Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪
Beta
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৪

কার্পেট বুননে এআই : ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির মেলবন্ধন

কার্পেট হাতে কাশ্মিরী এক বিক্রেতা।
কার্পেট হাতে কাশ্মিরী এক বিক্রেতা।
Picture of সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

সকাল সন্ধ্যা ডেস্ক

কাশ্মিরী কার্পেট মানেই হাতের বুনন, প্রাকৃতিক রং আর নৈসর্গিকতা। বৈশ্বিক চাহিদা বিবেচনায় কাশ্মীরের এই শিল্পটি কয়েক বছর আগেও বেশ হুমকির মুখে ছিল। ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভিতে উঠে এসেছিল কার্পেট শিল্পীদের দুর্দশার চিত্র। কিন্তু দিন পাল্টেছে। তাদের অবস্থা ক্রমেই উন্নত হচ্ছে।

কাশ্মীরের কার্পেট শিল্পীদের এই উন্নতির পেছনে আছে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ব্যবস্থা, এমনটাই দাবি করা হয়েছে বিবিসি এক প্রতিবেদনে।

দেখতে সরল সুন্দর মনে হলেও, এসব কার্পেট বুননের পেছনে আছে শতাব্দী প্রাচীন কৌশল আর ঐতিহ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তারা এই কৌশল আগলে রেখেছেন। আমলের পর আমল বদলেছে, কিন্তু তাদের বুনন কৌশল অবিকৃতই রয়ে গেছে।

কাশ্মিরী কার্পেটগুলো বুনন ও এর জটিল নকশার পেছনে আছে প্রাচীন এক প্রতীকী কোড। স্থানীয়রা একে বলেন ‘তালিম’। নকশা থেকে শুরু করে শিল্পীদের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানেও ব্যবহৃত হয়ে আসছে এটি। কখনও বংশ পরম্পরায়, আবার কখনও প্রিয় শিষ্যকে ওস্তাদরা শিখিয়ে আসছেন তালিম পদ্ধতি।

তেমনই একজন কার্পেট শিল্পী মোহাম্মদ রফিক সোফি। বাবার সঙ্গে আট বছর বয়স থেকে শুরু করেন কার্পেট বোনা। তার বয়স এখন ৫৭। ঠিকঠাক বুননের কাজ শিখতে তার পাঁচ বছরের বেশি সময় লেগেছিল।

গত পঞ্চাশ বছরে এই শিল্পের অনেক কিছু বদলে গেছে। শুরুর দিকে একটি কার্পেটের পুরো বুনন শেষ হতে ছয় মাসের বেশি সময় লাগতো। এখন কিন্তু তা লাগছে না।

তালিম।

প্রচলিত পদ্ধতিতে, কার্পেট বুনন শুরুর আগে নকশাকার আগে একটি নকশা আকেন। এরপর একজন তালিম বিশেষজ্ঞ সেই নকশাকে ছোট ছোট অংশে বিভক্ত করেন। এরপর সেগুলো কারিগরদের কাছে পাঠিয়ে দেন। মজার বিষয় হল- ওই ছোট ছোট নকশাগুলো যে কোড দিয়ে লেখা হয় তা শুধু সংশ্লিষ্টরাই বুঝতে পারেন। অনুমোদিত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ যেন বুঝতে না পারেন, তাই এই পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়।

কোডের সেই অংশগুলো মূলত সোফি বা তার মতো অন্য কারিগরদের জন্য প্রস্তুত করা হয়। এই কোড দেখেই তারা বুঝে যান কোথায়, কিভাবে সুতো বাঁধতে এবং কোন রং ব্যবহার করতে হবে। কোডের এক একটি অংশ তৈরি করা হয় কার্পেটের ছোট কোনও অংশের জন্য। ফলে পুরো কার্পেটের জন্য অনেক কোড তৈরি করতে হয়। এর বাইরে নকশাকার ও কারিগরদের আলাপের জন্য ভিন্ন ভিন্ন কোডও থাকে।

এই প্রক্রিয়ায় ভুল খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। আর সংশোধন করতেও অনেক সময় লাগে। কিন্তু এখন গোটা প্রক্রিয়াটিই অনেক সহজ করে দিয়েছে কম্পিউটার সফটওয়্যার। সোফি এখন এর কল্যাণে ছয় সপ্তাহে একটি কার্পেট বুনতে পারেন।

বুনন ও গিট বাঁধার কাজ এখনও হাতেই করা হয়। তবে কার্পেট ও গালিচার জন্য নকশা ও তালিম কোড এখন তৈরি করে দেয় সফটওয়্যার। ফলে এখন ছোট ছোট অংশের পরিবর্তে পুরো নকশার তালিমই এখন দেখা যায় একসঙ্গে। কোনও সমস্যা থাকলে তা আগেই চিহ্নিত করা যায়। এতে সংশোধনের ক্ষেত্রে সময়ও কম লাগে।

জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের তাঁত ও হস্তশিল্পের পরিচালক মেহমুদ শাহ বলেন, “এই উদ্ভাবনের ফলে কার্পেটের শৈল্পিকতা নষ্ট হচ্ছে না। কার্পেট হাতেই বোনা হচ্ছে। কিন্তু প্রক্রিয়াটি আগের চেয়ে সহজ হয়েছে। নকশা এখন দ্রুত পাওয়া যাচ্ছে।”

প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে এই প্রক্রিয়াটিকে আরও উদ্ভাবনী করে তুলেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ভার্চুয়াল অ্যাসিস্ট্যান্স হল একটি সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান। এর কাজ তথ্য বিশ্লেষণ করা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান পরিচালক অ্যাবি ম্যাথিউ। তার এই প্রতিষ্ঠান কার্পেট ও তালিম কোডের ছবি দেখিয়ে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষিত করছে।

এআইয়ের এই ব্যবস্থাটি এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। এখনও একজন মানুষকে তালিম লিখে দিতে হয়। তবে ম্যাথিউর মতে, কারিগররা তালিমকে এখন আগের চেয়ে দ্রুত বুঝতে পারে। এতে কার্পেট উৎপাদনেও সময় কম লাগবে।

তালিম দেখে কার্পেট বুনছেন এক কাশ্মিরী কারিগর।

তিনি আরও বলেন, “কারিগররা এখন নতুন নকশা সহজেই পরীক্ষা করতে পারেন। পাশাপাশি সমসাময়িক রুচি অনুসারে ধ্রুপদী কারুকাজকে আরও হালনাগাদ করে নিতে পারবেন।” ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কার্পেটের চাহিদাও বাড়ছে। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্প ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে হিমশিম খাবে বলেও তিনি মনে করছেন।

ম্যাথিউ বলেন, “গ্রাহকদের চাহিদার পরিবর্তন হচ্ছে। এখন তারা এমন কার্পেট চায় যা ফ্যাশনেবল, টেকসই এবং কম রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন। তবে ঐতিহ্যবাহী কার্পেট তৈরির পদ্ধতি বেশ শ্রমসাধ্য ও ধীরগতির। ফলে এই চাহিদা পূরণ করতে পারে না।”

আদিত্য গুপ্তা ৩২ বছর আগে ‘রাগ রিপাবলিক’প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার কর্মী নিয়ে মাসে ১৫ হাজার গালিচা তৈরি করে প্রতিষ্ঠানটি।

তিনি বলেন, “তুরস্ক ও চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী কারখানাগুলির কাছে ভারতীয় গালিচা ও কার্পেট শিল্প কঠিন প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে। আমাদের সবচেয়ে নতুন উৎপাদন কৌশল গ্রহণ করে এগিয়ে যেতে হবে। প্রত্যেক শিল্পেই উদ্ভাবন খুব গুরুত্বপূর্ণ।

“ভারতীয় কার্পেট শিল্প একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ, এখানে শুধু নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারে এগিয়ে যাওয়া নয়, বরং পুরাতন ও নতুনকে হাতে হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান উদ্ভাবনের লক্ষ্য হলো এমন নকশা তৈরি করা যা মেশিন দিয়ে অনুকরণ করা যাবে না। তবে একই সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী কৌশল ব্যবহার করতে হবে।”

রাগ রিপাবলিক নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে কার্পেটের নকশা, ধোয়া-শুকানো এবং আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণের জন্য। এছাড়াও তারা ঐতিহ্যবাহী উলের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহৃত জিন্স, তুলা এবং চামড়া দিয়েও কার্পেট তৈরির পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাচ্ছে। তবে এত কিছুর পরেও আদিত্য গুপ্তা পুরনো পদ্ধতির মূল্য দেন।

কার্পেট ও গালিচা বিক্রির স্টল।

“উৎপাদনের ক্ষেত্রে ঐতিহ্যবাহী এবং হাতের কাজের উপর জোর দেওয়া উচিত। কারণ এটিই গ্রাহকদের কাছে প্রধান আকর্ষণ।”

এই শিল্পের উন্নয়নে সাহায্য করেছে একটি অফিসিয়াল ট্যাগিং ব্যবস্থা। এতে হাতে বোনা কাশ্মীরি কার্পেটকে চিহ্নিত করা সহজ হয়। কিউআর কোড স্ক্যান করে ক্রেতারা কার্পেটের নকশাকার ও এটি কীভাবে তৈরি হয়েছে তা যাচাই করতে পারেন।

কার্পেট নকশাকার শাহনওয়াজ আহমদ মনে করেন, কাশ্মিরের হস্তশিল্প বিভাগ এই পদক্ষেপ না নিলে হাতে বোনা কার্পেটের ব্যবসা কয়েক বছরের মধ্যেই হারিয়ে যেত।

কার্পেট শিল্প কাশ্মীরের স্থানীয় অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এতে ওই অঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ জড়িত। তারা সম্মিলিতভাবে বছরে ২৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের কার্পেট ও গালিচা উৎপাদন করেন।

কার্পেট তৈরির ক্ষেত্রে যেসব উন্নয়ন হয়েছে তা ফিরোজ আহমদ ভাটের মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের আশার আলো দেখাচ্ছে। গত ত্রিশ বছর ধরে তিনি কার্পেট বুনছেন।

তিনি বলেন, “ছোটবেলায় আমাদের রোজগার ভালোই ছিল। অনেকে এই পেশার সঙ্গে যুক্ত ছিল। কিন্তু একটা সময়ে মজুরি অনেক কমে যায়। কিন্তু নতুন নকশা চালু হওয়াতে কাজের গতি আবার বেড়েছে। এখন আবার ফুলেফেঁপে উঠছে ব্যবসা।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত