Beta
সোমবার, ১৫ এপ্রিল, ২০২৪
সাক্ষাৎকারে অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান

দেশ ও দশের স্বার্থেই নারীকে এগিয়ে নিতে হবে

অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান।
অর্থ প্রতিমন্ত্রী ওয়াসিকা আয়শা খান।

সকাল সন্ধ‍্যা: নারীর অগ্রগতিতে বাধা দেখছেন কী?

ওয়াসিকা আয়শা খান: নারী অগ্রসর হলেও কিছু সামাজিক মূল্যবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গি নারীকে অধস্তন করে রাখছে। এর ফলে নতুন নতুন ধরনের নৃশংস ও নিষ্ঠুর সহিংসতার শিকার হচ্ছে আমাদের মা, কন্যা ও বোনরা। নারীরা পরিবার, রাস্তাঘাট, গণপরিবহন, কর্মক্ষেত্র, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন সহিংসতা ও টিজিং এবং অনলাইনে সাইবার বুলিং হচ্ছেন। এসব জায়গায় আমাদের সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে দেশ ও দশের স্বার্থেই সবাই মিলে নারীদের এগিয়ে নিতে কাজ করতে হবে।

সকাল সন্ধ‍্যা: গৃহস্থালীতে নারীর শ্রম জিডিপিতে গণনা করা হবে কি?

ওয়াসিকা আয়শা খান: কোনও অর্থনৈতিক লেনদেন ও ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশা না করেই নারীরা গৃহস্থালীর কাজ করে থাকেন। তাদের এই কাজটি উৎপাদনের জাতীয় হিসাব অথবা জাতীয় আয় পরিমাপের পদ্ধতির (এসএনএ) বাইরে থাকে। কিন্তু জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ব্যাপারে দিক নির্দেশনা দিয়েছেন। অনেক আগে থেকেই গ্রামীণ নারীরা কৃষি খাতে অবদান রাখছেন। অধুনা সেই হার বেড়েছে। বাংলাদেশে মোট কর্মজীবী মানুষের মধ্যে প্রায় ৪৭ দশমিক ৬ শতাংশ লোক কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত। আবার তাদের মধ্যে ৬৪ দশমিক ৮ শতাংশই নারী। তাই গৃহস্থালীতে নারীর শ্রম জিডিপিতে গণনার বিষয়ে যথাযথ পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে।

সকাল সন্ধ‍্যা: অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের আরও যুক্ত করার পরিকল্পনা আছে কি?

ওয়াসিকা আয়শা খান: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যুগান্তকারী নেতৃত্বে বর্তমান সরকার নারী উন্নয়নে বিশেষ করে নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নের লক্ষ্যে কাজ করে চলছে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সবসময় বাংলাদেশের নারীদের অংশগ্রহণ ছিল। ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের ভোগান্তি কমিয়ে ব্যাংক ঋণের সহজলভ্যতা ও অন্যান্য সব ক্ষেত্রে তাদের সহজ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এজন্য জেন্ডার ইনক্লুসিভ ফিন্যান্সিয়াল সিস্টেম এবং জেন্ডার লেন্স ইনভেস্টমেন্ট খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। নারী-পুরুষ বৈষম্য নিরসন করে জেন্ডার লেন্স ইনভেস্টমেন্ট সুবিধা প্রান্তিক পর্যায়ে নারীদের কাছে পৌঁছে দিয়ে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নারীদের সম্পৃক্ততা বাড়ালে সমগ্র দেশ উপকৃত হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে শহরমুখি উদোক্তাদের ঋণ দেওয়ার পাশাপাশি প্রান্তিক নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য গ্রামীণ এলাকায় নারী উদ্যোক্তাদের সময়মতো ঋণ দিতে হবে। বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে তাদের বাজারমুখী করার চেষ্টা করতে হবে।

সকাল সন্ধ‍্যা: নারীর অগ্রযাত্রায় সীমাবদ্ধতা কী কী?

ওয়াসিকা আয়শা খান: দেশের চলমান অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার পাশাপাশি নারী তার পরিবারের সচ্ছলতা আনতে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ইটভাঙা শ্রমিক থেকে শুরু করে হিমালয় চূড়া জয় করা, পোশাকশিল্প, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে বিভিন্ন দায়িত্বশীল পদে থেকে কাজে অংশগ্রহণ, পুলিশ, বিজিবি, সামরিক বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ ও ফলপ্রসূ ভূমিকা দৃশ্যমান।

সকাল সন্ধ‍্যা: কী কারণে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রী পর্যায়ের দায়িত্ব প্রথমবারের মতো একজন নারীকে দেওয়া হরো বলে মনে করেন?

ওয়াসিকা আয়শা খান: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীর ক্ষমতায়নের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন অনেক আগেই। ব্যবসা-বাণিজ্য, রাজনীতি, প্রশাসন, কূটনীতি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় নারীরা অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে বাঙালিদের শক্তিশালী জাতিতে পরিণত করে তুলছে। গ্রাম কিংবা শহর সব জায়গায় পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও নিজেদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে শুধু জাতীয় পর্যায়েই নয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমাকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যে পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, তা এরই ধারাবাহিকতা বলে আমি মনে করি। আর আমি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রথম নারী অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক এবং সংরক্ষিত মহিলা আসন থেকে প্রথম সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এছাড়া ১৯৯৭ সালে যোগদানকালে আমি চট্টগ্রামে আমেরিকান এক্সপ্রেস ব্যাংকে একমাত্র নারী কর্মকর্তা ছিলাম।

সকাল সন্ধ‍্যা: কখনও ভেবেছিলেন এমপি মন্ত্রী হবেন?

ওয়াসিকা আয়শা খান: আমি সব সময় মানুষের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করেছি। মানুষের সুখে-দুঃখে পাশে থাকার জন্য এগিয়ে গিয়েছি। আমার নিজ জেলা চট্টগ্রামের বিভিন্ন উপজেলায় গৃহহীন অসহায় পরিবারের জন্য শতাধিক ঘর নির্মাণ, কভিডসহ সব দুর্যোগকালীন সহায়তা, বহু কাঁচা সড়কের উন্নয়ন, অসংখ্য শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন, চিকিৎসা সহায়তা, সব ধর্মীয় উৎসবে সব ধর্মের মানুষের মাঝে নগদ অর্থ ও অন্যান্য উপহার প্রদানসহ প্রতিনিয়ত অসহায়-সাধারণ মানুষের কল্যাণে আমি নিয়ত নিয়োজিত। কখনও এমপি বা প্রতিমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন আমি দেখিনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার বদান্যতা, তিনি আমাকে পরপর তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত করার পাশাপাশি সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর পবিত্র দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, যার জন্য আমি তার কাছে চিরঋণী।

সকাল সন্ধ‍্যা: প্রথমবার প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বের পাশাপাশি অর্থ মন্ত্রণালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দায়িত্ব পেয়ে কেমন লাগছে?

ওয়াসিকা আয়শা খান: সরকারের সামগ্রিক কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিশেষায়িত ভূমিকা রয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে অর্থ মন্ত্রণালয়ের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। এই সময়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়ে আমি নিষ্ঠা ও সততার সাথে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করছি।

সকাল সন্ধ‍্যা: রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণের বিষয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

ওয়াসিকা আয়শা খান: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারীদের রাজনীতি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও চাকরিতে অংশগ্রহণ বৃদ্ধির লক্ষ্যে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন এবং এর সুফল পাচ্ছে বাংলাদেশ, এগিয়ে যাচ্ছে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা। প্রতিবার জেন্ডার গ্যাপ ইন্ডেক্সে বাংলাদেশের উচ্চ অবস্থানে সেটাই প্রতীয়মান হয়।

১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরে সভাপতি হওয়ার আগ পর্যন্ত সংকটময় সময়ে সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন এবং সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর ভূমিকা ছিল অতুলনীয়। ২০১৯ সালের ২১তম জাতীয় সম্মেলনে শেখ হাসিনা দলের সর্বস্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী নেতৃত্ব নিশ্চিতের প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয় এবং পরে আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্রেও যুক্ত করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই প্রত্যেকটি জায়গায় ক্ষমতায়নের চর্চা করেছেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের পরিচালনায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ হিসেবে নারীদের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব প্রদান করেছেন। দলের প্রেসিডিয়ামে তিনি নারী নেত্রীদের জায়গা করে দিয়েছেন। জেলা-উপজেলায় তিনি নারীদের স্বীকৃতি দিয়েছেন, দলের গুরু দায়িত্ব প্রদান করেছেন। এর সবকিছুই শেখ হাসিনার নেতৃত্বের দৃঢ়তা ও প্রাজ্ঞতার পরিচায়ক।

তিনি তার পরিবার থেকে যে শিক্ষা পেয়েছেন, রাজনৈতিক জীবনে তা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব দলের ক্রান্তিলগ্নে যে ধরনের সাহসী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন সেসব দৃষ্টান্ত দেখে তিনি উজ্জীবিত হয়েছেন এবং সেই অনুপ্রেরণায় রাজনীতিতে নারীদের প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist