Beta
সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৪

ইভিএম কারসাজি? ভারতে ভোটের আগে ফিরছে একই প্রশ্ন

india-vote

ইন্ডিয়া জোটের ব্যানারে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেছে ভারতের বিরোধীরা। দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধীসহ অন্য নেতারা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে নির্বাচন আয়োজন প্রশ্নে মোদী সরকারকে বিদ্ধ করতে চাইছে।

আর এক্ষেত্রে রাহুলের প্রধান হাতিয়ার হলো ‘ইলেকট্রিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম)’। তার দাবি, ভারতের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ইভিএমের জোরেই ক্ষমতায় টিকে আছেন।

রাহুলের মতো অন্য বিরোধী নেতারাও একই সুর তুলেছেন। নির্বাচনের অন্য সব কারসাজি ছাপিয়ে যেন ইভিএমেই সবকিছু আটকে আছে, এমনটাই মনে হচ্ছে তাদের দাবিতে।

কিন্তু কেন ইভিএম ঘিরে এত বিতর্ক বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটিতে?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই সম্প্রতি আল জাজিরা ভারতের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলেছে।

ইভিএম নিয়ে রাহুল ও বিরোধীদের অভিযোগ হলো- মেশিনগুলো হ্যাক করা যেতে পারে। এর মাধ্যমে মোদীর ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ভারতের ওপর তার নির্বাচনী আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায়; যদিও একাধিক জনমত জরিপে দেখা যায়, দেশের বিভিন্ন অংশের ভোটারদের মধ্যে বিজেপি বেশ পছন্দের দল।

এমন অভিযোগ নতুন কিছু নয়। কংগ্রেস ও অন্য বিরোধী দলগুলো এর আগেও ইভিএমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত নয় এমন মেশিনে যে চিপ ব্যবহার করা হয়, এনিয়েও তাদের অভিযোগ রয়েছে।

বিরোধীরা বলছে, ভোটাররা মেশিনের যে বাটনে চাপ দিয়ে তাদের ভোট দিচ্ছেন, তা রেকর্ড হচ্ছে না। আগে থেকেই মেশিনে কারসাজি করার কারণে এমনটা হয়।

ভারতের নির্বাচন কমিশন (ইসিআই) ও সুপ্রিম কোর্টও এই অভিযোগগুলো নাকচ করেছে। আর এখন পর্যন্ত দাবিগুলো প্রমাণ করার মতো কোনও স্পষ্ট প্রমাণ মেলেনি।

কিন্তু ১৯ এপ্রিল থেকে শুরু হতে যাওয়া সাত ধাপের জাতীয় নির্বাচনের আগে রাহুল গান্ধীর বক্তব্য নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।

রাহুল গান্ধী এখন লং মার্চে রয়েছেন। সেখানে থেকে তিনি নব্বইয়ের দশকে নির্বাচনে ব্যবহৃত কাগজের ব্যালটে ফিরে যাওয়ার দাবি জানাচ্ছেন। অবশ্য এই দাবি গত সপ্তাহেই প্রত্যাখ্যান করেছে সুপ্রিম কোর্ট। নির্বাচন কমিশন একে ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ প্রস্তাব বলে নাকচও করে।

তবুও বিরোধীরা তাদের দাবি থেকে সরে আসছে না। মজার বিষয় হলো – দেশের অর্ধেক রাজ্যে সরকার গঠন করেছে বিরোধী দলগুলো। সেখানে কিন্তু তারা ইভিএমে নির্বাচন করেই ক্ষমতায় বসেছে।

কংগ্রেস নেতা দিগ্বিজয় সিং। তিনি ছিলেন মধ্য প্রদেশের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী। ইভিএম মেশিন নিয়ে যে সমালোচনা, এর কেন্দ্রে আছেন তিনি। কাগজের ব্যালটে ফিরে আসার দাবিতে দেশের বিরোধীরা ও এনজিওকর্মীদের নিয়ে গঠিত একটি দলের নেতৃত্বে আছেন তিনি।

রিতু সিং নামের এক তরুণ দলিত শিক্ষাবিদ। তার মন্তব্য, বক্তৃতা ও ভিডিওর মাধ্যমে ইউটিউব ও ইনস্টাগ্রামে ভাইরাল হয়েছেন। তিনি তার ভিডিওগুলোতে দাবি করছেন, ইভিএম ভারতের গণতন্ত্রকে বিপদে ফেলেছে।

নয়াদিল্লিতে কংগ্রেসের ভোটার গ্রেগরি এক্কা জানান, তিনি আর নির্বাচনকে বিশ্বাস করেন না।

তিনি বলেন, “আমরা সবাই কংগ্রেসকে ভোট দিই। কিন্তু সেই ভোট কোথায় যায়, তা আমরা জানি না। যতদিন ইভিএম আছে, ততদিন বিজেপি ক্ষমতায় থাকবে।” এক্কার গোষ্ঠী মূলত ঝাড়খণ্ডের। আর তারা ঐতিহাসিকভাবেই কংগ্রেসকে ভোট দেন।

ইভিএমের প্রতি আস্থা ফেরাতে ২০১৩ সালে নির্বাচন কমিশন ভোটার ভেরিফায়েবল পেপার অডিট ট্রেইল (ভিভিপ্যাট) চালু করেছিল। এটি হলো একটি কাগজের স্লিপ, যা ভোটাররা ভোট দেওয়ার পর ৭ সেকেন্ডের জন্য দেখতে পান।

এরপর এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে কেটে একটি সিলড বাক্সে পড়ে। এই স্লিপে ভোটারের ভোটের ক্রমিক নম্বর, প্রার্থীর নাম ও প্রতীক থাকে। একজন ভোটার কাগজের স্লিপটি দেখে নিশ্চিত হতে পারেন যে তার ভোট সঠিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছে।

২০১৭ সালে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নেয়, প্রতিটি নির্বাচনী এলাকার কিছু নির্দিষ্ট ভোটকেন্দ্রে ভিভিপ্যাট স্লিপের ভোট গণনা করা হবে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে ইভিএমের ফলের সঙ্গে ভিভিপ্যাট স্লিপের তালিকা মিলছে কি না, তা যাচাই করা হবে।

এখন কংগ্রেস ও অন্য বিরোধী দলগুলো দেশের সব ভোটকেন্দ্রে ভিভিপ্যাট স্লিপের ভোট গণনার দাবি জানাচ্ছে।

অভিজ্ঞ নির্বাচন কর্মকর্তা ও স্বাধীন বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরোধী দলগুলো এভিএমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ভুল করছে।

সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এসওয়াই কুরাইশি বলেছেন, তিনি নিশ্চিত যে ‘ইভিএমের মাধ্যমে’ কোনও নির্বাচনী জালিয়াতি সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনকে একটি স্বাধীন সংস্থা হিসেবে পুনরায় বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জনের জন্য ভিভিপিএটি স্লিপ গণনার পক্ষে তিনি।

তিনি বলেন, “ইভিএমের সঙ্গে মিলিয়ে ভিভিপ্যাট স্লিপ গুনতে যদি বেশি দিন সময়ও লাগে, তবুও এটি করা উচিৎ। নির্বাচনী কারসাজি ভোটদানের আগেই ঘটে। ভোটদানের দিন কারসাজি ঘটার সম্ভাবনা কম।”

প্রতিটি নির্বাচনের আগে নির্বাচন কমিশন ভোটারদের তাদের নাম ভোটার তালিকায় আছে কি না, তা পরীক্ষার জন্য বিজ্ঞাপন দেয়, যাতে নিশ্চিত করা যায় যে তাদের নাম ভুলবশত সরিয়ে ফেলা হয়নি।

কুরাইশি বলেন, “যদি তারা (ভোটাররা) তাদের নাম পরীক্ষা না করে, তাহলে নির্বাচন কমিশনকে কীভাবে দোষ দেওয়া যায়?”

তবুও নির্বাচনী তালিকা সঠিকভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও হালনাগাদ কোনও সহজ কাজ নয়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নির্বাচনী কর্মকর্তার মতে, মৃত ব্যক্তি বা একাধিকবার লেখা নাম বাদ দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড মহামারির পর অনেক নাম মুছে ফেলতে হয়েছিল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বলছে, মহামারিতে প্রায় ৪০ লাখ ভারতীয় মারা গেছে। যদিও ভারত সরকারের দাবি, এই সংখ্যা আরও কম।

নাগরিক সমাজের অনেকে অবশ্য আশঙ্কা করেন যে, নির্বাচনী তালিকা সংশোধন করা হয় সরকারের জন্য অসুবিধাজনক ভোটারদের বাদ দেওয়া জন্য।

অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্রেটিক রিফর্মসের কাজ হলো ভারতের সুপ্রিম কোর্টকে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থায়নে ব্যবহৃত নির্বাচনী বন্ড সংক্রান্ত তথ্য সরবরাহ করা।

সংস্থাটির প্রধান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল অনিল ভার্মা বলেন, “যারা কোনও একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন না, এমন ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। আর এ ব্যাপারে ইসিআই তেমন কিছুই করে না।”

২০১৯ সালের নির্বাচনের আগে অ্যাক্টিভিস্টরা বলেছিলেন, কয়েক লাখ মুসলিম ও দলিত ভোটারদের নির্বাচনী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। এমন বক্তব্যের পর জনগণের মধ্যে ভয় ঢুকে যায় যে, হয়তো মোদী বা বিজেপিকে ভোট না দিলে তাদের নামও কাটা যাবে।

গত বছর ছত্তিশগড়ের নির্বাচনের পর কংগ্রেস নেতা প্রবীন চক্রবর্তী ডেকান হেরাল্ড পত্রিকায় একট নিবন্ধ লেখেন। সেখানে তিনি নির্বাচনের আগে করা ৭টি জনমত, ১০টি বুথফেরত ও দুইটি ভোট পরবর্তী জরিপের ফল প্রকাশ করেন। সেখানে দেখা যায়, বিজেপির চেয়ে কংগ্রেসই ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে এগিয়ে ছিল। অথচ কংগ্রেস কিন্তু চার শতাংশ কম ভোট পেয়ে হেরে গিয়েছিল।

নয়াদিল্লিভিত্তিক সেন্টার অব স্টাডি অব ডেভেলপিং সোসাইটির অধ্যাপক সঞ্জয় কুমার বলেন, “জরিপ ও চূড়ান্ত ফলের মধ্যে অমিলের মানে এই নয় যে নির্বাচনে কারচুপি হয়েছে।” তার মতে, ইভিএম চালুর পর নির্বাচনে ‘ব্যাপক কারসাজির’ কোনও প্রমাণ তিনি পাননি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist