বাচনের আগে কোনও অশান্তি চান না বলে জানান তৃণমূল নেতা।

চার বছর আগে উত্তর-পূর্ভ ভারতে এই আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ব্যাপক সহিংসতা হয়েছিল। সেসময় পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়া আসাম স্টুডেন্ট ইউনিয়ন এবারও আন্দোলনে নামবে।

তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম কে স্ট্যালিনও এই আইনের বিরোধীতা করেছেন। তিনি বিজেপির বিরুদ্ধে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অভিযোগ করেছেন।

সেসময় কংগ্রেসশাসিত কেরালা, পাঞ্জাব, রাজস্থান ও ছত্তিশগড় প্রদেশও আইনটির তীব্র বিরোধিতা করে। তেলেঙ্গানার ভারত রাষ্ট্র সমিতির সরকারও এই আইনে বাতিল করার আহ্বান জানায়।

সেসময় কংগ্রেস শাসিত মধ্যপ্রদেশ সরকার আইনটির বিরুদ্ধে একটি প্রস্তাব পাস করে। এছাড়া বিজেপির কয়েকজন আইন প্রণেতাও এই আইনের বিরোধিতা করেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist