Beta
সোমবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪

সেই তরুণীর ‘খোঁজ নেই’

গত ২৭ জানুয়ারি শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি হন ২৮ বছর বয়সী ওই তরুণী।

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান গাজী এজাজ আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা তরুণীর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না চারদিন ধরে।

পুলিশ বলছে, ওই তরুণী বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। মামলা করতে ‘না চাওয়ায়’ রোববার সন্ধ্যায়ই পরিবারের জিম্মায় তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।

তবে স্বজনরা বলছেন, ওই তরুণী এবং তার মা-মামী বাড়ি ফেরেননি। পুলিশের ধারণা, তরুণীর স্বজনরা তাদের অবস্থান জানলেও স্বীকার করছেন না।

ঘটনার দিন ওই তরুণী গোলাম রসূল নামে একজনকে ভাই পরিচয় দিয়ে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) গিয়েছিলেন।

সেই গোলাম রসূলও এখন উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজ আহমেদের পক্ষ নিয়েছেন। বলছেন, উপজেলার আরেক আওয়ামী লীগ নেতা মোস্তফা সরোয়ারই তাকে এ কাজে ইন্ধন দেন। মোস্তফা সরোয়ার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

গত ২৭ জানুয়ারি শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ভর্তি হন ২৮ বছর বয়সী ওই তরুণী।

তখন তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ডুমুরিয়া উপজেলার চেয়ারম্যান গাজী এজাজ আহমেদ শনিবার ডুমুরিয়ার চেচুঁড়ি বাজারে তার ব্যক্তিগত অফিসে ডেকে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। তরুণী আরও বলেন, চেয়ারম্যানের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বেশ কয়েকবার শারীরিক সম্পর্ক হলেও চেয়ারম্যান তাকে বিয়ে করতে রাজি নন।

পরদিন ২৮ জানুয়ারি রোববার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে ধর্ষণের অভিযোগ আনা ওই তরুনীকে তার মা ও মামার কাছে ছাড়পত্র দিয়ে হস্তান্তর করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। তারা ওসিসির ফটক থেকে বের হওয়ামাত্র তাদের দুটি মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যায় কিছু যুবক।

এ সময় সেখানে থাকা মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক ও সাধারণ মানুষদের লাঞ্চিত করে ওই যুবকরা। এতে উত্তেজিত জনতা উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজের আত্মীয় রুদাঘরা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. তৌহিদুজ্জামানকে আটকে পুলিশে দেয়।

রবিবারই সন্ধ্যা ৭টার দিকে খুলনার সোনাডাঙ্গা মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আমিনুল ইসলাম, খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির সামনে থেকে তৌহিদুজ্জামানকে আটক করে নিয়ে যায়। এ সময় তিনি বলেন, এ বিষয়ে অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তৌহিদুজ্জামান দাবি করেন, তিনি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। ওসিসির সামনে ভিড় দেখে চলে আসেন। তিনি কাউকে ধাক্কা দেননি, কারও সঙ্গে খারাপ ব্যবহারও করেননি।

সেদিন ঘটনাস্থলে ছিলেন মানবধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট মোমিনুল ইসলাম। সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “মেয়েটিকে জোর করে নিয়ে গেছে। ফিল্মি স্টাইলে তারা ছিনিয়ে নিয়ে গেছে। আমরা কথা বলতে গেলে আমাদের উপর চড়াও হয়েছে। এ সময় তোহিদুজ্জামানকে হাতেনাতে আটক করা হয়।”

২৮ জানুয়ারি রবিবারই রাত সাড়ে ১১টার দিকে সোনাডাঙ্গা মডেল থানায় সেই মাইক্রোবাস দুটিতে করে ওই তরুণী ও তার মাকে নিয়ে আসা হয়। এ সময় তাদের সঙ্গে উপজেলা চেয়ারম্যানে এজাজের অনুসারীদের দেখা যায়। তাদের উপস্থিতিতে ওই তরুণী জানান, তিনি অপহরণের শিকার হননি। তারা স্বেচ্ছায় যশোরের কেশবপুরে মামাবাড়ি গিয়েছিলেন। সেখান থেকে পুলিশের ফোন পেয়ে থানায় এসেছেন।

এসময় উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজের সঙ্গে তার সম্পর্ক ও ধর্ষণের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। ওই তরুণী জানান, এজাজ আহমেদের সঙ্গে তার পূর্বপরিচয় আছে। জমির দলিল সম্পর্কিত কাজে তিনি তার কাছে যেতেন। এইটুকু বলে বলেন, “আমি অসুস্থ, সুস্থ হয়ে আপনাদের সকল প্রশ্নের উত্তর দিব।”

এ সময় সোনাডাঙ্গা মডেল থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. আমিনুল ইসলাম জানান, অপহরণের কোনও ঘটনা না ঘটায় তৌহিদুজ্জামানকে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। আর মেয়েটি ও তার পরিবার ডুমুরিয়ায় তাদের বাড়ি চলে যাচ্ছে।

রবিবার রাতের ওই ঘটনার পর বৃহস্পতিবার এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত ডুমুরিয়ার চেঁচুড়ির মামাবাড়ি পৌঁছাননি ওই তরুণী, তার মা ও মামী। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তার এক আত্মীয় জানান, এখনও তারা তাদের বাড়িতে ফেরেনি।

ওই আত্মীয় বলছেন, ওই তরুণী ডুমুরিয়ার চেঁচুড়ীতে তার মামাবাড়িতিই থাকেন। তার বাবা ও মা আদালা হয়ে গেছেন অনেক দিন। তার বড় বোনের বিয়ে হয়ে গেছে।

জানতে চাইলে ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুক্তান্ত সাহা বলেন, “থানায় কোনও অভিযোগ নেই। আমরা এ বিষয়ে কিছু জানি না।”

গত ২৭ জানুয়ারি খুলনার হাসপাতালে ভর্তির সময় গোলাম রসূল ওই তরুণীর ভাই পরিচয় দিলেও ৩০ জানুয়ারি তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজের বিরুদ্ধে ‘অপপ্রচারের প্রতিবাদে’ ডুমুরিয়ায় আয়োজিত মানববন্ধনে অংশ নেন।

গোলাম রসূল দাবি করেন, ধর্ষণের অভিযোগ আনা ওই তরুণীকে তিনি চেনেনই না। মোস্তফা সরোয়ার নামে একজন তাকে ফোন করে হাসপাতালে যেতে বলেন। তার কথায় তিনি হাসপাতালে যান, ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে মিথ্যা কথা বলেন।

মানববন্ধনে অন্য বক্তারাও মোস্তফা সরোয়ারের দিকে আঙ্গুল তুলে বর্তমান চেয়ারম্যানকে নির্দোষ দাবি করেন।

উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজ আহমেদ ও এজাজ আহমেদ দুই জনই আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত। গুটুদিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোস্তফা সরোয়ার স্থানীয় একটি দৈনিকের সম্পাদক।

উপজেলা চেয়ারম্যান এজাজ আহমেদ বলছেন, এ বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। মেয়েটি কোথায় আছে- এ বিষয়ে পুলিশ ও মেয়েটির আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কথা বলতে বলেন তিনি।

“আমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এমন ষড়যন্ত্র যেন কেউ কারও সঙ্গে না করে”, বলেন এজাজ আহমেদ। 

২৮ জানুয়ারির ঘটনার দিন তার ভাই আটক হওয়া ও তার লোকদের হাসপাতাল ও থানায় উপস্থিত থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে ডুমুরিয়ার উপজেলা চেয়ারম্যান বলেন, “আমি কিছু জানি না। কে, কেন, কোথায় ছিল? তা আমি জানি না। কারণ ওখানে আমি ছিলাম না। ঐ মেয়েও বলেছে তাকে অপহরণ করা হয়নি। সেটি আপনারা সাংবাদিকরাই প্রচার করেছেন।”

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ভাই পরিচয় দেওয়া গোলাম রসূলকে ইঙ্গিত করে মোস্তফা সরোয়ার বলেন, “আমাকে অপরিচিত এক নাম্বার থেকে একজন ফোন করে বলে, তার বাড়ি ধামালিয়া, তার বোন ধর্ষণের শিকার হয়েছে।

“আমি কী করতে পারি? তখন তিনি বলেন, আপনি থানায় যেতে পারেন। সেই সময়ে অপরপাশ থেকে বলে, থানায় নিলে প্রমাণ চাইবে। সে ক্ষেত্রে আমরা কী করতে পারি?”

মোস্তফা সরোয়ার বলেন, তখন তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন।

“ওই ব্যক্তি সাংবাদিকদের হেল্প চাইলে আমি আমার সহকর্মীদেরও জানাই। পরে আমার সহকর্মীরা ও ওই ব্যক্তি আমাকে ফোন দিয়ে হাসপাতালে ডাকলে আমি সেখানে যাই। সেখানে ওই মেয়েসহ কয়েকজনকে পাই। তারা সবাই আমার অপরিচিত। আমি তখন পেশাগত কারণে তাদের সাক্ষাৎকার নেই। তখন আরও গণমাধ্যমের কর্মীও সেখানে ছিলেন।

“যারা বলছেন আমি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণে বর্তমান চেয়ারম্যান এজাজ আহমেদকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছি, তারা কি দেখছে না সাক্ষাৎকার নেওয়ার সময় আমি এজাজ আহমেদের পক্ষ নিয়েও ভিকটিমকে প্রশ্ন করেছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমি এলাকার একজন সাবেক জনপ্রতিনিধি, দৈনিক পত্রিকার সম্পাদক। সেই হিসেবে আমাকে একজন ফোন দিয়ে সাহায্য চেয়েছে, আমি সাহায্য করেছি। এর সঙ্গে আমার কোনও রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত কারণ নেই।”

মোস্তফা সরোয়ার বলেন, “অনেকেই বলছেন, আমি গতবার নৌকা মার্কা নিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছি। এবারও নির্বাচন করতে পারি। এ কারণে নির্বাচনের আগে এই ষড়যন্ত্র। আমি নির্বাচন করব কিনা- সে বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্ত নেইনি বা কোনও কার্যক্রম করছিও না। এখানে কোনও ষড়যন্ত্র নেই।”

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসির চিকিৎসক ডা. সুমন রায় জানান, মেয়েটি তাদের কাছে গেলে তারা প্রথমে ডুমুরিয়া থানাকে জানায়। মেয়েটির নানা ধরনের মেডিকেল পরীক্ষা করেন।

এরপর মেয়েটি জানান, তিনি থানায় অভিযোগ করতে চান না। কারণ সেখানে চেয়ারম্যান প্রভাব ফেলতে পারেন; তাই আদালতে অভিযোগ করবেন। এ কথাও ডুমুরিয়া থানাকে জানানো হয়।

ডুমুরিয়া থানা পুলিশ জানায়, থানায় ধর্ষণের কোনও অভিযোগ নেই। এরপর যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় পুলিশ সুপারের সঙ্গে। তাকে না পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগের পর ডুমুরিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ওসিসিতে যান এবং ওই তরুণীর সঙ্গে কথা বলেন। এ সময়ও তিনি আদালতে মামলা করতে চান। তখন পুলিশের পরামর্শে তাকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

চিকিৎসক ডা. সুমন রায় বলেন, “আমরা মামা ও মায়ের কাছে ছাড়পত্র দিয়ে তাকে ছেড়ে দিয়েছি।”

ডুমুরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুকান্ত সাহা জানান, এ বিষয়ে কিছুই তিনি জাননে না। তিনি ছুটিতে ছিলেন।

পুরো বিষয় নিয়ে জানতে খুলনার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাঈদুর রহমানের সঙ্গে কথা বলেছে সকাল সন্ধ্যা।

তিনি বলেন, “আমরা ভিকটিমকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি। পুলিশ ভিকটিমের আত্মীয়ের কাছে ভিকটিম, তার মা ও মামীর সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল। কিন্তু তারা কিছু জানেন না বলেছে।”

ধর্ষণ, অপহরণ বা নিখোঁজ কোনও বিষয়ে কোনও অভিযোগ তাদের কাছে নেই বলেও জানান পুলিশ সুপার।

তিনি আরও বলেন, “আমরা তাদেরকে কোনও অভিযোগ থাকলে থানায় এসে করতে বলেছি। পুলিশ মনে করছে, মেয়েটির পরিবার মেয়েটি কোথায় আছে জানে। তারা হয়তো যে কোনও কারণেই হোক শিকার করছেন না। তারপরও পুলিশ ভিকটিমকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

ad

সর্বাধিক পঠিত

Add New Playlist