Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

জাবিতে ‘ধর্ষণকাণ্ড’ : এবার প্রশাসনিক ভবনে তালা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবনের সামনে সোমবার অবরোধ চলাকালে বক্তব্য দেন ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাফরুহি সাত্তার। ছবি: সকাল সন্ধ্যা

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বামীকে আবাসিক হলে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতের দাবিতে আন্দোলন চলছে। আন্দোলনের নবম দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন প্রশাসনিক ভবন অবরোধ করে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের প্ল্যাটফর্ম ‘নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ’।

সোমবার সকাল ৯টায় প্রশাসনিক ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান নেন মঞ্চের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। সেখানে নিপীড়নবিরোধী মঞ্চের ব্যানারে অবরোধ লেখা ব্যানার ও প্ল্যাকার্ড ঝুলিয়ে দেন তারা। এসময় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা নতুন পাঁচ দফা দাবিও জানান।   

বেলা ১১টা পর্যন্ত চলে এই অবরোধ। এসময় প্রশাসনিক ভবনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সংশ্লিষ্টদের ফটকের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।

নিপীড়নবিরোধী মঞ্চের পাঁচ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে অছাত্রদের বের করে গণরুম বিলুপ্ত করা, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের আবাসন নিশ্চিত করা, র‌্যাগিং সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনা, যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠা শিক্ষক মাহমুদুর রহমান জনির বিচার নিষ্পত্তিসহ ক্যাম্পাসে নানা অপরাধে অভিযুক্তদের বিচারের আওতায় আনা, ‘ধর্ষণের’ ঘটনায় প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান ও মীর মশাররফ হোসেন হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক সাব্বির আলমের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ তদন্ত করা এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তদন্ত চলাকালে তাদের প্রশাসনিক পদ থেকে অব্যাহতি ও মাদকের সিন্ডিকেট চিহ্নিত করে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা এবং তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া।

প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান নেওয়ার সময় নিপীড়নবিরোধী মঞ্চের সংগঠক ও ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আনিছা পারভীন জলি বলেন, “উপাচার্য গতকালও বলেছেন, আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছি অছাত্রদের হল থেকে বের করার। তিনি যদি আপ্রাণ চেষ্টা করেই থাকবেন, তাহলে এই পাঁচ দিনে অন্তত ৫০০ শিক্ষার্থীকে বের করার কথা। যদি সেটা না পারেন, তাহলে তিনি কোন নৈতিকতার বলে তার পদে আছেন, সেই প্রশ্ন করতে চাই।”

আনিছা পারভীন আরও বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ উল হাসান গত কয়েক বছর ধরে ঘুরে ঘুরে এই পদে আছেন। আমরা জানি না তার মধ্যে বিশেষ কী গুণ আছে? তার কোনও বিশেষ গুণ তো দেখতে পাই না। তিনি নিজেও নিপীড়নের দায়ে অভিযুক্ত; অসংখ্য নিপীড়নের ঘটনাকে উস্কে দিয়েছেন। তাকে বারবার ক্ষমতায় বসিয়ে কী বোঝানো হচ্ছে, আমরা জানি না।”

সিন্ডিকেট সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের কোনও বাস্তবায়ন বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন করতে পারেনি এমন অভিযোগ তুলে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আলিফ মাহমুদ বলেন, “তারা পাঁচ কর্মদিবস সময় চেয়েছে। কিন্তু গতকাল নির্ধারিত সময় শেষ হলেও অছাত্রদের বের করা তো দূরে থাক, প্রশাসন বরং তাদের নিয়ে ভাগবাটোয়ারার মিটিং করছে প্রতিনিয়ত। তাই পূর্বঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে আমরা অবরোধ করছি।”

অবরোধ কর্মসূচিতে আরও বক্তব্য দেন সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক সামছুল আলম সেলিম, ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাফরুহি সাত্তার, প্রাণ রসায়ন ও অনুপ্রাণ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সোহেল আহমেদ, বাংলা বিভাগের অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক জামাল উদ্দিন ও পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। ছবি: সংগৃহীত

৩ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রলীগের নেতা মোস্তাফিজুর রহমান এবং তার সহযোগী মামুসুর রশিদ মামুনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ আনেন এক নারী। তার স্বামী আশুলিয়া থানায় ছয় জনকে আসামি করে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করেন।

মামলার অভিযোগে বলা হয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলসংলগ্ন জঙ্গলে ৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ওই নারী ধর্ষণের শিকার হন।

পরদিন ৪ ফেব্রুয়ারি সাভার মডেল থানা ও আশুলিয়া থানার পুলিশ যৌথভাবে অভিযান চালিয়ে মোস্তাফিজুর রহমানসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে। ওই দিনই ছাত্রলীগ নেতা মোস্তাফিজুর রহমানসহ চার আসামিকে তিন দিন রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেয় ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

মোস্তাফিজুর রহমান জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক। বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ৪৫তম ব্যাচের এই শিক্ষার্থী থাকতেন মীর মশাররফ হোসেন হলে। তিনি শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেলের অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

গ্রেপ্তার অন্যরা হলেন- একই বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সাব্বির হাসান সাগর, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাগর সিদ্দিকী ও হাসানুজ্জামান।

মামলার শুরুতে বাকি দুই আসামি ভুক্তভোগী নারীর পূর্বপরিচিত মো. মামুসুর রশিদ মামুন এবং স্বামীকে আটকে রাখায় সহায়তা ও মারধর করা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী মো. মুরাদ পলাতক ছিলেন। পরে মামুনকে ফার্মগেট ও মুরাদকে নওগাঁ থেকে গ্রেপ্তার করে র‍্যাব।

জানা গেছে, ওই দম্পতির বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি এলাকার বাসায় ভাড়া থাকতেন মামুন। ৩ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় মামুন ভুক্তভোগী নারীর স্বামীকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ডাকেন। ওই নারীর স্বামী বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে অভিযুক্তরা তাকে মীর মশাররফ হোসেন হলের ‘এ’ ব্লকের ৩১৭ নম্বর কক্ষে নিয়ে আটকে রাখেন।

পাশাপাশি তাকে দিয়ে স্ত্রীকে ফোন করান এবং বাসায় মামুনের রেখে আসা জিনিসপত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতে বলেন। স্বামীর ফোন পেয়ে ওই নারী মামুনের জিনিসপত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে যান। পরে জিনিসপত্র হলের কক্ষে রেখে অভিযুক্তরা ওই নারীকে পাশের জঙ্গলে নিয়ে ধর্ষণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে।

ভুক্তভোগী নারী বলেন, “মামুন আমাদের বাসায় ভাড়া থাকতেন। তিনি আমার স্বামীর মাধ্যমে ফোন দিয়ে আমাকে তার রেখে যাওয়া জিনিসপত্র নিয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে বলেন। আমি তার জিনিসপত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে যাই। তখন তিনি আমাদের বাসায় থাকবেন না, মোস্তাফিজ ভাইয়ের কাছে থাকবেন বলে জানান।

“এরপর মামুন আমার কাছ থেকে তার জিনিসপত্রগুলো নিয়ে হলে রেখে আসেন। পরে আমার স্বামী অন্যদিক থেকে আসবে বলে আমাকে হলের সামনে থেকে পাশের জঙ্গলে নিয়ে যান। তার সঙ্গে মোস্তাফিজ ভাইও ছিল। পরে তারা আমাকে ধর্ষণ করে।”

ভুক্তভোগী নারীর অভিযোগ জানাজানি হলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। ঘটনার পরদিন ৪ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্ষোভ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাসে মশাল মিছিল বের হয়। শিক্ষার্থীদের লিফলেট বিতরণ ও জনসংযোগ করতেও দেখা যায়।   

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ। ছবি : সকাল সন্ধ্যা

৫ ফেব্রুয়ারি গঠন করা হয় নিপীড়নবিরোধী মঞ্চ। এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক আনিছা পারভীন জলি বলেন, “আন্দোলন পরিচালনার জন্য রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন, সাধারণ শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মিলে ‘নিপীড়ন বিরোধী মঞ্চ’ তৈরি করা হয়েছে।”

শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের চাপে ৪ ফেব্রুয়ারি এক বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সব কার্যক্রম থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তাকে ছাত্রলীগ থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কারের জন্য কেন্দ্রীয় কমিটিতে সুপারিশও করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে নীতি আর্দশ ও সংগঠনবিরোধী কার্যকলাপে জড়িত থাকার অভিযোগে মোস্তাফিজুর রহমানকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনা খতিয়ে দেখতে ৭ ফেব্রুয়ারি দুই সদস্যবিশিষ্ট সত্যাসত্য যাচাই (ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং) কমিটি গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।

এর আগের দিন ৬ ফেব্রুয়ারি জাবিতে ধর্ষণের অভিযোগের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বিবৃতি দেন দেশের ১৮ বিশিষ্ট নাগরিক।

বিবৃতিতে তারা বলেন, ৩ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত নিকৃষ্টতম অপরাধে তারা হতবাক ও ক্ষুব্ধ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আগেও ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু সেসবের তদন্ত বা সুরাহা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ করেনি। ক্যাম্পাস নিরাপদ রাখতে ও শৃঙ্খলা আনতে কার্যকর পদক্ষেপও নেওয়া হয়নি। এই সুযোগে উচ্ছৃঙ্খল কিছু ছাত্র এ ধরনের অমানবিক ঘটনা ঘটাতে সক্ষম হয়েছে।

বিবৃতিতে স্বাক্ষর করেন হাসান ইমাম, অনুপম সেন, সারওয়ার আলী, রামেন্দু মজুমদার, আবেদ খান, ফেরদৌসী মজুমদার, মামুনুর রশীদ, মফিদুল হক, নাসির উদ্দীন ইউসুফ, মুনতাসীর মামুন, শাহরিয়ার কবীর, কেরামত মওলা, মিলনকান্তি দে, লাকী ইনাম, সারা যাকের, শিমূল ইউসুফ, গোলাম কুদ্দুছ ও আহকামউল্লাহ।

৮ ফেব্রুয়ারি জাবির ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংবাদ সম্মেলন করে র‌্যাব। সেখানে বাহিনীর আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন গ্রেপ্তারকৃত আসামি মামুনের বরাত দিয়ে জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এমন অপকর্ম হামেশাই ঘটছে। অনেক ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীরা ভয়ভীতি ও লোকলজ্জার ভয়ে এসব প্রকাশ করেন না।

কমান্ডার খন্দকার বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা মাদক ব্যবসায়ী, অনৈতিক কাজ করছেন, তাদের প্রবেশের ক্ষেত্রে দায়িত্ব অবশ্যই বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে নিতে হবে। আমরা যাদের গ্রেপ্তার করেছি, তাদের কাছ থেকে যেসব তথ্য পেয়েছি, তা উদ্বেগজনক। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আরও কঠোর হওয়া উচিত।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist