Beta
শুক্রবার, ১ মার্চ, ২০২৪

এবার বিআরটিএর তথ্য নিয়ে প্রশ্ন যাত্রী কল্যাণ সমিতির

প্রতীকী ছবি

দেশে সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক চলছেই। গত ১৪ জানুয়ারি বেসরকারি সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তিন দিন পর ১৭ জানুয়ারি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান প্রকাশ করে বলে, যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অতিরঞ্জিত।

এরপর ২৯ জানুয়ারি স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংস্থা নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) জানায়, সড়ক দুর্ঘটনার তারা আর কোনও তথ্য প্রকাশ করবে না। কারণ হিসেবে নিসচার সীমাবদ্ধতা ও পরিসংখ্যান নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হওয়ার কথাও জানান সংস্থাটির চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন।

সর্বশেষ রবিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি আয়োজিত ‘এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে সরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক ডাটা ব্যাংক চাই’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বিআরটিএর পরিসংখ্যান নিয়ে উল্টো প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

সংগঠনটির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী সভায় বলেন, “সড়কের দুর্ঘটনা, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখলে মনে হয় দেশের সড়কে একটি ভয়াবহ যুদ্ধ চলছে। আমাদের সীমিত সামর্থ্যের কারণে প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার ডাটাবেজ সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। তাই সংবাদপত্র তথা সেকেন্ডারি উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার প্রতিবেদন তৈরি করছি। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র আমাদের প্রতিবেদনে উঠে আসে না।

“আমরা মনে করি, দেশের গণমাধ্যমে সড়ক দুর্ঘটনার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত স্থান পায়। সব সংবাদপত্র আমরা মনিটরিং করতে পারি না। তাই ২০ থেকে ২৫ শতাংশের চিত্র তুলে ধরতে পারি। বিআরটিএ এই সেকেন্ডারি সোর্সের তথ্যকে অতিরঞ্জিত বলে বিভিন্ন সময়ে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে।

“কিন্তু প্রাথমিক উৎসগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত অবস্থা কী বা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদনের সত্যতা কী- তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন মনে করছে না। ফলে সরকারের কাছে সড়ক দুর্ঘটনার সঠিক চিত্র পৌঁছায় না। এ কারণে সরকার সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছে না।”

তিনি আরও বলেন, ২০২৩ সাল থেকে প্রথমবারের মতো বিআরটিএ সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এতে দেখা গেছে, বিআরটিএ প্রতিবেদনের সঙ্গে পুলিশের প্রতিবেদন ও যাত্রী কল্যাণ সমিতিসহ বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিবেদনের অমিল রয়েছে।

বিআরটিএর প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে ৫ হাজার ৪৯৫টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৫ হাজার ২৪ জন নিহত, ৭ হাজার ৪৯৫ জন আহত হয়েছে।

পুলিশের প্রতিবেদনে ২০২৩ সালে ৫ হাজার ৯৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪ হাজার ৪৭৫ জন নিহত হয়েছে। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনে ৬ হাজার ২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৯০২ জন নিহত ও ১০ হাজার ৩৭২ জন আহতের তথ্য মিলেছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল রোড সেইফটি রিপোর্ট ২০২৩ এ বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২১ সালে ৩১ হাজার ৫৭৮ জন নিহত হয়েছে।

বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদার কোনও প্রকার খতিয়ে দেখা ছাড়াই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টকে অবাস্তব, যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনকে অতিরঞ্জিত দাবি করেছেন।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব বলেন, বিআরটিএর সড়ক দুর্ঘটনার তথ্য বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া এবং জেলা প্রশাসন ও পুলিশ বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে তৈরি দাবি করা হলেও এখানে কোনও হাসপাতালের তথ্য নেওয়া হয়নি।

বিআরটিএ তাদের সড়ক দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সঠিক দাবি করলেও যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতালের (পঙ্গু হাসপাতাল) জরুরি বিভাগেই ১৪ হাজার ৩৫৭ জন ভর্তি হয়েছে।

একই সময়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৯ হাজার ৮৭৯ জন, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৯ হাজার ২৯৩ জন, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৪ হাজার ৭৮৪ জন ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৩ হাজার ৫৬৩ জন ভর্তি হয়েছে।

সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে গত বছর কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৬ হাজার ৭৪৮ জন ও ৩০০ শয্যা বিশিষ্ট নারায়ণগঞ্জ খানপুর হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ৪ হাজার ৫৮৩ জন ভর্তি হয়েছে।

দেশের এই সাত হাসপাতালেই ২০২৩ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে জরুরি বিভাগে ভর্তির তথ্য মিলেছে ৫৩ হাজার ২০৭ জনের। বিআরটিএর প্রতিবেদনে দেশের একটি বিভাগীয় সদর হাসপাতালে ভর্তি করা সড়ক দুর্ঘটনায় আহতের সংখ্যাও সারাদেশ থেকে তুলে আনতে পারেনি। 

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণে আরও দেখা গেছে, সারাদেশে ৬৪টি জেলা সদর হাসপাতাল প্রতিদিন গড়ে ৮ থেকে ১০ জন, ৮ বিভাগের ১০টি বিভাগীয় বড় হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২০ জন হারে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগী ভর্তি হচ্ছে। সারাদেশে ৮০০০ নিবন্ধিত বেসরকারি হাসপাতালের চিত্রও অনুরূপ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত রোগীর ১৫ শতাংশ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।

মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতি মনে করে বিআরটিএ প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডাটা সংগ্রহ করলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার রিপোর্টের সমপরিমাণ হতাহত ও দুর্ঘটনার তথ্য উঠে আসবে। কিন্তু বিআরটিএ সেকেন্ডারি সোর্স ব্যবহারের কারণে সড়ক দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র তুলে আনতে পারছে না। ফলে দেশের মানুষের জীবন বাঁচাতে সরকার সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারছে না।

“এমন পরিস্থিতিতে এসডিজির লক্ষ্য অর্জনে সরকারি উদ্যোগে বিআরটিএর মাধ্যমে প্রাথমিক উৎস থেকে সড়ক দুর্ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ডাটা ব্যাংক চালুর দাবি জানাচ্ছি।”

একই সঙ্গে ছোট যানবাহন বন্ধ করে নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও স্মার্ট গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী।

সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সড়ক নিরাপত্তা জোটের (শ্রোতা) সভাপতি হোসেন জিল্লুর রহমান।

তিনি বলেন, “এই বিষয়ে কেউ কারও প্রতিপক্ষ নয়। এখানে আলাদাভাবে নিজেকে দেখার কোনও কারণ নেই। বিআরটিএ যে তথ্য দিচ্ছে সেটা পুলিশের দেওয়া। পুলিশের তথ্য ভুল নয়, অসম্পূর্ণ। তবে হাসপাতাল ও পুলিশের তথ্য নিয়ে আমাদের পূর্ণাঙ্গ চিত্র পাওয়া সম্ভব।”

যাত্রী কল্যাণ সমিতির অভিযোগের বিষয়ে জানতে বিআরটিএ চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ মজুমদারের মোবাইল ফোনে একাধিবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি।

গত ১৪ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে নিজেদের তথ্যগুলো ঠিক দাবি করেছিলেন বিআরটিএ চেয়ারম্যান।

তিনি বলেছিলেন, “সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তুলনায় যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অতিরঞ্জিত। যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদনের বিস্তারিত তথ্য জানতে চেয়ে বারবার চিঠি দিয়েছে বিআরটিএ। কিন্তু তারা চিঠির কোনও জবাব দেয় না। তাদের তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে দুর্ঘটনায় নিহতদের তালিকা বিআরটিএকে দিতে সমস্যা কোথায়?”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist