Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪
Beta
রবিবার, ১৪ জুলাই, ২০২৪

অর্থ সঞ্চয়ে জাপানিদের শত বছরের আস্থা কাকেইবো

SS-JAPAN-KAKEIBO-150224 (1)
Picture of সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতির দেশের তালিকায় ১৯০৪ সালে জাপানের অবস্থান ছিল ষষ্ঠ। তখন দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল ১২ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

২০১০ সাল পর্যন্ত জাপান বিশ্বের দ্বিতীয় বড় অর্থনীতির দেশ হিসেবে দাপট ধরে রেখেছিল, তবে ওই বছর চীনের অর্থনীতি জাপানকে ছাড়িয়ে যায়। এরপর থেকে জাপান ছিল বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।

তবে দেশটি ২০২৩ সালের শেষ তিন মাসে মন্দায় পড়েছে, এতে এবার টপকে গেল জার্মানি। ফলে জাপান নামল চতুর্থ অবস্থানে, অর্থনীতির আকার ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়নের মতো। আর জার্মানির অর্থনীতি ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়নের।

তবে বারবার প্রশ্ন উঠে জাপানের অর্থনীতি কেন এত শক্তিশালী? কী কী কৌশল নিয়েছেন দেশটির নীতিনির্ধারকরা?

অনেক কৌশলের মধ্যে একটি হলো জাপানিদের সঞ্চয়ের পদ্ধতি, যা দেশটির অর্থনীতিতে ভূমিকা রেখেছে।

বিশেষ এই পদ্ধতির নাম কাকেইবো, যার অর্থ ‘ব্যয়ের খাতা’। ১৯০৪ সালে জাপানের প্রথম নারী সাংবাদিক হানি মোতোকো এটি আবিষ্কার করেন।

তিনি লক্ষ্য করেছিলেন, জাপানি নারীরা অর্থ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অতটা সচেতন নন। ফলে তারা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় করতেন। হানি মোতোকো কাকেইবো পদ্ধতির মাধ্যমে নারীদের ব্যয় সম্পর্কে সচেতন করার চেষ্টা করেন।

জাপানিদের বার্ষিক আয় অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জাপানিদের এই উচ্চ আয়ের অন্যতম কারণ সঞ্চয় প্রবণতা। ২০২২ সালে তাদের গড় সঞ্চয়ের হার ছিল ৩৫ দশমিক ৭ শতাংশ, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ।

কাকেইবো পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো আয়-ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে সাহায্য করা। এই পদ্ধতি অর্থের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে ও সঞ্চয় বাড়াতে উৎসাহিত করে।

সহজ এই পদ্ধতি অনুসরণের জন্য একটি ছোট খাতা বা ডায়েরির দরকার হয়। এতে প্রতিদিন, সপ্তাহ বা মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা যায়। হিসাবের সময় চাহিদা, উপযোগিতা, আয়, লক্ষ্য ও পরিকল্পনার বিষয় প্রাধান্য পায়। ব্যয় করতে হবে চাহিদার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে, অপ্রয়োজনীয় ব্যয় এড়িয়ে চলার অভ্যেস করা; এমন বিষয়গুলো এই পদ্ধতিতে উল্লেখ থাকে।

পদ্ধতিটি জাপানে বেশ জনপ্রিয়। দেশটির প্রায় ৮০ শতাংশ পরিবার কাকেইবো পদ্ধতি অনুসরণ করে। এ কারণে জাপানিরা তাদের আয়-ব্যয় সম্পর্কে বেশ সচেতন। এতে বেড়েছে তাদের সঞ্চয়ের হার এবং ব্যক্তিগত আর্থিক নিরাপত্তা।

কাকেইবো পদ্ধতির ধরন

এই পদ্ধতির কয়েকটি প্রকারের মধ্যে তিনটি বেশ জনপ্রিয়।

সাধারণ কাকেইবো : সবচেয়ে সহজ হওয়ায় এই পদ্ধতির জনপ্রিয়তাও শীর্ষে। এতে একটি খাতা বা ডায়েরিতে প্রতিদিন, সপ্তাহ বা মাসের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখা হয়। সেখানে তারিখ, খাত, পরিমাণ ও দামের তথ্য লেখা থাকে। খাবার, পরিবহন, আবাসন, বিনোদনসহ অন্য ব্যয়ের বিভাগও অন্তর্ভুক্ত থাকে। আর পরামর্শ হিসেবে থাকে অতিপ্রয়োজনীয় ব্যয় চিহ্নিত করার কথা।

লক্ষ্যভিত্তিক কাকেইবো : দ্বিতীয় জনপ্রিয় এ পদ্ধতিতে সাধারণ কাকেইবোর বিভাগগুলোর সঙ্গে লক্ষ্য এবং পরিকল্পনাও লেখা থাকে। এখানে ব্যয়গুলো বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত। প্রতিটি বিভাগের জন্য একটি লক্ষ্য নির্ধারণ করা যায়। যেমন- একটি নতুন গাড়ি কিনতে প্রতি মাসে কী পরিমাণ সঞ্চয় করতে হবে তা নির্দিষ্ট করা যায়।

অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর কাকেইবো : এই পদ্ধতিতেও আয়-ব্যায়ের হিসাব রাখা হয়। এখানে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর পরিকল্পনায় গুরুত্ব দেওয়া হয়। এক্ষেত্রে কিছু বিকল্প পরিকল্পনা দেওয়া থাকে পরামর্শ আকারে। যেমন- বাড়িতে রান্না না করে বাইরে খেতে গেলে বেশি অর্থ ব্যয় হয়।

কাকেইবো পদ্ধতির আরও কিছু রূপ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সামাজিক ও ডিজিটাল কাকেইবো।

সামাজিক পদ্ধতিতে একজন ব্যক্তি তার আয়-ব্যয়ের হিসাব অন্যদের সঙ্গে শেয়ার করতে পারেন। আর ডিজিটাল পদ্ধতিতে অ্যাপ বা ওয়েবসাইট ব্যবহার করে আয়-ব্যয়ের হিসাব সহজেই রাখা যায়।

জাপানের অর্থনীতিতে কাকেইবোর প্রভাব

কাকেইবো পদ্ধতি দেশটির অর্থনীতিতে শত বছরের বেশি সময় ধরে প্রভাব রেখে চলেছে। পরিবারকেন্দ্রিক ও নারীর অর্থনৈতিক নিরাপত্তায় এর বিশেষ প্রভাব রয়েছে।

জাপানের পরিসংখ্যান ব্যুরো প্রতি বছর তাদের অর্থনীতির পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে, জাপানের ব্যক্তিগত আয়ের তুলনায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের হার ছিল ৭০ দশমিক ৩ শতাংশ। অর্থাৎ জাপানিরা ১০০ ইয়েন আয়ের বিপরীতে ৩০ দশমিক ৭ ইয়েন সঞ্চয় করতে পেরেছে। এই হার বিশ্বে সর্বোচ্চ।

জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক প্রতি বছর দেশটির ঋণের পরিমাণ প্রকাশ করে। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, দেশটির মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ২৫৫ দশমিক ৯ ট্রিলিয়ন ইয়েন, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ কম।

কাকেইবো পদ্ধতির আগেও জাপানিরা আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখতো। সেক্ষেত্রে তারা ছোট কাগজের টুকরোতে হিসাব লিখতেন। এর বাইরে সিরিও কাগজ ব্যবহৃত হতো। এটি হলো একটি নির্দিষ্ট আকার ও রংয়ের কাগজ। প্রথম খ্রিষ্ট্রীয় শতাব্দীতে জাপানে এটি তৈরি হয়েছিল। ভিন্ন রংয়ের সিরিও কাগজে আলাদা আলাদা হিসাবের খাত উল্লেখ থাকতো।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত