Beta
বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০২৪

হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধবিরতি চুক্তি কোথায় আটকে আছে

হামাস যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ায় গাজার বাসিন্দারা উল্লাস প্রকাশ করেন। ছবি: এএফপি।
হামাস যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ায় গাজার বাসিন্দারা উল্লাস প্রকাশ করেন। ছবি: এএফপি।
Picture of সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে কার্যকর কোনও চুক্তি হওয়া সহজ না হলেও আন্তর্জাতিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। এর মধ্যে জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, কাতার ও মিশরের মধ্যস্থতায় উপস্থাপিত গাজায় যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব গ্রহণ করেছে হামাস।

সোমবার সন্ধ্যায় প্রস্তাবটি মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে এক বিবৃতিতে হামাস জানায়, তাদের নেতা ইসমাইল হানিয়াহ কাতারের প্রধানমন্ত্রী ও মিশরের গোয়েন্দা প্রধানকে যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তাবে তাদের সম্মতির বিষয়টি জানিয়েছেন।

প্রস্তাবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন জ্যেষ্ঠ ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেছেন, প্রস্তাবের শর্তগুলো পূরণ হলে হামাস চিরকালের জন্য ইসরায়েলের প্রতি শত্রুতামূলক কার্যকলাপ বন্ধ করতেও রাজি হয়েছে।

তার একথা থেকে ইঙ্গিত মিলছে, হামাস যোদ্ধারা হয়তো তাদের সশস্ত্র সংগ্রামের সমাপ্তির কথাও ভাবছে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনও বিবরণ দেওয়া হয়নি।

তবে ইসরায়েল এখনও যুদ্ধবিরতি চুক্তির প্রস্তাবে সম্মতি জানায়নি। ইসরায়েল বলছে, প্রস্তাবটির শর্তগুলো তাদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, হামাসের গৃহীত প্রস্তাবটি ইসরায়েলের মৌলিক চাওয়াগুলো থেকে অনেক দূরে রয়েছে। তবে আলোচনা অব্যাহত থাকবে।

হামাসের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা খলিল আল হায়া এএফপিকে বলেছেন, “বল এখন ইসরায়েলের কোর্টে, তাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তারা যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে রাজি হবে, নাকি বাধা দেবে।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইসরায়েলি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, হামাস যে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছে, তা ছিল মিশর উত্থাপিত প্রস্তাবের একটি ‘নমনীয়’ সংস্করণ, যার মধ্যে এমন ‘সুদূরপ্রসারী’ সিদ্ধান্ত রয়েছে, যা ইসরায়েল মেনে নিতে পারবে না।

তিনি বলেন, “এটি ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি প্রত্যাখ্যানকারী সাব্যস্ত করতে একটি কৌশল বলে মনে হচ্ছে।”

তবে পরে প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর কার্যালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, “যদিও হামাসের প্রস্তাবটি ইসরায়েলের মৌলিক চাওয়াগুলো থেকে অনেক দূরে, তথাপি ইসরায়েল গ্রহণযোগ্য শর্তে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য কায়রোতে চলমান আলোচনায় একটি প্রতিনিধি দল পাঠাবে।”

অবশ্য বিবৃতিতে এও বলা হয়, আলোচনার পাশাপাশি ইসরায়েলের যুদ্ধ মন্ত্রিসভা তাদের লক্ষ্য অর্জনে রাফায় হামাসের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রস্তাবে ৪২ দিন করে মোট তিনটি পর্যায়ে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর করার কথা বলা হয়েছে। এতে যুদ্ধ বন্ধের পর গাজা থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের কথাও রয়েছে। পাশাপাশি গাজায় হামাসের হাতে বন্দী ইসরায়েলি জিম্মি এবং ইসরায়েলের কারাগারে বন্দী ফিলিস্তিনিদের মুক্তিও মিলবে।

যুদ্ধবিরতিতে হামাস রাজি হওয়ার খবরে রাফা বাসিন্দাদের উল্লাস। ছবি : রয়টার্স

হামাস যুদ্ধবিরতিতে রাজি হওয়ায় গাজার বাসিন্দারা উল্লাস প্রকাশ করেছেন। গাজার বাসিন্দাদের মনে আশা জেগেছে, অবশেষে হয়তো প্রায় সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসান ঘটবে। যে যুদ্ধে ইসরায়েলি হামলায় ইতিমধ্যেই প্রায় ৩৫ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।

তবে যুদ্ধবিরতিতে হামাসের সম্মতি নিয়ে ইসরায়েল কম উৎসাহী। তারা এখনও দক্ষিণ গাজার রাফায় আক্রমণ এবং হামাসকে পুরোপুরি পরাজিত করার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।

মঙ্গলবার ইসরায়েল রাফাহ সীমান্তের সংযোগস্থল, যে পথ দিয়ে সাহায্য আছে, তা দখলে নিয়েছে এবং আশ্রিতদের সেখান থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। সোমবার রাতে সেখানে বিমান হামলাও চালায় ইসরায়েল। রাফায় প্রায় ১৪ লাখ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এখনও এ ব্যাপারে কিছু বলেনি। প্রেসিডেন্ট বাইডেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলেছে, তারা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে হামাসের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথিউ মিলার সাংবাদিকদের বলেন, “আমরা হামাসের প্রতিক্রিয়া পর্যালোচনা করে দেখছি। আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে এটি নিয়ে আলোচনা করছি।”

গত বছরের ৭ অক্টোবর ইসরায়েলে হামাসের হামলায় প্রায় ১২০০ জন নিহত হয় এবং প্রায় ২৫০ জনকে হামাস জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়। এর মধ্যে গত নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে ৬ দিনের যুদ্ধবিরতির সময় হামাস ১১২ জনকে মুক্তি দেয়। ইসরায়েল উদ্ধার করে ৩ জনকে।

এখনও আনুমানিক ১০০ জিম্মি জীবিত এবং গাজায় আটক রয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। এছাড়া অন্তত ৩৫ জন জিম্মি যুদ্ধের সময় নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

যুদ্ধবিরতির প্রস্তাবে কী বলা হয়েছে

প্রস্তাবিত চুক্তিটি বেশ জটিল এবং এতে তিনটি পর্যায় রয়েছে, যার প্রতিটি ছয় সপ্তাহ ধরে স্থায়ী হবে।

প্রথম পর্যায়ে, হামাস ও ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত সাময়িকভাবে বন্ধ হবে। সেইসঙ্গে গাজার অধিক জনবহুল এলাকা থেকে দূরে এবং গাজার পূর্ব দিকে ইসরায়েল সীমান্তের দিকে ইসরায়েলি সেনাদের সরিয়ে নেওয়া হবে। সাধারণভাবে প্রতিদিন ১০ ঘণ্টা এবং বন্দিদের মুক্তি দেওয়ার দিনে ১২ ঘণ্টা করে ইসরায়েল গাজায় বিমান হামলা বন্ধ রাখবে।

হামাস প্রথম পর্যায়ে ধীরে ধীরে ৩৩ জন ইসরায়েলি নারী জিম্মিকে মুক্তি দেবে, যাদের বয়স ৫০ বছরের বেশি ও অসুস্থ বা ১৯ বছরের কম বয়সী বেসামরিক নাগরিক। প্রতিজন বেসামরিক ইসরায়েলি জিম্মিকে জীবিত মুক্তি দেওয়ার বিনিময়ে ইসরায়েল ৩০ জন ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেবে। আর প্রতিজন নারী সৈনিকের মুক্তির বিনিময়ে ইসরায়েল ৫০ জন ফিলিস্তিনিকে মুক্তি দেবে।

ইসরায়েলি সেনাদের প্রত্যাহারের পর বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিকরা গাজায় তাদের বাড়িঘরে ফিরে যাবে। এটি ঘটবে হামাস জিম্মিদের মুক্তি দেওয়ার পাশপাশি ধীরে ধীরে। আলাদাভাবে, চুক্তিতে আরও বলা হয়েছে, গাজায় পুনর্গঠনের কাজ এই পর্যায়েই শুরু করতে হবে। সেইসঙ্গে ত্রাণ সহায়তা প্রবেশের এবং ইউএনআরডাব্লিউ ও অন্যান্য ত্রাণ সংস্থাগুলোকে বেসামরিকদের সাহায্য করার জন্য কাজ শুরু করার অনুমতি দেওয়া হবে।

চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ হবে। গাজা থেকে ইসরায়েল সব সেনা প্রত্যাহার করে নেবে। গাজায় বন্দি সেনাসহ বাকি সব ইসরায়েলি পুরুষ জিম্মিদের নিয়ে আরেকবার বন্দি বিনিময় হবে। তবে এই পর্যায়ে একজন ইসরায়েলিকে মুক্তির বিনিময়ে কতজন ফিলিস্তিনি ‍মুক্তি পাবে, তা এখনও নির্ধারণ করা হয়নি।

তৃতীয় ধাপে উভয় পক্ষের বন্দি ও বন্দিদের দেহাবশেষ বিনিময় হবে। এই পর্যায়ে গাজার জন্য তিন থেকে পাঁচ বছরের একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করা হবে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো, এই পর্যায়ে গাজার ওপর থেকে ইসরায়েলের সব অবরোধ তুলে নিতে হবে।

ইসরায়েলের প্রতিক্রিয়া কী

আন্তর্জাতিক বিরোধিতা সত্ত্বেও ইসরায়েল মঙ্গলবার রাফাহ থেকে ফিলিস্তিনিদের সরে যেতে বলেছে। ইতিমধ্যেই ইসরায়েলি ট্যাংকবহর রাফাকে ঘিরে ফেলেছে। এ থেকে ইঙ্গিত মেলে, ইসরায়েল হয়তো চুক্তিতে খুব একটা আগ্রহী নয়।

ইসরায়েলি মিডিয়ার প্রতিবেদনগুলোতে বার্তা দেওয়া হচ্ছে, হামাস যে চুক্তিতে সম্মত হয়েছে, তা ইসরায়েলের আলোচনায় ছিল না।

ইসরায়েলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির তাৎক্ষণিকভাবে সোশ্যাল মিডিয়ায় চুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করার এবং রাফা আক্রমণের আহ্বান জানান।

সোমবার রাতে দক্ষিণ গাজায় ইসরায়েল ব্যাপক বিমান হামলা চালিয়েছে।

এদিকে গাজায় বন্দি ইসরায়েলি জিম্মিদের পরিবারের সদস্যরা তেল আবিবে বিক্ষোভ করেছে। তারা তাদের সরকারকে যুদ্ধবিরতি চুক্তি মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

মঙ্গলবার গাজার দক্ষিণাঞ্চল রাফায় ইসরায়েলের হামলার পর ধোয়া উড়তে দেখা যায়। ছবি : রায়টার্স

যুক্তরাষ্ট্র কী বলছে

সাংবাদিকদের বারবার প্রশ্ন সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার ও হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তার মুখপাত্র জন কিরবি এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।

মিলার বলেছেন, হামাসের প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে পর্যালোচনা না করা পর্যন্ত ওয়াশিংটন কোনও সিদ্ধান্ত নেবে না।

হামাস যুক্তরাষ্ট্র-অনুমোদিত প্রস্তাবে সম্মত হয়েছে, নাকি প্রস্তাবের ভিন্ন সংস্করণে সম্মত হয়েছে, তাও বলতে অস্বীকৃতি জানান মিলার।

তিনি বলেন, “আপনারা জানেন, সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস বিষয়টি নিয়ে কাজ করছেন। আমরা আগামী সময়ে আমাদের অংশীদারদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করব।”

জন কিরবি বলেছেন, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে হামাসের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছে। আলোচনাটি একটি সন্ধিক্ষণে রয়েছে, তাই তিনি এমন কিছু বলতে চাননি, যা একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে বিপন্ন করবে।

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা, বিবিসি

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত